লোকাল বাস, ট্রেন বা মেট্রোতে আমরা প্রায়ই একটি ভুল ধারণা শুনি—সংরক্ষিত সিট বা নারীদের জন্য আলাদা বগি থাকলে নাকি বাকি সব সিট ও বগি পুরুষদের জন্য। বাস্তবতা হলো সব সাধারণ সিট ও বগি নারী-পুরুষসহ সবার জন্য। তার মধ্যে কয়েকটি সিট বা একটি বগি বিশেষভাবে নারীদের জন্য রাখা হয়, যাতে যাত্রাপথে নিরাপত্তা, স্বস্তি এবং ন্যূনতম প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা যায়। এই সাধারণ ধারণাটুকু সমাজের বড় অংশের মাথায় এখনো ঢোকে না—এটাই দুঃখজনক। কিন্তু আরও দুঃখজনক হলো, যখন একজন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, নারীদের জন্য কিছু বিনামূল্যে হলে পুরুষদের জন্য কেন নয়।
এই প্রশ্নটি শুনতে আপাতদৃষ্টিতে সমতার কথা মনে হলেও, আসলে এটি সমতা (equality) ও ন্যায্যতার (equity) মৌলিক পার্থক্য বুঝতে ব্যর্থ হয়। সমাজে সবাই একই জায়গা থেকে দৌড় শুরু করে না। বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোতে ছেলে ও মেয়ের প্রতি পারিবারিক বিনিয়োগ, সামাজিক প্রত্যাশা এবং স্বাধীনতার সুযোগ দীর্ঘদিন ধরেই অসম। অনেক পরিবার এখনো মনে করে ছেলে শিক্ষিত হয়ে চাকরি করবে, সংসারের দায়িত্ব নেবে; আর মেয়ে বিয়ে হয়ে “পরের ঘরে” চলে যাবে। ফলে মেয়েদের শিক্ষায় বিনিয়োগকে অনেক সময় প্রয়োজনীয় নয়, বরং অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে দেখা হয়। এই চিন্তা কেবল দরিদ্র পরিবারের সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক মানসিকতা।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৮ নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করে। কিন্তু সংবিধান শুধু কাগজে সমতা ঘোষণা করেই থেমে থাকে না। একই অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে নারী, শিশু এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগও দেয়। কারণ রাষ্ট্র জানে, ঐতিহাসিক ও সামাজিক বৈষম্য থাকলে কেবল “সবাই সমান” বললেই সমতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। যাদের পিছিয়ে রাখা হয়েছে, তাদের এগিয়ে আনতে অতিরিক্ত সহায়তা প্রয়োজন। একে বলা হয় ইতিবাচক বৈষম্য বা positive discrimination ।
নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন, চাকরিতে নারী কোটা, শিক্ষা বৃত্তি, অবৈতনিক শিক্ষা বা নিরাপদ যাতায়াত—এসব কোনো “অতিরিক্ত সুবিধা” নয়। এগুলো হলো অসম বাস্তবতায় ন্যায্য সুযোগ তৈরির নীতি। বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রেই এর ফল দেখা যায়। প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক হবার আগে নারীশিক্ষার হার ২৫-৩০% হলেও, বর্তমানে প্রাথমিকে নারীশিক্ষার্থীর হার ৫১%। তবে এখনো স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে নারী শিক্ষার হার ৩৬-৩৮%। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নারীদের ঝরে পড়ার হার বেশি। এর পেছনে আছে বাল্যবিবাহ, পারিবারিক নিরাপত্তা-ভীতি, যাতায়াত সমস্যা, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক সংকট এবং কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা।
তাই নারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে আমাদের জিজ্ঞেস করা উচিত—নারীরা কি সত্যিই একই সামাজিক নিরাপত্তা, একই পারিবারিক স্বাধীনতা, একই শিক্ষার পরিবেশ, একই কর্মক্ষেত্র, একই রাস্তাঘাট এবং একই গণপরিবহন পায়? উত্তর যদি না হয়, তাহলে “পুরুষদের জন্য কেন নয়” প্রশ্নটি সমতার প্রশ্ন নয়; এটি বৈষম্যের ইতিহাস অস্বীকার করার প্রশ্ন।
রাষ্ট্রের কাজ সবাইকে একই মাপে মাপা নয়; রাষ্ট্রের কাজ হলো সবার জন্য ন্যায্য সুযোগ তৈরি করা। যে সমাজে নারীরা প্রতিদিন শিক্ষা, চলাচল, নিরাপত্তা ও কর্মক্ষেত্রে কাঠামোগত বাধার মুখে পড়ে, সেখানে নারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা কোনো দয়া নয়, কোনো অনুগ্রহ নয়—এটি সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং সামাজিক ন্যায়ের অপরিহার্য শর্ত।
