গাবতলীতে বস্তিতে আগুন, অন্যদিকে সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের প্রধানের পদত্যাগের দাবীতে কর্মচারীদের ঘেরাও, পরবর্তীতে সেনা সদস্যদের সহায়তায় তাকে “বের করে নিয়ে আসা”, সবই ৫ মার্চের ঘটনা। অথচ আমাদের চোখ পড়ে ছিলো অন্যদিকে। আমাদের চোখ হয়তো বা পড়ে ছিলো শাহবাগ থানায়, যেখানে উত্তেজিত জনতা ঢাবির একজন কর্মচারীকে ছুটানোর জন্য উদগ্রীব হয়ে ছিলেন। কী করেছিলো সেই কর্মচারী? উত্যক্ত করেছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থীকে। অন্য কারো কারো চোখ আটকে ছিলো হয়তো স্কাই নিউজ বা বিবিসিকে দেয়া ডক্টর ইউনূসের সাক্ষাতকারের দিকে। এদিকে রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাতকারে সাবেক উপদেষ্টা এবং অধুনা সৃষ্ট নাগরিক পার্টির নেতা নাহিদ ইসলাম বলেছেন, এ বছর আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনুকূলে নেই বলে নির্বাচন সম্ভব নয়। তার সদ্য সাবেক সহকর্মী বর্তমান তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলমও সোশাল মিডিয়াতে বলেছেন, নির্বাচিত সরকার “আরো শক্তভাবে এবং নিকৃষ্টরূপে” জরুরী অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে। এত ভয় কেনো তাদের নির্বাচনে?
নাগরিক পার্টির দিকেই চোখ ফেরানো যাক। নাহিদ ইসলামের বিস্ময়কর উত্থান, আন্দোলনের পথ থেকে শুরু করে খপ করে উপদেষ্টা, এটা বাংলাদেশী সকলেই দেখেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের এই প্রাক্তন শিক্ষার্থী গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরের সাথে এক প্যানেলে ডাকসু নির্বাচন করেছিলেন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে। ছাত্র অধিকার পরিষদের ঢাবি শাখার সভাপতি আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, চলচ্চিত্র আন্দোলনের কর্মী মাহফুজ ইসলাম (আমরা জানতে পেরেছি যে তিনি সিনেযোগ নামে একটা পত্রিকাও সম্পাদনা করতেন), এদেরকে নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি। ছাত্রশক্তি আর নাই, আছে জাতীয় নাগরিক পার্টি।
প্রথমে কমিটি আকারে যাত্রা শুরু করলেও কমিটি সদস্যেরা ছিলেন উৎকণ্ঠিত, কবে নাহিদ আসবেন পদ ছেড়ে তাদের মাঝে। অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও বলি, এটা যেনো সুইজারল্যান্ড থেকে লেনিন (১৯১৭) বা পাকিস্তান থেকে শেখ মুজিবুর রহমান (১৯৭২) ফিরে আসার গল্প, যারা ফিরে এসে তাদের পার্টির হাল ধরেছিলেন। পার্থক্য দুইটা, লেনিন ছিলেন পরবাসে, মুজিব ছিলেন কারাগারে, আর নাহিদ ছিলেন ক্ষমতায়। আর লেনিন বা মুজিবের ব্যর্থ হতে কিছুটা সময় লেগেছিলো, নাহিদ ইসলাম এখনো সফলতার মুখ দেখাতে পারেননি।
স্বৈরশাসক হওয়া তো পরের কথা, বছরের পর বছর জেলে থাকার মতন বা পার্টিকে শূন্য থেকে গুছিয়ে আনার মতন শক্তিমত্তা নাহিদ ইসলাম দেখাতে পারবেন কি না, সেটাও এখনো অনিশ্চিত।
অনেকে বলবেন পার্টি উদ্বোধনের দিন নাহিদ ইসলামের ঘোষণাপত্রের কথা। শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতির বাইরে আমরা সেখানে উল্লেখযোগ্য কিছু খুঁজে পাইনি। বরং এর একদিন পরই তাদের এক সদস্যকে ব্যক্তিজীবনের জন্য নীরবে মুছে ফেলা (সমকামী কাউকে পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে রাখতে হবে কেনো, আর রাখলে বের করে দেয়ার পর সেটা নিয়ে পার্টির কোনো বক্তব্য নেই কোনো, একাধিক নেতাকর্মীকে প্রশ্ন করেও আমরা জানতে ব্যর্থ হয়েছি), বা এর পর নারী উত্যক্তকরণের ইস্যুতে মার্চের প্রথম সপ্তাহ জুড়ে তাদের নেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, পার্টির ভঙ্গুর চেহারা শুরুতেই উন্মুক্ত করে দিলো।
নাহিদ ইসলাম অবশ্য সোশাল মিডিয়ায় বেশি কথা বলেন না, সেই অর্থে তিনি নেটিজেনদের নয়, নাগরিকদেরই নেতা। কিন্তু নাগরিকদের প্রতিও তার কোনো আহ্বান বা আবেদন আমরা দেখি না। বরং জুলাইয়ের তরুণ নাহিদের চাইতে সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ পরিণতের বদলে প্রৌঢ় আর ম্রিয়মাণ। পার্টির একাধিক সদস্যের সাথে কথা বলে বরং তাদের চাপা পড়া ক্ষোভের প্রকাশই বেশি দেখা গেলো। এদিকে আমরা নাগরিক পার্টির সদস্যদের তালিকাটি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোনো কোষাধ্যক্ষের নাম খুঁজে পেলাম না। তাদের আয় ব্যয়ের হিসাব তাহলে কে রাখে? অপচয় রোধ করতে হলেও তো একজন এই দায়িত্বে থাকা চাই। তাদের আরেক নেতা সারোয়ার তুষার বলেছেন, টক শোতে যে টাকা দেয়া হয়, তার অর্ধেক যায় পার্টির ফান্ডে। আমরা ধরে নিলাম মসজিদের দান বাক্সের মতন এই ফান্ডে যে কেউ টাকা জমা করতে পারে, কিন্তু টাকা উত্তোলন কে করতে পারে? অন্তত পার্টি সৃষ্টির পরের ছয়দিনে (এই লেখা লেখা পর্যন্ত, ৬ মার্চ ২০২৫) তাদের কোষাধ্যক্ষের নামটি আমরা জানতে পারিনি।
১৯৭২ এর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, এই পার্টির নিবন্ধন পেতে যে কোনো একটি কাজ করতে হবে — কোনো সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে অন্তত একটি আসনে জিততে হবে, অথবা দলটির প্রার্থীরা যেসব নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, সেসব আসনে মোট ভোটের ৫ শতাংশ পেতে হবে, অথবা কেন্দ্রীয় কমিটিসহ একটি সক্রিয় কেন্দ্রীয় অফিস থাকতে হবে, জেলা অফিস থাকতে হবে দেশের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ জেলায়, থানা অফিস থাকতে হবে আরও অন্তত ১০০টি উপজেলা বা পৌর বা মেট্রোপলিটান এলাকার থানায়, যার প্রতিটিতে সদস্য হিসেবে কমপক্ষে ২০০ জন ভোটারও থাকতে হবে।
প্রথম দুইটা শুরুতেই পূরণ সম্ভব নয়, তাই অফিস দেখানোই একমাত্র রাস্তা, সেটা তারা পারবেনও। আরও কিছু শর্ত পরবর্তীতে যোগ হয়েছে, যেমন ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য, ইত্যাদি। এটাও তারা পারবেন। তবে, নাহিদ ইসলামের নাগরিক পার্টি নিবন্ধন পেলেও, ভোট কি তারা পাবেন? যে লেনিন বা মুজিবের মতন নাহিদ জনতার মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন, তাদের মতন সেই বিপুল জনসমর্থন কি তার আছে? নির্বাচনে এত ওজর আপত্তি কেনো তাদের সকলের? তাদের মুখে যেসব কথা শোনা যায়, নতুন সংবিধান, দ্বিতীয় রিপাবলিক, সিভিলাইজেশনাল কনফ্লুয়েন্স, এই কথাগুলো ভোটারদের মাঝে কতখানি সাড়া ফেলবে, যেখানে জানমালের নিরাপত্তা বা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আজও বাংলার মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় সংকট?
রাজনৈতিক দলের নেতা হওয়ার জন্য নাহিদের আগেও পাকিস্তান আমলে শেখ মুজিব ক্ষমতা ছেড়েছিলেন, কিন্তু তারপর ছিলো লড়াইয়ের এক দীর্ঘ দিনলিপি, যেখানে জেলে থেকে থেকে তার রাজনৈতিক ধীশক্তি আরো বেড়েছিলো। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি, নিজেকে স্বৈরশাসক হওয়া থেকে শেখ মুজিব আটকাতে পারেননি। কিন্তু স্বৈরশাসক হওয়া তো পরের কথা, বছরের পর বছর জেলে থাকার মতন বা পার্টিকে শূন্য থেকে গুছিয়ে আনার মতন শক্তিমত্তা নাহিদ ইসলাম দেখাতে পারবেন কি না, সেটাও এখনো অনিশ্চিত। নেতা এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তার নেতৃত্বের প্রমাণ এখনো দৃশ্যমান হলো না। তাদের মনে রাখতে হবে, জুলাই বছরে একবার আসে, প্রতিটি মাসের নাম জুলাই নয়।
ইবনে নাহদা ঢাকায় বসবাসরত একজন লেখক ও প্রাবন্ধিক
Leave A Reply