আমাদের দেশের মানুষ নারীবাদ বা ফেমিনিজম জিনিসটাকে ভুলভাবে জানে বা ব্যাখ্যা করে। এমনও একটা সময় ছিল যখন আমি নিজেও নারীবাদী বলতে একপ্রকার ‘সন্ত্রাসী’ কার্যক্রম মনে করতাম, কারণ আমি এব্যাপারে যা শুনতাম তা সবই হচ্ছে অনেকটা সন্ত্রাসী টাইপ। নারীদের ভিলেন বানিয়ে এখানে নারীবাদ বুঝানো হয়। ব্যাখ্যাগুলো শুনলে মনে হবে শুধু সুবিধাবাদী আর নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতেই হয়তো নারীবাদ সৃষ্টি করেছে নারীরা।
তবে নারীবাদ সম্পর্কে আমাদের দেশ সহ প্রায় পুরো বিশ্বে পুরুষ সমাজের সবচেয়ে বড় যে ভুল ধারণা সেটা হচ্ছে নারী পুরুষের সমান অধিকারের কনসেপ্ট। যারা নারীবাদ বিরোধী তারা সবসময় মনে করে নারীবাদ মানেই পুরুষের উপরে উঠতে চাওয়া বা পুরুষদের সুযোগ সুবিধা কমিয়ে দেওয়া। সঙ্গে আরো কিছু কথাবার্তা লোকজন যোগ করে থাকে যেমন নারীবাদী নারীরা সন্তান বড় করতে পারে না, ক্যারিয়ারে এতটা ডুবে থাকে যে পরিবার থেকে দূরে সরে যায় বা সংসারে সমস্যা হয়। কিন্তু বাস্তবে নারীবাদ নারীদের পাশাপাশি পুরুষদের পক্ষেও কথা বলে। নারীবাদ নারীদের পুরুষের সাথে কম্পিটিশন করার পক্ষে, আর সেটা কোনোপ্রকার কোটা ছাড়াই। অর্থাৎ সমাজ নারীদের শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে যেসব কোটা দিয়ে থাকে নারীবাদ সেসব কোটারও বিরুদ্ধে। যা হবে সব যোগ্যতা ভিত্তিক, যদি এখানে কেউ কাউকে পেছনে ফেলে তাহলে সেটা যোগ্যতার উপর ভিত্তি করে হবে। মানে কোনো পুরুষ যদি নারীর সাথে হেরে যায় তাহলে তার ইমপ্রুভমেন্টের দরকার, ইগোর না। একটা অফিসের বস যদি নারী হয় তাহলে সে তার যোগ্যতা দিয়ে সেই অবস্থানটায় যাবে, তার অধিনে যেসব পুরুষরা কাজ করবে তারা সেই অবস্থানে যাওয়ার জন্য এখনো যোগ্য হয়নি। হিসেবটা এমন, যোগ্য হতে হলে সেল্ফ ইমপ্রুভমেন্টে আরো মনযোগ দিতে হবে। শুধুমাত্র পুরুষ হওয়াতে যোগ্য না হওয়া সত্বেও বস আর শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে যোগ্য হওয়া সত্বেও অযোগ্য কারোর অধিনে কাজ এধরণের অসমতা নারীবাদ পুরোপুরি অস্বীকার করে।
নারীবাদ শুধু সমান অধিকার না, সমান দায়িত্বেও বিশ্বাসী। মানে শুধু অধিকারের সুবিধা নেওয়ার সুযোগ নাই, দায়িত্ব পালনও সমান হতে হবে। নারীবাদ সমর্থন করা নারীরা পুরুষদের সাথে ব্যাটলফিল্ডেও যেতে রাজি থাকে, ইতিহাসে এমন অনেক নারী যোদ্ধা আছে যারা নারী হওয়ার জন্য প্রথমে সুযোগ না পেলেও পরে দক্ষতা দিয়ে স্থান করে নেয়। আমাদের সমাজে সবসময় কিছু কথা শোনা যায় যেমন পুরুষরা কাঁদতে পারবে না, পুরুষদের সবকিছুর হাল ধরতে হবে, যত যা-ই হয়ে যাক পুরুষদের লড়াই করতে হবে ইত্যাদি। এধরণের কথাবার্তা এখন পুরোনো হয়ে গেছে। একটা পুরুষও মানুষ, তারও ইমোশন ও দুর্বলতা থাকতে পারে, আর নারীবাদ সেটা স্পষ্ট স্বীকার করে নেয়। একটা সিম্পল উদাহরণ দেই–
সমাজের ভাষায় একটা পুরুষ সারাদিন অফিস করে, ইভেন বসের কাছ থেকে চরম দুর্ব্যবহার সহ্য করে এসে বাসায় এমন একটা ভাব নিয়ে ঢোকা উচিত তার কোনো সমস্যাই নাই। তার কিছুই হয়নি এমন একটা অবস্থা। এই চরম মানসিক চাপ নিয়ে সে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে গেলেই সমাজ ও নারীবাদ বিরোধীদের কাছে সে আলফা সিগমা আরো অনেক কিছু।
অন্যদিকে একটা পুরুষ একইরকম মানসিক চাপ নিয়ে এসে তার স্ত্রীর সাথে সবটা শেয়ার করল। স্ত্রী তাকে সময় দিল, প্রয়োজনে কাঁদার সুযোগও দিল। নারীবাদের কনসেপ্টটা এমনই। একটা পুরুষ যখন মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে ভেঙে পড়ে তখন পুরুষতন্ত্র ও সমাজের নিয়ম অনুযায়ীই সে কাপুরুষ, কারণ এই দুটো সিস্টেম পুরুষকে রোবট হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। পুরুষরা কখনো ভেঙে পড়তে পারবে না, যে শত মানসিক চাপ সহ্য করে বেঁচে থাকে সে-ই আসল পুরুষ, এধরণের চিন্তাভাবনার কারণে অনেক সময় মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেকে আত্মহত্যা করে। নারীবাদ এসকল পুরুষদের পক্ষেও কথা বলে। নারী ও পুরুষ উভয়ই মানুষ, উভয়ই ভেঙে পড়তে পারে।
খেয়াল করলে দেখবেন নারীবাদের বেসিক সবকিছু কিন্তু আমরা প্রাইমারি স্কুলের বিভিন্ন বইতেই পড়ে আসি। কিন্তু মানুষ যত বড় হয়, যত বিভিন্ন মানুষের সাথে মিশে তত মানসিকতার পরিবর্তন ঘটে। মানুষ জন্মগতভাবেই মানবাধিকার বুঝে, কিন্তু পরিস্থিতি ও পরিবেশের কারণে মানুষ বদলে যায়। একই হিসেবে মানুষ জন্মগতভাবেই নারীবাদী হয়, সময়ের সাথে তা বদলে যায়।
পুরুষতন্ত্র শুধু নারীদের নিয়ন্ত্রণ করে না; এটি পুরুষদের জন্যও একটি সংকীর্ণ চরিত্র নির্ধারণ করে দেয়। সেই চরিত্র অনুযায়ী পুরুষকে আক্রমণাত্মক, নির্ভীক, অর্থ উপার্জনকারী, যৌনভাবে শক্তিশালী এবং আবেগহীন হতে হবে। কোনো পুরুষ কোমল, শান্ত, লাজুক, আবেগপ্রবণ কিংবা সাহায্যের প্রয়োজন অনুভব করলে তার পৌরুষ নিয়েই প্রশ্ন তোলা হয়। এই বিষাক্ত পৌরুষের ধারণা পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও বিপজ্জনক। সাহায্য চাওয়াকে দুর্বলতা মনে করার কারণে অনেক পুরুষ বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং মানসিক সংকটের মধ্যেও চিকিৎসা কিংবা কাউন্সেলিং নিতে চান না। তারা নিজেদের কষ্ট গোপন করতে করতে একসময় চরমভাবে ভেঙে পড়েন। নারীবাদ বলে, পুরুষের চোখের পানিও মানুষের চোখের পানি; সেটিকে লজ্জা বা ব্যর্থতা হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই।
নারীবাদ সমান অধিকারের পাশাপাশি ন্যায়সংগত দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার কথাও বলে। এর অর্থ এই নয় যে নারী শুধু অধিকারের সুবিধা নেবেন কিন্তু কোনো দায়িত্ব পালন করবেন না। নাগরিক, পেশাজীবী, পরিবারের সদস্য কিংবা রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে নারী ও পুরুষ উভয়েরই দায়িত্ব রয়েছে।
তবে সমতা মানে সব পরিস্থিতিতে সবাইকে হুবহু একইভাবে দেখা নয়। কারণ বাস্তবে সবাই একই জায়গা থেকে যাত্রা শুরু করে না। যে নারী ছোটবেলা থেকে শিক্ষার সুযোগ পাননি, চলাচলের স্বাধীনতা পাননি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ পাননি কিংবা সামাজিক বাধার কারণে পিছিয়ে পড়েছেন, তাকে শুধু “এখন থেকে সবার জন্য নিয়ম সমান” বললে প্রকৃত সমতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। তবে চূড়ান্ত লক্ষ্য এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে একজন নারী শুধু নারী হওয়ার কারণে পিছিয়ে পড়বেন না এবং একজন পুরুষও শুধু পুরুষ হওয়ার কারণে অযৌক্তিক সুবিধা কিংবা অসহনীয় দায়িত্ব পাবেন না।
নারীবাদের লক্ষ্য নারীদের প্রমাণ করতে বাধ্য করা নয় যে তারা পুরুষের মতো হতে পারেন। কারণ পুরুষকে সব সক্ষমতার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে ধরে নেওয়াও সমস্যাজনক। লক্ষ্য হলো প্রত্যেক মানুষকে তার নিজস্ব দক্ষতা ও আগ্রহ অনুযায়ী বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া। সব নারীকে চাকরিজীবী হতেই হবে-নারীবাদ এমন কথা বলে না। কোনো নারী স্বেচ্ছায় গৃহিণী হতে চাইলে সেটিও তার অধিকার। কিন্তু তার সিদ্ধান্তটি যেন সামাজিক চাপ, অর্থনৈতিক নির্ভরতা কিংবা বিকল্প সুযোগের অভাব থেকে না আসে। একইভাবে কোনো পুরুষ যদি সন্তান লালন-পালনে বেশি সময় দিতে চান, গৃহস্থালির কাজ করতে চান কিংবা স্ত্রীকে পেশাগতভাবে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেন, তাহলে তাকেও উপহাস করা উচিত নয়। প্রকৃত স্বাধীনতা হলো মানুষের সামনে একাধিক বাস্তব বিকল্প থাকা এবং ভয় বা চাপ ছাড়া নিজের পথ বেছে নিতে পারা। নারীবাদ পুরুষকে শত্রু হিসেবে দেখে না; বরং বৈষম্যমূলক চিন্তা, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক কাঠামোকে সমস্যার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে। নারী-পুরুষ উভয়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
ফারহান আহমেদ ফারাবী একজন গবেষক এবং রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন।
