মাত্র পঁচিশ বছরের জীবন বিরসা মুন্ডার। কিন্তু তার জীবন অবিস্মরণীয় ও এর প্রভাব অসীম। জন্মভূমি, গ্রাম বা শহরের সীমা ছাড়িয়ে তাঁর নাম ছড়িয়ে গেছে দেশের নানা প্রান্তে। মুন্ডা আদিবাসী মানুষ তাঁকে ‘ধরতি আবা’ (যার অর্থ : পৃথিবীর পিতা)—নামে জানে। এই নাম শুধু শ্রদ্ধার নয়, এটি মানুষের এবং প্রকৃতির সঙ্গে বিরসার গভীর সম্পর্কের প্রতীক। ঝাড়খণ্ড রাজ্যের শহরে শহরে তাঁর নাম ও মূর্তি দেখা যায়। সংসদ ভবনে তাঁর প্রতিকৃতি রয়েছে। ১৫ নভেম্বর তাঁর জন্মদিন ‘জনজাতীয় গৌরব দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।
তবে, এই মর্যাদা প্রায়ই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। আদিবাসী অধিকার ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের বার্তা অনেক সময় আড়াল হয়ে যায়। বিরসা কেবল একজন নেতা ছিলেন না, তিনি একজন দার্শনিক ও সমাজ সংস্কারকও ছিলেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ভূমি ও অরণ্যের ওপর আদিবাসীদের অধিকার, সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ এবং নৈতিক পরিবেশ চেতনা প্রতিষ্ঠা।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ব্রিটিশ শাসন ছোটনাগপুরের প্রাক-ঔপনিবেশিক সামূহিক ভূমি ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয়। আগে ভূমি ও অরণ্য জনগণের যৌথ সম্পদ ছিল। মানুষ তা থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী জীবনযাপন করত, কিন্তু তা কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে মনে করা হতো না। ব্রিটিশ শাসনের নীতির ফলে জমি ব্যক্তিগত মালিকানায় রূপান্তরিত হয়। জমি বিক্রয় ও দখল তখন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। বন, নদী, মৃত্তিকা, পশুপাখি—সবই পুঁজির আগ্রাসনের শিকার হয়।
এই পরিস্থিতির মাঝেই খুঁটি জেলার চালখাঁদ গ্রামে বিরসার জন্ম। তাঁর পরিবারের দারিদ্র্য সত্ত্বেও তিনি স্কুলে পড়াশোনা করতে পেরেছিলেন। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে জানতে চাওয়ার প্রবল ইচ্ছা ছিল। সমাজ ও ধর্ম নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। খ্রিস্টান ও বৈষ্ণবদের সঙ্গে পরিচয় তাঁর চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে। এর থেকে জন্ম নিল বিরাসাইত ধর্ম। এটি ছিল আদিবাসী লৌকিক পুনর্জাগরণ।
১৮৯০-এর দশকে তিনি মুন্ডা, ওরাঁও ও অন্যান্য গোষ্ঠীর মধ্যে আত্মশাসন, নৈতিক সংস্কার ও আধ্যাত্মিক জাগরণের বার্তা ছড়িয়ে দেন। তাঁর বিখ্যাত আহ্বান ছিল, “আবুয়া দিশুম, আবুয়া রাজ—আমাদের দেশ, আমাদের শাসন।” এটি কেবল রাজনৈতিক দাবি নয়। এটি মানুষের নিজস্ব শাসন, জমি ও প্রকৃতির প্রতি অধিকার এবং আত্মনির্ভরতার আহ্বান।
১৮৯৯–১৯০০ সালে তিনি ব্রিটিশ ও স্থানীয় দিকুদের বিরুদ্ধে উলগুলান প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এটি শুধু সশস্ত্র বিদ্রোহ নয়। এটি সামাজিক সংস্কার ও লৌকিক পুনর্জাগরণের এক মিশ্র রূপ। গ্রামবাসীরা কর দিতে অস্বীকার করেন, নিজেদের জমি পুনর্দখল করেন এবং বিরসার নেতৃত্বে একত্রিত হন। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ বাহিনী আন্দোলন দমন করে। বিরসাকে গ্রেপ্তার করে রাঁচি জেলে পাঠানো হয়। ১৯০০ সালের ৯ জুন মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে তিনি রহস্যজনকভাবে মারা যান। ব্রিটিশরা কলেরা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে বলে ঘোষণা করলেও আদিবাসীরা বিরসাকে হত্যা করা হয়েছে বলে মনে করেন।
মৃত্যুর পরও বিরসার ভাবনা অমর হয়ে ওঠে। তিনি আদিবাসীদের মধ্যে এক ঈশ্বরের মতো রূপ নেন। যেকোনো অনাচারের বিরুদ্ধে লড়াইতে আদিবাসীরা নিজেকে বিরসার সঙ্গে মিলিয়ে নেয়। যদিও তাঁর আন্দোলন স্বল্পস্থায়ী ছিল, তবু ১৯০৮ সালে ছোটনাগপুর টেনান্সি অ্যাক্ট প্রণীত হয়। এটি আদিবাসী ভূমি বিক্রি ও হস্তান্তরের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে।
বিরসার চিন্তায় চারটি বিষয় স্পষ্ট:
১. ভূমি পবিত্র, যৌথ ও অ-বিক্রেয় সম্পদ।
২. লৌকিক সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ।
৩. কুসংস্কার, মদ্যপান ও বিভেদের বিরোধিতা।
৪. নৈতিক পরিবেশ চেতনা—মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে সঙ্গতি।
তাঁর সমাজচিন্তা অনুযায়ী রাজনীতি নয়, সমাজ ও প্রকৃতিই মূল। আজকের পরিবেশ সংকটের সময়ে বিরসার চিন্তাভাবনা নতুন অর্থ পাচ্ছে।
আজও ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, ওড়িশা ও পূর্ব ভারতের বহু আদিবাসী এলাকা খনন, শিল্প প্রকল্প ও বাঁধ নির্মাণের কারণে উচ্ছেদের শিকার হচ্ছেন। এটি বিরসার যুগের ব্রিটিশ জমিদার ও দিকুদের আধুনিক রূপ। তাঁর বলা কথাটি আজও প্রাসঙ্গিক: ‘আমাদের জমি আমাদের মা’। জমি বিক্রি মানে আত্মার বিক্রয়।
বিরসা শুধু জমির লড়াই করেননি। তিনি আদিবাসী সমাজের দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম করেছেন। তাঁর ধর্ম, যা না হিন্দু, না খ্রিস্টান- তা আদিবাসী লৌকিক পুনর্জাগরণকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এই ধারণাকে বলা হয় ‘পরিবেশমুখী একেশ্বরবাদ।’ এই বিশ্বাস অনুযায়ী, ঈশ্বর, মানুষ, পাহাড়, নদী—সবার সমান অংশ। তিনি ধর্মকে বিভাজন ও উচ্ছেদ থেকে মুক্ত রাখতে চেয়েছিলেন।
২০০০ সালে ঝাড়খণ্ড আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে গঠিত হলে বিরসা রাজ্যের প্রতীক হন। বিশ্ববিদ্যালয়, বিমানবন্দর, স্টেডিয়াম, ডাকটিকিট—সবকিছুতেই তাঁর নাম। রাজনীতিবিদরা তাঁর নাম ব্যবহার করে আবেগ সৃষ্টি করেন ঠিকই, কিন্তু নীতি প্রণয়নে তাঁর দর্শনকে উপেক্ষা করা হয়। বনাঞ্চল বেসরকারিকরণ ও কর্পোরেট পুঁজির হাতে ছেড়ে দেয়ার সময় ‘বিরসা মুন্ডা দিবস’ পালিত হয়। আদিবাসীরা উচ্ছেদের শিকার হন। এটি মূলত ‘স্মৃতি রাজনীতি’—অতীতকে বর্তমান সুবিধার জন্য ব্যবহার করা।
বিরসা মুন্ডা কেবল একজন জনজাতীয় নেতা ছিলেন না । তিনি প্রকৃতি, ন্যায্যতা ও স্বাধীনতার দার্শনিক।তাঁর দর্শন আমাদের জানায়: ভূমি শুধু অর্থের জন্য নয়, এটি সংস্কৃতির ভিত্তি। সংস্কৃতি শুধু নৃত্য-গীত নয়; এটি আত্মসম্মান ও নৈতিক শক্তি। রাজনীতি শুধু ক্ষমতা নয়; এটি সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যম।
আজ যখন বন উজাড় হচ্ছে, নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, ভাষা বিলুপ্ত হচ্ছে, বিরসার কথা মনে করিয়ে দেয়: “যে সমাজ প্রকৃতিকে ভুলে যায়, সে সমাজ নিজেকে ধ্বংস করে।”
বিরসার প্রতীককে রাষ্ট্রনায়কের হাতের খেলায় রূপান্তর করা হয়েছে। তাঁর নামে শাসন চলে অন্যদের। তাঁর স্বপ্নের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নৈতিক, পরিবেশমুখী স্বাধীনতা বাস্তবায়ন করতে হলে তা গণমানুষের হাতে নিতে হবে। প্রকৃত শ্রদ্ধা মানে শুধু জন্মদিন পালন নয়। বরং তাঁর ভাবনার পুনরুজ্জীবন—মুক্তি, ন্যায্যতা, পরিবেশ ও মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা।
বিরসা মুন্ডার জীবন ও চিন্তাধারা আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের শেখান—স্বাধীনতা মানে মানুষের ওপর রাষ্ট্রের দখল নয়। স্বাধীনতা হলো মানুষের এবং প্রকৃতির মুক্ত, সমান ও সম্মিলিত অগ্রগতি। পুঁজিবাদ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যারা সংগ্রামে বদ্ধপরিকর, বিরসা আজও তাদের পথ দেখান।
