সুইডেনের গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্রেসি’ (সংক্ষেপে V-Dem) তাদের সাম্প্রতিক ডেমোক্রেসি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে পৃথিবীর ৭৪% মানুষ স্বৈরতন্ত্র (Autocracy) এবং মাত্র ৭% মানুষ উদার গণতান্ত্রিক (Liberal Democracy) ব্যবস্থার অধীনে বসবাস করছে।
৯২টি দেশ বর্তমানে স্বৈরতান্ত্রিক এবং ৮৭টি দেশ মোটের ওপর গণতান্ত্রিক। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ৮৭টি গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যেও প্রায় ৪৪টি দেশ ধীরে ধীরে স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঝুঁকছে। রিপোর্টে এই ক্যাটাগরিকে বলা হচ্ছে ‘Autocratizing’ বা সহজ বাংলায় ‘স্বৈরতন্ত্রীকরণের পথে থাকা দেশ’। এই ক্যাটাগরিটা বেশ জটিল ও ধূসর, যেখানে সূচকগুলো খুবই ইঙ্গিতপূর্ণ। অর্থাৎ, এই দেশগুলোকে এখনই সরাসরি স্বৈরতান্ত্রিক বলা যাবে না, তবে তাদের রাজনৈতিক কাঠামো ও অভিমুখ স্পষ্টতই স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঝুঁকছে—যাকে বলা যায় ‘সম্ভাব্য স্বৈরতন্ত্র’।
এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, ভি-ডেম কেবল সরকার পরিচালন ব্যবস্থা বা ‘মোডালিটি অব গভর্নেন্স’-এর ওপর ভিত্তি করে কোনো দেশকে স্বৈরতন্ত্র কিংবা গণতন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করেনি। বরং তারা সামগ্রিক রাজনৈতিক কাঠামো এবং আর্থ-সামাজিক পরিবেশের সবকটি উপাদান ও সূচককে বিবেচনায় নিয়েছে। এই কারণেই স্বৈরতন্ত্রীকরণের এই তালিকায় যুক্তরাজ্যের মতো দেশ এবং ইউরোপের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রও স্থান পেয়েছে। অর্থাৎ, এসব দেশের শাসনকাঠামো আপাতদৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক হলেও সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা ক্রমেই অগণতান্ত্রিক হয়ে উঠছে। এর বড় প্রমাণ ইউরোপজুড়ে কট্টর ডানপন্থার (Far-Right) উত্থান এবং চরম অভিবাসন-বিরোধী রাজনীতির দ্রুত বিস্তার।
ইউরোপীয় রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া এখন বেশ স্পষ্ট। একদিকে রক্ষণশীল ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীদের প্রবল উত্থান ঘটছে, অন্যদিকে ইউরোপীয় বামপন্থী ব্লকগুলোও প্রতিরোধের রাজনীতি জারি রেখেছে। যেমন জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় স্যাক্সনি রাজ্যে উগ্র ডানপন্থী দল এএফডি (AfD)-র জয় হয়েছে; আবার সুইডেনে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হচ্ছে। এই দলটি দীর্ঘদিন ধরে ‘পার্টি অব ইউরোপিয়ান সোশ্যালিস্টস’ এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের দ্বিতীয় বৃহত্তম জোট ‘প্রোগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স অব সোশ্যালিস্টস অ্যান্ড ডেমোক্র্যাটস’-এর অন্যতম প্রধান শক্তি। এই জোটে সুইডেন, ডেনমার্ক, জার্মানি, স্পেন, ইতালি, নরওয়ে ও আইসল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের মধ্য-বামপন্থী দলগুলো রয়েছে। বিশেষ করে নর্ডিক অঞ্চলে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব ঐতিহাসিকভাবেই সবসময় শক্তিশালী ছিল।
তবে মূল সংকট তৈরি হয়েছে নব্য-উদারনীতিবাদ (Neoliberalism) ও করপোরেটিজমের নতুন আগ্রাসনের কারণে। এর চাপে দলগুলো তাদের বামপন্থী আদর্শ থেকে সরে এসে অনেক বেশি মধ্যপন্থার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছে। কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, উদার গণতন্ত্রী নেতারাও এখন টিকে থাকার জন্য ডানপন্থী ও রক্ষণশীলদের সাথে জোট বাঁধছেন। উদাহরণস্বরূপ, সুইডেনের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ‘মডারেট পার্টি’ চরম ডানপন্থী ‘সুইডেন ডেমোক্র্যাটস’-এর সমর্থন নিয়ে সরকার পরিচালনা করছে। ফলে একদিকে ইউরোপীয় রাজনৈতিক মূল্যবোধভিত্তিক সামাজিক চুক্তিগুলো নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে উদার ও সংসদীয় গণতান্ত্রিক দলগুলোও কার্যত ডানপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে।
ইউরোপীয় রাজনীতিতে মধ্যপন্থী শক্তিগুলো এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। জার্মানির ঐতিহ্যবাহী ‘ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন’ (CDU) এর বড় প্রমাণ। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে তাদের সবচেয়ে বেশি আসন থাকা সত্ত্বেও জার্মানির পূর্বাঞ্চলে এএফডি-র জয়ে তারা স্পষ্টতই দিশেহারা। তারা যে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের সাথে কোনো স্থায়ী ও শক্তিশালী সমঝোতায় যাবে, সেই ঐতিহ্যবাহী আর্থ-সামাজিক ঐকমত্যও এখন ভেঙে পড়েছে। রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব ছিল করপোরেট আগ্রাসন থেকে সাধারণ নাগরিক ও শ্রমিক শ্রেণিকে সুরক্ষা দেওয়া, কিন্তু সেই বোঝাপড়া আজ অনেকটাই বিলুপ্ত। আবার বামপন্থী সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরাও উভয়সংকটে রয়েছে—তারা অভিবাসী ও মেহনতি মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায় ঠিকই, কিন্তু যুদ্ধ ও নজিরবিহীন মূল্যস্ফীতিজনিত অর্থনৈতিক সংকটের মুখে তারা না পারছে উদার অভিবাসন নীতি ধরে রাখতে, না পারছে করপোরেট শক্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে। ডেনমার্কের বর্তমান সরকার এর বড় উদাহরণ। নর্ডিক মডেলে অর্থনৈতিক সংকট সামাল দিতে মেটে ফ্রেডেরিকসেনের সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে, যার ফলে টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পরও শেষ পর্যন্ত তাকে অভিবাসন নীতি কঠোর করার পথেই হাঁটতে হয়েছে।
সুইডেনে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এলেও তাদের ব্যবধান খুব সামান্য (মাত্র তিনটি আসন)। ফলে তাদেরও হয়তো শেষ পর্যন্ত জনতুষ্টির চাপে পড়ে অভিবাসন নীতিতে ছাড় দিতে হবে। অর্থাৎ, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরাও আদর্শিক অবস্থান হারিয়ে মধ্যপন্থীতে রূপ নিচ্ছে। বিপরীতে, পুরো ইউরোপজুড়ে এখন ‘ফার-লেফট’ বা চরম বামপন্থী দলগুলোর সক্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে তাদের আসন সংখ্যা (মাত্র ৫৩টি) কম হলেও সামাজিক মাধ্যমে এবং রাজপথের আন্দোলনে তাদের সরব উপস্থিতি লক্ষণীয়। ফ্রান্স, স্পেন কিংবা ইতালিতে তাদের শক্ত অবস্থান থাকলেও নর্ডিক অঞ্চলে এই মেরুকরণ কম, যা রাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্য এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করছে।
অন্যদিকে স্লোভেনিয়া কিংবা ক্রোয়েশিয়ার মতো দেশে ডানপন্থীরা মাথাচাড়া দিচ্ছে, আবার অস্ট্রিয়া বা পোল্যান্ডের রাজনীতিতে বামপন্থীরা এখনও যথেষ্ট প্রভাবশালী। হাঙ্গেরির মতো রাষ্ট্রে দীর্ঘদিনের কট্টর ডানপন্থী ভিক্টর অরবানের স্বৈরতান্ত্রিক ধাঁচের রাজনীতির বিরুদ্ধে মধ্য-ডানপন্থীরা প্রতিরোধ গড়ে তুললেও দেশটির ভৌগোলিক ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বড় কোনো রূপান্তর কঠিন। মজার ব্যাপার হলো, ইউরোপের চরম ডানপন্থীদের বড় একটি অংশ মুখে কট্টর জাতীয়তাবাদী হলেও তলে তলে ক্রেমলিনপন্থী (পুতিনঘনিষ্ঠ)—যা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও রণকৌশল গবেষণার একটি চমৎকার বিষয় হতে পারে।
ইউরোপের রাজনীতিতে আরেকটি ঐতিহাসিক স্ববিরোধিতা লক্ষণীয়। সাবেক সোভিয়েত বা কমিউনিস্ট ব্লকের দেশগুলোতে কখনো কার্যকর লিবারেল ডেমোক্রেসি বা সোশ্যাল ডেমোক্রেসির বিকাশ ঘটেনি বললেই চলে। সেখানে হয় ডানপন্থী, নয়তো মধ্য-ডানপন্থীরাই রাজত্ব করেছে। এদের বিরুদ্ধে সবসময় চরম বামপন্থীরাই সোচ্চার ছিল। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, এসব দেশের ডানপন্থীরা মূলত পুরনো সোভিয়েত কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা দ্বারাই পরিচালিত, অথচ বামপন্থীরা বরং অনেক বেশি বহুজাতিক ও উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে।
এই আলোচনার দুইটি দিক স্পষ্ট হয়। এক, বিশ্বজুড়ে চরম ডানপন্থার (Far-right) উত্থান যেমন ঘটছে, তেমনি তার বিপরীতে প্রতিরোধও দানা বাঁধছে একেবারেই ভিন্ন ও অভিনব উপায়ে। বাস্তবতাকে বুঝতে হলে এই দ্বিমুখী প্রক্রিয়ার দুটোকেই আমলে নিতে হবে। দুই, আমাদের দেশে যারা বামপন্থী বা লিবারেল রাজনীতিকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বা অকার্যকর মনে করে উপহাস করেন, তাদের বোঝা দরকার যে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি। তা না হলে কমিউনিস্টদের শক্ত ঘাঁটি হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব জার্মানিতে আজ নব্য-নাৎসিবাদীরা কেন জনসমর্থন পাচ্ছে? কেন নিউইয়র্কের মতো পুঁজিতান্ত্রিক মেগাসিটিতে জোহরান মামদানির মতো ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টরা শক্ত অবস্থান তৈরি করছেন? কিংবা শান্তিপ্রিয় নর্ডিক দেশগুলোতে আশ্রয় নেওয়া যেসব অভিবাসী নিজ দেশে ডানপন্থা সমর্থন করতেন, তারা কেন নতুন দেশে এসে নিজেদের নাগরিক সুরক্ষার স্বার্থে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিচ্ছেন?
নির্বাচনী গণতন্ত্রের সমীকরণ আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও এটি অত্যন্ত জটিল। উপরন্তু, ‘ইলেকটোরাল অটোক্রেসি’ (নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র) শেষমেশ ‘ক্লোজড অটোক্রেসি’র রূপ নেয়। ভি-ডেম তাদের রিপোর্টে পূর্ববর্তী তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশকে এই কাতারে রেখেছে। দেখার বিষয়, আগামী বছরগুলোতে এই মূল্যায়ন কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
ভি-ডেম তাদের পর্যালোচনায় বর্তমান সময়কে স্বৈরতন্ত্রীকরণের ‘তৃতীয় তরঙ্গ’ (Third Wave of Autocratization) বলে অভিহিত করেছে। তবে এই সংজ্ঞায়নের সাথে শতভাগ একমত হওয়া কঠিন। কারণ কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কখনোই একমাত্রিক বা সম্পূর্ণ ‘মনোলিথিক’ হতে পারে না। এই সংকটের সমান্তরালে বিশ্বজুড়ে ‘গণ-গণতান্ত্রিকরণ’ (Mass Democratization)-এরও এক নীরব তরঙ্গ বইছে, যার প্রকৃত চরিত্র হয়তো কেবল প্রচলিত নির্বাচনী সূচকগুলো দিয়ে পুরোপুরি পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
(নোট: ভি-ডেমের প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের কার্যপদ্ধতি ও সূচক নির্ধারণ তুলনামূলকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং তারা স্থানীয় প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় নেয়। তাছাড়া তাদের গবেষক দল শুধু পশ্চিমা গবেষকনির্ভর নয়, বরং বৈচিত্র্যময়। তবে দিনশেষে কোনো গবেষণাই পরম সত্য নয়।)
