বাংলাদেশের উচিত ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা। শিশুদের ডিজিটাল দক্ষতা শেখা, শিক্ষার জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করা এবং আধুনিক বিশ্বের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর ডিজিটাল শিক্ষার বিষয়টি এক নয়। টিকটক, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব শর্টস এবং অ্যালগরিদমনির্ভর অন্যান্য ফিড অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের জন্য উপযুক্ত নয়। এসব প্ল্যাটফর্ম এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে মানুষের মনোযোগ যতটা সম্ভব ধরে রাখা যায়, ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ করা যায় এবং তাকে সীমাহীন সময় ধরে স্ক্রল করতে উৎসাহিত করা যায়।
একটি শিশুর বিকাশমান মস্তিষ্ককে সেই যন্ত্রের ভেতরে একা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের শিশুরা খুব অল্প বয়সেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। এমনকি কেউ কেউ স্কুলে যাওয়ার আগেই স্মার্টফোন ব্যবহার শুরু করে। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুদের ওপর করা একটি ইউনিসেফ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ২৫ শতাংশ শিশু ১১ বছর বয়সের আগেই ডিজিটাল জগতে প্রবেশ করেছে। ৬৩ শতাংশ শিশু মূলত নিজেদের ঘর থেকেই ইন্টারনেট ব্যবহার করে এবং অনেকেই অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার কথা জানিয়েছে।
দুঃখজনকভাবে, অনেক অভিভাবক এই সমস্যার গভীরতা বুঝতে পারেন না। বরং অল্প বয়সেই সন্তান স্মার্টফোন খুব ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারছ এতে অনেক অভিভাবক গর্ববোধ করেন। অথচ এর প্রভাব শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশের পাশাপাশি তার দৃষ্টিশক্তির ওপরও পড়তে পারে। অনেক শহুরে পরিবারে স্মার্টফোন এখন এক ধরনের ‘ডিজিটাল বেবিসিটার’-এ পরিণত হয়েছে। বাবা-মা যখন কর্মব্যস্ত থাকেন কিংবা ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখন শিশুকে ব্যস্ত রাখার জন্য তার হাতে একটি ফোন তুলে দেন। শিশুটি হয়তো চুপচাপ হয়ে যায়; কিন্তু সেই নীরবতার আড়ালে সে কার্টুন থেকে সহিংস ভিডিওতে, কমেডি থেকে অশ্লীল কনটেন্টে, নিরীহ গেম থেকে জুয়ায়, শিশুদের গান থেকে ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতি, বডি-শেমিং, গালাগালি এবং প্রাপ্তবয়স্কদের নানা উদ্বেগের জগতে ঢুকে পড়তে পারে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক কারণ শৈশব মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর একটি। এই সময়েই নৈতিকতা, আবেগ এবং ভাষাগত দক্ষতার বিকাশ ঘটে। সেই সময়টি যদি স্ক্রিনের দখলে চলে যায়, তাহলে শিশুর অভ্যাস পরিবার, স্কুল, বই, খেলার মাঠ, প্রতিবেশী ও সামাজিক পরিবেশের পরিবর্তে অ্যালগরিদম দ্বারা নির্ধারিত হতে শুরু করে।
বাংলাদেশ এর আগে এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। কয়েক বছর আগে অনেক বাংলাদেশি শিশু জাপানি কার্টুন ‘ডোরেমন’-এর প্রতি গভীরভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছিল, বিশেষ করে টেলিভিশনে প্রচারিত হিন্দি ডাবিং সংস্করণটির প্রতি। অভিভাবকেরা লক্ষ্য করেছিলেন, কিছু শিশু বাংলার তুলনায় হিন্দিতে বেশি সাবলীল হয়ে উঠছে। শেষ পর্যন্ত সরকার এর সম্প্রচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, কারণ শিশুদের শিক্ষা ও ভাষাগত পরিবেশের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে কেউ একমত হতে পারেন, আবার নাও হতে পারেন। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত যুক্তিটি ছিল শিশুরা কী ধরনের গণমাধ্যম গ্রহণ করছে, তা কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে ভাষা, সংস্কৃতি ও শিশুর বিকাশের প্রশ্নও জড়িত।
আজ শিশুদের ব্যস্ত রাখার সেই পদ্ধতি টেলিভিশন থেকে স্মার্টফোনে চলে এসেছে। ব্যক্তিগত স্ক্রিনের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের বিনোদনের প্রধান মাধ্যমগুলোর একটি হয়ে উঠেছে; দিনের প্রায় যেকোনো সময়, অনেক ক্ষেত্রে শোবার ঘরের ভেতরে এবং প্রায়ই কোনো ধরনের নজরদারি ছাড়াই। একটি শিশুর ফিডে অপরাধের ভিডিও, রাজনৈতিক বিদ্বেষ, সহিংস ‘প্র্যাঙ্ক’, পর্নোগ্রাফি, নারীবিদ্বেষী কনটেন্ট, উগ্রবাদী প্রচারণা, জুয়া এবং প্রতারণামূলক কনটেন্ট চলে আসার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
এ ধরনের কনটেন্টের বারবার সংস্পর্শ নিষ্ঠুরতাকে স্বাভাবিক বলে মনে করতে শেখাতে পারে, বিপজ্জনক কর্মকাণ্ডের পদ্ধতি শেখাতে পারে এবং কোনো কাজের পরিণতি সম্পর্কে শিশুর উপলব্ধিকে দুর্বল করতে পারে। কিশোর-কিশোরীরা যখন অস্বাভাবিকভাবে নৃশংস কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, তখন ইন্টারনেট তাদের মতো অপরিণত মনের সামনে এমন সহিংসতা, প্রতারণা ও অপমানের নানা ‘স্ক্রিপ্ট’ তুলে ধরছে কি না সেটিও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি এই ডিজিটাল জগত কীভাবে সামলাতে হয়, সে ধরনের বিচারবোধ একটি শিশুর এখনও তৈরি হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের সরাসরি যৌন শিকারি, ব্ল্যাকমেইলার এবং ভুয়া বন্ধুত্বের ফাঁদে ফেলতে পারে। বিশেষ করে মেয়েদের এই পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত চাপ ও ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়। একটি ব্যক্তিগত ছবি তাদের ব্ল্যাকমেইলের অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। একটি ভুল সিদ্ধান্ত তাদের জীবনের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
এই কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট ব্যবহারে কঠোর আইনি বিধিনিষেধ আরোপ করা প্রথম দেশ। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, স্ন্যাপচ্যাট, এক্স, ইউটিউবসহ বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোতে ১৬ বছরের কম বয়সীদের অ্যাকাউন্ট ব্যবহারে সেখানে আইনগত বাধা দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাজ্যও ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার অনুরূপ মডেল অনুসরণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যা ২০২৭ সালের বসন্তে কার্যকর হওয়ার কথা। সংযুক্ত আরব আমিরাতও একই দিকে এগিয়েছে। দেশটি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ন্যূনতম বয়স ১৫ নির্ধারণ এবং আরও শক্তিশালী বয়স যাচাই ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এসব দেশের পদক্ষেপের মূল বার্তা হলো শিশুদের এমন ব্যবসায়িক মডেল থেকে সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন, যেখানে তাদের মনোযোগই একটি পণ্য।
বাংলাদেশেরও এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি স্পষ্ট আইনি কাঠামো প্রণয়ন করা উচিত: ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট থাকবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে আইনগতভাবে বাধ্য করতে হবে, যাতে তারা অপ্রাপ্তবয়স্কদের অ্যাকাউন্ট খোলা প্রতিরোধ করে এবং কোনো অ্যাকাউন্ট যে শিশুর তা জানতে পারলে সেটি বন্ধ করে দেয়। একই সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্কদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ করতে হবে এবং অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে কার্যকর পরিচয় ও বয়স যাচাই ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, এক্স এবং এ ধরনের অন্যান্য আসক্তি-সৃষ্টিকারী প্ল্যাটফর্মকে এর আওতায় আনতে হবে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে শিশুদের জন্য পুরো ইন্টারনেট বন্ধ করে দিতে হবে। শিক্ষামূলক ওয়েবসাইট, অনলাইন ক্লাস, স্কুলের পোর্টাল, শিশুদের জন্য নিরাপদ শিক্ষামূলক অ্যাপ কিংবা অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ এর আওতার বাইরে রাখতে হবে। তবে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। এর সঙ্গে অভিভাবকদের দায়িত্বও যুক্ত করতে হবে। সন্তানকে ব্যস্ত রাখার জন্য হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না। বরং অভিভাবকদের উচিত শিশুর সঙ্গে অর্থবহ ও আনন্দদায়ক সময় কাটানো, এমন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা যা শিশুর বিকাশের পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধনও শক্তিশালী করে।
আরও বৃহত্তর পরিসরে বাংলাদেশকে শিশুদের জন্য একটি সাংস্কৃতিক নীতি গড়ে তুলতে হবে। স্কুলগুলোতে বিতর্ক, আবৃত্তি, নাটক, সংগীত, চিত্রকলা, বিজ্ঞান ক্লাব, খেলাধুলা এবং পাঠ প্রতিযোগিতার মতো কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে হবে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে জেলা পর্যায়ে শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। নব্বইয়ের দশকে বই পড়া, স্কুলভিত্তিক প্রতিযোগিতা, লাইব্রেরি, খেলাধুলা এবং পাড়া-মহল্লায় খেলাধুলার একটি শক্তিশালী সামাজিক সংস্কৃতি ছিল। সেই পৃথিবী নিখুঁত ছিল না। কিন্তু শিশুদের একা একটি স্ক্রিনের সামনে বসে থাকার চেয়ে বেড়ে ওঠার জন্য সেখানে অনেক বেশি সুযোগ ছিল।
আমাদের আনন্দের জন্য বই পড়ার অভ্যাসও ফিরিয়ে আনতে হবে। শিশুদের শুধু পাঠ্যবই পড়ার জন্য নয়, গল্প, কমিকস, বিজ্ঞানবিষয়ক বই, জীবনী, কবিতা ও অ্যাডভেঞ্চারের বই পড়ার জন্যও লাইব্রেরিতে যেতে হবে। বই পড়া ধৈর্য শেখায়; অন্যদিকে অবিরাম স্ক্রল করার অভ্যাস অধৈর্যতা বাড়ায়। শিশু সুরক্ষার সঙ্গে নগর পরিকল্পনাও সরাসরি যুক্ত। ঢাকার মতো শহরে অনেক শিশুর খেলার মাঠ নেই, পার্ক নেই, নিরাপদ সাইকেল লেন নেই, সাঁতারের জায়গা নেই, নেই পর্যাপ্ত খোলা জায়গা। যখন সব খেলার মাঠ হারিয়ে যায়, তখন স্ক্রিনই হয়ে ওঠে তাদের খেলার মাঠ।
উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র একদিকে শিশুদের শারীরিক বিনোদনের জায়গা ক্রমাগত সংকুচিত করবে, অন্যদিকে শিশু স্ক্রিনে আসক্ত হয়ে পড়লে তার জন্য শুধু শিশুকেই দায়ী করবে এটি হতে পারে না। প্রতিটি ওয়ার্ডে শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার মাঠ, পার্ক, খেলাধুলার সুযোগ এবং সাশ্রয়ী সাঁতারের ব্যবস্থা থাকা উচিত। বিশেষ করে বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোরদের জন্য এসব সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই উদ্যোগগুলো সম্মিলিতভাবে নতুন প্রজন্মের মস্তিষ্ক ও মানসিক বিকাশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। শিশুদের শুধু ঘরে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করার বিনোদন না দিয়ে আমাদের তাদের জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক ও শারীরিক চর্চাভিত্তিক বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষতি অপূরণীয় হয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে।
