বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে ‘বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ’ নামে একটি বিতর্কিত বিষয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ফৌজদারি আইন, বিশেষ করে দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারা ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ অনুযায়ী, যদি কোনো পুরুষ ভয়ভীতি, প্রতারণা বা মিথ্যা আশ্বাসের মাধ্যমে নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে, তবে তা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু বিয়ের প্রতিশ্রুতি বা প্রলোভন দেখিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষের সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনকে ধর্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা কতটা যৌক্তিক—সেই প্রশ্নটি আজ নতুন করে সামনে এসেছে।
দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারা অনুযায়ী, পাঁচটি অবস্থায় শারীরিক সম্পর্ককে ধর্ষণ বলে গণ্য করা হয়:
- নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে শারীরিক সম্পর্ক
- নারীর সম্মতি ছাড়া
- নারীর সম্মতি থাকলেও মৃত্যু বা জখমের ভয়ভীতির মাধ্যমে সেই সম্মতি আদায় করা হলে।
- নারীর সম্মতি নিয়েই, যদি ঐ নারী মনে করেন পুরুষটি তার স্বামী অথচ পুরুষটি জানেন তিনি ঐ নারীর স্বামী নন
- ১৬ বছরের কম বয়সী নারীর সঙ্গে সম্মতিতেও শারীরিক সম্পর্ক
পরবর্তীতে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ প্রণয়ন করা হয় যা বাংলাদেশের বিদ্যমান দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর পরিমার্জিত অংশ। এতে নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর ও গুরুতর অপরাধের জন্য আলাদা করে কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়েছে। বিশেষত, ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে এখন আগের চেয়ে আরও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। এই আইনের ৯ ধারায় ধর্ষণকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, এবং যে ব্যক্তি কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করবে, তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে।
বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তোলা অবশ্যই নৈতিকভাবে অন্যায়, তবে তা ধর্ষণ নয়। ধর্ষণের প্রকৃত সংজ্ঞা ও গুরুত্ব বজায় রাখতে আইন সংশোধনের মাধ্যমে এ ধরনের অভিযোগকে প্রতারণার আওতায় আনা জরুরি।
এই আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞায় নতুন একটা টার্ম যোগ করা হয়েছে- ‘প্রতারণার মাধ্যমে সম্মতি আদায়’। এর ফলে যখন একজন পুরুষ বিয়ের প্রলোভন দিয়ে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে, পরে তা পূরণ না করলে তখন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯(১) ধারা অনুযায়ী, তিনি প্রতারণার মাধ্যমে সম্মতি আদায় করেছেন গণ্য করা হয়। কোনো নারী যদি বিশ্বাস করেন যে তাকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এবং সেই আশ্বাসের ভিত্তিতে তিনি শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, পরবর্তী সময়ে সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হলে সেই পুরুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা দেওয়া হয়।
তবে বাস্তবতা ভিন্ন। দুই প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি পরস্পরের সম্মতিতে সম্পর্ক স্থাপন করলে সেটিকে “ধর্ষণ” হিসেবে গণ্য করা আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে অসংগতিপূর্ণ।
বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে সম্পর্ক স্থাপন করা নারীর সম্মতি স্বেচ্ছায় ছিল না কি প্রতারণার মাধ্যমে আদায় করা হয়েছে—এটি প্রমাণ করা জটিল। অনেক সময় নারী ও পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক দীর্ঘদিন চলার পর বিয়ে ভেঙে গেলে প্রতিশোধমূলকভাবে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। এতে পুরুষরা হয়রানির শিকার হয় এবং ন্যায়বিচারের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। বিয়ের প্রতিশ্রুতির অভিযোগে অনেক পুরুষকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর নজির রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে গেলেও নারী প্রতিশোধমূলক মনোভাব থেকে “বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ” মামলা দায়ের করে। এতে আসামিরা সামাজিক, মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব মামলার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রমাণের অভাবে আসামিরা খালাস পান, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে বিচার প্রক্রিয়ার ভোগান্তির শিকার হন।
উক্ত আইনে অবশ্য ‘বিয়ের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের’ জন্য নারীদের জন্য কোনো শাস্তির বিধান নেই, যা লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত তৈরি করে। প্রতারণা বা মিথ্যা প্রতিশ্রুতির দায় শুধুমাত্র পুরুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বিচার ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট করে। নারী-পুরুষ উভয়ের সম্মতিতে সংঘটিত কোনো সম্পর্ককে পরবর্তী সময়ে বিয়ের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগে ধর্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা আইনগতভাবে অযৌক্তিক।
ধর্ষণ হলো একটি ভয়াবহ অপরাধ, যা নারীর সম্মতি ছাড়া বলপূর্বক বা প্রতারণার মাধ্যমে সংঘটিত হয়। কিন্তু বিয়ের প্রলোভনে সম্মত শারীরিক সম্পর্ককে ধর্ষণ বলে বিবেচনা করা ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের গুরুত্বকে হ্রাস করে। এতে প্রকৃত ধর্ষণ মামলাগুলো গুরুত্ব হারায় এবং অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। বিয়ের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা বা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ঘটনাকে ধর্ষণ নয়, প্রতারণা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণিত হলে ভিন্ন ধরনের শাস্তির বিধান রাখা যেতে পারে। এতে ধর্ষণের সংজ্ঞা স্পষ্ট থাকবে এবং নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
প্রস্তাবিত আইন সংশোধনী ও সমাধান
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধন আনতে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা সময়োপযোগী ও প্রশংসার দাবিদার। বিশেষ করে, “নারী” শব্দের পাশাপাশি “পুরুষ” শব্দটিও যোগ করার কথা বলা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, আইনটি যেন শুধুমাত্র নারী নয়, পুরুষদের ক্ষেত্রেও সহিংসতা বা নির্যাতনের ঘটনা আচ্ছাদিত করতে পারে। তাছাড়া, ডিএনএ টেস্ট ও ফরেনসিক বিশ্লেষণের জন্য ল্যাব প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ধরনের ল্যাব স্থাপনের ফলে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের মামলায় সঠিক প্রমাণ উপস্থাপন সহজ হবে, ফলে প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যাবে।পাশাপাশি, মিথ্যা অভিযোগের মাধ্যমে হয়রানি ও প্রতিশোধমূলক মামলার প্রবণতাও হ্রাস পাবে। এছাড়াও, ধর্ষণ মামলার তদন্তের সময় ৩০ দিন থেকে কমিয়ে ১৫ দিন এবং বিচার কাজের সময় ১৮০ দিন থেকে কমিয়ে ৯০ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
তবে, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সম্মতি নিয়ে প্রতারণামূলকভাবে ধর্ষণকে একটি স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা এবং এর জন্য ৭ বছরের সাজার বিধান এখনও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ এটি মিথ্যা মামলার ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক সময় দীর্ঘদিনের প্রেম বা সম্মতিমূলক সম্পর্ক শেষ হলে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে বিয়ের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করা হয়। এতে নিরপরাধ ব্যক্তিরা বছরের পর বছর হয়রানির শিকার হন এবং সমাজে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হন। আইনের এই ধারা প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তির পাশাপাশি মিথ্যা মামলার সুযোগ তৈরি করে, যা ন্যায়বিচারের ধারাকে ব্যাহত করে এবং বিচারব্যবস্থার ওপর জনআস্থার সংকট সৃষ্টি করে।
বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তোলা অবশ্যই নৈতিকভাবে অন্যায়, তবে তা ধর্ষণ নয়। ধর্ষণের প্রকৃত সংজ্ঞা ও গুরুত্ব বজায় রাখতে আইন সংশোধনের মাধ্যমে এ ধরনের অভিযোগকে প্রতারণার আওতায় আনা জরুরি। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে নারী ও পুরুষ উভয়ের প্রতি সমতার ভিত্তিতে বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে মিথ্যা মামলা ও হয়রানি রোধ করা সম্ভব হয়।
অপরাজিতা দেবনাথ ঢাকা জজ কোর্টের একজন অ্যাডভোকেট
Leave A Reply