সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের সর্বশেষ খসড়াটি হাতে পেলাম। খসড়াটির প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে:
“সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ রহিতক্রমে সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, দমন ও উক্ত অপরাধের বিচার এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে বিধান প্রণয়নকল্পে প্রণীত অধ্যাদেশ।
যেহেতু সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ রহিতক্রমে সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, দমন ও উক্ত অপরাধের বিচার এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে বিধান প্রণয়ন করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়;
এবং
যেহেতু সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া অবস্থায় রহিয়াছে এবং রাষ্ট্রপতির নিকট ইহা সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইয়াছে যে, আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে;
সেহেতু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৩ (১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি নিম্নরূপ অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করিলেন:
প্রস্তাবনা পড়ে বুঝবার উপায় নাই যে বাংলাদেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইন দ্বারা শেখ হাসিনা এবং তার দোসরবৃন্দ সাইবার আইনসমূহদ্বারা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত করেছেন কিন্তু কেন? প্রস্তাবনা সংশোধন করেন। সাইবার স্পেস লিখেছেন দুই জায়গায়— দয়া করে স্পেসের বাংলা পরিসর ব্যবহার করুন।
বিভিন্ন দেশের আইনে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’ বলতে কোন কোন কাঠামো গণ্য করা হবে, তা-ও আইনের মাধ্যমেই নির্ধারণ করা হয়। সার্বিক পর্যালোচনায়, প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে মূলত ‘নিরাপত্তার বিষয়কে’ প্রাধান্য দিয়েছে। এই ধারায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর সংজ্ঞা যথেষ্ট স্পষ্ট না হওয়া এবং কোন কোন কম্পিউটার সিস্টেম বা নেটওয়ার্কের অন্তর্গত হবে, তা নির্ধারিত না থাকায় অনেকের কাছেই এই সংজ্ঞা অস্পষ্ট মনে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কেউ অপরাধ করছেন কি না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত না হয়েই বা ভুলবশত কোনো অপরাধ করে ফেলতে পারেন।
একই সঙ্গে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’র বিরুদ্ধে অপরাধ বলতে কী ধরনের কার্যক্রম বোঝাবে, তারও কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। তাই ভয়ের কারণ থেকেই যাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর কোনো তথ্য বা উপাত্ত অননুমোদিতভাবে প্রকাশ করাকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ রয়েছে।
শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশে কোনো ভাড়াটে লোকজন বা ব্যক্তি যেন বাধা সৃষ্টি করতে না পারে সেই নিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে জোহানেসবার্গ প্রিন্সিপলে। এর সুপারিশ অনুযায়ী, কোনো গোপন তথ্য প্রকাশ অপরাধ হবে না, যদি না তথ্য প্রকাশ ন্যায়সংগতভাবে জাতীয় নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত না করে বা করার মতো না হয়।
যদি জাতীয় নিরাপত্তার চেয়ে জনস্বার্থ বেশি জরুরি বা মূল্যবান হয়, তবে সে ক্ষেত্রে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না। কিন্তু ২(জ) ধারা ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’ সম্পর্কিত সংজ্ঞা ও ধারায় এসবের উল্লেখ না থাকায় সরকার বা সরকারের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর অন্তর্গত তার কোনো দুর্নীতি, অসদাচরণ বা অপরাধ প্রকাশ করার ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা কোনো প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে সংবাদমাধ্যমকর্মীরা নিরুৎসাহিত হবেন। এ ক্ষেত্রে কেউ কোনো গোপন তথ্য প্রকাশ করলে, যা জোহানেসবার্গ প্রিন্সিপলে অপরাধ হিসেবে গণ্য নয়; কিন্তু এই ধারায় অপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত হতে পারেন।
এ ছাড়া, প্রস্তাবিত আইনের ২(জ) ধারায় সরকার যেসব প্রতিষ্ঠানকে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’ বলে ঘোষণা করেছে, সেসব প্রতিষ্ঠান তার দুর্নীতি, অপরাধ বা অসদাচরণ গোপন করার ইচ্ছায় ব্যবহার হতে পারে। অন্যদিকে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা সংবাদকর্মীর জন্য দুর্নীতি, অপরাধ বা অসদাচরণ প্রকাশের পথ সংকুচিত করবে।
আবার আন্তর্জাতিক সাইবার চুক্তিতে বেআইনি প্রবেশসহ অবৈধ বাধা, ডেটা ও সিস্টেমের হস্তক্ষেপের আলাদা আলাদা সংজ্ঞা দিয়েছে। কিন্তু আমাদের প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে ‘বেআইনি প্রবেশ’-এ সবগুলো বিষয়কে একসঙ্গে আনা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এতে আইনটি অপপ্রয়োগের সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশ খুব কম আইনে অতিরাষ্ট্রিক (extraterritorial) এখতিয়ার প্রয়োগের কথা বলা হয়ে থাকে, তবে আইনের নীতির জায়গা থেকে তা নতুন নয়। কিন্তু ব্যবহারিক দিক থেকে দেখতে গেলে রাষ্ট্রকে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে, বিশেষ করে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের এবং আদালতকে। এসব সমস্যার মধ্যে অন্যতম হলো, যথাযথ আইনি নিয়ম মেনে অন্য আরেকটি রাষ্ট্র থেকে প্রয়োজনীয়, পর্যাপ্ত এবং যথাযথ তথ্য সংক্রান্ত প্রমাণাদি জোগাড় করার ক্ষেত্রে, অতিরাষ্ট্রিক (extraterritorial) প্রয়োগের বিধানটি খুব বেশি মাত্রায় বিস্তৃত, অপরিষ্কার এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের দিকেও পরিচালিত হতে পারে।
আমরা মনে করি, দেশের আইনে অতিরাষ্ট্রিক (extraterritorial) এখতিয়ার প্রয়োগের বিধান কেবল তখনই প্রয়োগ করা উচিত, যখন অপরাধটির সঙ্গে সত্যিকারের এবং উল্লেখযোগ্য সংযোগ স্থাপন করা যাবে এবং আদালত ও তদন্তকারী সংস্থাসমূহ পর্যাপ্ত কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে সমর্থ হবে। অতিরাষ্ট্রিক (extraterritorial) এখতিয়ারের অনুশীলনের সবচেয়ে কঠিন দিকটি হলো, এখানে একাধিক রাষ্ট্রের এখতিয়ারের দাবি করতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, যদি রাষ্ট্র ‘ক’-তে অবস্থানরত রাষ্ট্র ‘খ’-এর নাগরিক, রাষ্ট্র ‘গ’ নাগরিকের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ করে, তবে তিনটি রাষ্ট্রেরই বৈধ ভিত্তি থাকতে পারে। যাতে করে রাষ্ট্রসমূহ নিজ নিজ রাষ্ট্রের আইনি ও এখতিয়ারে নীতি এবং সক্রিয় ব্যক্তিত্বের নীতির ভিত্তিতে অপরাধ এবং অপরাধীর ওপর এখতিয়ার প্রয়োগ করতে ও চাইতে পারেন।
এই ধারার কারণে আইনসভা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মাধ্যমে জাতীয় আইনকে বহিরাগতভাবে প্রয়োগ এবং আন্তঃরাষ্ট্র দ্বন্দ্বের যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে:
১) কখন একটি রাষ্ট্র তার অঞ্চলের বাইরে সংঘটিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, তদন্ত কিংবা নিজ রাষ্ট্রীয় এখতিয়ারে পরিচালনা করতে পারে; এবং ২) দুই বা ততোধিক রাষ্ট্রের মাঝে বিচার বিভাগের অধিক্রমণের সমাধান কেমন হওয়া উচিত?
সেবা প্রদানকারী কোনো তৃতীয় পক্ষের দায়মুক্তি
বাংলাদেশের ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন-২০০৬’ ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (আইএসপি) অথবা নেটওয়ার্ক সেবা প্রদানকারী মধ্যবর্তী সংস্থাগুলোকে সব ধরনের দায় থেকে মুক্তি দিয়েছে। আইনে বলা হয়েছে: তাদের সেবা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ করা হলে তারা দায়ী হবে না। এই দায়মুক্তি পাওয়া যাবে তখনই, যখন তারা এটা প্রমাণ করতে পারবে যে, এই অপরাধ তাদের অজ্ঞাতসারে হয়েছে অথবা এ অপরাধ হতে না-দিতে সংস্থা যথেষ্ট মনোযোগ দিয়েছিল। যদিও আইএসপিগুলোকে এ ধরনের দায়মুক্তি দিলে কারিগরিভাবে সত্যিকারের সাইবার অপরাধীকে খুঁজে বের করা সহজ হয়; কিন্তু সন্দেহ দূর করার জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৭৯ ধারায় বলা হচ্ছে: ‘নেটওয়ার্ক সেবা প্রদানকারী কোনো তৃতীয় পক্ষ তথ্য বা উপাত্ত প্রাপ্তিসাধ্য করিবার জন্য এই আইন বা তদধীন প্রণীত বিধি বা প্রবিধানের অধীন দায়ী হইবেন না, যদি প্রমাণ করা যায় যে, সংশ্লিষ্ট অপরাধ বা লঙ্ঘন তাহার অজ্ঞাতসারে ঘটিয়াছে বা উক্ত অপরাধ যাহাতে সংঘটিত না-হয় তজ্জন্য তিনি সাধ্যমতো চেষ্টা করিয়াছেন।’
এখানে মনে রাখা দরকার, এসব সেবা প্রদানকারী সংস্থা সাধারণত কোম্পানি হয়ে থাকে এবং এ সংক্রান্ত জাতিসংঘের ‘ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা ও ইন্টারনেট প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ ৭৬ সুপারিশ করেছে যে, রাষ্ট্র যখন মানবাধিকারের প্রধান দায়িত্ববহনকারী, তখনও কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব রয়েছে মানবাধিকারকে শ্রদ্ধা করার।
ইন্টারনেট সেবা সরবরাহকারীরা বাংলাদেশে নিয়মিতভাবে নানা বিষয়বস্তু ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে ফেলা ও ফিল্টার করার ‘অনুরোধ’ পান (ফ্রিডম অন দ্য নেট প্রতিবেদন-২০১৯)। এছাড়া প্রতিমাসেই তাদের বিটিআরসির কাছে ট্রাফিক ও ব্যবহারকারীদের বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে হয়, যা অনলাইনে ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি স্পষ্টতই হুমকি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের করা এসব ‘অনুরোধ’ (আদেশ) কোনো ধরনের আইনগত এখতিয়ারের মধ্য থেকে করা হয় না, যা স্পষ্টতই বে-আইনি। অনলাইনে ভাব এবং মতামত প্রকাশে বাধা প্রদানের জন্য অনেক সময় সেবা প্রদানকারীকে নানা বাধা-বিপত্তির পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে দেখা যায় এবং বিচারিক হস্তক্ষেপের ব্যত্যয় করে মধ্যবর্তী সেবা সংস্থাগুলোকে মানবাধিকার হরণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে দেখা যায়। একইসঙ্গে স্মরণ রাখা ভালো, বাংলাদেশে এ পর্যন্ত কোনো স্থানীয় মধ্যবর্তী কোম্পানি কোনো ধরনের স্বচ্ছতার প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি, যা অনলাইনে ভাব প্রকাশের স্বাধীনতাসহ অন্যান্য মানবাধিকারের নিশ্চয়তা দিতে পারে। অন্যদিকে গুগল এবং ফেসবুক কর্তৃক স্বচ্ছতার প্রতিবেদন এখনো বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
কিন্তু প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে ইন্টারনেট সেবা সরবরাহকারীরা নাগরিকদের সুরক্ষা ও মানবাধিকারের নীতিগুলো মেনে চলবে তেমন কোন দায়িত্বের কথা বলা হয় নাই …
তাহলে কি করা যেতে পারে?
প্রস্তাবিত অধ্যাদেশের ধারা ৩৯ বলছে, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের গোপনীয়তা কথা । তদন্তের স্বার্থে কোনো ব্যক্তি, সত্তা বা সেবা প্রদানকারী কোনো তথ্য প্রদান বা প্রকাশ করিলে উক্ত ব্যক্তি, সত্তা বা সেবা প্রদানকারীর বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি আইনে অভিযোগ দায়ের করা যাইবে না এবং এই অধ্যাদেশের অধীন তদন্তের সহিত সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি, সত্তা বা সেবা প্রদানকারীর তদন্ত সংশ্লিষ্ট তথ্যাদির গোপনীয়তা রক্ষা করিবেন। কেউ যদি বিধান লঙ্ঘন করে তবে এটি অপরাধ হিসাবে গ্রহণ করেছে এবং উক্ত অপরাধের জন্য তিনি অনধিক ২ (দুই) বৎসর কারাদণ্ডে বা অনধিক ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। এখানে বলে রাখা ভালো তদন্তের স্বার্থে ৯০ দিন পর্যন্ত ডাটা সংরক্ষণ করবেন কিন্তু কোন কোন মামলার তদন্তের জন্য ডাটা আইন শৃঙ্খলার বাহিনীর জন্য দেওয়া হয়েছে কিংবা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য প্রদানে অনীহা প্রকাশ করেছে কিংবা দিতে পারেন না, সেই সংক্রান্ত কোন স্বচ্ছতা প্রতিবেদনের বাধ্যবাধকতা তৈরী করা হয় নাই, যা করা উচিত ছিল।
জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল হবে, আগেও ছিল, কোনদিন বসেছিল কিনা সন্দেহ আছে; তো আমাদের দাবি ছিল জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের অনবরত এবং নিয়মিতভাবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি থাকবে কিন্তু তারা হাসিনারমত নিরাপত্তা সংকটের দোহাই দিয়ে নাগরিক সমাজের উপযুক্ত প্রতিনিধি নিযুক্তির ভার কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের ওপর নিযুক্ত করেছে; অদ্ভুত লাগে তাদের বিবেগবিহীন বেডাগিরির দাসত্ব; ঐ বেডা, চেয়ারম্যান কি আবার? চেয়ারপার্সন লিখেন?
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, বাতিলকৃত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৭ ধারা এবং বাতিলযোগ্য সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২৭ ধারা হুবহু অধ্যাদেশের ২৩ ধারায় রেখে দেওয়া হয়েছে। আবার একই অধ্যাদেশ বাতিলযোগ্য সাইবার নিরাপত্তা আইনের ধারা ২৭ অনুযায়ী পরিচালিত মামলাসমূহ বাতিল করা হয়েছে।
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশটির ২৩ ধারায় সাইবার সন্ত্রাসী কার্য সংঘটনের অপরাধ ও দণ্ড সম্পর্কে বলা হয়েছে। সাইবার সন্ত্রাসের আওতাও ব্যাপক। এখানে রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করা এবং জনগণ বা এর কোনো অংশের মধ্যে ভয়ভীতি সঞ্চার করার উদ্দেশ্যে ম্যালওয়্যার প্রবেশ করানো, যা কোনো ব্যক্তির মৃত্যু বা গুরুতর জখম পাওয়ার মতো ঘটনা ঘটায় বা জনসাধারণের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ ও সেবা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংসসাধন করে বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর ওপর বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে, বৈদেশিক কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বা জনশৃঙ্খলা পরিপন্থী কোনো কাজে ব্যবহৃত হতে পারে অথবা বৈদেশিক কোনো রাষ্ট্র বা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুবিধার্থে ব্যবহার করা হতে পারে—এসব কিছু আনা হয়েছে।
সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রচার ও সুরক্ষার বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক সুপারিশ করেছেন যে ‘সন্ত্রাসী অপরাধের’ অধিক্ষেত্র হওয়া উচিত তিনটি। যেমন (ক) মৃত্যু ঘটার মতো গুরুতর শারীরিক আঘাত, বা জিম্মি করার অভিপ্রায়ে সংঘটিত কাজ; (খ) কোনো রাষ্ট্রকে সন্ত্রাসে উসকে দেওয়া, জনগোষ্ঠীকে ভয় দেখানো বা কোনো সরকার বা আন্তর্জাতিক সংস্থাকে কোনো কাজ করতে বা বিরত থাকতে বাধ্য করার চেষ্টা এবং (গ) সন্ত্রাসের সঙ্গে সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং প্রটোকলের পরিধির মধ্যে যেসব বিষয়কে অপরাধ বলা হয়েছে, তেমন ধরনের অপরাধ ঘটানো।
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশটি ধারা ২৩ বৈধতার নীতিকেও ব্যর্থ করে। কারণ, অপরাধের শর্তগুলো খুবই অস্পষ্ট। একজন ব্যক্তির পক্ষে এই বিধান মেনে চলা কঠিন হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যে ব্যক্তি জেনে বা না জেনে, ‘জনসাধারণের দৈনন্দিন দ্রব্যের সরবরাহ ও পরিষেবাকে প্রভাবিত করে বা ক্ষতি করে বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কাঠামোর ওপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করে’ সে সাইবার সন্ত্রাসবাদের জন্য দায়ী হতে পারে। এই শর্তগুলো এতটাই অস্পষ্ট যে সরকার নির্বিচার ধারা ২৩ রাজনৈতিক মতপ্রকাশের অধিকার হরণে অপপ্রয়োগ করতে পারে।
বলে রাখা ভাল সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের গেজেট হলে সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল হবে, এবং অধ্যাদেশে বলা হয়েছে সাইবার নিরাপত্তা আইনের ধারা ২১, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩১, ৩৪ এবং উক্ত ধারাসমূহে বর্ণিত অপরাধ সংঘটনে সহায়তার অপরাধে কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালে নিষ্পন্নাধীন কোনো মামলা বা অন্যান্য কার্যধারা অথবা কোনো পুলিশ অফিসার বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের নিকট তদন্তাধীন মামলা বা কার্যক্রম বাতিল হইবে এবং উহাদের বিষয়ে আর কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা যাইবে না এবং উক্ত ধারাসমূহের অধীনে কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত দণ্ড ও জরিমানা বাতিল বলিয়া গণ্য হইবে।
অনেক বড় ঘটনা – আসলে সুখবর, বিশেষ করে প্রতিবাদী ভুক্তভোগীদের পাশে আমরা যারা দাঁড়িয়েছিলাম তাদের জন্য। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, বাতিলকৃত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৭ ধারা এবং বাতিলযোগ্য সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২৭ ধারা হুবহু অধ্যাদেশের ২৩ ধারায় রেখে দেওয়া হয়েছে। আবার একই অধ্যাদেশ বাতিলযোগ্য সাইবার নিরাপত্তা আইনের ধারা ২৭ অনুযায়ী পরিচালিত মামলাসমূহ বাতিল করা হয়েছে।
কি দাঁড়াইলো? আইন বাদ দিচ্ছেন, আইনের ধারা বাদ দিচ্ছেন, পুরাতন আইনের ধারা সংক্রান্ত মামলা বাদ দিচ্ছেন; আবার অধ্যাদেশ করে হাসিনা যে অস্ত্র ব্যবহার করে মানবতা বিরোধী অপরাধ করেছেন, সেই আইনের ধারা উজ্জেবিত করতেছেন, যেন আপনারা এবং অন্যরা মানবতা বিরোধী অপরাধ করতে আগ্রহী?
এই প্রস্তাবিত আইনের ধারার ২৬ (১) এ অপরাধের সংজ্ঞায়ন ঠিক করে করা হয়নি, এখানে অপরাধের সংজ্ঞায়ন এমনভাবে করা হয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা ধারণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। আবার ধর্মীয় কুসংস্কার বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে বা ধর্মের পর্যালোচনা বা সমালোচনা নিয়ে যারা বিভিন্ন অনলাইন নেটওয়ার্কে মতামত প্রকাশ করেন তাঁদের জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়াবে। কোনো একক ব্যক্তির ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষা করা আর পাবলিক অর্ডার বা মোরাল রক্ষা করা এক ব্যাপার নয়। আন্তর্জাতিক নাগরিক এবং রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত চুক্তিতে ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্পর্কিত ১৮ নম্বর ধারার ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে এর ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। তাই একদিকে যেমন কারো ধর্মীয় এবং বিশ্বাসের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে কারো ধর্মীয় ভিন্ন অবস্থান, বিশ্বাস বা ধর্মের পর্যালোচনা করার অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে ধর্মকেন্দ্রিক ঘৃণা প্রতিরোধ করার দায়িত্বও পালন করতে হবে। তাই অপরাধের এমন সংজ্ঞায়ন যারা ধর্মের মূলধারার ভিন্ন কোনো অবস্থান বা বিশ্বাস ধারণ করেন বা যারা ধর্মীয় বা বিশ্বাস বিষয় নিয়ে মতামত প্রকাশ করেন তাঁদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
রেজাউর রহমান লেনিন একজন সাংবাদিক ও গবেষক
Leave A Reply