সাম্প্রতিক সময়ে দেশে কন্যাশিশুর ওপর ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে এমন কোনো না কোনো নৃশংসতার খবর আসে, যা শুধু একটি পরিবারকেই নয়, গোটা সমাজকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। শিশুরা যখন ঘরে, প্রতিবেশির বাসায়, রাস্তায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, এমনকি পরিবারের মানুষের কাছেও নিরাপদ নয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে মেয়েরা কোথায় নিরাপদ?
একটি কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিয়ে বাবা-মায়ের যে আতঙ্ক, তা কোনো বিচ্ছিন্ন পারিবারিক উদ্বেগ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিফলন। সন্তান স্কুলে গেল কি না, কোচিং থেকে ফিরল কি না, বাইরে খেলতে গেল কি না এসব স্বাভাবিক বিষয়ও আজ অনেক পরিবারের কাছে দুশ্চিন্তার কারণ। যে সমাজে শিশুর স্বাধীন চলাফেরা ভয়ের মধ্যে আটকে যায়, সেই সমাজের আইনশৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচারের অবস্থা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হয়।
এসব ঘটনার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। একের পর এক ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের খবর আসে, কিছুদিন জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়, গণমাধ্যমে আলোচনা হয়, প্রশাসন আশ্বাস দেয়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায়। তদন্তের দুর্বলতা, আদালতের জট, সাক্ষী সুরক্ষার অভাব, প্রভাবশালী মহলের চাপ এবং আপিল প্রক্রিয়ার দীর্ঘ বিলম্ব—সব মিলিয়ে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পাওয়ার আগেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
ইতোপূর্বে আছিয়ার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাও সারা দেশে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলেও সেই রায় এখনো কার্যকর হয়নি; উচ্চ আদালতে আপিল ঝুলে আছে। এমন উদাহরণ জনমনে হতাশা তৈরি করে। সাধারণ মানুষ যখন দেখে আলোচিত মামলাতেও চূড়ান্ত বিচার নিশ্চিত হতে দীর্ঘ সময় লাগে, তখন বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। আর এই আস্থাহীনতা অপরাধীদের জন্যও এক ধরনের সুযোগ তৈরি করে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আসামি গ্রেপ্তার করা নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন একটি বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের তদন্ত দ্রুত, সঠিক ও প্রমাণনির্ভরভাবে সম্পন্ন হবে; বিচার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হবে; এবং রায় চূড়ান্ত হলে তা কার্যকর হবে। বিচার বিলম্বিত হলে ন্যায়বিচারও বিলম্বিত হয়, আর বিলম্বিত ন্যায়বিচার অনেক সময় ন্যায়বিচারহীনতার সমান হয়ে দাঁড়ায়। ন্যায়বিচার হতে হবে আইনের শাসন, প্রমাণ, সাক্ষ্য ও যথাযথ প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। কিন্তু যথাযথ প্রক্রিয়ার নামে বছরের পর বছর মামলা ঝুলিয়ে রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধে রাষ্ট্রকে দৃশ্যমানভাবে কঠোর, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে।
কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু শাস্তির ভয় যথেষ্ট নয়; প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে শিশু সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। থানায় অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে মেডিকেল পরীক্ষা, ফরেনসিক প্রতিবেদন, সাক্ষী সুরক্ষা এবং আদালতে বিচার—প্রতিটি ধাপে ভুক্তভোগীবান্ধব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
কন্যাশিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে এই নৃশংসতা থামবে না। তাই প্রতিটি শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং চূড়ান্ত রায় কার্যকর করার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রকে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে।
