ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকরের সাম্প্রতিক একটি সতর্কবার্তা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাঁর আশঙ্কা, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভয়াবহ খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে। তবে তাঁর বক্তব্যকে সরাসরি ‘বিশ্বে দ্রুত খাবার ফুরিয়ে যাবে’ কিংবা এর পেছনে ভারতের কোনো কারসাজি থাকতে পারে মর্মে সফট সিগন্যাল আছে কিনা, এমন কিছু চিন্তা করলে নিতান্তই ভুল হতে পারে। বরং তিনি যে সংকেতটি দিয়েছেন, তা হলো খাদ্য, জ্বালানি, সার ও অর্থনীতির ওপর একই সময়ে একাধিক বৈশ্বিক চাপ তৈরি হচ্ছে। তাঁর কথাটা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ ব্যাপারে এখনই বাংলাদেশের খুব একটা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠার কোনো কারণ নেই।
২৯ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে এশিয়া সোসাইটির এক অনুষ্ঠানে চলমান সংঘাতের সামগ্রিক প্রভাব তুলে ধরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের জন্য এটি একটি বড় চিন্তার বিষয়। ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং বর্তমানে ইরান-উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাতের দিকে তাকালেই বোঝা যায় যে এই পরিস্থিতি গ্লোবাল সাউথের উদীয়মান অর্থনীতির ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলেছে।’ তাঁর আলোচনায় উঠে আসে চারটি ‘F’—Food, Fuel, Fertiliser and Finance; অর্থাৎ খাদ্য, জ্বালানি, সার ও অর্থায়ন। এই চারটি বিষয়কে আলাদা করে দেখার সুযোগ কম। একটি জায়গায় সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব অন্য জায়গায় গিয়ে পড়ে।
যেমন, যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক নৌপথ ও বাণিজ্য ব্যাহত হলে খাদ্যশস্যের সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদনের খরচ বাড়ে। সার আমদানি ও পরিবহন ব্যাহত হলে কৃষকের উৎপাদন খরচ আরও বাড়তে পারে, এমনকি প্রয়োজনীয় সময়ে সার না পাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। আর এসবের সঙ্গে যদি জলবায়ুগত বিরূপ পরিস্থিতি যুক্ত হয়, তাহলে পরবর্তী মৌসুমের উৎপাদনেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই উদ্বেগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো সারের ওপর আমদানিনির্ভরতা। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় সারের ৮৫ শতাংশের বেশি আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম, জ্বালানির মূল্য, পরিবহনব্যবস্থা কিংবা সরবরাহ-শৃঙ্খলে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে বাংলাদেশের কৃষিও এর প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারে না। এখানে সময়টাও খেয়াল করার বিষয়।
বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে বোরো ধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট বার্ষিক ধান উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ বোরো মৌসুম থেকে আসে। একই সময়ে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়টিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সারবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তার প্রভাব শুধু আজকের বাজারে নয়, পরবর্তী বছরগুলোতেও ফসলের উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই প্রভাবের ভয়াবহতা দেখা যেতে পারে।
সহজভাবে বললে, সার সংকট হলে উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি হবে, কৃষকের ওপর চাপ বাড়বে স্বভাবতই। ফলশ্রুতিতে, উৎপাদন কমে আসার ঝুঁকি তো থাকবেই। আর উৎপাদন কমে আসার অর্থ হলো, সরবরাহের অভাবের চাপ সামলাতেই হিমশিম খেতে হবে। এবং সর্বশেষ ফলাফল, খাদ্যের দাম বৃদ্ধি। কম আয়ের দেশগুলোর মানুষের বাড়তি কষ্ট।
তবে কি খাদ্য ফুরিয়ে যাবে বাংলাদেশে ?
উত্তর হচ্ছে, ‘না’। এই মুহূর্তে, আপাতত, এমন কোনো চিন্তার প্রয়োজন নেই বাংলাদেশের। দেশের সাম্প্রতিক ধান উৎপাদনের চিত্র তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের ধান উৎপাদনের মাত্রা গড়ের চেয়ে বেশি থাকার পূর্বাভাস রয়েছে। বোরো উৎপাদনও প্রায় ৩১.৯ মিলিয়ন টন হতে পারে, যা আগের বছরের রেকর্ড উৎপাদনের কাছাকাছি।
কিন্তু এখানে আরেকটি বাস্তবতা রয়েছে। খাদ্য পাওয়া এবং খাদ্য কেনার সামর্থ্য এক বিষয় নয়।
FAO-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর সময়ে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মুখোমুখি হতে পারে। এর আগে মে থেকে আগস্ট সময়ে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ। অর্থাৎ, সংকটের একটি বড় অংশ সরাসরি খাদ্যের অস্তিত্বের সঙ্গে নয়; বরং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি এবং খাদ্যের দাম-এর সঙ্গে সম্পর্কিত।
মুশকিল হলো, একটি মাত্র সমস্যা হয়তো একটি দেশ সামলে নিতে পারে। কিন্তু একই সময়ে যদি কয়েকটি সমস্যা একসঙ্গে দেখা দেয়, তখন পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
ধরা যাক, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত চলছে। ইরান টালমাটাল। এর অর্থ হরমুজ প্রণালী বন্ধ। ইয়েমেনের বাব আল মান্দেব প্রণালীও অস্থির। ফলাফল জ্বালানি ও নৌপরিবহনে অস্থিরতা। সারের দাম ও সরবরাহের অভাবের চাপ বাড়বেই। বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে একই সাথে। ধান উৎপাদনে চাপ থাকবে। ঘুরে ফিরে, চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকার সম্ভাবনা থাকবে। সহজ বাংলায়, ভাতের উপর নির্ভরশীল বাঙ্গালি জাতির ভাত খেতেই পয়সা বাড়বে।
এর সঙ্গে যদি শক্তিশালী এল নিনো বা অন্য কোনো বড় ধরনের জলবায়ুগত অস্বাভাবিকতা যুক্ত হয়, তাহলে মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ, এল নিনোর প্রভাবে অনেক অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যেতে পারে, কোথাও খরা দীর্ঘায়িত হতে পারে, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, খাদ্য সরবরাহ কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তাহলে বাংলাদেশের করণীয় কী? এই মুহূর্তে আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে নজরদারি ও প্রস্তুতি বেশি জরুরি। আগামী কয়েক মাসে বাংলাদেশের জন্য অন্তত আটটি বিষয় বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। সারের মজুত ও আন্তর্জাতিক দামের ওঠানামার দিকে গভীরভাবে লক্ষ রাখতে হবে ( বিশেষভাবে, যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি), এবং বাংলাদেশ সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে, বোরো মৌসুমে সারের সরবরাহ সঠিকভাবে, সঠিক জায়গায়, সঠিক মানুষগুলোর কাছে পৌঁছাচ্ছে কিনা, ধান ও গমের সারের আমদানি ব্যয় কমিয়ে আনতে কোনো পদক্ষেপ কিংবা বিকল্প খুঁজে নেয়া সম্ভব হচ্ছে কিনা। সঙ্গে নজরে রাখতে হবে আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম, হরমুজ প্রণালির নৌবাণিজ্য পরিস্থিতি, এল নিনো ও অন্যান্য জলবায়ুগত পূর্বাভাস, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের চাপ, সরকারি খাদ্য মজুত ও বাজারে খাদ্য সংগ্রহের পরিস্থিতি। ফলে খাদ্য কতটা সহজলভ্য থাকবে এবং সাধারণ মানুষ তা ঠিক কতটা সহজে কিনতে পারবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
জয়শংকরের সতর্কবার্তা কীভাবে দেখা উচিত?
বাংলাদেশের জন্য আতঙ্কের বার্তা হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই আপাতত, তবে আবার একেবারে উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। দেশের সাম্প্রতিক ধান উৎপাদন ভালো থাকলেও আমরা আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সারবাজারের ওপর যথেষ্ট নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক সংঘাত, সরবরাহব্যবস্থার ব্যাঘাত, সারের সংকট এবং জলবায়ুগত ঝুঁকি একই সময়ে দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যমূল্যে পড়তে পারে।
খাদ্য সংকট সাধারণত একদিনে তৈরি হয় না। প্রথমে বাড়ে উৎপাদন খরচ। এরপর বাড়ে বাজারদর। তারপর মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে। শেষ পর্যন্ত খাদ্য উৎপাদন যথেষ্ট থাকার পরও একটি বড় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য কেনা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সুতরাং জয়শংকরের বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, বিশ্ব অর্থনীতি ও খাদ্যব্যবস্থা এমন একটি সময়ে প্রবেশ করছে, যেখানে যুদ্ধ, জ্বালানি, সার, অর্থনীতি ও জলবায়ু, একটি সংকটকে আরেকটি সংকটের সঙ্গে যুক্ত করে, বিপর্যয়ের সম্ভাবনা আরো ঘনীভূত করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য তাই এখন মূল বিষয় আতঙ্ক নয়, বরং আগাম প্রস্তুতি নেওয়া, পর্যাপ্ত মজুত রাখা, সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং খাদ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা।
