‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামক এক স্যাটায়ারমূলক ফেসবুক পেজ থেকে জন্ম নেওয়া ভারতের সাম্প্রতিক শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞই নজিরবিহীন বলে গণ্য করেছেন। আপাতদৃষ্টিতে এই পার্টির জন্ম ও পরিচালনাকে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত অভিনব মনে হলেও, বিগত দশকে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে বিভিন্ন ইস্যু ও সংকটকে ঘিরে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম-ভিত্তিক আন্দোলনের দৃষ্টান্ত দেখা গেছে।
ইউরোপের ঠিক মধ্যভাগে ইতালি, সুইডেন, জার্মানি, চেক প্রজাতন্ত্র, স্পেন ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলোতে এই ধরনের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম-ভিত্তিক আন্দোলন গড়ে তোলার নিদর্শন রয়েছে। এমনকি সেই সব আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর সংশ্লিষ্ট দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া থেকে শুরু করে সরকার গঠন করার নজির পর্যন্ত রয়েছে।
ইতালির ‘ফাইভ স্টার মুভমেন্ট’, সুইডেন, জার্মানি ও চেক প্রজাতন্ত্রের ‘পাইরেট পার্টি’, স্পেনের ‘পোদেমোস’, ফ্রান্সের ‘লা ফ্রান্স ইনসুমিজ’ ইত্যাদি দলগুলোর উত্থান ও রাজনৈতিক নীতি-প্রক্রিয়া পুরোটাই অনলাইন-ভিত্তিক। ভারতের ককরোচ জনতা পার্টিকেও এই ধারার রাজনৈতিক দল হিসেবে গণ্য করলে ভুল হবে না; যদিও অধিকাংশ তাত্ত্বিক ও রাজনীতি বিশেষজ্ঞ একে ‘রাজনৈতিক দল’ বলতে এখনো কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত। কিন্তু বাস্তবিকভাবে, এই প্ল্যাটফর্ম বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত।
এই ধারার রাজনৈতিক দল বা প্ল্যাটফর্মের দুটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথমত, রাজনৈতিক দল গঠনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সদস্য সংগ্রহ ও জনসম্পৃক্ততা—পুরোটাই অনলাইন ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম-ভিত্তিক। দ্বিতীয়ত, এই রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে যারা ছিলেন বা আছেন, তাদের প্রায় সকলেই ‘অরাজনৈতিক’ ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা। অর্থাৎ, অরাজনৈতিক শিক্ষার্থী এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের সম্মিলনে এই রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান হয়েছে।
তাই এই দলগুলোর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরের আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট একটি আদর্শকে ঘিরে নয়, বরং নিত্যদিনের সংকট ও ইস্যুকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও বিশ্লেষকগণ তাই এই দলগুলোকে প্রথাগত রাজনৈতিক তত্ত্বের ছকে না ফেলে বরং ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন।
একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, বিশেষ করে ২০০৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংঘটিত আন্দোলনগুলো পর্যবেক্ষণ করলে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে—তা হলো প্রায় সবকটি আন্দোলনই প্রথাগত রাজনৈতিক নেতৃত্বহীন। পাশাপাশি, এই আন্দোলনগুলোর বেশিরভাগই নিত্যদিনের কোনো না কোনো সংকটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। আরব বসন্তের পাশাপাশি ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এই ধরনের নেতৃত্বহীন আন্দোলনের বিপুল উদাহরণ পাওয়া যায়।
আন্দোলনগুলোর ধরন মোটামুটি এক হলেও একেকটির ফলাফল ও পরিণতি ভিন্ন। বিগত দশকের এই আন্দোলনগুলোর মধ্য দিয়ে খোদ রাজনৈতিক ডিসকোর্স ও ব্যবহারিক রাজনীতির ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্যগুলো ফিকে হয়ে এসেছে। দল-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক চর্চার যে প্রথাগত সংজ্ঞা, সেই মোতাবেক এই আন্দোলনগুলোর পরিণতি বিশ্লেষণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রথাগত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজনীতি করার অভ্যাসের বদলে বরং আন্দোলনের মধ্য দিয়েই মানুষের রাজনৈতিক চর্চা ও চিন্তার বিকাশ ঘটতে দেখা যাচ্ছে।
প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি তথা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মাঝে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক জীবন আর সীমাবদ্ধ থাকছে না। কেবল ভোট দিয়ে এবং সংসদীয় প্রতিনিধি নির্বাচন করেই মানুষ এখন আর সন্তুষ্ট থাকছে না; বরং বিভিন্ন ইস্যুকে ভিত্তি করে অপ্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে রাজনৈতিক মতামত ও অধিকার চর্চার এক নতুন চল লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
রাজনীতির জগতে চলমান এই প্রবণতাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বেশ সূক্ষ্ম ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখছেন। ব্রিটিশ রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ অ্যান্টন ইয়াগারের মতে, এটা সম্পূর্ণই একটি ‘হাইপার-পলিটিক্যাল’ অবস্থা। অর্থাৎ, মানুষ এখন তার রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের মাঝে কোনো ফারাক রাখছে না, বরং সবকিছুকেই রাজনৈতিক দৃষ্টিতে দেখছে ও রাজনীতিকরণ করছে।
অন্যদিকে বেলজিয়ান প্রখ্যাত রাজনৈতিক তাত্ত্বিক শঁতাল মুফের মতে, প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতির বাইরে আন্দোলন-নির্ভর যে অবস্থানকে আগে ‘সাধারণ অরাজনৈতিক আন্দোলন’ হিসেবে অভিহিত করা হতো, তা আসলে খোদ রাজনীতিরই এক নতুন রূপ। মুফে মনে করেন, শুধু ভোট দিয়ে সংসদে প্রতিনিধি প্রেরণের মাধ্যমে এই সময়ের মানুষ নিজের রাজনৈতিক জীবনকে সীমিত করতে চায় না। বরং নানারকম আন্দোলন, সংগ্রাম ও দাবিদাওয়ার মধ্য দিয়ে তারা এক ধরনের ‘রেডিক্যাল ডেমোক্রেসি’ চর্চায় আগ্রহী।
ফলে নাগরিকত্বের ধারণা এখন শুধু ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; একজন নাগরিক হিসেবে মানুষ সংসদের বাইরের পরিসরেও রাজনৈতিক মতামত ও অধিকার চর্চা করে, যাকে সে তার নাগরিকত্বের মৌলিক অংশ বলেই মনে করে। ফলে এখানে রাজনৈতিকতার পাশাপাশি নাগরিকত্বের প্রথাগত সংজ্ঞাতেও একটি ভাঙন লক্ষ করা যায়। মুফ-কথিত এই সংসদের বাইরের পরিসর মানেই কেবল কোনো সামাজিক বা সংগঠিত প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও হতে পারে। ভারতের ককরোচ জনতা পার্টি এর একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন।
অন্যদিকে, ইতালীয় তাত্ত্বিক পাওলো গেরবাওদো মনে করেন, এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক মতামত চর্চা, দল গঠন এবং আন্দোলন গড়ে তোলা প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির জন্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। এখানে যেমন প্রতিনিধিত্বের সংকট তৈরি হয়, তেমনি এমন রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক তৈরি হয় যা আপাতদৃষ্টিতে সামাজিক মনে হলেও তা গভীর অর্থে রাজনৈতিক কর্মসূচিরই নামান্তর।
রাজনীতির একটি মৌলিক উপাদান হলো রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা। গেরবাওদোর মতে, ডিজিটাল ও সামাজিক মাধ্যমে রাজনৈতিক চর্চাগুলো মূলত ইস্যু-ভিত্তিক হয়। একেক ইস্যুতে একেক গ্রুপ বা ব্যক্তির অবস্থান একেক রকম হতে পারে। ফলে প্রথাগত অর্থে প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠন না গড়ে উঠলেও এই নেটওয়ার্কগুলো রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য নিয়েই সক্রিয় থাকে, যার প্রভাব বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিসরে গভীরভাবে পড়ে।
ককরোচ জনতা পার্টি সাম্প্রতিক সাফল্যের পরেও তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। তবে তারা এখনই প্রথাগত রাজনৈতিক দলের পথে হাঁটছে না, বরং নতুন ধরনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তারা ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা এখন ভারতের সাধারণ মানুষের বিভিন্ন সংকট ও সমস্যার কথা শুনবে। ইতোমধ্যে, ভারতের নির্বাচনে ভোট কারচুপির বিরুদ্ধে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। গতবারের মতো এবারো তাদের আন্দোলনে বিপুল পরিমাণে তরুণ-তরুণীরা অংশগ্রহণ করেছে।
অর্থাৎ, প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে তাদের আগ্রহ না থাকলেও তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের সাথে কাজ করার আকাঙ্ক্ষা তীব্র। ফলে একে কেবল ‘সিভিল সোসাইটি’ কিংবা ‘প্রেশার গ্রুপ’ আখ্যা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা মুশকিল। কারণ, এই দলটি ইতোমধ্যে একটি বিশাল আন্দোলন গড়ে তুলেছে যার প্রভাব ভারতজুড়ে অনুভূত হয়েছে এবং একটি শক্তিশালী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা জনগণের সাথে যুক্ত রয়েছে।
এই দলটিকে ‘অরাজনৈতিক’ বলার সুযোগ নেই; কারণ আন্দোলন সমন্বয় করা এবং সফলতার পরেও প্রথাগত রাজনীতিতে না জড়িয়ে বরং ‘অতি-রাজনৈতিক’ কর্মসূচিতে নিজেদের যুক্ত করার যে সাংগঠনিক রূপরেখা তারা পেশ করেছে, তা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেরই অংশ। এর ফলে রাজনীতি ও রাজনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত প্রচলিত ধারণা ও ডিসকোর্সে একটি সুপ্ত পরিবর্তন বা ভাঙন ধরছে বললেও অত্যুক্তি হবে না।
যেকোনো আন্দোলনের নেপথ্যে থাকা নেতৃত্বদানকারীদের নতুন রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অথবা আন্দোলন সফল হওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্ম হয়। প্রথাগতভাবে প্রশ্ন ওঠে—এই নতুন শক্তি কি রাজনৈতিক দল গঠন করে নির্বাচনী কাঠামোতে অংশ নেবে কি না? বিগত দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হয়েছে, তারা প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছে, এমনকি সরকারও গঠন করেছে।
কিন্তু ককরোচ জনতা পার্টির বর্তমান কর্মসূচি আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে যে, রাজনীতি কি আদৌ তার প্রথাগত কাঠামোতে আছে? অথবা ককরোচ জনতা পার্টির আগামী দিনের কর্মসূচিকে মুফ-কথিত ‘রেডিক্যাল ডেমোক্রেটিক’ রাজনীতি বলা যাবে কি না? সেই সাথে, প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির যে কাঠামো কেবল নির্বাচনী রাজনীতির দ্বারা নির্ধারিত, তার মাঝেই কি সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার সীমাবদ্ধ থাকবে? এই প্রশ্নগুলো বর্তমানে গভীরভাবে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে।
