গতকাল ছিল লেখক ও বুদ্ধিজীবী আহমেদ ছফার ২৫তম প্রয়াণ দিবস। তাঁর আলোচিত-সমালোচিত নানা কাজের ভিড়ে বাঙালি মুসলমানের মন সৃষ্টিখানি এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এর আগে কিংবা পরেও – বাঙালি মুসলমানের মনকে এত সূক্ষ্ম আতশকাঁচের নিচে কেও ফেলতে পারেননি। সকল আলোচনা ও সমালোচনাকে গ্রহণ করেই সে সৃষ্টি আজো – অর্ধশত বর্ষ পর– প্রবল ভাবে প্রাসঙ্গিক।
৫ আগস্ট, ২০২৪ এ শেখ হাসিনার তল্পি তল্পা গুটিয়ে দিল্লি পালানোর পর থেকে বাংলাদেশে বাঙালি মুসলমানের রাজনীতি এক নব রূপ ধারণ করেছে। এমতাবস্থায় দাঁড়িয়ে বাঙালি মুসলমানের মনস্তত্ব পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি।’৭১ এ ধর্মীয় নিরপেক্ষতার দাবিতে গড়ে ওঠা একটা রাষ্ট্র, ঠিক কবে ও কেন সেকুলারিজমকে নিজ শত্রু জ্ঞান করতে শুরু করলো? ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দাঁড়িয়ে অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া একটা দলের রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু কেনই বা ছলে বলে কৌশলে সংবিধান থেকে সেকুলারিজম অপসারণে কেন্দ্রীভূত হলো? – এসব জটিল ধাঁধার উত্তর খুঁজতে আমাদেরকে ছফা সাহেবের শরণাপন্ন হতে হবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশ।এদেশে শীতকাল আসলে রাস্তার মোড়ে মোড়ে মাইক লাগিয়ে ওয়াজ মাহফিলের ধুম পড়ে। সোশাল মিডিয়ার বিস্তর প্রভাবের ফলে এলিট থেকে ওয়ার্কিং ক্লাস – সকলেই সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে সেসব ওয়াজ মাহফিলের দর্শক ও শ্রোতা।ওয়াজগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় হিন্দু দেব দেবীর প্রতি নিগ্রহ বিদ্বেষ উগ্রে দিচ্ছেন ইসলামী বক্তারা।এই ঘটনাকে আমরা সম্প্রতি ঘটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে পাঠ করলে ভুল করবো।আহমেদ ছফা এর সমাজতাত্ত্বিক ইতিহাস ব্যাখ্যা করেছেন।
তিনি বলছেন, আর্যরা ভারতবর্ষে প্রবেশের পর ধীরে ধীরে হিন্দু ধর্মে জাতপ্রথা প্রচণ্ডতা লাভ করে।উঁচু বর্ণের হিন্দুদের দ্বারা নিচু বর্ণের হিন্দুরা ক্রমাগত নির্যাতিত, নিপীড়িত হয়ে আসছিল।সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে নিপীড়নের শিকার হয়ে সে নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা প্রথমে বৌদ্ধ ও পরবর্তীতে ইসলামের সাম্যের বাণী শুনে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।পুঁথি লেখকদের রচনা বিশ্লেষণ করে ছফা দেখান, সদ্য ধর্মান্তরিত মুসলিম পুঁথি লেখকদের মাঝে তখনো পূর্ব নির্যাতনকারী দেবদেবী পূজারীদের প্রতি প্রতিশোধ স্পৃহা জ্বলন্ত।তাই সুযোগের সদ ব্যবহার করে তারা নিজ পুথিতে হিন্দু দেব দেবীর প্রতি তাচ্ছিল্য ও ঘৃণা গর্ব ভরেই প্রকাশ করতো।ছফার বিশ্লেষণে আমরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, বিংশ শতাব্দীর প্রথম বাঙালি মুসলিম ঔপন্যাসিক মীর মোশাররফ হোসেনও পুঁথি লেখকদের সেই হিন্দু দেবদেবীদের প্রতি বিদ্বেষকে ঠিক উৎড়ে উঠতে পারেননি।
বাঙালি মুসলমানকে ইদানিং কালে ভিক্টিমহুড কমপ্লেক্সে ভুগতে দেখা যায়।নব্বই শতাংশ মুসলিমের দেশে সে নিজেকে প্রকৃত সংখ্যালঘু বলে দাবি করছে।তার যাবতীয় ইহজাগতিক ও নৈতিক স্খলনের একমাত্র কারণ বুঝি অপর।
ছফা এ ব্যাপারে চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।তিনি শুরুতেই বলে নিচ্ছেন, বাঙালি মুসলমান ইতিহাসের আদি থেকেই নির্যাতিত এক জাতি। ছফা্র মতে, এদেশে সাম্প্রদায়িকতার মূল উৎস হিন্দু বর্ণাশ্রম প্রথা। তারা আর্য বা ব্রাহ্মণ্য শক্তির দ্বারা পরাজিত হওয়ার পর থেকে সে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিগ্রহ থেকে পরিত্রাণের আশায় বারংবার ধর্ম পরিবর্তন করেছে।যদিও পাঠান, মোগল, নবাবী আমলে বিভিন্ন সময়ে এদেশে ইসলামী শাসনকর্তারা এসেছে, তাদের সাথেও সামাজিক, সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে রুচি ও মননগত কোনো যোগসাজেশ বাঙালি মুসলমান করতে পারেনি।এর অন্যতম কারণ হিসেবে ছফা ভাষাকে দায়ী করছেন-ইসলাম ধর্ম সারা বিশ্বেই ঐতিহাসিকভাবে এর বিস্তারের জন্য আরবি ভাষাকে বেছে নিয়েছে।যথারীতি, বাঙালি মুসলমানও সে পথ অবলম্বন করতে চেয়েছে। তবে তাদের আরবি ভাষার উপর দখল ছিল অস্বাভাবিক রকমের কম। তাই ইউরোপ, আফ্রিকায় জ্ঞান বিজ্ঞানে ইসলামিক যে বিপ্লব ঘটেছে, তার ছিটে ফোঁটাও বাঙালি মুসল্মানকে স্পর্শ করেনি।তারা ঐতিহ্য ইতিহাস সংস্কৃতির জন্য সর্বদা অপরের কাছে হাতড়ে বেরিয়েছে। আরবি ভাষায় ইসলামের মহিমা প্রকাশে তেমন যুৎ করতে না পারায় তারা ফারসি ভাষায় ঝুকেছে।ফারসি থেকে ক্রমে তারা নিজেরা একটা পাঁচমিশালী ভাষা বানিয়ে নাম দিয়েছে উর্দু। বলে রাখা ভালো, আরবি, ফারসি, উর্দুকে বাঙালি মুসলমান কেবল মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে গণ্য করেনি।তারা এ ভাষাগুলোকে বেহেশতে যাও্যার চাবিকাঠি মনে করতো।তারা ভাবতো, এ কাফেরদের (কাফের আর হিন্দু দেরকে সমার্থক ভাবা বাঙালি মুসলমানের পুরাতন অভ্যাস) ভাষা বর্জন করে ইসলাম ঘেঁষা ভাষার চর্চা করলে খোদা তা’লা খুশি হবেন।
এর ফলশ্রুতিতে বাঙালি মুসলমানের ভবিতব্য ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করার মতো কোনো প্রকৃত চিন্তক বেড়ে ওঠেনি।ছফা প্রথম সার্থক বাঙালি মুসলিম রাজনৈতিক নেতা হিসেবে ফজলুল হককে চিহ্নিত করছেন।তবে এর বাইরে, নবাব সলিমুল্লাহ, এপিজে আবুল কালাম আজাদ, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কেওই বাঙলা ভাষী ছিলেন না।তাই বাঙালি মুসলমানের দৈনন্দিন দীনতা, চাওয়য়া পাওয়া বোঝার মতো দূরদর্শী নেতার অভাব তারা বোধ করেছে আজীবনকাল।
ছফা বলছেন, হিন্দু ধর্মের নানা সামাজিক দিক নিয়ে এক শ্রেণীর হিন্দুদের ভোকাল হতে দেখা গিয়েছে।ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যা সাগর, রাজা রামমোহন রায়ের মতো লোকেরা নিজ ধর্ম সংস্কারে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। কিন্তু বাঙালি মুসলমান সমাজে এমন কোনো ব্যক্তিত্বকে পাওয়া যায় না। সামাজিক সাংস্কৃতিক মুক্তির পথে বাঙালি মুসলমানের এ লড়াইয়ের অভাব তাঁকে আজও পিছনে রেখেছে। উল্লেখযোগ্য এই যে, বাঙালি মুসলমানের আজকের পরিণতি কেবল বাঙালি হওার জন্যও না, কেবল মুসলমান হওার জন্যও না।এর সমন্বয়টিই বাঙালি মুসলমানকে তাঁর বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উতড়ে উঠতে বাধা দিচ্ছে। তারা এক পা এগোলে ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছে তিন চার পা। সে সবসময় নিজের দুর্দশার জন্য অপরকে দোষারোপ করে গিয়েছে।কিন্তু নিজের দুর্বলতা নিরসনে কোনো মনোনিবেশ করেনি।এজন্যই আজও নব্বই শতাংশ মুসলিমের দেশে তারা আজ নিজেদের প্রকৃত সংখ্যালঘু জ্ঞান করছে।
ছফার বাঙালি মুসলমানের ব্যাখ্যা স্বাভাবিক ভাবেই অনেক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বহু স্কলার, বুদ্ধিজীবী আহমেদ ছফার কঠিন সমালোচনা করে কলাম, রিভিউ লিখেছেন। কিন্তু এ কথা আশা করি তাঁর শত্রুরাও মানতে বাধ্য হবেন যে, বাঙালি মুসল্মানের মনের এহেন সামাজিক ও নৃতাত্বিক ব্যাখ্যা আজ অবধি কেও উৎপাদন করতে পারেনি।বাঙ্গালি মুসলমান তাঁর যাবতীইয় হীনিম্মন্যতা বোধকে অতিক্রম করে নিজের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য অপরের দিকে আঙ্গুল না তুলে নিজের উপর আলোকপাত করবে- এ আশাই ব্যক্ত করছি।
