সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে যুবসমাজের মধ্যে মাদকের এমন অবাধ বিস্তার নিঃসন্দেহে ভয়াবহ সামাজিক সংকট। মাদক পাচারকারী চক্র, তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক, অর্থের জোগানদাতা এবং প্রশাসনিক সহযোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু কঠোরতার নামে এমন আইন তৈরি করা উচিত নয়, যা অপরাধীর চেয়ে নিরপরাধ নাগরিক, রাজনৈতিক বিরোধী, সাংবাদিক কিংবা সরকারের সমালোচকের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে পাস হওয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬ সেই আশঙ্কাই সামনে নিয়ে এসেছে। সংশোধনী অনুসারে সাইবারস্পেস, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ, ডিজিটাল ডিভাইস কিংবা ইলেকট্রনিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে মাদক কেনা, বিক্রি, সরবরাহ, বিজ্ঞাপন, যোগাযোগ বা কোনোভাবে সহায়তা করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এসব অভিযোগে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আরও উদ্বেগজনক হলো, ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের মামলা করতে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে কোনো মাদক উদ্ধার করাও বাধ্যতামূলক হবে না। বিলটি কণ্ঠভোটে পাসের সময় জনমত যাচাই ও সংশোধনীসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোও নাকচ করা হয়।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে এই আইন কি কাউকে ফাঁসাতে চাইলে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে?
কোনো ব্যক্তির বাসা বা গাড়িতে মাদক রেখে দেওয়ার অভিযোগ বাংলাদেশে নতুন নয়। ইতিপূর্বেও আমরা দেখেছি বডি সার্চ এর সময় পকেটে মাদকের প্যাকেট ঢুকিয়ে দিয়ে পুলিশ সাধারণ জনগণদের হয়রানি করে টাকা দাবী করতো। এখন সেই পুরোনো আশঙ্কার সঙ্গে যুক্ত হবে ডিজিটাল আলামতের নতুন জগৎ। কারও নামে ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট খুলে মাদক কেনাবেচার বার্তা পাঠানো, তার মোবাইল ফোন বা অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে কথোপকথন তৈরি করা, সম্পাদিত স্ক্রিনশট দেখানো কিংবা তার নম্বর ব্যবহার করে অন্য কেউ যোগাযোগ করলে- এসবের কোনটি সত্য, কোনটি সাজানো, তা নির্ধারণের আগেই একজন মানুষ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য মামলার আসামি হয়ে যেতে পারেন।
যে দেশে ডিজিটাল ফরেনসিক ব্যবস্থার স্বাধীনতা, আলামতের ধারাবাহিক সংরক্ষণ বা ‘চেইন অব কাস্টডি’, তদন্তকারী সংস্থার জবাবদিহি এবং পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এখনো প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়, সেখানে শুধু ডিজিটাল যোগাযোগের অভিযোগের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের দরজা খুলে দেওয়া ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষত যখন প্রকৃত মাদক উদ্ধার করাই বাধ্যতামূলক নয়, তখন তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, জব্দ করা ফোন এবং প্রশ্নবিদ্ধ ডিজিটাল তথ্যই একজন মানুষের জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান নির্ধারণ করতে পারে।
আমরা এর আগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, আইনটি সাইবার অপরাধ ও অপপ্রচার দমনের উদ্দেশ্যে তৈরিকৃত হলেও, এর অস্পষ্ট ও বিস্তৃত ধারায় সাংবাদিক, লেখক, মানবাধিকারকর্মী এবং সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে অগণিত হয়রানিমূলক মামলা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এর অধীনে শত শত মানুষের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের তথ্য নথিবদ্ধ করেছিল। অনেক ক্ষেত্রে বিচার নয়; মামলা, গ্রেপ্তার, কারাবাস এবং বছরের পর বছর আদালতপাড়ায় ঘোরানোই হয়ে উঠেছিল শাস্তি।
নতুন মাদক আইনের ক্ষেত্রেও একই মডেল ফিরে আসতে পারে। তবে এবার পরিণতি হতে পারে আরও ভয়ংকর। কারণ এখানে অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মৃত্যুদণ্ডের আতঙ্ক। ক্ষমতাসীনদের জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে একটি কথিত ডিজিটাল আলাপ বা লেনদেনের অভিযোগই যথেষ্ট হয়ে উঠতে পারে। বিরোধী দলের স্থানীয় নেতা, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী, অনুসন্ধানী সাংবাদিক কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা কোনো নাগরিককে প্রথমে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার এবং পরে ডিজিটাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত দেখানো অসম্ভব কোনো দৃশ্যপট নয়। ২০১৮ সালের মাদকবিরোধী অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে শত শত কথিত মাদক কারবারি নিহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অন্তত ৩৭৩টি মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করে অনেক ঘটনাকে সম্ভাব্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্তের দাবি জানিয়েছিল। অতএব “মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” ঘোষিত হলেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ন্যায়সংগতভাবে ব্যবহৃত হবে বাংলাদেশের ইতিহাস এমন নিশ্চয়তা দেয় না।
এই আইন পাস হবার ফলে এখন মাদকের মামলায় একটি সাজানো ডিজিটাল আলামত, মিথ্যা সাক্ষ্য কিংবা ত্রুটিপূর্ণ তদন্তের ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেলে রাষ্ট্র নিজের ভুল আর ফিরিয়ে নিতে পারবে না।
জাতিসংঘ স্পষ্টভাবে বলেছে, Poorly designed drug policy also harms other human rights. মাদকসংক্রান্ত অপরাধ মৃত্যুদণ্ড দেবার মত গুরুতর অপরাধের সীমার মধ্যে পড়ে না। মৃত্যুদণ্ড মাদক পাচার অন্য শাস্তির তুলনায় বেশি প্রতিরোধ করে এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণও নেই। সুতরাং, শাস্তির নিষ্ঠুরতা নয়, বরং অপরাধী শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আসার নিশ্চয়তাই কার্যকর প্রতিরোধ তৈরি করে। অথচ সহজ সমাধান হিসেবে মৃত্যুদণ্ড সামনে আনা হলে মূল হোতারা আড়ালে থেকে যাবে, আর ধরা পড়বে দরিদ্র বাহক, ক্ষুদ্র বিক্রেতা কিংবা ফাঁসানো মানুষ।
জাতীয় সংসদ ও সরকারের উচিত হবে আইনটি পুনর্বিবেচনা করা। শুধু ডিজিটাল কথোপকথনের ভিত্তিতে অভিযোগ গ্রহণ না করে প্রকৃত মাদক জব্দ, আর্থিক লেনদেন কিংবা স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত একাধিক প্রমাণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। ডিজিটাল ডিভাইস জব্দের জন্য আদালতের পূর্বানুমতি, স্বাধীন ফরেনসিক পরীক্ষা, আলামত সংগ্রহের ভিডিও রেকর্ড এবং মিথ্যা আলামত তৈরির জন্য তদন্ত কর্মকর্তার কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শুধুমাত্র মাদক সংক্রান্ত গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ডের মত শাস্তি রাখা যেতে পারে।
