দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর জয়ের পেছনে অনেক নারীর প্রত্যক্ষ অবদান ছিল, ইতিহাস যাদের বীরত্বকে বারবার কুর্নিশ জানিয়েছে। কেউ স্নাইপারের দূরবীনে চোখ রেখে শত্রুর বুকে কাঁপন ধরিয়েছেন, কেউ ছদ্মবেশী গুপ্তচর হয়ে নাৎসিদের ফাঁদে ফেলেছেন, আবার কেউ উত্তাল সমুদ্রে জাহাজের ইঞ্জিন সামলে বাঁচিয়েছেন সহযোদ্ধাদের প্রাণ। চলুন জেনে নেওয়া যাক যুদ্ধের ময়দানে অমর হয়ে থাকা এমনই তিন কিংবদন্তী নারীর বীরত্বগাথা।
লুডমিলা পাভলিচেনকো
ছবির এই অল্প বয়সী মেয়েটির কোমলতার পেছনে একজন দুর্ধর্ষ স্নাইপার লুকিয়ে আছে। নাম লুডমিলা পাভলিচেনকো, গোটা ৩০৯ জন শত্রু সেনার হত্যাকারী একা একটা মেয়ে! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত রেড আর্মি র একজন পরিচিত স্নাইপার তিনি; শত্রুরা তাকে দ্য লেডি ডেথ (The Lady Death) বলে ডাকত।

লুডমিলার জন্ম ১৯১৬ সালে বেলায়া সের্কোভ শহরে। কিয়েভ ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাস পড়ার সময়ে তিনি একটি শ্যুটিং ক্লাবে যোগ দিলে সেখানে তাঁর তীক্ষ্ণ নিশানার জন্য মার্কসম্যান সার্টিফিকেটটি অর্জন করেন। ১৯৪১ সালে নাৎসি জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলে তিনি পড়াশোনা বাদ দিয়ে যোগ দেন সোভিয়েত রেড আর্মিতে। শুরুতে তাঁকে কেবল একজন নার্স হিসেবে ফিল্ডে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হলেও তিনি সবাইকে ভুল প্রমাণিত করে ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের একজন স্নাইপার হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন।
তিনি ওডেসা ও সেভাস্তোপল অবরোধের যুদ্ধে স্নাইপার হিসেবে ভূমিকা রাখেন। গোটা ৩০৯ জন শত্রুকে স্নাইপিং করে হত্যা করেন তিনি। এর মাঝে ৩৬ জনই ছিল শত্রুপক্ষের দক্ষ স্নাইপার! লুডমিলা পাভলিচেনকোকে ইতিহাসের সফলতম নারী স্নাইপারদের মধ্যে শীর্ষস্থান অধিকারী মনে করা হয়।
ফ্রন্টলাইনে তার ভয়ঙ্কর গল্পগুলোর একটি হলো টানা তিনদিনের স্নাইপার ডুয়েল। এই তিনদিন ও তিনরাত তিনি ঠিক মতো ঘুমাতে বা খেতে পারেননি, কারণ তাঁর মুখোমুখি হয়েছিল শত্রুপক্ষের আরেকজন ভয়ঙ্কর স্নাইপার।
তিনি মোট চারবার যুদ্ধে আহত হন, ১৯৪২ সালে যুদ্ধক্ষেত্রে মর্টারের সেলের আঘাতে আহত হওয়ার পর তাঁকে ফ্রন্টলাইন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর মিত্রশক্তির দেশগুলো, যেমন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের সমর্থনের জন্য লুডমিলাকে একটি প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে বিদেশ সফরে পাঠানো হয়। সেসময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি এলিনর রুজভেল্ট তাঁকে হোয়াইট হাউসে অভ্যর্থনা জানান এবং তাঁদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তিনি কিয়েভ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর পড়াশোনা সম্পন্ন করেন এবং একজন ইতিহাসবিদ ও গবেষক হিসেবে জীবন অতিবাহিত করেন। বিশ্বযুদ্ধে এমন দুঃসাহসিকতার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন তাঁকে সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা “হিরো অব দ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন” উপাধি দেয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক সফরে গিয়ে সেখানকার সাংবাদিকরা তাঁর যুদ্ধক্ষেত্রের দক্ষতার চেয়ে তাঁর মেকআপ, লিপস্টিক বা পোশাকের ডিজাইন নিয়ে অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করায় তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। সাংবাদিকদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর এই ইউনিফর্ম রক্তে ভেজা এবং এর গায়ে দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা রয়েছে। তাঁর একটি উক্তি ইতিহাসে খুব বেশি আলোচিত–-“আমার বয়স ২৫ বছর এবং আমি ইতিমধ্যে ৩০৯ জন ফ্যাসিস্ট দখলদারকে হত্যা করেছি। আপনাদের কি মনে হয় না ভদ্রমহোদয়গণ, আপনারা অনেক দীর্ঘ সময় ধরে আমার পিছে লুকিয়ে আছেন?”
১৯৭৪ সালের ১০ অক্টোবর লুডমিলা পাভলিচেনকো মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর যুদ্ধ ও জীবনী নিয়ে ২০১৫ সালে জনপ্রিয় সিনেমা Battle Of Sevastopol মুক্তি পায়, জনপ্রিয় রুশ অভিনেত্রী ইউলিয়া পেরেসিল্ড তাঁর চরিত্রে অভিনয় করেন। এটি রাশিয়া ও ইউক্রেনের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত একটি বিগ বাজেটের যুদ্ধভিত্তিক সিনেমা।
ভার্জিনিয়া হল
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আরেকজন সাহসী কিংবদন্তী নারী হলেন মার্কিন গুপ্তচর ভার্জিনিয়া হল। তিনি ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও সফল গুপ্তচর। শত্রুরা তাঁর মাথার দাম পর্যন্ত ঘোষণা করেছিলো। তাঁকে ডাকত দ্য আর্মেটিজ বা সবচেয়ে বিপদজনক মিত্র গুপ্তচর হিসেবে।
ভার্জিনিয়া হলের জন্ম ১৯০৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে। অল্প বয়সে তুরস্কের মার্কিন দূতাবাসে কর্মরত অবস্থায় একটি দুর্ঘটনায় তাঁর বাম পায়ে গ্যাংগ্রিন ছড়িয়ে পড়ায় তাঁর পা হাঁটু থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে কেটে ফেলতে হয়েছিল। তারপর থেকে তিনি কাঠের তৈরি কৃত্রিম পা ব্যবহার করতেন, ওটার নাম তিনি দিয়েছিলেন কাথবার্ট।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা শুরু হলে তিনি ব্রিটিশ স্পাই এজেন্সি Special Operations Executive (SOE)-তে যোগ দেন। ১৯৪১ সালে তাঁর কৃত্রিম কাঠের পা কাথবার্টকে নিয়েই তিনি নাৎসি অধ্যুষিত ফ্রান্সে পা রাখেন। ভার্জিনিয়া হলই ছিলেন ফ্রান্সে পাঠানো প্রথম পূর্ণকালীন নারী ব্রিটিশ গুপ্তচর।
ভার্জিনিয়া হল ফ্রান্সে গিয়েই স্থানীয় প্রতিরোধ বাহিনী তথা ফ্রেঞ্চ রেজিস্ট্যান্সের যোদ্ধাদের সংগঠিত করেন। সুড়ঙ্গ তৈরি, অস্ত্র সাপ্লাই, নাৎসিদের ট্রেন লাইনে নাশকতা বা সাবোটাজ আক্রমণ এবং মিত্রবাহিনীর পাইলটদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশন পরিচালনা করেন ভার্জিনিয়া হল। হিটলারের গেস্টাপো তাঁকে ধরতে মরিয়া হয়ে উঠে পথেঘাটে মোস্ট ওয়ান্টেড পোস্টার লাগিয়েছিল।
একটা সময়ে গেস্টাপোর ফাঁদে পড়তে পড়তেও ফ্রান্স ছেড়ে পালিয়ে আসেন ভার্জিনিয়া হল। স্পেনের সীমান্তরক্ষীরা তাঁকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠালেও তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তারপর তিনি আমেরিকান ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি Office of Strategic Service-এ যোগ দেন। ঐতিহাসিক ডি ডে অপারেশনে ল্যান্ডিংয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি ছদ্মবেশে আবারও ফ্রান্সে প্রবেশ করেন এবং নাৎসিদের বিরুদ্ধে গেরিলা যোদ্ধাদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেন।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর অসামান্য সাহসিকতার জন্য তাঁকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা “ডিস্টিংগুইশড সার্ভিস ক্রস” প্রদান করা হয়। একমাত্র বেসামরিক নারী হিসেবে তিনি এই সম্মাননা লাভ করেছিলেন। এছাড়া ব্রিটিশ সরকার তাঁকে OBE উপাধিতে ভূষিত করে। দীর্ঘ জীবন কাটিয়ে ১৯৮২ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
ভিক্টোরিয়া ড্রামমন্ড
ভিক্টোরিয়া ড্রামমন্ড ১৮৯৪ সালে স্কটল্যান্ডের এক অভিজাত পরিবারে জন্ম নেন। সমাজের নিয়ম অনুযায়ী তাঁর এক স্বাচ্ছন্দ্যময় ও আরামদায়ক জীবন কাটানোর কথা থাকলেও তিনি বেছে নেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চ্যালেঞ্জিং পথ—জাহাজের ইঞ্জিন নিয়ে কাজ করা।

ভিক্টোরিয়া ড্রামমন্ড ১৯১৬ সালে স্কটল্যান্ডের শিপইয়ার্ডে হাজার হাজার পুরুষের মাঝে একমাত্র নারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সমস্ত বাধা ও সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করে তিনি যুক্তরাজ্যের প্রথম নারী মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তিনিই ইন্সটিটিউট অব মেরিন ইঞ্জিনিয়ার্সের প্রথম নারী সদস্য ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি বিভিন্ন মালবাহী ও তেলবাহী জাহাজে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।
১৯৪০ সালে যখন সারাবিশ্বে তুমুল যুদ্ধ চলছে, তখন আটলান্টিক মহাসাগরে ভিক্টোরিয়া ড্রামমন্ডের জাহাজ আচমকাই নাৎসি জার্মানির বোমারু বিমানের হামলার শিকার হয়। জাহাজে পানি ঢুকতে শুরু করলে এমন চরম বিপদের মাঝেও তিনি সাহসিকতার সাথে ইঞ্জিন রুম একা সামাল দেন। তাঁর এমন দুঃসাহসিক কাজের জন্য জাহাজটা রক্ষা পায় ও জাহাজের ক্রুরা প্রাণে বেঁচে যায়।
যুদ্ধে এমন দুঃসাহসিকতার জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ব্রেভরি অ্যাট সি পদকে ভূষিত করে তিনিই প্রথম নারী ইঞ্জিনিয়ার যিনি এই সম্মান অর্জন করেছিলেন। ভিক্টোরিয়া ড্রামমন্ড ১৯৬২ সালর চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে অবসর নেন। তারপর, ১৯৭৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
