এক বছরও হয় নাই কোটি মানুষের আন্দোলনের চাপের মুখে এক ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হয়েছে। হাজার হাজারেরও বেশি জীবন ক্ষয় হয়েছে, এবং আরও বহু হাজার মানুষ আহত হয়েছে – আর আমরা এক কোটির অধিক মানুষ রাস্তায় নেমেছি আমাদের জীবন বাজি রেখে। আমরা বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার উদ্দেশ্যে রাস্তায় নামিনাই। আমরা নেমেছিলাম দেশের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন নিয়ে।
ঘর-বাড়ি, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, মন্দির, মাদ্রাসার দেয়াল পেরিয়ে প্রথম পা বাড়ানোর সেই মুহূর্ত থেকেই আমাদের হৃদয় ও মনের গভীরে এক অটল মন্ত্র বাঁধা হয়েছিল – “করবো বা মরবো”। আমরা হয় খুনী হসিনাকে সফলভাবে ক্ষমতাচ্যুত করব, অথবা সেই চেষ্টা করতে গিয়ে প্রাণ হারাবো; কিন্তু, আমরা স্বৈরাচারের পদতলে আর একদিনও থাকবো না। একটি নতুন, স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে, ২০২৪ সালের ৩৬ শে জুলাই, আমরা সেই স্বৈরাচারীর বাসভবনের দিকে অগ্রসর হই এবং সেই মুহুর্তে সে পালাতে বাধ্য হয়।
এক মুহূর্তের জন্যও ভেবে নেবেন না যে যেহুতু স্বৈরাচার পালিয়েছে এবং যেহুতু দেশ স্বৈরাচারের পদতল থেকে মুক্তি পেয়েছে, সেহুতু সেই দিনের স্বপ্ন আমাদের মন থেকে এতটুকুও ম্লান হয়ে গেছে। কখনোই ভুলে যাবেন না যে আজকে আপনারা যেই জোর গলায় সংস্কারের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, সেই জোর গলায় কথা বলার অধিকার হাজার শহীদের রক্ত দিয়ে কেনা। কখনোই ভুলে যাবেন না যে আপনাদের আন্দোলনে আওয়ামীলীগের পতন হয় নাই। আপনারা থাকেন বা নাই থাকেন, আমরা এই দেশকে সংস্কারের পথে অগ্রসর করবই। জুলাইয়ের চেতনা এখনও বেঁচে আছে। যদি দরকার হয়, আমরা আবারো রাস্তায় নেমে আসবো, আবারো আমাদের রক্ত ক্ষরণ হবে। শোনো মহাজন, আমরা অনেকজন।
আমাদের জীবন দিয়ে হলেও রাষ্ট্রের সংস্কার হবেই হবে। সংস্কারের আগে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না – এখানে কোন “যদি” বা কোন “কিন্তু” নাই। এই লক্ষ্যে আমরা আমাদের প্রাণ আবারো বাজি রাখতে প্রস্তুত। আপনাদের কাছে আমার প্রশ্ন হল ক্ষমতায় আসার জন্য আপনি কি মরতে প্রস্তুত? আমার মনে হয় না। কারণ, বিএনপির মধ্যে সেই স্পৃহা নাই। এই কারণেই আপনাদের ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন দেখতে হচ্ছে অন্য মানুষের আন্দোলনের উপর ভর করে।
এনসিপির একজন সদস্য বলেছে যে আওয়ামী লীগ ছিল ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত পর্যায়ে। আপনারা ঐতিহাসিক ভাবেই স্বৈরাচারিতার দিক থেকে আওয়ামী লীগের থেকে দুর্বল। যদি আওয়ামী লীগকে বিপ্লব দ্বারা মাত্র এক মাসেরও কম সময়ে উৎখাত করা যায়, তাহলে ভেবে দেখুন, দেশের মঙ্গলের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে আমরা আপনাদের কত সহজে পতন ঘটাতে পারবো।
যদি আপনি দেশের পক্ষে থাকেন, তবে আমরা আপনার পাশেই থাকব; কিন্তু, যদি এখন আপনি বর্তমান রাজনৈতিক প্রথা বজায় রাখতে চান, কেননা এখন সেটা বজায় রাখা আপনার স্বার্থে, তাহলে আমরা আপনাদের চরম বিরোধিতা করব। ঝড় হয়ে আসবো এবং সেই ঝড়ে আপনার অস্তিত্ত্ব সংকটে পরে যাবে। আপনারা ভাবতে পারেন যে আপনারা তো এখন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল, তাই আপনারা যা ইচ্ছা করতে পারবেন; কিন্তু এই চিন্তার পুনর্বিবেচনা করুন। নির্বাচনের দিনে মানুষ হয়তো আপনাদেরকে ভোট দিবে, কিন্তু দ্রুত নির্বাচন দাবি করলে কয়জন সাধারণ মানুষ রাজপথে আপনাদের পাশে দাঁড়াবে?
আপনাদের কথা সঠিক – আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষ মৌলিক প্রয়োজনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। তবে, মুদ্রাস্ফীতি কমছে। এমন পরিস্থিতিতে কয়জন সরকার পরিবর্তনের জন্য সত্যিকার অর্থে আগ্রহী হবে? জনসমর্থন ছাড়া কোনো বিক্ষোভকে সফল করা আপনাদের পক্ষে কতটা সম্ভব? আপনাদের কাছে সেই পরিমাণ রাজনৈতিক পুঁজি নেই। জনগণের শত্রু হবেন না। দেশের ইতিহাসে এমন প্রথম দল হয়েন না যারা ক্ষমতায় আসার আগেই ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে।
শামস ইশতিয়াক রহমান মুক্তিপত্রের একজন যুগ্ম-সম্পাদক
Leave A Reply