“যুদ্ধই জীবন, যুদ্ধই সর্বজনীন” – অ্যাডলফ হিটলার।
“ভালোবাসা হল আবেগের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী, কারণ এটি একই সাথে মাথা, হৃদয় এবং অনুভূতিতে আঘাত করে।”– লাও জু
মানুষের সাথে মানুষের ভ্রাতৃত্ববোধ পৃথিবীতে শান্তি রক্ষার প্রথম ধাপ। কিন্তু পৃথিবীতে একটা জিনিস কখনোই বদলায় না, তা হলো মানুষের ওপর মানুষের ক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা করা। একে অন্যকে দাস বানিয়ে রাখার বিকৃত কামনা আমাদের মনে লুকিয়ে থাকে। তাই বলাই যায় যে মানুষের এই স্বভাব ‘ব্যক্তি’ হিসেবে যেমন মানুষকে নিয়ে গেছে অমানুষের পর্যায়ে, ঠিক তেমনি ব্যক্তি মানুষের আবিষ্কার করা শাসন কাঠামোর অন্তর্গত ‘রাষ্ট্র’ও দিনের পর দিন হয়ে উঠেছে অমানুষিক কাজগুলোর রক্ষক ও পালনকর্তা। ফলে দেখা যায়, যুদ্ধ নামক একটি চরম বাস্তবতার নাগপাশে আমরা বন্দী হয়ে আছি। সেই যুদ্ধ সমরযুদ্ধও হতে পারে, স্নায়ুযুদ্ধও হতে পারে। যে নামেই বাস্তবতাকে অভিহিত করা হোক না কেন, তার হাত থেকে নিস্তার পাওয়া কঠিন।
এই বাস্তবতার মায়াজালে মানুষের সম্পর্কগুলোর যথেষ্ট পরিমাণে ক্ষতি হয়। মানুষ সামাজিক জীব এ কথা যেমন সত্য, আবার মানুষ রাজনৈতিক জীব এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই। তো মানুষ যেহেতু রাজনৈতিক জীব সেহেতু মানুষকে রাজনৈতিক সমস্যা থেকে উৎপন্ন জিঘাংসাময় বাস্তবতার মোকাবিলা করতে হয়। মোকাবিলা করার সময় একেকজনের প্রতিক্রিয়া হয় একেক রকম। বিভ্রান্ত, পরিশ্রান্ত এবং ক্লান্ত এই তিনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা মানুষের মনে তখন চিন্তাভাবনার দমকা হাওয়া বয়ে যেতে থাকে। মানুষ মুক্ত হওয়ার চেষ্টায় নিজের সবকিছু বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হয়।
তেমন বিভীষিকাময় বাস্তবতার মধ্যে নিজেকে বন্দি অবস্থায় দেখতে পান একজন লেখক। তাঁর নাম এরিক মারিয়া রেমার্ক। বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি যার সামনে মরীচিকাময় আনন্দ কিংবা ক্ষোভের পরিপূরক হিসেবে হাজির হয়। একজন লেখক তাঁর সময়কে বুঝতে চেষ্টা করেন সবসময়। নিজের ভাবনা এবং কল্পনার মাধ্যমে একটি সমাজের সর্বোৎকৃষ্ট উপাদানগুলো নিজের লেখায় তুলে ধরতে চান। কিন্তু নিজের চারপাশের পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করে যখন লেখক দেখতে পান যে উৎকৃষ্ট বলে কোনো বিশেষণের অস্তিত্ব এই পৃথিবীতে আর নেই, তখন তিনি বিপন্ন বোধ করেন।
এই বিপন্ন বোধ রেমার্কের লেখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পাঠক নিজেকে প্রশ্ন করে রুথ কিংবা কার্নের স্থলে নিজেকে বসিয়ে। পাঠক তখন সচেতন হয়ে ওঠে নিজের মনে উৎপন্ন হওয়া লুকানো ক্রোধ সম্পর্কে। সে তখন ভাবতে থাকে এইসব ক্রোধ, হিংসা আর জিঘাংসা যুদ্ধ নামক একটি অমানবিক বিপর্যয়ের মূল কারণ। রেমার্কের লেখা চরিত্রগুলো যখন নিজেদের হারিয়ে খোঁজে, তখন আমরা আবিষ্কার করি এই ভুবনের সকল পবিত্র তত্ত্বকথা গুম করে ফেলা হয়েছে। মানুষ যখন মানুষ খুঁজে পায় না, তখন এইসব রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার সবকিছুই মরীচিকা বলে মনে হয়।
রেমার্কের ফ্লটসাম বা কোথায় স্বর্গ ( অনুবাদ: ইসমাইল আরমান)-এর মূল দুই চরিত্র কার্ন এবং রুথ যখন একদম উপন্যাসের শেষাংশে বলে “একটু বেশিই মানুষ”, তখন আমরা উপলব্ধি করি মানুষই মূলত সকল সমস্যার মূলবিন্দু। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক কিংবা বৈশ্বিক সমস্যা সবকিছুর জন্য মানুষ নামক জগতের সবচেয়ে বুদ্ধিমান বলে খ্যাত প্রাণীটিই দায়ী।
মানুষ বিভিন্ন সম্পর্কের বাঁধনে নিজেকে সবসময় জড়ানো অবস্থায় দেখতে পায়। কোনো কোনো সময় এই বাঁধন তার মনে চরম বিরক্তি উৎপন্ন করে। মনে হতে থাকে ক্রমশ একটি জেলখানার মধ্যে সে হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই জেলখানার দেয়ালে যখন যুদ্ধের তীব্র আঘাত লাগে তখন মানুষের কী প্রতিক্রিয়া আমরা দেখতে পাই? মানুষ তখন আবার ঐ জেলখানায় বন্দী হওয়ার জন্য হাঁসফাঁস করে। রেমার্কের উপন্যাসের চরিত্রগুলো এর উৎকৃষ্ট উদহরণ।
প্রেম পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন আবেগগুলোর একটি। প্রেমের ক্ষমতা আছে বাকি সব নীতি ও আবেগের উপর জোরালো আঘাত হানার। আর প্রেমের সঙ্গে যখন দায়িত্ব নামক আরেকটি শব্দ যুক্ত হয় তখন মানুষ বুঝতে পারে কেন সে মানুষ হয়ে জন্মেছে। রেমার্কের “A Night In Lisbon”-এর চরিত্র যোশেফ লিসবনের এক পাবে বসে সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষকে খুলে বলতে শুরু করে তার জীবনের সবচেয়ে অভূতপূর্ব ঘটনা। নিজের স্ত্রী হেলেনকে আবার দেখতে পাওয়ার জন্য যে কিনা গেস্টাপোদের নজর এড়িয়ে চলে যায় জার্মানিতে। যাওয়ার সময় কিন্তু আবার তার মনে হয় না গেলেই বোধহয় ভালো হতো। যুদ্ধের বাস্তবতার কারণে মনের মধ্যে তৈরি হওয়া এই দোটানা প্রমাণ করে যুদ্ধের আঘাত কঠিন আবেগ দিয়ে তৈরি প্রেমের দেয়ালেও আঁচড় কাটতে পারে। কিন্তু যোশেফ তবুও যায় এক তীব্র আকর্ষণের কারণে। কিন্তু এই জীবন তাকে কী উপহার দেয়। জীবনের আসলে উপহার দেওয়ার মতো একটা জিনিসই আছে আর তা হলো মৃত্যু। যুদ্ধের বাস্তবতার সাথে মৃত্যুর বাস্তবতা মিলেমিশে একজন পাঠককে উপলব্ধি করায় এই জীবনের তুচ্ছতা।
স্মৃতি রোমন্থন করে কিছুক্ষণের জন্য সুখ পাওয়া যায় এ কথা সত্য। মানুষ কোনো কোনো সময় নিজের জীবনের অতি তুচ্ছ বিষয়ের ওপরেও আলোকপাত করে। নিজেকে নিজের আয়নায় দেখতে চাওয়ার একটা আকাঙ্ক্ষা তার মনে সবসময় থাকে। “থ্রি কমরেডস”-এর বৃদ্ধ যখন বলে “মানুষ বুড়ো হয় স্মৃতির ভারে” তখন মনে হয় জীবনের সকল আয়োজন যখন একদম শেষ পর্যায়ে থাকে তখনও মানুষের মনে জীবনের শূন্যতাগুলোকে অভিজ্ঞতার আলোকে বিচার করার ইচ্ছে রয়ে যায়। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মানুষের মধ্যে বিরাজ করে চাপা এক অস্থিরতা। নিজের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, বিপ্লবকে নিজের চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখলে মানুষ আবারো উপলব্ধি করে মানুষের আসলে মানুষ ছাড়া আর কেউ নেই। প্রেম এবং বন্ধুত্ব নামক দুটি শব্দকে মানুষ তখন আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। প্রেম কিংবা বন্ধুত্ব কোনোকিছুই অবিনশ্বর না হলেও এই শব্দ দুটির মধ্যে জমে থাকা আবেগ যে অমর তা একজন পাঠক বুঝতে পারেন যখন তিনি ‘থ্রি কমরেডস’ পড়েন।
আবারো মনে করিয়ে দিতে হবে যে যুদ্ধের ক্ষমতা অনেক বেশি। যুদ্ধ বোধহয় সবচেয়ে তাড়াতাড়ি বাস্তবতা নির্মাণ করার ক্ষমতা রাখে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে ক্রমেই মানুষ বন্দী হতে শুরু করে অদ্ভুত বাস্তবতার জেলখানায়। যুদ্ধ যেহেতু মনের গভীরে দাগ কাটতে থাকে অবিরত তাই মানুষ যেখানেই যাক না কেন ‘আতঙ্কিত অবস্থা’ তাকে সাদরে বরণ করে নিতে হয়। রেমার্কের আরেকটি উপন্যাস ‘শ্যাডোজ ইন প্যারাডাইস’ ( বঙ্গানুবাদ: সায়েম সোলাইমান)-এর চরিত্র রবার্ট রস দেখতে পায় যুদ্ধের সময় তার মনে গড়ে ওঠা আতঙ্ক তার পিছু ছাড়বে না কখনোই। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আমেরিকা যখন অনেকের কাছে স্বর্গের চেয়েও দামি তখন সে এমন কিছু উপলব্ধি করছে। রীতিমতো বিস্ময়কর ভাবনা বলা যায়। প্রেমের কাছে রবার্ট সাহায্য চেয়েছিল। কিন্তু রেমার্কের অন্য উপন্যাসের প্রেমের মতো তার ভাগ্য এই ক্ষেত্রে খুব একটা ভালো না। রবার্ট রস পাঠককে উপলব্ধি করায় যুদ্ধের ক্ষমতা আছে প্রেমকে বিভ্রান্ত ও পরাজিত করার।
শান্তি এবং একাকিত্ব কোনো কোনো সময় মানুষের একমাত্র চাওয়া হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ মানসিকভাবে যখন চরম বিধ্বস্ত অবস্থায় থাকে তখন সে উপলব্ধি করে যে এবার নিজের সাথে নিজের একটা বোঝাপড়া দরকার। যুদ্ধের পরিস্থিতি মানুষকে একা করে ফেলে এবং সে এই একাকিত্ব থেকে মুক্তি চায় একথাও ঠিক। কিন্তু তারা যুদ্ধের মাঝখানে পড়ে যাওয়া রিফিউজি। বন্দী ও অত্যাচারিত মানুষ হিসেবে যাদের জীবনযাপন করতে হয়, তাদের জন্য বিষয়টাই আলাদা। রেমার্কের “স্পার্ক অব লাইফ” বইয়ের শেষাংশে কেন্দ্রীয় চরিত্র যখন তার উপলব্ধির কথা আমাদের শোনায়, তখন আমরা বুঝতে পারি একজন বন্দী যখন একইরকম কিছু বন্দী মানুষের সাথে থাকতে থাকতে অতিষ্ঠ হয়ে যায় তখন সে মুক্ত হতে চায় কারাপ্রকোষ্ঠ এবং দীর্ঘ এক আত্মীয়তার বন্ধন থেকে।তবে সে সেই একাকিত্বের মাঝেও নিজের প্রেমের অনুভূতিকে পাশে পায়, যা থেকে বোঝা যায় প্রেমের বন্ধন অন্য যেকোনো সম্পর্কের চেয়ে আলাদা।
অপেক্ষা জীবনের সবচেয়ে ভিন্ন রকমের এক বাস্তবতা। প্রথমে মনে হয় এর অবদান কিংবা গুরুত্ব খুবই কম কিন্তু ক্রমেই মানুষ বুঝতে পারে যে তার সবকিছুর জন্য আসলে অপেক্ষা করে থাকতে হবে চিরকাল। কারণ নিজের আকাঙ্ক্ষার সামনে মানুষ অসহায়। তবে মানুষ বোধহয় সবচেয়ে বেশি অপেক্ষা করে ফিরে আসার কিংবা ফিরে যাওয়ার। মানুষ সবসময় চলমান বাস্তবতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজের সকল কিছুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে অতীতের যেকোনো ভালো অনুভূতির কাছে ফিরে যেতে চায়। অতীত খুব একটা সুখকর না হলে বর্তমানে ফিরে এসে সে ভবিষ্যতকে সুন্দর করতে চায়। কিন্তু যুদ্ধ বর্তমান-ভবিষ্যৎ ও অতীতকে তছনছ করে নিজের ক্ষমতার জানান দেয়। রেমার্কের “এ টাইম টু লাভ আ্যন্ড এ টাইম টু ডাই” এ গ্রেবারের নিজের বাড়িতে ফিরে আসার সময় পাঠকের মনে হয়, না এলেই ভালো হতো। কিন্তু গ্রেবার যখন আবার এলিজাবেথের মতো সাথী পেয়ে যায় তখন পাঠক ভাবে ফিরে যাওয়ার দরকার নেই ঐ বিচ্ছিরি যুদ্ধের ময়দানে। কিন্তু বাস্তবতা থেকে লেখকের বিচ্যুত হওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে যুদ্ধাবস্থায়। খুব ইতিবাচক কিছু করলে বিষয়গুলো মেকি দেখায় যা আবার সাহিত্যের মানদণ্ডে খারাপ। তাই অপেক্ষা, যুদ্ধ ও প্রেমের মিশ্রণে পাঠককে আবার দ্বিধার মধ্যে ফেলে দিয়ে উপন্যাসটি শেষ হয়।
এরিক মারিয়া রেমার্ক যুদ্ধ ও প্রেমের যৌথ সংলাপের আয়োজন করেন। ‘যুদ্ধ’ ও ‘প্রেম’ নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করে। সেই বিতর্কে মাঝেমাঝে শান্তি, অপেক্ষা, ভালোবাসা বা ভালোলাগা, বাস্তবতা, ঘৃণা, জিঘাংসা, হিংসা, সত্য, মিথ্যা ও ক্রোধ এই অনুভূতিগুলো যোগদান করে সাধারণভাবে। মানুষ খুব আগ্রহ নিয়ে এই বিতর্ক দেখে। সমস্যা হলো মানুষ দেখে বেশি, না বুঝে বলে বেশি, কিন্তু উপলব্ধি করে কম। সুতরাং, মানুষ ক্রমশ বিতর্কের অন্ধকার অংশে ঘুরপাক খেতে থাকে। মানুষ কি এই ধাঁধার ভেতরে চিরকালই ঘুরপাক খেতে থাকবে? এর উত্তর বোধহয় মহাকাল আর মহামানবদের কাছে আছে।
