১৩ বছরের ছোট্ট শিশু অপ্রতিম মায়ের আইফোন নিয়ে বের হয়েছিলো বন্ধুদের সাথে ছবি তুলতে, আর ঘরে ফেরেনি। অপ্রতিমের বাবা সেদিনই থানায় জিডি করেন। পরের দিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটে লালমাই সানন্দা পাহাড়ের জঙ্গলে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, অপ্রতিমের মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। এ ঘটনায় ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয় এবং তদন্ত এখনো চলমান। ঘটনাটি বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজের সংকটটি আমাদের সামনে নতুন করে তুলে ধরেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে। অর্থাৎ এখনো সন্ধান মেলেনি ২ হাজার ৩৮ জনের। এর আগের বছরগুলোতেও সংখ্যা কম ছিল না । ২০২৪ সালে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ১৬ হাজার ৪১৪ টি সাধারণ ডায়েরি হয়েছিলো, যা ২০২৫ সালে গিয়ে দাঁড়ায় ২২ হাজার ৫৫০-এ। সংখ্যাগুলো উদ্বেগজনক, এরকম পরিসংখ্যান রাষ্ট্রের নিরাপত্তার উপর গুরুতর প্রশ্ন তুলে। আর এখানেই আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে পড়ে ।
পুলিশ ব্যাখ্যা দিয়েছে যে, ছোটদের ক্ষেত্রে নিখোঁজের কারণের মধ্যে রয়েছে অপরিচিত জায়গায় পথ হারিয়ে যাওয়া, একা বাড়ি ফেরার পথে হারিয়ে যাওয়া ইত্যাদি। ১০ থেকে ১৭ বছরের কিশোরদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে পারিবারিক অশান্তি, পড়াশুনার চাপ, অভিমান, বন্ধুদের সাথে বের হয়ে যাওয়া কিংবা স্বাধীনভাবে থাকার ইচ্ছা কারণ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু এখানে মূল প্রশ্নটি হচ্ছে, আমাদের রাষ্ট্রে কোনো শিশু স্বেচ্ছায় বের হয়ে গেলেও কি সে নিরাপদ? সে কোথায় আছে, কার সাথে আছে, পাচারের শিকার হয়েছে কি না, কেউ কি তাকে আটকে রেখেছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত এধরণের ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়। বরং কারণ যতই সাধারণ হোক না কেন, প্রত্যেকটি শিশুকে সমান গুরুত্ব দিয়ে খুঁজে বের করা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শিশু নিখোঁজের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই চলতি বছরের জানুয়ারিতে “মুন এলার্ট” চালু হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং ‘অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশ’ যৌথ উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সেবাটি চালু করে। এই উদ্যোগে নিখোঁজের পর প্রথম তিন ঘণ্টাকে “গোল্ডেন টাইম” ধরে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়। প্রথম তিন ঘণ্টায় শিশুকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা সর্বোচ্চ। ১৩২১৯ নম্বরে ২৪ ঘণ্টার টোল ফ্রি হেল্পলাইনও চালু আছে। প্রশ্ন হলো এসব ব্যবস্থা বাস্তবে কত দ্রুত কাজ করে? ঢাকার পল্লবীতে ৯ বছরের শিশু আব্দুল্লাহ আল সাদিব হারিয়ে যাওয়ার পর থানায় গেলে পুলিশ প্রথমে সাধারণ ডায়রি করতে চায়নি এবং অনুসন্ধানের প্রক্রিয়াও শুরু করেনি বলে অভিযোগ করেন সাদিবের গৃহশিক্ষক। পরে তিনি মুন এলার্টে যোগাযোগ করেন। সতর্কবার্তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে প্রায় ১ ঘণ্টার মধ্যে একজন ফার্মেসিকর্মী শিশুটিকে দেখতে পেয়ে পুলিশকে জানায়, এবং পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। অর্থাৎ যে সময় পুলিশের অনুসন্ধান শুরু করার কথা, তখন এই উদ্যোগই কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। যে কাজটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারের ফলে এক ঘণ্টায় সম্ভব হলো, পুলিশ যদি নিজ উদ্যোগে কাজটি করতো তাহলে কত দ্রুত করতে পারতো? যদি একটি নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পেতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অথবা সাধারণ নাগরিকের চোখে পড়ার ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রের নিজস্ব ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। অপ্রতিমের ক্ষেত্রেও তার মা ফেসবুকে পোস্ট করার পর, বাচ্চাটির তথ্য ও ছবি মুন এলার্টে দেখানো হয়। পরবর্তীতে তার সঙ্গে থাকা ফোনের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করা হয় এবং সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু প্রায় ২২ ঘণ্টা পর অপ্রতিমকে মৃত উদ্ধার করা হয়। তার হত্যায় কারা জড়িত তা তদন্তে বের করতে হবে কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টায় পুলিশ কেমন পদক্ষেপ নিয়েছিলো, সেই প্রশ্নও তদন্তের বাহিরে থাকা উচিত নয়।
ঝিনাইদহের ১২ বছরের শিশু মোহাম্মদ আলীর পরিবারও জিডি নিতে অনিহার অভিযোগ এনেছে। তার বাবা হোসেন আলীর মতে, সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর জিডি করতে তাকে ৩ দিন থানায় ঘুরতে হয়েছিলো এবং জিডি নেয়ার পরও পুলিশ আর তার সাথে যোগাযোগ করেনি। দেড়মাস পরও সন্তানকে খুঁজে পাননি তিনি। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে এমন অভিযোগ দেখা যায় যে, কিছু থানা ২৪ ঘণ্টার পূর্বে জিডি নিতে অনীহা দেখায় এবং পরিবারকে নিজ উদ্যোগে খুঁজে দেখতে বলা হয়, অথচ প্রথম ৩ ঘণ্টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুর জীবন যদি প্রথম কয়েক ঘণ্টার উপর নির্ভর করে তাহলে সেই সময় নষ্টের জবাবদিহিতার দায় পুলিশেরই। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত অভিভাবক থানায় আসার সাথে সাথে জিডি দায়ের করা এবং তাৎক্ষণিকভাবে অনুসন্ধান চালু করা।
থানাগুলোকে এই সমস্যা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। নিখোঁজ শিশু নিছক একটি জিডির বিষয় না, বরং শিশুর নিরাপত্তা ও জীবনের সাথে জড়িত জরুরি বিষয়। ২৪ ঘণ্টার পূর্বে ডায়েরি না করার অলিখিত প্রথা থানাগুলোতে থাকতে পারে না। সাধারণ ডায়েরি হওয়ার সাথে সাথেই নিখোঁজ শিশুর প্রত্যেকটি তথ্য নথিভুক্ত করে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া শুরু করার বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রথম তিন ঘণ্টা অর্থাৎ গোল্ডেন টাইমে পুলিশ কি করেছে তার লিখিত হিসাব থাকতে হবে। প্রতিটি থানায় নিখোঁজ শিশুদের নিয়ে কাজ করার জন্য একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে, যিনি পরিবারের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পুলিশের জবাবদিহিতার মাপকাঠি পরিবর্তন করতে হবে। শুধু কতজন শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে তা দিয়ে সাফল্য মাপলে হবে না, অভিযোগ পাওয়ার পর কত সময়ের মধ্যে অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছে, সম্ভাব্য স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধারের উদ্যোগ কখন নেয়া হয়েছে এবং কেন দীর্ঘদিন ধরে কোনো শিশু নিখোঁজ রয়েছে– এসব তথ্যও নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। কোনো কর্মকর্তা সাধারণ ডায়েরি করতে বিলম্ব করতে অথবা অনুসন্ধান দ্রুত শুরু না করলে তাকেও জবাবদিহিতার মধ্যে আনার ব্যবস্থা থাকা উচিত।
বাংলাদেশে প্রত্যেকটি শিশুর নিরাপত্তার দায়িত্ব এই রাষ্ট্রের এবং যদি কোনো শিশু নিখোঁজ হয় সেই ব্যর্থতার দায়ও রাষ্ট্রকে নিতে হবে। প্রত্যেকটি পরিবার তাদের নিখোঁজ সন্তানকে ফিরে পেতে রাষ্ট্রের এই ব্যবস্থার ওপর ভরসা করে। সেই ভরসার মর্যাদা রাখতে হলে, নিখোঁজের পর প্রতিটি মুহূর্তকে গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান শুরু করতে হবে।
তথ্যসূত্র:
সাত মাসে সাড়ে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ: পুলিশ
‘Mun Alert’ services launched to rescue missing children; hotline 13219 activatedWhen a notification brings a child home
কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় আটক ৩
Bangladesh to launch ‘MUN Alert’ system, toll-free helpline 13219 to rescue missing children
‘You lost your child, what can I do?’: Missing child’s parent alleges police apathy
