একসময় ছিনতাইকে রাতের অপরাধ ভাবা হতো, এখন দিনের ব্যস্ত সময়েও তা সমান আতঙ্কের কারণ। সম্প্রতি বগুড়ার এক স্কুল শিক্ষিকা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ঢাকায় এসে সংসদ ভবনের সামনে দিন-দুপুরে ছিনতাইয়ের শিকার হন। দুই মোটরসাইকেল আরোহী তার ব্যাগ ধরে টান দিয়ে পালিয়ে যাবার সময় ছিনতাইকারীর হ্যাচকা টানে তিনি রাস্তায় পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে নিহত হন। বাসস্ট্যান্ড, বাজার বা যানজটের মধ্যে ভিড়ের সুযোগ নিয়ে পকেটমার বা মোবাইল চুরির ঘটনা নিত্যদিনই ঘটে। এছাড়াও, নির্জন গলিতে বা ওভারব্রিজে আচমকা পথ আটকে বাসের টিকিট কাটার বা ঠিকানা খোঁজার অজুহাতে এসে অস্ত্রের ভয় দেখানো হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের নিজস্ব তথ্যেই উঠে এসেছে, রাজধানীর তিন শতাধিক পরিচিত ছিনতাই-স্পটের মধ্যে অন্তত ৫৫টি এখন নিয়মিত সক্রিয় হটস্পট, আর তেজগাঁও তার শীর্ষে। কোনো কোনো মাসে শুধু রাজধানীতেই তিন শতাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনা রেকর্ড হয়েছে, আগের সময়ের তুলনায় যা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি। পুলিশের কাছে হাজার তিনেকের বেশি পেশাদার ছিনতাইকারীর তালিকা থাকলেও রাস্তায় নিরাপত্তার বোধ ফিরছে না। সমস্যাটা শুধু সংখ্যার নয়, আইনের কাঠামোরও। ছিনতাইয়ের শিকার ব্যক্তি থানায় গেলে বলা হয় একটি জিডি করে যান।
বাংলাদেশের আইনে “ছিনতাই” নামে আলাদা কোনো অপরাধের সংজ্ঞা নেই। কথ্য ভাষায় যা আমরা ছিনতাই বলি, বিচারের সময় তা দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর দস্যুতা-সংক্রান্ত ধারায় বিবেচিত হয়- ৩৯২, ৩৯৩ ও ৩৯৪ ধারা। দস্যুতার চেষ্টার জন্য ৩৯৩ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা সাত বছর, আর দস্যুতা সংঘটিত হলে ৩৯৪ ধারায় তা যাবজ্জীবন পর্যন্ত গড়াতে পারে। অস্ত্র বা ছুরি-চাপাতি দেখিয়ে ছিনতাই করা হলে অস্ত্র আইনের ধারাও যুক্ত হতে পারে, যাতে সাজা আরও বাড়ে। তা সত্ত্বেও বাস্তবে দেখা যায়, থানাগুলো প্রায়ই ৩৯৩ ধারাতেই বেশি মামলা করে, কারণ প্রমাণের চাপ কম, প্রক্রিয়া দ্রুত। ফলে সমাজে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক তৈরি করা অপরাধটির শাস্তির মাত্রা আইনি খাতায় থেকে যাচ্ছে তুলনামূলক হালকা। খোদ ডিএমপি কমিশনারও স্বীকার করেছেন, আসামি গ্রেপ্তারের পর আদালত থেকে সহজে জামিন মিলে যাওয়াই বড় বাধা—পুলিশ ধরে, আদালত ছেড়ে দেয়, একই রাস্তায় একই সন্ত্রাসী আবার ফিরে আসে।
ভুক্তভোগীর জন্য প্রতিকারের পথ কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তা পাওয়া কঠিন। প্রথম ধাপ হওয়া উচিত থানায় গিয়ে সরাসরি এজাহার বা মামলা দায়ের করা, নিছক জিডি নয় । মামলা নথিভুক্ত হলে তদন্ত বাধ্যতামূলক হয়, জিডিতে তা হয় না। কিন্তু মামলার সংখ্যা কম দেখানোর প্রবণতা থেকে অনেক থানা ছিনতাইয়ের অভিযোগে মামলার বদলে জিডির পরামর্শ দেয়। ভুক্তভোগীর অধিকার আছে এতে আপত্তি জানানোর, আর থানা প্রত্যাখ্যান করলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করার। এরপরও এফআইআর না নিলে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশ দায়েরের সুযোগ আছে, যেখান থেকে আদালত থানাকে এফআইআর নিতে নির্দেশ দিতে পারেন। ঘটনার পরপরই ছিনতাইকারীর বা তার বাহনের বিবরণ লিখে রাখা এবং আশপাশের দোকান বা ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের অনুরোধ জানানো এই ছোট পদক্ষেপগুলোই পরে মামলা টিকিয়ে রাখার প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। এই পথগুলো আইনে থাকলেও অধিকাংশ ভুক্তভোগী তা জানেন না, আর জানলেও উকিলের খরচ জোগাতে না পেরে মামলা এগিয়ে নিতে পারেন না। অথচ প্রতিটি জেলায় সরকারি লিগ্যাল এইড কমিটির মাধ্যমে বিনা খরচে আইনজীবী পাওয়ার সুযোগ আছে; কিন্তু সেই তথ্যই অনেক সময় থানা পর্যায়ে ভুক্তভোগীকে জানানো হয় না। ফলে আইনি সহায়তা কাঠামো থাকা সত্ত্বেও তা ব্যবহারের আগেই অনেকে মামলার পথ ছেড়ে দেন।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এর জন্য প্রথমত ছিনতাইকে দণ্ডবিধির পুরোনো দস্যুতার ধারায় গুঁজে না রেখে একে সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও স্তরভিত্তিক শাস্তির আওতায় আনা দরকার, যাতে সুবিধামতো হালকা ধারায় মামলা করার সুযোগ কমে। দ্বিতীয়ত, জামিন প্রক্রিয়ায় পুনরাপরাধের ইতিহাস বিবেচনায় নেওয়ার সুস্পষ্ট নির্দেশনা দরকার, যাতে গ্রেপ্তার আর মুক্তির এই চক্র থেমে যায়। তৃতীয়ত, হটস্পট-কেন্দ্রিক টহল স্থায়ী হতে হবে, মৌসুমি অভিযান নয়।
