দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বহু মানুষ যখন বন্যা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের সঙ্গে লড়ছেন, তখন জাতীয় পরিসরে এ দুর্যোগ নিয়ে প্রত্যাশিত আলোচনা, উদ্বেগ ও নাগরিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িসহ সাত জেলায় বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। দশ লাখের বেশি মানুষ আটকা পড়েছেন এবং প্রায় ২ লাখ ৬৮ হাজার পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সেনা ও নৌবাহিনী খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী পৌঁছালেও সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হচ্ছে। রাজধানীর বাইরে ঘটছে বলেই কোনো দুর্যোগ কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দেশের একটি অঞ্চলের মানুষ যখন পানিবন্দী, তখন তাদের উদ্ধার ও পুনর্বাসন পুরো রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।
অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড় আকারের তহবিল সংগ্রহ, সমন্বিত স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর দৃশ্যমান তৎপরতা তুলনামূলকভাবে কম। অতীতে দেশের বিভিন্ন দুর্যোগে শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সাধারণ নাগরিকদের দ্রুত চাঁদা সংগ্রহ এবং ত্রাণ নিয়ে ছুটে যেতে দেখা গেছে। এবার সেই সামাজিক আলোড়ন এখনো তৈরি হয়নি। যদিও সরকার ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসামগ্রী ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে, কিন্তু শুধু সংবাদ সম্মেলন কোনো দুর্যোগকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করে না। কোথায় কত মানুষ আটকা পড়েছেন, কোন ইউনিয়নে খাদ্যসংকট তীব্র, কোথায় উদ্ধারকারী নৌকা প্রয়োজন এবং কোন আশ্রয়কেন্দ্রে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেই এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। জাতীয় গণমাধ্যমে বিশেষ বুলেটিন, যাচাইকৃত ত্রাণতালিকা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় যোগাযোগব্যবস্থাও চালু করা জরুরি।
বর্তমান দুর্যোগকে শুধু অতিবৃষ্টির ফল হিসেবে দেখলে বড় একটি সত্য উপেক্ষিত থেকে যাবে। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। নদী, খাল, বিল, হাওর ও জলাভূমিই এ ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক পানি ধারণ ও নিষ্কাশনব্যবস্থা। কিন্তু কয়েক দশক ধরে দখল, ভরাট, অপরিকল্পিত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ, আবাসন প্রকল্প, পলি জমা এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অসংখ্য জলপথ সংকুচিত বা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, খাল ও জলাভূমি দখল, বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল ভরাট এবং অপর্যাপ্ত নিষ্কাশনব্যবস্থা জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ। চট্টগ্রামেও খাল দখল, অবৈধ স্থাপনা, পলি জমা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে কয়েক ঘণ্টার টানা বা মাঝারি বৃষ্টিতেই পানি দ্রুত নদী কিংবা নিম্নভূমিতে নামতে পারে না এবং বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ বা প্লাবিত হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরকারের দেশব্যাপী নদী-নালা ও খাল খনন এবং পুনঃখনন কর্মসূচি প্রশংসনীয়। প্রথম পর্যায়ে ৫৪ জেলায় এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল, নালা, জলাধার ও জলাশয় খনন বা পুনঃখনন করা। কৃষিতে সেচসুবিধা বৃদ্ধি, বর্ষার পানি নিষ্কাশন এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ তিন ক্ষেত্রেই এ উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি সুফল দিতে পারে।
তবে খাল খনন যেন কেবল মাটি কাটা, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ না থাকে। স্থানীয় ভূপ্রকৃতি, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের জোয়ার-ভাটার বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে বৈজ্ঞানিকভাবে কাজ করতে হবে। খননের পর পুনর্দখল ঠেকানো, খালে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা, নিয়মিত পলি অপসারণ এবং স্থানীয় জনগণকে তদারকিতে যুক্ত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দখলদার উচ্ছেদ ও রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া পুনঃখনন করা খাল কয়েক বছরের মধ্যেই আবার অকার্যকর হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, খাল খনন ভবিষ্যতের সমাধান; আজকের বন্যার্ত মানুষের জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধার করা প্রয়োজন। তাদের প্রয়োজন খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, শিশুখাদ্য, স্যানিটারি সামগ্রী ও নিরাপদ আশ্রয়। বিশ্ববিদ্যালয়, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক এবং প্রবাসীদের সমন্বয়ে অবিলম্বে জাতীয় ত্রাণ উদ্যোগ গড়ে তোলা দরকার।
