২০১৯ সালের কথা।
বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ শাড়ি নিয়ে পত্রিকায় একটি কলাম লেখেন। শাড়ির স্তুতি গাইতে গিয়ে তিনি এক পর্যায়ে এটিকে ‘পৃথিবীর সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ’ পোশাক হিসেবে আখ্যা দিয়ে বসেন।
ধারণা করা যায়, তিনি নিতান্ত সরলমনেই শাড়ির প্রশংসা করতে গিয়ে এই অতিশয়োক্তি করে ফেলেন, যা অনেক সংবেদনশীল মনেই তীব্র নারীবিদ্বেষী ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ হিসেবে প্রতিভাত হয়।
কেননা তার বক্তব্যের গভীরে লুকিয়ে ছিল এক অস্বস্তিকর সত্য: আমাদের দেশের তথাকথিত প্রগতিশীল পুরুষ বুদ্ধিজীবীরাও নারীর পোশাককে পুরুষের আদিম কামনার বাইরে গিয়ে দেখতে পারেন না।
এই উদাহরণের সারকথা হলো: নারীরা কী পরবেন বা কেমন রূপে নিজেদের উপস্থাপন করবেন, তা নির্ধারণ করার এই যে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, এটি কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক বা আদর্শিক গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
তথাকথিত উদারপন্থী ও উচ্চশিক্ষিত শ্রেণী থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরেই এই পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যবাদের শিকড় সমানভাবে বিস্তৃত।
ইদানীং প্রায়শই ফেসবুকে কিছু পোস্ট ভাইরাল হতে দেখা যায়, যেখানে জয়া আহসানের মতো অভিনেত্রীরা বোটক্স করিয়ে কীভাবে তাঁদের ‘স্বাভাবিক সৌন্দর্য’ নষ্ট করেছেন, তা নিয়ে আক্ষেপের কমতি থাকে না।
কিংবা অনেক পোস্টেই দেখা যায় বলা হচ্ছে, নারীদের মেকআপ ছাড়া থাকা উচিত এবং তথাকথিত ‘প্রাকৃতিক রূপ’ ধরে রাখা উচিত।
যদিও কিছু নারীও এই ধরনের আলোচনায় যোগ দেন (এবং নারী হিসেবে নিজেদের মধ্যে এই নিয়ে কথা বলার পূর্ণ অধিকার তাদের আছে), কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যাবে, এসব আলোচনায় পুরুষদের আধিপত্যই সবচেয়ে বেশি।
তারা যেন নিজেদের নারীর রূপের স্বঘোষিত বিচারক মনে করেন; ভাবখানা এমন যেন নারীর শরীর ও চেহারা কোনো পাবলিক প্রপার্টি।
এই খবরদারি একেক সময় একেক রূপ নেয়।
প্রগতিশীল পুরুষরা নারীদের পুঁজিবাদ আর ভোগবাদী সংস্কৃতি বর্জনের ছবক দেন এবং রূপচর্চা বা কসমেটিক সার্জারির বিরোধিতা করেন।
পুঁজিবাদবিরোধী এমন সমালোচনা অবশ্যই যৌক্তিক হতে পারে, কিন্তু যখন সেটি নারীর নিজের শরীরের ওপর তার অধিকার ও সিদ্ধান্তকে খর্ব করার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা আর প্রগতিশীল থাকে না।
অন্যদিকে, রক্ষণশীল পুরুষরা ঐতিহ্য আর ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীর স্বাধীন ইচ্ছাকে শিকল পরাতে চান।
উভয় মানসিকতার ফলাফল কিন্তু একই: কোনো পক্ষই নারীকে নিজের রূপ বা পোশাকের ব্যাপারে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ন্যূনতম অধিকারটুকু দিতে রাজি নয়; যেন প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য পুরুষদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
ঠিক একই মানসিকতার প্রতিফলন আবারো দেখা গেল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরকে কেন্দ্র করে।
আমরা দেখলাম, তার স্ত্রী জোবাইদা রহমান শাড়ির বদলে সালোয়ার-কামিজ পরায়, পুরুষদের একটি বড় অংশ এ নিয়ে এক চরম অর্থহীন বিতর্কে মেতে উঠেছে।
পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য কোন মাত্রায় পৌঁছালে এমন ক্ষোভের জন্ম হতে পারে, তা এই বিতর্কের ঝড়ের গতি দেখেই বোঝা যায়।
এই বিতর্কের সবচেয়ে কৌতুকপূর্ণ দিক হলো এর ভেতরের প্রচ্ছন্ন ধারণাটি: একজন নারী কোথাও যাওয়ার সময় কী পোশাক পরবে, তা জনসমক্ষে ব্যবচ্ছেদের বিষয় হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী যেহেতু পুরুষ, তাই তার পোশাক উপযুক্ত ছিল কি না, তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। তার পোশাকের সাংস্কৃতিক প্রভাব কী, তা নিয়ে কোনো বিতর্ক হয়নি। কিন্তু যত নজরদারি আর জাতীয় সমালোচনা, সব গিয়ে পড়ল একজন নারীর পোশাকের উপর।
এসব সস্তা বিতর্ক আসলে নারী, সংস্কৃতি বা জাতীয় পরিচয় সম্পর্কে কোনো গভীর বার্তা দেয় না। যা প্রকাশ করে তা হলো পুরুষদের একাংশের সেই আদিম অহংকার, যা তাদের বিশ্বাস করায় যে নারীর বাহ্যিক রূপ নিয়ে রায় দেওয়ার জন্মগত অধিকার রয়েছে তাদের।
এটি কেবল ফ্যাশন বা সৌন্দর্যের বিতর্ক নয়; এটি ক্ষমতার লড়াই। কে গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করবে, কার কথা শেষ কথা হবে — লড়াইটা আসলে সেই কর্তৃত্বের।
এর চেয়েও বড় সংকট হলো, এই আলোচনাগুলো নারীর কাছ থেকে তার অত্যন্ত মৌলিক একটি অধিকার কেড়ে নেয়: নিজের শরীরের ব্যাপারে নিজেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার।
একজন নারী শাড়ি পরবে না সালোয়ার-কামিজ, মেকআপ করবে নাকি করবে না, সেটি সম্পূর্ণই তার নিজস্ব পছন্দ। এর পেছনে তার ব্যক্তিগত, সাংস্কৃতিক, ব্যবহারিক বা নান্দনিক কারণ থাকতে পারে। এর জন্য সে জনসাধারণের কাছে কোনো ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য নয়।
তাই সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, এই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা যখন সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের মোড়কে নিজেদের উপস্থাপন করে।
পুরুষরা ‘আমাদের ঐতিহ্য’-এর দোহাই দিয়ে বোঝাতে চায় যে, নারীর পোশাকের পছন্দের ওপর নাকি জাতীয় বা সভ্যতার মান-মর্যাদা নির্ভর করছে!
এভাবে তারা নারীকে একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে না দেখে, ‘ঐতিহ্য’, ‘আধুনিকতা’ বা ‘সাংস্কৃতিক গৌরব’-এর মতো কিছু বিমূর্ত ধারণার প্রতীক বানিয়ে ফেলে।
নারী তখন আর রক্তমাংসের মানুষ থাকে না, হয়ে ওঠে পুরুষদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় সংকটের এক একটি পুতুল।
এই ধরনের আলোচনা-সমালোচনার চরিত্র বদলাতে পারে — আজ শাড়ি, কাল সালোয়ার-কামিজ, পরশু মেকআপের ধরন — কিন্তু পুরুষদের অবচেতন মনের সেই আদিম মানসিকতা একই থাকে: নারীর প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য পুরুষের সিলমোহর বা অনুমোদন লাগবে।
সেই অনুমোদন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য নাকি স্বাভাবিক সৌন্দর্যের নামে চাওয়া হচ্ছে, তাতে এর মূল রূপটি বদলে যায় না। তা চিরকালই আধিপত্যকামী।
এর সমাধান স্রেফ পুরুষদের উচিত জবাব দেওয়া হতে পারে না। কারণ এসব জবাবে তারা থোড়াই কেয়ার করে।
বরং এখন সময় এসেছে তাদের এই অযাচিত বিতর্ককে পাত্তাই না দেওয়ার। নারীদের কারও কাছে নিজের রূপ বা পোশাকের ন্যায্যতা প্রমাণের কোনো প্রয়োজন নেই। তাদের পছন্দ একান্তই তাদের নিজস্ব।
যতদিন না পুরুষরা নারীর শরীরকে পাবলিক প্রপার্টি বা মন্তব্য করার চারণভূমি ভাবা বন্ধ করছে, ততদিন এই ক্লান্তিকর ও বিরক্তিকর বিতর্ক চলতেই থাকবে।
তাই লড়াইটা এই নিয়ে হওয়া উচিত নয় যে নারীরা কী পরবে; লড়াইটা হওয়া উচিত এই ধারণাকে ছুড়ে ফেলার, যেটি মনে করে নারীর পোশাকের ব্যাপারে অন্য কারও নাক গলানোর অধিকার আছে।
জান্নাতুল নাঈম পিয়াল একজন লেখক ও সাংবাদিক। বর্তমানে কর্মরত আছেন দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায়। যোগাযোগ করতে পারেন jn.pieal@gmail.com ঠিকানায়।
