এই লেখাটা মূলত একটা অবজারভেশন। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে, বিশেষ করে ডানপন্থী তরুণদের রাজনীতিতে, যে পরিবর্তনটা আমি দেখেছি, সেই নিয়ে অবজারভেশন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। পরে সাংবাদিকতা করেছি। সেই সুবাদে বাংলাদেশের তিনটা বড় রাজনৈতিক ব্লক, আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জামায়াত, তিন দিকেই আমার পরিচিত মানুষ আছে। বন্ধু আছে। সিনিয়র-জুনিয়র আছে। ফলে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরেও মানুষগুলো কী ভাবছে, নিজেদের মধ্যে কী নিয়ে কথা বলছে, তাদের চিন্তার পরিবর্তন কোথায় হচ্ছে, কিছুটা কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। শাহবাগ আন্দোলনের সময় আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। শাহবাগের আগের সময়টা দেখেছি। শাহবাগ দেখেছি। তার প্রতিক্রিয়ায় হেফাজতের উত্থান দেখেছি। তারপরের দশ বছরের রাজনীতিও মোটামুটি চোখের সামনেই গেছে।
ওই সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিরোধের একটা বড় অংশ ছিল জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে। একদিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটা এথনো-কালচারাল ভার্সন, যার রাজনৈতিক নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ছিল এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে বাম ও লিবারেল-প্রগ্রেসিভ অংশেরও বড় ভূমিকা ছিল। অন্যদিকে ছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থী একটা বড় অংশ।২০১৩-১৫ সালের দিকে এই দুই পক্ষের কালচারাল ওয়ার ছিল বেশ প্রকাশ্য। কেউ কাউকে খুব একটা ছাড় দিত না।
কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংকট, তারপর ২০১৮ সালের নির্বাচন, এই সময়ের পরে আমি ডানপন্থী তরুণদের একটা অংশের ভাষায় একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলাম। বিশেষ করে জামায়াত-শিবির ঘরানার যেসব তরুণের সঙ্গে কথা হতো, তাদের অনেকেই ইতিহাসের পুরোনো বিতর্কে আগের মতো আগ্রহ দেখাত না। আমার অন্তত সে রকমই মনে হয়েছিল। তাদের বক্তব্য মোটামুটি এমন ছিল: একাত্তর নিয়ে যা হওয়ার হয়েছে। ইতিহাসের বিতর্ক শেষ করা সম্ভব না। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান সমস্যা হচ্ছে গণতন্ত্র, নির্বাচন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক অধিকার এবং ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন। কাজেই সামনে তাকানো দরকার।
২০২০, ২০২১, ২০২২ সালেও বিভিন্ন আড্ডা, অনুষ্ঠান বা ব্যক্তিগত আলোচনায় একই ধরনের টোন পেয়েছি। একাত্তরকে ভারতের ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা অন্তত শিক্ষিত তরুণ অংশে খুব জোরালোভাবে দেখিনি। আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধের ন্যারেটিভ নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলত। শেখ হাসিনার সরকার মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিক লেজিটিমেসি তৈরির জন্য কীভাবে ব্যবহার করেছে, তার সমালোচনা করত। কিন্তু সেই সমালোচনা আর সরাসরি মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা এক জিনিস ছিল না। বরং একটা ভাইব ছিল: হিস্ট্রি নিয়ে এন্ডলেস ফাইট করে লাভ কী? বাংলাদেশের পলিটিক্যাল সিস্টেম ঠিক করি।
আমার তখন মনে হয়েছিল, সম্ভবত বাংলাদেশের ডানপন্থী রাজনীতিতে একটা জেনারেশনাল শিফট হচ্ছে। বিশেষ করে জামায়াত-শিবিরের তরুণদের মধ্যে হয়তো একটা অংশ বুঝতে শুরু করেছে যে তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম একাত্তরের প্রশ্নে যে রাজনৈতিক ব্যাগেজ তৈরি করে গেছে, সেটা সারাজীবন বয়ে বেড়ানোর কোনো অর্থ নেই। গণতান্ত্রিক রাজনীতি করতে হলে বর্তমানের প্রশ্নে আসতে হবে। আমি ভেবেছিলাম, এই পরিবর্তনটা জেনুইনও হতে পারে।
২০২৪-এর পরে এসে আমার সেই ধারণা অনেকটাই বদলে গেছে।
৫ আগস্ট ২০২৪-এ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়। জুলাই-আগস্টের আন্দোলন একই সঙ্গে পুরোনো ক্ষমতা কাঠামো ভেঙেছে এবং একটি নতুন রাজনৈতিক স্পেস তৈরি করেছে। এই জায়গাতেই আমার প্রশ্ন। এত বড় একটা গণঅভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রধান এজেন্ডা কী হওয়া উচিত ছিল? আমার কাছে উত্তরটা খুব কঠিন মনে হয় না। প্রসিডিউরাল ডেমোক্রেসি, ফ্রি পলিটিক্যাল কম্পিটিশন, হিউম্যান রাইটস, রুল অব ল, ইনস্টিটিউশনাল রিফর্ম, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বন্ধ করা এবং ভোটের অধিকার ফেরানো।
কারণ আন্দোলনের পরে একটা বিরল জায়গা তৈরি হয়েছিল যেখানে বিএনপি, জামায়াত, লিবারেল, প্রগ্রেসিভ, বাম, ইসলামপন্থী, ছাত্র, নাগরিক সমাজ, সবাই অন্তত কিছু বেসিক পলিটিক্যাল প্রিন্সিপলের জায়গায় কথা বলতে পারত। কিন্তু খুব দ্রুত অন্য একটা জিনিস সামনে চলে এল। কালচারাল ওয়ার।
এবং আমার কাছে এই পরিবর্তনটাই সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং। কারণ ২০১৩ সালে কালচারাল ওয়ার কেন হয়েছিল, সেটা বোঝা যায়। দুইটা শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ব্লক মুখোমুখি ছিল। আওয়ামী লীগের পাশে ছিল শক্তিশালী বাঙালি জাতীয়তাবাদী কালচারাল এস্টাবলিশমেন্ট। অন্যদিকে ইসলামপন্থীরাও নিজেদের কাউন্টার-ন্যারেটিভ তৈরি করছিল।
কিন্তু ২০২৪-এর পরে পরিস্থিতি তো আর ২০১৩ সালের মতো ছিল না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় নেই। তাদের সাংগঠনিক শক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। তাদের কালচারাল এস্টাবলিশমেন্টও আগের মতো ডমিন্যান্ট পজিশনে নেই। তাহলে কালচারাল ওয়ার কাদের বিরুদ্ধে?
আমার মনে হয় এই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজলেই বর্তমান ডানপন্থী রাজনীতির একটা বড় কনট্রাডিকশন ধরা পড়ে। শুরুতে বলা হলো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কালচারাল ফাইট। ঠিক আছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ যখন মাঠেই প্রায় অনুপস্থিত, তখন সেই ফাইট খুব দ্রুত অন্যদিকে যেতে বাধ্য। প্রথমে লিবারেল-প্রগ্রেসিভ অংশের দিকে গেল। তারপর বামদের দিকে। তারপর বিএনপির দিকেও যেতে শুরু করল। অর্থাৎ যুদ্ধের ভাষা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে থাকলেও বাস্তবে যুদ্ধটা ক্রমে অ্যান্টি-আওয়ামী কোয়ালিশনের নিজেদের মধ্যেই ঢুকে গেল। এটাই কালচারাল ওয়ারের একটা মৌলিক সমস্যা। কালচারাল ওয়ারের জন্য একটা এনিমি দরকার। এনিমি শেষ হয়ে গেলে ওয়ার শেষ হয় না। নতুন এনিমি তৈরি হয়।
এই জায়গায় মাহমুদুর রহমানের মতো সম্পাদকদের ভূমিকা দেখা গেল, যিনি একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। আবার হাদির কিংবা ঝুমার মতো তরুণ অ্যাক্টিভিস্টরাও এই কালচারাল ফাইটের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠলেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নিয়োগ পাওয়া কিছু ভাইস চ্যান্সেলর, শিক্ষক এবং বুদ্ধিজীবীর মধ্যেও একই ধরনের ভাষা ও প্রবণতা দেখা গেল। এখানে ব্যক্তি মাহমুদুর রহমান বা হাদি একা মূল বিষয় না। মূল বিষয় হচ্ছে ব্রডার পলিটিক্যাল প্যাটার্ন।
ডানপন্থী সাংবাদিকদের একটা অংশ, অ্যাক্টিভিস্ট, অনলাইন সেলিব্রিটি, ইন্টেলেকচুয়াল, শিক্ষক, নতুন ইনস্টিটিউশনাল ফিগার, সবাই মিলে খুব দ্রুত একটা প্রশ্নকে কেন্দ্রীয় করে তুললেন: বাংলাদেশের ইতিহাস এবং কালচার আসলে কার দখলে? এবং এর সঙ্গে আরেকটা ন্যারেটিভ তৈরি হলো। লিবারেল এবং লেফটিস্টরা নাকি স্বাধীনতার পর থেকে দেশের ইন্টেলেকচুয়াল এবং কালচারাল স্পেস দখল করে রেখেছে। এখন সেই জায়গা “ফেরত” নিতে হবে।
এই ল্যাঙ্গুয়েজ খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে পলিটিক্স আর সিটিজেন রাইটসের পলিটিক্স থাকে না। পলিটিক্স হয়ে যায় পজেশনের পলিটিক্স।
দেশ কার? ইতিহাস কার? সংস্কৃতি কার? কোন গান বাংলাদেশের? কোন পোশাক বাংলাদেশের? কে ন্যাশনালিস্ট? কে ইন্ডিয়ান এজেন্ট? কে শাহবাগী? কে সেক্যুলার? কে ইসলামবিরোধী? এই প্রশ্নগুলো সামনে আসতে শুরু করলে খুব দ্রুত ইনস্টিটিউশনাল রিফর্মের প্রশ্ন পিছনে চলে যায়।
এবং আরও ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, এর সঙ্গে সঙ্গে আবার ১৯৭১-এর পুরোনো বিতর্কগুলো ফিরতে শুরু করল। যে বিষয়গুলো কয়েক বছর ধরে অন্তত তরুণ ডানপন্থীদের একটা অংশ তুলনামূলকভাবে এড়িয়ে যাচ্ছিল, সেগুলো আবার সেন্টার স্টেজে চলে এল। আল-বদর নিয়ে বিতর্ক। ইসলামী ছাত্র সংঘ নিয়ে বিতর্ক। পাকিস্তানি সিম্বলিজম নিয়ে বিতর্ক। মুক্তিযুদ্ধের এস্টাবলিশড ন্যারেটিভের বিভিন্ন অংশকে নতুন করে রিইন্টারপ্রেট করার চেষ্টা।
এখানে একটা হিস্টোরিক্যাল ডিস্টিংকশন পরিষ্কার থাকা দরকার। ১৯৭১ সালের আল-বদর এবং তৎকালীন জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের সম্পর্ক কোনো নতুন আওয়ামী লীগ ন্যারেটিভ নয়। ১৯৭১ সালের দলিলপত্রে আল-বদরের সঙ্গে ইসলামী ছাত্র সংঘের সাংগঠনিক সম্পর্ক এবং বুদ্ধিজীবী হত্যায় আল-বদরের ভূমিকা নথিভুক্ত হয়েছে।
ইতিহাস নিয়ে নতুন গবেষণা অবশ্যই হবে। পুরোনো ইন্টারপ্রিটেশন চ্যালেঞ্জও করা যাবে। কিন্তু হিস্টোরিক্যাল রিসার্চ আর পলিটিক্যাল রিহ্যাবিলিটেশন এক জিনিস না। আমার সমস্যা দ্বিতীয় জায়গায়। কারণ কখনো কখনো আমার মনে হচ্ছে, ইতিহাস জানার আগ্রহ থেকে এই ডিবেট হচ্ছে না। বরং বর্তমানের একটা মুসলিম ন্যাশনালিস্ট পলিটিক্যাল আইডেন্টিটি তৈরির প্রয়োজন থেকে অতীতকে নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা হচ্ছে।
এখানেই আমি নতুন ডানপন্থার জন্য একটা বড় পলিটিক্যাল ডেঞ্জার দেখি। তারা সম্ভবত ধরে নিচ্ছে কালচারাল ওয়ারটা তারা জিততে পারবে। আমার ধারণা, এই হিসাব ভুল।
আপাতত তাদের শক্তিশালী মনে হওয়া খুব স্বাভাবিক। ইসলামিস্ট ইন্টেলেকচুয়াল ইকোসিস্টেম আগের তুলনায় অনেক দৃশ্যমান। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের রিচ অনেক বেশি। মিডিয়ায় তাদের ইনফ্লুয়েন্স বেড়েছে। দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক রিপ্রেশনের মধ্যে থাকার কারণে তাদের অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কও ডিসিপ্লিনড।
কিন্তু কালচারাল পলিটিক্স শুধু অর্গানাইজেশনাল স্ট্রেংথ দিয়ে চলে না। একটা দেশের হিস্ট্রি থাকে। মেমোরি থাকে। ট্রমা থাকে। সোশ্যাল কম্পোজিশন থাকে। একটা নির্দিষ্ট টেরিটরিতে ন্যাশনালিজমের নিজের একটা জিনিয়োলজি থাকে। বাংলাদেশকে শুধু “৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশ” হিসেবে পড়ে এই সোসাইটি বোঝা সম্ভব না। এখানেই আমার মনে হয় বাংলাদেশের নতুন রাইটের একটা ফান্ডামেন্টাল অ্যানালিটিক্যাল মিসটেক আছে। তারা রিলিজিয়াস ডেমোগ্রাফিকে পলিটিক্যাল ইউনিফর্মিটি মনে করছে। কিন্তু বাংলাদেশের মুসলমানরা কোনো ইউনিফর্ম পলিটিক্যাল কমিউনিটি না।
একই গ্রামের তিনজন মানুষই মুসলমান হতে পারে। একজন আওয়ামী লীগ করে। একজন বিএনপি করে। একজন জামায়াত করে। তিনজনই নামাজ পড়তে পারে। তিনজনেরই ইসলামের সঙ্গে কালচারাল অ্যাটাচমেন্ট থাকতে পারে। কিন্তু তাদের পলিটিক্যাল হিস্ট্রি এক না। ফ্যামিলি মেমোরি এক না। রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণা এক না। ১৯৭১ সম্পর্কে পারসেপশনও এক না।
বাংলাদেশের পলিটিক্সে পার্টি আইডেন্টিটি শুধু আইডিওলজি দিয়ে তৈরি হয়নি। ফ্যামিলি, লোকালিটি, প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট রিলেশনশিপ, হিস্টোরিক্যাল মেমোরি, পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স, পার্সোনাল এক্সপেরিয়েন্স, সবকিছু মিলিয়ে আইডেন্টিটি তৈরি হয়েছে। এই রিয়েলিটিকে “মুসলমান বনাম সেক্যুলার” দিয়ে এক্সপ্লেইন করতে গেলে শেষ পর্যন্ত অ্যানালিসিস ভুল হবেই।
আমার মনে হয় বাংলাদেশের নতুন রাইটের একটা অংশ ভারতের বিজেপি মডেল দেখে খুব বেশি এক্সাইটেড। ভারতে বিজেপি দীর্ঘ সময় ধরে একটা কালচারাল প্রজেক্ট করেছে। কংগ্রেসের সেক্যুলার ন্যাশনালিজমের বিপরীতে হিন্দু ন্যাশনালিজম কনসোলিডেট করেছে। পাকিস্তান এবং মুসলিম আইডেন্টিটিকে থ্রেট ন্যারেটিভের অংশ করেছে। হিস্টোরিক্যাল গ্রিভেন্স ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশে একই ফর্মুলা কপি করা যাবে, এমন ধারণা আমার কাছে খুবই দুর্বল মনে হয়। কারণ বাংলাদেশ ইজ নট ইন্ডিয়া।
বাংলাদেশের রাষ্ট্র জন্মেছে একটা লিঙ্গুইস্টিক-কালচারাল ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। আপনি সেই ন্যাশনালিজমের অনেক কিছু সমালোচনা করতে পারেন। আওয়ামী লীগ এটাকে অ্যাবিউজ করেছে, এই আর্গুমেন্টও করা যায়। মুক্তিযুদ্ধের নামে কর্তৃত্ববাদকে জাস্টিফাই করা হয়েছে, সেটাও বলা যায়। কিন্তু আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকে অ্যাবিউজ করেছে বলে মুক্তিযুদ্ধের হিস্টোরিক্যাল ক্যাপিটাল শেষ হয়ে যায় না। এই জায়গাটাই সম্ভবত নতুন রাইট আন্ডারএস্টিমেট করছে।
এবার আসা যাক বিএনপির আলাপে। আমার ধারণা, বিএনপি এই কালচারাল ওয়ার দীর্ঘমেয়াদে ফাইট করতে পারবে না। তার কিছু কারণ আছে। বিএনপি নিদার জামায়াত, নর আওয়ামী লীগ। তার ন্যাশনালিজম অনেক বেশি স্টেট-সেন্ট্রিক এবং টেরিটোরিয়াল। তার মধ্যে মুসলিম আইডেন্টিটি আছে। আবার ১৯৭১-ও আছে। জিয়াউর রহমান নিজে মুক্তিযোদ্ধা এবং সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। ফলে বিএনপি যদি একদিকে পুরো ইসলামিস্ট হিস্টোরিক্যাল রিভিশনিজমের দিকে যায়, তার নিজের পলিটিক্যাল জিনিয়োলজির সঙ্গে কনফ্লিক্ট তৈরি হবে। আবার অন্যদিকে আওয়ামী লীগের বেঙ্গলি ন্যাশনালিস্ট ল্যাঙ্গুয়েজ পুরোপুরি গ্রহণ করাও বিএনপির পক্ষে সম্ভব না। ফলে কালচারাল ওয়ার তীব্র হলে বিএনপি মাঝখানে পেরালাইজড হয়ে পড়বে। কেননা সে জোরালোভাবে পক্ষ নিতে পারবে না। তারা কিছু ট্যাকটিক্যাল রেজিস্ট্যান্স দিতে পারবে। কিছু আর্টিকুলেশন তৈরি করতে পারবে। কিন্তু ইন্টেলেকচুয়াল কালচারাল ওয়ারের জন্য যে দীর্ঘ ইনস্টিটিউশনাল ট্র্যাডিশন লাগে, সেটা বর্তমানে বিএনপির খুব শক্তিশালী জায়গা বলে আমার মনে হয় না।
তাহলে কী হবে?
আমার ধারণা, কালচারাল কনফ্লিক্ট যদি এভাবেই বাড়তে থাকে, তাহলে বেঙ্গলি ন্যাশনালিজম আবার পলিটিক্যাল নেসেসিটি হিসেবে ফিরে আসবে।
আজকে কথাটা স্ট্রেঞ্জ মনে হতে পারে। কারণ আওয়ামী লীগ দুর্বল। তাদের কালচারাল ইনফ্লুয়েন্সও আগের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু পলিটিক্স ভ্যাকুয়াম পছন্দ করে না। আপনি যদি প্রতিদিন মানুষের সামনে বলেন মুক্তিযুদ্ধের এস্টাবলিশড মেমোরি প্রশ্নবিদ্ধ, সেক্যুলার বা লিবারেল পলিটিক্স বিদেশি, বেঙ্গলি কালচারাল ন্যাশনালিজম সাসপেক্ট, দেশের কালচারাল স্পেস “দখলমুক্ত” করতে হবে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এর বিপরীতে একটা কাউন্টার-আইডেন্টিটি তৈরি হবে।
এবং সেই কাউন্টার-আইডেন্টিটি তৈরি করার সবচেয়ে রেডি-মেড পলিটিক্যাল ল্যাঙ্গুয়েজ বাংলাদেশে কী? বাঙালি জাতীয়তাবাদ।
এখন আওয়ামী লীগ দুর্বল বলে এই ন্যাশনালিজমও দুর্বল মনে হচ্ছে। কিন্তু কালচারাল ওয়ার চালিয়ে গেলে ডানপন্থীরাই সেই ন্যাশনালিজমের পলিটিক্যাল ডিমান্ড আবার তৈরি করতে পারে। এটা তাদের সবচেয়ে বড় প্যারাডক্স হবে। যে রাজনীতিকে তারা শেষ করতে চাইছে, তার পুনর্জন্মের কন্ডিশন তারাই তৈরি করবে।
এবং তখন হয়তো নতুন কোনো পলিটিক্যাল ফরমেশন সেই স্পেস নেবে। সেটা আওয়ামী লীগ হতে পারে। আওয়ামী লীগের পরিবর্তিত কোনো ভার্সন হতে পারে। সম্পূর্ণ অন্য কোনো লিবারেল বা বেঙ্গলি ন্যাশনালিস্ট ফোর্সও হতে পারে। নামটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ না। পলিটিক্যাল ডিমান্ডটা গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটা বিপদ আরও বড়।
২০১৪-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ডানপন্থীদের একটা বড় অংশ রাষ্ট্রীয় রিপ্রেশনের শিকার হয়েছে। গুম, মামলা, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক এক্সক্লুশন, মত প্রকাশের সংকোচন, এসবের কারণে সমাজের অনেক লিবারেল এবং নন-ইসলামিস্ট মানুষের মধ্যেও তাদের প্রতি সিমপ্যাথি তৈরি হয়েছিল।
এই সিমপ্যাথি খুব ভ্যালুয়েবল পলিটিক্যাল ক্যাপিটাল। কারণ এটা আইডিওলজি থেকে তৈরি হয়নি। এটা তৈরি হয়েছিল ইনজাস্টিসের অভিজ্ঞতা থেকে। মানুষ ভেবেছিল, আমি আপনার পলিটিক্স পছন্দ না-ও করতে পারি, কিন্তু আপনার রাজনৈতিক অধিকার আছে। এটাই ডেমোক্রেসির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
২০২৪ সেই জায়গাটাকে আরও বড় করার সুযোগ দিয়েছিল। জামায়াত চাইলে বলতে পারত, আমাদের সঙ্গে যা হয়েছে, সেটা আর কারও সঙ্গে হতে দেব না। শিবির চাইলে বলতে পারত, ক্যাম্পাসে আমাদের ওপর যে পলিটিক্যাল এক্সক্লুশন হয়েছে, আমরা ক্ষমতা পেলে অন্যদের সঙ্গে সেটা করব না। ডানপন্থী তরুণরা বলতে পারত, হিস্ট্রি নিয়ে ডিজঅ্যাগ্রিমেন্ট থাকবে, কিন্তু স্টেট হবে সবার। এটা একটা এক্সট্রাঅর্ডিনারি পলিটিক্যাল ট্রান্সফরমেশন হতে পারত। কিন্তু কালচারাল ওয়ারের বর্তমান ট্রেন্ড সেই পসিবিলিটিকে দুর্বল করছে।
কারণ আপনি যদি একদিকে বলেন, আমাদের ওপর রিপ্রেশন অন্যায় ছিল, আবার অপরচুনিটি পাওয়ার পর অন্যদের কালচারাল লেজিটিমেসিই অস্বীকার করতে শুরু করেন, তখন একটা ক্রেডিবিলিটি প্রবলেম তৈরি হয়।
আজকে আপনি বলছেন লিবারেলরা দেশ দখল করেছিল। কাল অন্য কেউ বলবে আপনারা দেশ দখল করেছেন। আজকে আপনি বলছেন আমাদের হিস্ট্রি বলতে দেওয়া হয়নি। কাল অন্য কেউ বলবে আপনারা আমাদের হিস্ট্রি বলতে দিচ্ছেন না।
এই সাইকেলের শেষ নেই।
সেই কারণেই আমার কাছে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০২৪-এর পরে বাংলাদেশের নতুন রাইট এমন একটা যুদ্ধ বেছে নিয়েছে যে যুদ্ধটা তাদের করার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। তাদের সামনে পলিটিক্যাল ফিল্ড খোলা ছিল। তারা ডেমোক্রেসির পলিটিক্স করতে পারত। ইনস্টিটিউশনের পলিটিক্স করতে পারত। করাপশন, ডিসেন্ট্রালাইজেশন, ইকোনমিক ইনইকুয়ালিটি, এডুকেশন, হেলথকেয়ার, ফরেন পলিসি, গভর্ন্যান্স নিয়ে একটা সিরিয়াস কনজারভেটিভ পলিটিক্যাল প্রোগ্রাম দাঁড় করাতে পারত।
কিন্তু তার বদলে আবার ইতিহাসের ট্রেঞ্চে ঢুকে পড়া হলো। আবার কে বাঙালি, কে মুসলমান। কে দেশপ্রেমিক, কে ভারতের লোক। কে শাহবাগী, কে ইসলামপন্থী। কে ১৯৭১-এর সঠিক ইন্টারপ্রিটেশন দিচ্ছে।
আমরা আবার সেই একই জায়গায় ফিরে যাচ্ছি। আর এই জায়গায় আমার শেষ অবজারভেশন একটু কঠিন।
ডানপন্থীরা দীর্ঘদিন যে পলিটিক্যাল সিমপ্যাথি অর্জন করেছে, সেটা আনলিমিটেড না। রাজনীতিতে রাখাল বালকের গল্প খুব নিষ্ঠুরভাবে কাজ করে। একবার মানুষ যদি বিশ্বাস করে আপনার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে, তারা আপনার পাশে দাঁড়াবে। দ্বিতীয়বারও দাঁড়াতে পারে। কিন্তু আপনি যদি সুযোগ পাওয়ার পরে দেখান যে আপনার আপত্তি রিপ্রেশনের বিরুদ্ধে ছিল না, আপনার আপত্তি ছিল শুধু রিপ্রেশনের টার্গেট আপনি ছিলেন বলে, তাহলে পরেরবার মানুষ আর একইভাবে বিশ্বাস করবে না। বাংলাদেশের জামায়াত-শিবির এবং তাদের কাছাকাছি থাকা নতুন ডানপন্থী অংশের (এনসিপি) সামনে তাই আমার মনে হয় একটা খুব সিম্পল চয়েস আছে।
তারা চাইলে ২০২৪-কে ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশনের বিগিনিং হিসেবে দেখতে পারে। অথবা এটাকে কালচারাল রিভেঞ্জের অপরচুনিটি হিসেবে দেখতে পারে। দুইটা এক জিনিস না। প্রথমটা তাদের বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিম ডেমোক্রেটিক পলিটিক্সের স্থায়ী অংশ বানাতে পারে। দ্বিতীয়টা হয়তো শর্ট টার্মে খুব স্যাটিসফাইং। ফেসবুকে অ্যাপ্লজ পাওয়া যায়। নিজেদের লোকজন এক্সাইটেড থাকে। এনিমি বানানো সহজ হয়। কিন্তু লং রানে এর ফল সম্ভবত উল্টো।
কারণ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটা অদ্ভুত ব্যাপার বারবার ঘটেছে। যে ন্যাশনালিজমকে ফোর্স দিয়ে চেপে রাখা হয়েছে, কালচারাল হিউমিলিয়েশন দিয়ে ডিসমিস করা হয়েছে, অথবা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে মৃত ধরে নেওয়া হয়েছে, সে ন্যাশনালিজম অন্য ফর্মে আবার ফিরে এসেছে। আজকে যারা বেঙ্গলি ন্যাশনালিজমকে মৃত ধরে নিয়ে কালচারাল ওয়ার করছে, তারা হয়তো খেয়াল করছে না, সেই ন্যাশনালিজমের পরবর্তী রিভাইভালের পলিটিক্যাল কন্ডিশন তারা নিজেরাই তৈরি করছে।
এবং সেদিন সবচেয়ে আয়রনিক ব্যাপার হবে এই যে, আওয়ামী লীগ নয়, বাংলাদেশের নতুন ডানপন্থার কালচারাল পলিটিক্সই হয়তো বাঙালি জাতীয়তাবাদকে আবার প্রয়োজনীয় করে তুলবে।
