মোংলার মিরাজ শেখকে গত ১০ এপ্রিল সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল কোস্ট গার্ডের হেফাজতে। তারপর থেকে তাঁর খোঁজ মেলেনি। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এটিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম জোরপূর্বক গুম হিসেবে অভিহিত করেছে। মিরাজের এই ঘটনা যখন আমাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে, তখন আরও আশঙ্কার কারণ নিয়ে হাজির হয়েছে বর্তমান সরকারের ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’। প্রশ্ন রয়েছে নতুন মানবাধিকার কমিশন আইন নিয়েও। মিরাজ শেখের ঘটনাকে সামনে রেখে আমরা পর্যালোচনা করতে পারি, এই আইনগুলো গুম থেকে মানুষকে কতটা সুরক্ষা দেবে, অভিযুক্ত সদস্যদের কতটা জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারবে।
আওয়ামী লীগের দেড় দশকের স্বৈরাচারী আমলে পদ্ধতিগতভাবে গুমের শুরু হয়, যার নজির বাংলাদেশে আগে ছিল না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর, ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ ‘গুম হইতে সকল ব্যক্তিকে সুরক্ষার নিমিত্ত আন্তর্জাতিক কনভেশন’-এ অনুস্বাক্ষর করে। ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারি হয়, পরে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে গুম হওয়া ব্যক্তির পরিবারের আইনি সুরক্ষা ও উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে এর একটি সংশোধনী আনা হয়। মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে এগুলো ছিল অগ্রগতি। কিন্তু নতুন সংসদে এই অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরিত করা হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন বলেছিলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা এসব অধ্যাদেশে যা ছিল, তার সবকিছুই যে নির্ভুল ছিল তা নয়। আমি নিজেই গুমের শিকার হয়েছিলাম, তাই আমি বুঝি এর ভয়াবহতা। গুম প্রতিরোধে ভালো আইন করা হবে।”
অন্তর্বর্তী আমলের অধ্যাদেশে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে বলা হয়েছিল, ‘গুমের অভিযোগ বা তথ্য পাওয়া গেলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫–এর প্রযোজ্য বিধান অনুসারে উক্ত অভিযোগের তদন্ত করিবার জন্য তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত করিবে এবং ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা দায়ের করিবে।’ কিন্তু গুম বিষয়ে নতুন আইনের যে খসড়া সামনে এসেছে, তাতে দেখা গেল, গুমের অভিযোগের তদন্তভার দেওয়া হয়েছে পুলিশ বা ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। কোনো বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ এলে ওই বাহিনীই তদন্ত করে সত্য উদ্ঘাটন করবে, এমন বিশ্বাসযোগ্যতা আমাদের বাহিনীগুলো এখনো অর্জন করেনি।
মিরাজ শেখের ঘটনার দিকে তাকালে দেখা যায়, ১১ এপ্রিল মিরাজের স্ত্রীকে কোস্টগার্ডের একজন বলেছিলেন মিরাজকে নিয়ে অপারেশনে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু সেদিন বিকেলে পরিবার আবার গেলে মিরাজকে ধরে নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়। যে কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে মিরাজকে ধরে নেওয়ার বিষয় অস্বীকার করেছে। এ বিষয়ে তদন্ত করছে মোংলা থানা পুলিশ। পুলিশের বিরুদ্ধে মিরাজের বোন লিজা ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, “আমরা ৪ বার থানায় যাই, আমাদের জিডি নেয় না। পরবর্তীতে ২৩ এপ্রিল আমাদের জিডি নেওয়া হয়। পুলিশ তখন আমাদের বলে দেখেন আমরা কী করবো, ওদের অনেক পাওয়ার।”
সেই জিডিতেও রয়েছে পুলিশের হস্তক্ষেপ। জিডিতে লেখা রয়েছে মিরাজ শেখ “নিজ বসতবাড়ির নিচে নিজের অজান্তে হারিয়ে গেছেন”। মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খানম দ্য ডিসেন্টকে জানান, “জিডির লেখা পুলিশে লিখে দিয়েছে। এটা নিয়ে আমরা থানায় প্রতিবাদ করেছি তখন তারা বলেছে যে কোস্টগার্ডের নাম লেখা যাবেনা। এরপর বাধ্য হয়ে আমরা সাক্ষর করি।” এ ব্যাপারে মোংলা সার্কেল অফিসের সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ রেফাতুল ইসলামের ভাষ্য, “জিডির ভাষার ব্যাপারে যদি বলি, “অপহরণ”, “গুম” এসব শব্দ জিডিতে লেখা যায় না। মামলা করতে হবে। আবার কোস্ট গার্ড বা আন্ত বাহিনীর বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া যাবে না, সেজন্য কোর্টে বা আইনজীবীর মাধ্যমে পরামর্শ নিতে বলা হয়েছিলো তাদেরকে। পরে উনারা জিডি করেন।”
দেখা যাচ্ছে, জিডিতে “গুম” লেখা যায় না, এই অজুহাতে পরিবারকে দিয়ে “কোস্টগার্ড নিয়ে ধরে নিয়ে গেছে”-এর বদলে “নিজের অজান্তে হারিয়ে গেছেন” লেখানো হয়েছে। কোস্টগার্ড যেখানে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে অস্বীকার করেছে, পুলিশ যেখানে জিডির ভাষা ঠিক করে দিচ্ছে, সেখানে পুলিশ আদৌ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করবে কিনা, সেই প্রশ্ন অনিবার্য। আর ঠিক এখানেই গুমের তদন্তের জন্য একটি নিরপেক্ষ সংস্থার প্রয়োজন, যার উল্লেখ অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে ছিল।
মিরাজ শেখের ঘটনায় পুলিশ-কোস্টগার্ড পরস্পরের স্বার্থ রক্ষা করে চলছে কিনা, সেই সন্দেহেরও অবকাশ রয়েছে। কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার মাহবুব হোসেন ভুক্তভোগী পরিবারের দেরীতে জিডি করা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “…পরবর্তীতে গত ২২ এপ্রিল যৌথ বাহিনীর একটা অভিযান হয়। এ সময় আমরা ওই পাঁচজনের মধ্যে দুজনকে আটক করি। তখন মিরাজকেও খোঁজা হয়। কিন্তু সেদিন তাঁকে পাওয়া যায়নি। আর ২২ তারিখের ওই অভিযানের পর ২৩ তারিখ তাঁর পরিবার থানায় মিরাজ নিখোঁজ উল্লেখ করে জিডি করে।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, “১০ তারিখে যদি নিখোঁজ হয়, ১২-১৩ দিন পর জিডি হবে? বিষয়গুলো খুবই সাসপেশিয়াস।” তবে দেরীতে জিডির কারণ জানা যায় মিরাজের বোন লিজা ইসলামের ভাষ্যে। দ্য ডিসেন্টকে তিনি বলেন, “আমরা ৪ বার থানায় যাই আমাদের জিডি নেয় না। পরবর্তীতে ২৩ এপ্রিল আমাদের জিডি নেওয়া হয়। পুলিশ তখন আমাদের বলে দেখেন আমরা কী করবো, ওদের অনেক পাওয়ার।”
অভিযোগ অনুযায়ী, পুলিশ প্রথমে জিডি নিতে চায়নি। তাই দেরি হয়েছে। অথচ এটিকেই ভুক্তভোগী পরিবারের “সাসপেশিয়াস” কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখাতে চেয়েছে কোস্টগার্ড। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে উল্লেখ ছিল, “গুম কমিশনের কাছে ১৯০০-এর বেশি অভিযোগের মধ্যে মাত্র ২৫০টির মতো অভিযোগের ক্ষেত্রে কোনো রেকর্ড, জিডি, সিসিটিভি ফুটেজ, সংবাদ প্রতিবেদন ইত্যাদি পাওয়া গিয়েছিল। পরিবারগুলোর সিংহভাগই জানিয়েছেন, তাঁরা যখনই কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করার চেষ্টা করেছেন, তখনই তাঁদের চরমভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে কিংবা হুমকি দেওয়া হয়েছে।”
কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, এক ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্য জানান: “কর্তব্যরত অফিসারের কাছে ঘটনার বিবরণ বললে, তিনি সাধারণ ডায়েরি নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে ওসি মহোদয়ের শরণাপন্ন হলে তিনি বিভিন্ন জায়গায় ফোনে যোগাযোগ করেন। তিনি বলেন যে, প্রশাসনের নামে জিডি করা যাবে না।” আওয়ামী আমলের এই ভুক্তভোগীর অভিযোগের সাথে মিরাজ শেখের বোনের অভিযোগের মিল রয়েছে। মিরাজের পরিবারের জিডি নিতে পুলিশের অনীহা ও জিডির ভাষ্য ঠিক করে দেওয়াকে আওয়ামী আমলের ধারাবাহিকতা হিসেবে পাঠ করা যায়।
ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর খড়গহস্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও পুলিশ-কোস্টগার্ডের যৌথতা দেখা যায়। গত ১১ জুন উত্তেজনার জেরে স্থানীয়দের একাংশ কোস্টগার্ডের হারবাড়িয়া স্টেশনে ঢুকে ভাঙচুর চালায়; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোস্টগার্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এই হামলার ঘটনায় কোস্টগার্ডের করা মামলায় ৪৪ জনের নামসহ প্রায় ৩০০ জনকে আসামি করা হয় — যার মধ্যে ১, ২ ও ৩ নম্বর আসামি যথাক্রমে মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন, বোন লিজা ইসলাম ও মা তাসলিমা বেগম। এই তিনজনকেই কোস্টগার্ড ও পুলিশের যৌথ অভিযানে আটক করা হয়, এবং তাঁরা ২৭ দিন কারাবন্দি থাকেন।
এসব আলামত জনমনে এ ধারণাই দৃঢ় করে যে, গুমের মতো মারাত্মক অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্ত ছাড়া উপায় নেই। তবে এ সংকট কেবল গুম বিষয়ক আইনেই না, নতুন মানবাধিকার কমিশন আইনেও আছে। মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়াতে বলা হয়েছে, অভিযোগ যদি কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে হয়, তবে কমিশন নিজের তদন্তকারী পাঠাতে পারবে না; বরং যে বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের নিজেদের সম্পর্কেই রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিতে হবে। ২০০৯ সালের আইনে অন্তত এই অনুরোধটি সরকারের কাছে পাঠানোর বিধান ছিল, কিন্তু ২০২৬ সালের বিলে তা সরাসরি অভিযুক্ত বাহিনীর কাছেই পাঠানোর বিধান রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে, ২০০৯-এর আইন থেকেও বর্তমান আইন দুর্বল।
তাছাড়া নতুন খসড়ায় নির্বাচন কমিটির ৯ সদস্যের মধ্যে স্পিকার, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভা সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে নিয়োগপ্রক্রিয়াতেও সরকারের একক প্রাধান্য থাকছে। এই প্রক্রিয়া বহাল রেখে মানবাধিকার কমিশনের ওপর তদন্তভার দিলেও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে।
গুম এবং ক্রসফায়ার ও অন্যান্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘন ঠেকাতে গুম বিষয়ক আইন ও মানবাধিকার কমিশন বিষয়ক আইন, উভয়েরই পরিবর্তন দরকার। শুধু আইন নিশ্চয়ই অপরাধ ঠেকাতে বা ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য যথেষ্ট নয়, কিন্তু আইনের মাধ্যমেই যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি এড়ানোর পথ সুগম করা হয়, তবে আশার কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না।
মিরাজ শেখকে কোস্টগার্ড তুলে নিয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়ার মতো যথেষ্ট পরিমাণে সাক্ষ্য রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি মাঠ পর্যায়ে তদন্ত করেছে। তারপরও কোস্টগার্ড আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে, পুলিশের তদন্তে নেই অগ্রগতি। এই মুহূর্তে দরকার স্বাধীন তদন্ত । এ ধরনের ঘটনা ও ভুক্তোভুগী পরিবারের ভোগান্তির পুনরাবৃত্তি এড়াতে আইনের যথাযথ পরিবর্তনও জরুরি।
তথ্যসূত্র:
১. Human Rights Watch. (2026, July 19). Bangladesh: First enforced disappearance case since July 2024 uprising.
২. The Commission Of Inquiry On Enforced Disappearances. (4 January 2026), Unfolding The Truth: A Structural Diagnosis Of Enforced Disappearance In Bangladesh (Vol. 1)
৩. ক্রাইসিস ডকুমেন্টেশন সেন্টার। (আগস্ট ৬ ২০২৬)। ঘটনাপ্রবাহ: মিরাজ শেখ নিখোঁজের চার মাস ।
৪. দ্য ডিসেন্ট। (২০২৬, জুলাই ৩০). কোস্টগার্ড আটকের পর ৪ মাস ধরে গুম মিরাজ, প্রতিবাদ করে জেল খেটেছেন মা-স্ত্রী-বোন।
৫. প্রথম আলো। (২০২৬, ১২ জুন)। মোংলায় কোস্টগার্ড স্টেশনে হামলায় দস্যু-সহযোগীদের সম্পৃক্ততার সন্দেহ।
