আপনার লাইফের সবচেয়ে ভয়াবহ মুহূর্তটা কী জানেন? আপনার বা আপনার মায়ের মৃত্যু না। আপনার সন্তানের যখন কিডনি ফেইল করে অথবা তার যখন ক্যান্সার ধরা পড়ে – সেটা আপনার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ মুহূর্ত, অসহায় মূহুর্ত। কারণ লাশ শুধু নিজে মরে। রোগী সবাইকে নিয়ে মরে। আপনি একজন সাধারণ বাঙলাদেশি হইলে, ফ্যামিলির কারও আকস্মিক রোগে এক নিমিষে রাস্তার ফকির হয়ে যাবেন। বাইকটা কি জমিটা কি রিকশাটা বিক্রি করে দিতে হবে। FDR ভাঙতে হবে। বাড়ি বিক্রি করে নিঃস্ব হইতে হবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের করিডোর হইলো পৃথিবীর বুকে একটা দোযখ। বাঙলাদেশে এর চাইতে কোন অশুভ স্থান হইতে পারে না। দুঃখের জন্য না, অসহায়ত্বের জন্য। এই দেশের মানুষ ঢামেকের করিডোরে দাঁড়ায়া যত চোখের পানি ফেলসে, যে হেল্পলেস, গডলেস ফিল করসে – আর কিছুতে সে এমন অসহায় ফিল করে নাই। ঢাকা মেডিকেলের ডাক্তারেরা কসাই না। তারা সিড়ির কোনায় তোষক ফালায়া হইলেও আপনাকে চিকিৎসাটা দিতে চাইবে। বাঙলাদেশে আর যেভাবেই মরেন, আপনি বিনা চিকিৎসায় মরবেন না। রাষ্ট্র আপনাকে ফ্রিতে চিকিৎসা দিবে। আপনি মরবেন শুধু ইঞ্জেকশনের আর ওষুধের দাম দিতে গিয়ে। আপনার সন্তান কি মায়ের ক্যান্সার হইলে টাকাটা কেমোথেরাপি, যাতায়াত বা ডাক্তারের ফিতে খরচ হয় না। মূলত ওষুধের দাম দিতে গিয়েই ফ্যামিলিগুলো সর্বসান্ত হয়।
এই দেশের মানুষের সবচাইতে অসহায় মুহূর্তগুলার সাথে ওষুধ কোম্পানির একটা প্যারাডক্সিকাল সম্পর্ক আছে। আপনি নিশ্চয়ই দেখেছেন এই শহরের মসজিদের বাইরে একজন বুড়ি মা হাতে ইনহেলার নিয়ে বসে থাকে? পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত শহরের বুড়ি মার আসলে ইনহেলার নিয়েই বসে থাকার কথা। খাবার বা ঘর ভাড়া না। নিঃশ্বাস নিতে চাওয়ার প্রাইমাল আঁকুতি নিয়া সে আপনার কাছে হাত পাতে। ৩-৪-৫ দিন ভিক্ষা করার পর তার ৮০০ টাকা জমে। এই টাকাটা দিয়ে সে এক মাসের জন্য একটা ইনহেলার কিনে। এটা না থাকলে সে শ্বাস নিতে পারে না। বাঙলাদেশে বেক্সিমকো, একমি, অ্যারিস্টোফার্মারা বছরে টোটাল ৯০ লক্ষ+ ইউনিট ইনহেলার বিক্রি করে। উৎপাদন থেকে শুরু করে খুচরা বাজারে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত পার-ইউনিট ইনহেলারে সে খরচ করে ৩৩০ টাকা। আর বিক্রি করে ৮০০ টাকা। মোট ৪৭০ টাকা লাভ। এই লাভটা বেআইনী না। সরকারের সকল আইন মেনেই সে দ্বিগুণের বেশি প্রফিট করে। ইনহেলার বা সাপোসিটার আলু পটল বেগুন না যে আপনি দাম অনুমান করবেন, তাকে নায্য বা অনায্য ট্যাগ দিবেন। হার্টের রিং বানাইতে আসলে কী টেকনোলজি লাগে আর কত খরচ হয় আমরা জানি না। সরকারও দাম নির্ধারণ করে না। আর সেই সুযোগটাই নেয় ব্যবসায়ীরা। এগেইন, হার্টের রিং বা সাপোসিটার আলু পটল না যে আপনি এটাকে ফ্রি মার্কেট ইকোনমি মনে করবেন। এই ব্যবসায় ঢুকার ব্যারিয়ার অনেক হাই। আপনার হাজার হাজার কোটি টাকা লাগবে। আবার টাকা থাকলেই শুধু হবে না। টেকনিকাল ক্ষমতা থাকতে হবে। আপনার পলিটিকাল ক্ষমতা থাকতে হবে। সারা দেশে ওষুধ সাপ্লাই চেইন মেইন্টেইন করার মতো লাঠিয়াল বাহিনী থাকতে হবে, এজেন্ট থাকতে হবে, অনুগত ডাক্তার শ্রেণি থাকতে হবে।
ওষুধ ব্যবসায় ঢোকা এই দেশের সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটা। আর এই কারণেই এটা ফ্রি মার্কেট ইকোনমি না। কম্পিটিশন নেই। সবাই মিলে যোগসাজেশ করে ৩৩০ টাকার ওষুধ ৭৫০ টাকায় বিক্রি করে। এই দৈত্যাকার লভ্যাংশের ভাগ সকলে পায়। ডাক্তারদের বিদেশ ট্রিপ, প্রতি সপ্তাহে তাদের গিফট, ডিনার সেট, ব্লেন্ডার, কফি মেকার, হাজার হাজার ড্রাগ রিপ্রেসেন্টিভের বেতন, মুদি দোকানের চাইতে অতি-লাভদায়ক জাঁকজমকপূর্ণ বেকারির মতো দেখতে কম্পাউন্ডার ব্যবসা – এই সব কিছুর খরচ আসে এই দৈত্যাকার প্রফিট মার্জিন থেকে। যেটা মূলত আপনার, আমার আর ঐ ভিক্ষুক বুড়ির পকেট থেকে যায়। আর একটা সিঙ্গেল প্রশ্নের সম্মুখীনও হতে হয় না ওষুধ ব্যবসায়ীদের। গ্যাসের দাম বাড়লে আপনি তারেক রহমানের মাথা খাবেন, আলুর দাম বাড়লে খাতুনগঞ্জের পাইকারদের জরিমানা করবেন। কিন্তু ওষুধ মালিক সমিতি একটা গোপন মিটিং ডেকে, রাতারাতি ইসোমিপ্রাজলের দাম ২ টাকা বাড়ালে আপনার কিচ্ছু করার নেই। একটা মানববন্ধন পর্যন্ত না। কারণ সে যা করেছে সেটা বৈধ। আর সে যা করেছে তার টেকনিকাল নলেজ আপনার নাই। এটি শুধু অর্থনীতির প্রশ্ন নয়। এটি public health policy-র প্রশ্ন।
১৯৯৪ সালে জাফরুল্লাহ চৌধুরীরা ৭৫০টা ওষুধকে অত্যাবশকীয় ঘোষণা করে দাম নির্ধারণ করে দেন। কিন্তু তালিকা টিকতে পারে নাই। ওষুধ সমিতির চাপে সেটা নেমে আসে ১১৭তে। সেই ১১৭ কে বাইপাস করার জন্যও আয়োজনের শেষ নেই। যেমন নাপার দাম সরকার নির্ধারণ করেছে ১.২০ টাকা। বেক্সিমকো তখন ৫০০ মি.গ্রা. নাপার মধ্যে ৬৫ মি.গ্রা. ক্যাফেইন দিলো। মানে চা-কফির ক্যাফেইন আরকি। দিয়ে বললো, আজ থেকে এর নাম Napa Extra। দাম ২.৫০ টাকা। দ্বিগুণের বেশি লাভ। সরকার ১১৭ তালিকায় রিবোফ্লাভিনের দাম ঠিক করলো ৩০ পয়সা। স্কয়ার তখন রিবোফ্লাভিনের মধ্যে থায়ামিন দিলো। দাম করলো ১.৭৫ পয়সা। ডাকাতির লেভেল চিন্তা কইরেন শুধু। ২০-৪০% না, বাড়াইলে এরা এক লাফে ৪০০-৫০০% করে দাম বাড়ায়। এরা ১ লিটার পানির মধ্যে গ্লুকোজ আর খাবার লবণ দিয়ে স্যালাইন বানায়। হসপিটালে গেলে আপনার পানি শূন্যতা থাকুক আর নাই থাকুক এরা সবচেয়ে আগে ৭০০ টাকার একটা স্যালাইন ঝুলায়। যেটা ম্যানুফ্যাকচারে তাদের খরচ ২৫ টাকা। তার মধ্যে ২২ টাকায় স্যালাইনের প্লাস্টিকের খরচ। পানি ৩ টাকা। পানিতে অল্প একটু পটাসিয়াম যোগ করে নাম চেঞ্জ করে দাম বাড়িয়ে ৭০০ টাকা। অত্যাবশকীয় আইন থেকে দায়মুক্তি। এভাবে অত্যাবশকীয় ওষুধের তালিকা অকার্যকর হতে থাকলো। তাছাড়া ৩২ বছর আগের অ্যান্টি বায়োটিক আর ওষুধ এখন আর কেউ খায় না, কেউ বানায় না।
২০২০ সাল নাগাদ ৪০% ওষুধ বাতিল হয়ে গেলো। ৩২ বছর আগের রোগগুলো ছিল ডায়রিয়া, কলেরা, পোলিও, ম্যালেরিয়া। এখন ঢাকার জনপ্রিয় রোগ হলো ব্রেস্ট ক্যান্সার, জরায়ুমুখের ক্যান্সার, যক্ষ্মা, স্ক্যাবিস, হৃদরোগ, হাপানী, চর্মরোগ, হাইপার টেনশন। নতুন স্বাভাবিক হয়ে ওঠা এই রোগগুলোকে প্রতিহত করতে, নতুন দিনের অ্যান্টিবায়োটিকগুলোকে জায়গা দিতে, ট্রাম্প সরকার ক্ষমতায় আসার পর সারা বিশ্বে এইডসের ফ্রি ওষুধ বন্ধ করার অসহায়ত্ব কমাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১১৭ থেকে বাড়িয়ে তালিকাটা ২৯৫তে নিয়ে গেলো। তালিকাটা কার্যকর হলে মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বুড়িমার ইনহেলারের দাম ৮০০ থেকে নেমে যেতো ৪০০ টাকায়। তখন সে মাত্র ২ দিন ভিক্ষা করেই স্বাস নিতে পারতো। কিন্তু ওষুধ কোম্পানির জন্য এটা একটা নাইটমেয়ার। তার সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ওষুধগুলোর প্রফিট আপনি এক প্রজ্ঞাপনে ৮০-৯০% কমিয়ে দিচ্ছেন। ওরা লাগলে সরকারকে মারবে বা নিজেরা মরে যাবে তাও এই ৮ই জানুয়ারি করা এই প্রজ্ঞাপন সহ্য করবে না। ২২ জানুয়ারি ওরা হাইকোর্টে গিয়ে মামলা করে দিলো। আমার ইনটুইশন বলছে বিচারপতিকেও যা খাওয়ানো দরকার খাওয়ালো। আমার ইনটুইশন বলছে বিএনপিকে নির্বাচনের জন্য ফেব্রুয়ারি মাসে কয়েকশত কোটি টাকা ডোনেশন দিলো। ফলাফল হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ জনগুরুত্বপূর্ণ এই সংস্কার বাতিল করে দিলো। না দিয়ে উপায়ও বিএনপির কাছে নেই। তারা ওষুধ মালিক সমিতির সাথে বেয়াদবি করার মতো রাজনৈতিক পজিশনে নেই। আপনারা নিশ্চিত থাকেন প্রতিবাদ করে লাভ হবে না। ওরা আপনার মায়ের আর সন্তানের লাশ খুবলে খাবেই। এটাই ওদের পেশা। ওদের রুটি-রুজি। এটা তো গেলো ওষুধের দাম। ইন্টেরিম হার্টের রিং এর দাম কমিয়েছিল। এখন শক্ত লবি চলছে রিং এর দাম বাড়ানো নিয়ে। হয়তো শীঘ্রই সেটাও বাড়বে।
জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা কোনো anti-business নীতি নয়। ওষুধ কোম্পানি লাভ করতেই পারে। তারা গবেষণা করবে, বিনিয়োগ করবে, কর্মসংস্থান তৈরি করবে, ব্যবসা সম্প্রসারণ করবে। কিন্তু মানুষের অসহায়ত্বকে unlimited pricing power-এ পরিণত করার অধিকার কোনো শিল্পের থাকতে পারে না।
