শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশের ডানপন্থী পপুলিস্টদের অনেকেই শরীয়াহ আইনের কথা বলছেন। কেউ কেউ আবার ঘুরে ফিরে সেই নারীদেরই পোশাকের দোষ দিচ্ছেন। অথচ একই সময়ে কিংবা পূর্বে বহু মাদ্রাসায় নারী ও পুরুষ শিশু ধর্ষিত হয়েছে, খুন হয়েছে মাদ্রাসার শিক্ষকদের হাতে যারা কিনা নিজেরাই শরীয়াহ আইন চান। যাহোক, শরীয়াহ আইন যদি প্রয়োগ হয় তাহলে শিশু রামিসার এই কেস এর ধর্ষণের বিচারই হতো না। কেননা ৪ জন পুরুষ সাক্ষীর প্রয়োজন হতো যারা এই ঘটনা সচক্ষে দেখেছেন এবং রামিসা বেচে থাকলে উল্টো রামিসারই শাস্তি হতো যিনার দায়ে।
বাংলাদেশে ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের সংকট কোনো ধর্মীয় আইন না থাকার সংকট নয়। এটি মূলত আইনের প্রয়োগ, বিচারব্যবস্থার ধীরগতি, পুলিশি ব্যর্থতা, সামাজিক ক্ষমতার অসমতা, ভিকটিম ব্লেমিং সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতির সংকট। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই মৃত্যুদণ্ড। তারপরও ধর্ষণ বন্ধ হয়নি। কারণ সমস্যা শুধু শাস্তির মাত্রায় নয়; সমস্যা বিচার পাওয়ার পথে।
শরীয়াহ আইনের পক্ষে যারা কথা বলেন, তাদের অনেকেই বলেন, কঠোর শাস্তি থাকলে ধর্ষণ কমে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়। শরীয়াহ আইনে ধর্ষণের দুইটি কাঠামো রয়েছে। ইসলামি ফিকহে ধর্ষণ মূলত দুইভাবে বিচার হয়:
১. হুদুদ – কোরআন ও হাদিস দ্বারা নির্ধারিত নির্দিষ্ট শাস্তি (১০০ বেত্রাঘাত, পাথর নিক্ষেপে মৃত্যু, মৃত্যুদণ্ড)। প্রমাণের শর্ত কঠোর: ৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক, ন্যায়পরাযণ, মুসলিম পুরুষ সাক্ষী যারা সরাসরি যৌনাঙ্গর মিলন প্রত্যক্ষ করেছেন (সূরা আন-নূর ৪:১৩), অথবা অভিযুক্তের চারবার পৃথক স্বীকারোক্তী।
২. তাজির – বিচারকের বিবেচনাধীন শাস্তি। এখানে DNA, ফরনসিক রিপোর্ট, একজন ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য, পরিস্থিতিগত প্রমাণ – সবই গ্রহণযোগ্য। শাস্তি বেত্রাঘাত থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ এটি প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার মতই যেখানে বিচারক তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার সাথে এর পার্থক্য হলো বিচার নির্দিষ্ট আইনী কাঠামোতে পড়ে না, বিচার ও শাস্তি সম্পূর্ণরূপে বিচারকের বিবেচনা নির্ভর।
বাস্তবতা হলো – হুদুদের ৪ সাক্ষীর শর্ত পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। কোন ধর্ষক প্রকাশ্যে ৪ জনের সামনে অপরাধ করে? উল্লেখ্য, কিছু আধুনিক আলম (যেমন ইউসুফ আল-কারদওয়ি) ধর্ষণকে “হিরবা” (সশস্ত্র ডাকাতি/সমাজবিরোধী অপরাধ) হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করার পক্ষে যাতে ৪ সাক্ষীর শর্ত প্রযোজ্য না হয়। কিন্তু এই ব্যাখ্যা সর্বজনস্বীকৃত নয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গাটি হলো—কঠোর হুদুদ ব্যাখ্যার অধীনে বহু ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নিজেই অপরাধী হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন। যদি ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণ করা না যায়, তবে অভিযোগকারী নারীর বক্তব্যকে কখনও কখনও যিনার স্বীকারোক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিভিন্ন মুসলিমপ্রধান দেশে অতীতে এমন একাধিক ঘটনা আলোচনায় এসেছে, যেখানে ধর্ষণের অভিযোগকারী নারীই উল্টো শাস্তির মুখে পড়েছেন। সৌদি আরব, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সুদান, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের কিছু ঘটনা এই বাস্তবতার নির্মম উদাহরণ হিসেবে বারবার আলোচিত হয়েছে। যেমনঃ
- সৌদি আরব – “কতিফ গার্ল” (২০০৬): ১৯ বছর বয়সী এক শিয়া নারী ৭ জনের গণধর্ষণের শিকার হন। আদালত ধর্ষকদের পাশাপাশি ভুক্তভোগীকেও প্রথমে ৯০, পরে ২০০ বেত্রাঘাত ও ৬ মাস কারাদণ্ড দেয় কারণ তিনি অপরিচিত পুরুষের সাথে গাড়িতে ছিলেন এবং পরে মিডিয়ায় কথা বলেছিলেন। আন্তর্জাতিক চাপের পর রাজা আবদুল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন।
- পাকিস্তান – সাফিয়া বিবি (১৯৮৩): দৃষ্টিপ্রতিবন এক কিশোরী গৃহকর্ত ও তার ছেলের দ্বারা ধর্ষিত হয়ে সন্তান জন্ম দেন। সেই সন্তানই হয়ে দাঁড়ায় তার বিরুদ্ধে “প্রমাণ”। যিনার দায়ে ৩ বছর কারাদণ্ড ও ১৫ বেত্রাঘাত। পরে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদে মুক্তি পন।
- পাকিস্তান – মুখতারান মই (২০০২): গ্রামীণ পঞ্চায়েতের (জিরগা) নির্দেশে গণধর্ষণর শিকার হন এক নারী – তার ভাইয়ের অপরাধের “শাস্তি” হিসেবে। Human Rights Commission of Pakistan-এর তথ্য অনুযায়ী, Hudood Ordinance চলাকলে (১৯৭৯-২০০৬) কারাগারে থাকা প্রায় ৮০% নারী ছিলেন এই আইনের শকার।
- সুদান – ইনতিসর শরাফ আদ্দিন (২০১২): ১৬ বছরের কিশোরী ধর্ষণের অভিযোগ করায় তাকেই পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
- আফগানিস্তান – গুলনাজ কেস (২০০৯): এক নারী চাচাতো ভাইয়ের স্বামীর দ্বারা ধর্ষিত হয়ে গর্ভবতী হন। অভিযোগ জানালে তাকেই ১২ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয় “ব্যভিচরের” দায়ে। কারাগারে সন্তান জন্ম দেন। মুক্তির পর — ধর্ষককে বিয়ে করতে বলা হয়।
- ইন্দোনেশিয়া (আচেহ, ২০১৪): ২৫ বছর বয়সী এক বিধবা নারী ৮ জনের গণধর্ষণের শিকার হন। ধর্ষকদের পাশাপাশি তাকেও ৯ বার বেত্রাঘত করা হয় (খালওয়াত আইন লঙ্ন)।
- সংযুক্ত আরব আমিরাত – মারত দাইবিচ (২০১৩): নরওয়েজিয়ান এই নারী দুবাইয়ে ব্যবসায়িক সফর গিয়ে সহকর্মীর দ্বারা ধর্ষিত হন। অভিযোগ করায় তাকেই ১৬ মাস কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এই উদাহরণগুলো দেখায়, আইন যতই “কঠোর” হোক, যদি তার প্রমাণ কাঠামো ভুক্তভোগীর পক্ষে না দাঁড়ায়, যদি বিচারব্যবস্থা শ্রেণি, লিঙ্গ, জাতিগত পরিচয় ও ক্ষমতার দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাহলে সেই আইন ভুক্তভোগীর জন্য নিরাপত্তা নয়, বরং আরেকটি শাস্তির ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীদের অভিজ্ঞতা। এই বিষযটি যারা শরীয়াহ চাইছেন, তাদের সবচেয়ে আগে পড়া উচিত। কারণ এটি দূর কোনো দেশের গল্প নয়, এটি আমাদেরই বোন, মা, প্রতিবেশীর গল্প।
শরীয়াহ আইন যেখানে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ, সেখানে বাংলাদেশের দরিদ্র নারী শ্রমিকদের একটি বড় অংশ নির্যাতন, ধর্ষণ, বন্দিত্ব, বেতন না পাওয়া, পাসপোর্ট জব্দ, শারীরিক সহিংসতা ও আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন বলে বহু প্রতিবেদন উঠে এসেছে। ১৯৯১ সাল থেকে প্রায় ৩,০০,০০০ বাংলাদেশি নারী সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গেছেন।  তাদের অভিজ্ঞতা ভয়ংকর। ২০১৯ সালের আগস্ট যখন একই দিনে অস্বাভাবিকভাবে বহু নারী দেশে ফিরে আসেন, সরকার তদন্তে দেখা যায় – ১১১ জন ফেরত আসা নারীর মধ্যে ৩৮ জন তাদের মালিকদের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছিলেন।  অর্থাৎ প্রতি ৩ জনে ১ জন। ২০১৯ সালের প্রথম নয় মাসেই মধ্যপ্রাচ্যে ১০০-এর বেশি বাংলাদেশি গৃহকর্মীর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৩৬ জন আত্মহত্যা করেছেন।  গত চার বছরে সৌদি আরবে ৬৬ জন নারী কর্মীর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৫২ জনই আত্মহত্যা করেছেন।  প্রায় ৯০-৯৫% ক্ষেত্রে কর্মীদের পাসপোর্ট মালিকরা জব্দ করে রাখেন, ফলে তারা মূলত জোরপূর্বক দাসত্বে আবদ্ধ থাকেন। 
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিছু বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হলোঃ
🔸 আবিরন বেগম (খুলনা, ২০১৯): ৪০ বছর বয়সী এই নারী ২০১৭ সালে সদি গিয়েছিলেন। ৮ সদস্যের একটি সৌদি পরিবারে তাকে অকল্পনীয় নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। মালিকরা তাকে খাবার দিত না, মারধর করত, শরীরে গরম পানি ঢেলে দিত, এমনকি তার মাথা গ্রিলে ঢুকিয়ে রখত।  তার মৃতদেহ ৭ মস সৌদি মর্গে রাখার পর দেশে ফেরত পাঠানো হয়। এটি বিরল ঘটনা — সৌদি আদালত মালিক আযশা আল-জিজানিকে মৃত্যুদণ্ড দেয। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শাকিরল ইসলাম বলেন, “আমি বহ বছর অভিবাসন ক্ষেত্রে কাজ করছি, কন্তু এমন রায় কখনো শুনিন।” 
🔸 উম্মে কুলসুম (১৪ বছর, ২০২০): মাত্র ১৪ বছর বয়সে এই কিশোরীকে রিক্রুটিং এজেন্সি M/H Trade International সৌদি পাঠিয়েছিল। সখানে মালিকের অত্যাচারে তার মৃত্যু হয়। 
🔸 টি. আক্তার (ঢালপুর, ২০১৮): ২৮ বছর বযসী এই নারীকে হায়েল শহরে গৃহকর্মী হিসেবে পাঠানো হয়। তিনি ছাদে কাপড় শুকাতে গেলে মালিকের স্ত্রী তাকে ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। তার দই পা ভেঙে যায়। ভাঙা পা নয়েই তাকে একটি ঘরে আটক রেখে ধর্ষণ করা হয়, এবং কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। 
🔸 রিমা (২০২৬): এতিমখানায় বড় হওয়া এই নারীকে চালক ধর্ষণ করে, এবং পরে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। মালিক তার বিরুদ্ধে চুরির মিথ্যা মামলা করায় তাকে ৫ মাস কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জেলে তাকে মারধর ও ইলকট্রিক শক দেওয়া হয়। মেডিকেল টস্টে দেখা যায় সে গর্ভবতী। দেশে ফিরে এসে সে বলে – “আমি বেচে ফিরেছি। কিন্তু এই সন্তান নিয়ে কীভাবে বাঁচব? কে আমাকে গ্রহণ করবে?” 
🔸 ৩১ বছর বয়সী এক নারী (২০২৬): গহকর্মীর কাজের কথা বলে নিয়ে যাওয়া হলেও তাকে প্রথমে মরুভূমিতে ছাগল চরাতে বাধ্য করা হয়। পরে এক ঘরে আটকে রেখে ৫-৭ জন পুরুষ প্রতিদিন তাকে ধর্ষণ ও নির্যাতন করে। 
যদি শরীয়াহ আইন নিজে নিজেই নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করত, তাহলে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া বাংলাদেশি নারীরা এত ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হতেন কেন? কেন অনেক ক্ষেত্রে তারা বিচার পান না? BRAC-এর অভিবাসন কর্মসূচির শরিফুল ইসলাম হাসান জানান: “আমি একটি ঘটনাও পাইনি যেখানে মালিকদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তাই সৌদি মালিকরা মনে করে – এই কর্মীদের সাথে তারা যা খুশি তাই করতে পারে, কোনো পরিণতি ছাড়াই।” এসব ক্ষেত্রে বিচার না পাওয়ার কয়েকটি কারণঃ
• পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে গেলে ভাষার সমস্যা। ভুক্তভোগীরা এতটাই ট্রমাটইজড হন যে দ্রুত দেশে ফিরতে চান, দীর্ঘ মামলায় ঝুলে থাকার মতো অবস্থায় থাকেন না। ফলে প্রায়ই অপরাধীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। 
• কাফালা ব্যবস্থা — কর্মী মালিকের কাছে আইনিভাবে “বাঁধা”। মালিকের অনুমতি ছাড়া চাকরি ছাড়া বা দেশ ত্যাগ করা যয় না।
• পাসপোর্ট জব্দ — পালানোর কোনো উপায় নেই।
• ৪ সাক্ষীর শর — বদ্ধ ঘরে ধর্ষণের সাক্ষী কথায়?
• জাতিগত-শ্রেণিগত বৈষম্য — সৌদি আদালতে দরিদ্র দক্ষিণ এশীয় নারীর সাক্ষ্যের ওজন প্রায় শূন্য।
যদি শরীয়াহ আইন সত্যিই ধর্ষণ থেকে নারীকে রক্ষা করত, তাহলে সৌদি আরবে – যেখানে শরীয়াহ পূর্ণমত্রায় চালু – কেন প্রতি ৩ জনে ১ জন ধর্ষিত? কেন মালিকদের শাস্তি হয় না? এখানেই শরীয়াহ-স্লোগানের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। আইন ধর্মীয় নাম পেলেই বিচার নিশ্চিত হয় না। বিচার নিশ্চিত হয় তখনই, যখন ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে পারেন, পুলিশ মামলা নিতে বাধ্য থাকে, মেডিকেল পরীক্ষা দ্রুত হয়, ফরেনসিক প্রমাণ সংরক্ষিত হয়, সাক্ষী সুরক্ষিত থাকে, আদালত দ্রুত শুনানি করে এবং অপরাধী ক্ষমতাবান হলেও শাস্তি পায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ছেলে শিশুদের যৌন নির্যাতন। বাংলাদেশের জনপরিসরে ধর্ষণ নিয়ে আলোচনা প্রায়ই নারী ও কন্যাশিশুকেন্দ্রিক থাকে। সেটি অবশ্যই জরুরি, কারণ নারী ও কন্যাশিশুর ওপর যৌন সহিংসতা ভয়াবহ মাত্রায় রয়েছে। কিন্তু ছেলে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতাও বাস্তব এবং অনেক ক্ষেত্রেই অস্বীকার করা হয়। বিশেষ করে মাদ্রাসা, আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কর্মক্ষেত্র বা পরিবার—এমন বহু জায়গায় ছেলে শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হতে পারে। কিন্তু সামাজিক লজ্জা, পরিবারের সম্মান, “ছেলে শিশুর কিছু হয় না” ধরনের বিপজ্জনক ধারণা এবং ধর্মীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্বের ভয়ে এসব ঘটনা প্রায়ই চাপা পড়ে যায়। পুরুষ শিশু ধর্ষণ শরীয়াহ আইনে “লিওয়াত” (সমকামী যৌনাচার) ক্যটাগরিতে পড়ে। কিন্তু মাজহাবভেদে মতামত ভিন্ন: হানাফি মাজহাবে একে সাধারণত হুদুদ অপরাধ হিসেবে না দেখে তাজিরের আওতায় বিচারকের বিবেচনাধীন শাস্তির বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবে এই অপরাধের জন্য অত্যন্ত কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে—কোথাও পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড, কোথাও সরাসরি মৃত্যুদণ্ড।
শরীয়াহ আইন প্রচলিত আছে এমন কিছু দেশে ছেলেশিশুকে যৌন নির্যাতনের বাস্তব চিত্রঃ
- আফগানিস্তান – বাচা বজি: পুরুষ শিশুদের নারী সাজিয়ে নাচ ও যৌন দাসত্বের প্রথা যুদ্ধবাজ কমান্ডার ও ক্ষমতাশালীদের মধ্যে এখনও প্রচলত। নিউইয়র্ক টাইমসের ২০১৫-এর রিপোর্টে প্রকাশ – মার্কিন সেনাদের এই অপরাধ “উপেক্ষা করতে” বলা হয়েছিল।
- পাকিস্তান: SPARC ও Sahil-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী দৈনিক গড়ে ১১টি শিশু যৌন নির্যাতন ঘটে। মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ছেলে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ প্রচুর – কিন্তু সামাজিক কলঙ্ক, পরিবারের সম্মান, ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের ভয়ে ৯০%-এর বেশি ঘটনা রিপোর্টই হয় না।
- ইরান: ২০১৪ সালে কোম শহরের এক প্রভাবশালী আলেমের বিরুদ্ধে একাধিক মাদ্রাসা ছাত্র যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আনে। ৪ সাক্ষীর অভাবে অভিযোগ খারিজ।
- সৌদি আরব: ছেলে শিশু ধর্ষণে তাত্ত্বিকভাবে মৃত্যুদণ্ড, কিন্তু পারিবারিক বা গোত্রভিত্তিক মীমাংসায় দিয়া (রক্তমূল্য) পরিশোধে অপরাধী মুক্তি পেতে পারে। ধনী ধর্ষক টাকা দিয়েই বেঁচে যায়।
বাংলাদেশের মাদ্রাসায়ও ছেলে শিশু নির্যাতনের একাধিক ঘটনা নিয়মিতভাবে গণমাধ্যমে আসে। কিন্তু ডানপন্থী শরীয়াহ চাওয়া ব্যক্তিরা আবার এই ব্যাপারে নিরব ভূমিকা পালন করেন। যারা শরীয়াহ আইনের নামে ধর্ষণের বিচার চান, তাদের উচিত প্রথমেই মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের শিশু সুরক্ষা কাঠামো নিয়ে কথা বলা। শরীয়াহ আইন নিয়ে আলোচনাও একরৈখিকভাবে করা উচিত নয়। মুসলিম আইনচিন্তার ভেতরেও সংস্কারপন্থী বহু চিন্তাবিদ বলেছেন, ধর্ষণকে যিনা হিসেবে নয়, সহিংসতা, জবরদস্তি ও সামাজিক নিরাপত্তার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে দেখা উচিত। সংস্কারপন্থী মুসলিম আইনবদরা – যেমন খালেদ আবু এল ফাদল, আমিনা ওয়াদুদ, কেসিয়া আলি – এর পক্ষে যুক্তি দেন:
• DNA ও ফরেনসিক প্রমাণকেই আধুনিক “সাক্ষী” ধরা উচিত
• ধর্ষণকে যিনা নয়, হিরাবা (সমাজবিরোধী সহিংস অপরাধ) হিসেবে বিচার করা উচিত
• ভুক্তভোগীকে শাস্তি দেওয়া মাকাসিদ আশ-শরীয়াহ (শরীয়াহর মূল উদ্দেশ্ — জীবন, সম্মান, ন্যায়বিচার রক্ষা) এর সম্পূর্ণ বিরোধী
বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যে সংস্কারের পথে হাঁটছে। যেমনঃ
- তিউনিসিয়া (২০১৭): Law on Eliminating Violence Against Women পাস। ধর্ষককে বিয়ে করে রক্ষা পাওয়ার বিধান বাতিল।
- মরক্কো (২০১৪): ১৬ বছরের আমিনা ফলালির আত্মহত্যার পর ধর্ষককে বিয়ে দেওয়ার আইন বাতিল।
- পাকিস্তান (২০০৬): Women Protection Act – ধর্ষণ Zina Ordinance থেকে আলাদা, DNA ও ফরেনসিক এভিডেন্স গ্রহনযোগ্য।
- জর্ডান (২০১৭): Article 308 বাতিল।
কিন্তু সৌদি আরব, ইরান, তালেবান-আফগানিস্তান, সুদান, ব্রুনাই, নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলে ধর্ষণের হার কমেছে এমন কোনো প্রমাণ নেই। বরং UN Women ও Human Rights Watch বলছে – এসব দেশে আন্ডাররিপোর্টিং অনেক বেশি, এবং ভুক্তভোগীরা চুপ থাকতে বাধ্য।
অনেকে বলেন, “কঠোর শাস্তি দিলেই অপরাধ কমবে।” কিন্তু আইনবিজ্ঞানের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, শাস্তির মাত্রার চেয়ে শাস্তির নিশ্চয়তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি ধর্ষক জানে যে মামলা হবে না, পুলিশ টাকা খাবে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো যাবে, প্রমাণ নষ্ট করা যাবে, ভুক্তভোগীকে সামাজিকভাবে চুপ করানো যাবে, তাহলে মৃত্যুদণ্ড থাকলেও সে ভয় পাবে না। আবার যদি সে জানে অভিযোগ হলেই দ্রুত তদন্ত হবে, ডিএনএ পরীক্ষা হবে, সাক্ষী সুরক্ষা থাকবে, আদালত দ্রুত বিচার করবে এবং প্রভাবশালী হলেও ছাড় পাবে না—তখন আইন কার্যকর প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে। ধর্ষণ একটা আইন প্রয়োগ ও সংস্কৃতির সমস্যা, ধর্মীয় শূন্যতার নয়। উন্নত সামাজিক নিরাপত্তার দেশগুলোতে আইনের প্রয়োগ ও বিচার দ্রুত হওয়ায় সামাজিক নিরাপত্তা বেশি। ধর্ষণের হার কমাতে যেসব পদ্ধতি সত্যিই কাজ করে:
• দ্রুত বিচার (ফাস্ট ট্র্যাক টইব্যুনাল)
• বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ ব্যবস্থা (DNA, ফরেনসিক ল্যাব)
• ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা ও সাক্ষী সুরক্ষা
• নারী পুলিশ ও নারী বিচরক
• পুলিশি জবাবদিহি
• প্রাথমিক স্কুল থেকে শিশু সুরক্ষা শিক্ষা
• ধর্ষণ-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সমাজিক লড়াই
• মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা প্রটোকল
• ধর্ষণের জন্য ধর্ষকেই দায়ী করার বদলে ভিকটিম ব্লেমিং সংস্কৃতি বর্জন
শরীয়াহ চালু করে দিলেই ধর্ষণ বন্ধ হবে – এই বিশ্বাস ইতিহাস, পরিসংখ্যান ও তথ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। সবচেয়ে বড় প্রমাণ আমাদের নিজের দেশের দরিদ্র বোনেরা- যারা শরীয়াহর জন্মভূমি সৌদি আরবে গিয়ে ধর্ষিত হয়ে ফিরছেন, এবং বিচার পাচ্ছেন না। বাংলাদেশের শিশু ধর্ষণের ভয়াবহতা থামাতে দরকার কার্যকর ও দ্রুত বিচার ব্যবস্থা, পুলিশি সংস্কার, সামাজিক সচেতনতা ও রাজনৈতক সদিচ্ছা – শরীয়াহর নামে আবেগী রাজনীতি নয়।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড আছে। কিন্তু এই শাস্তি কার্যকর হয়েছে খুব কম ব্যক্তির। সম্প্রতি রামপুরায় মাদ্রাসায় পুরুষ শিশু ধর্ষণের ঘটনায় যে ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছেন সে পুর্বেও একাধিকবার এমন অপরাধ করেছেন বলে জানা যায়। অর্থাৎ এসব অপরাধের জন্য পূর্বে তার কোন শাস্তি হয়নি, আইনের প্রয়োগ হয়নি। ফাক ফোকর গলে অপরাধী বেরিয়ে গেছে। এই সুযোগ বন্ধ করতে হবে। ডানপন্থী যারা শরীয়াহ আইন চাইছেন তারা একজোট হয়ে মাদ্রাসাগুলোতে নজর দিন, দেখুন বন্ধ করতে পারেন কিনা। আর বাকিরা আসুন আলাপ করি আইন ও তার প্রয়োগের দুর্বলতাগুলো কোথায়। বাংলাদেশের ধর্ষণ আইনে পুরুষ শিশুর ধর্ষণ অন্তর্ভূক্ত না। এই সকল দুর্বলতা নিয়ে আমাদের কথা বলা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সমস্যা হলো, আমরা প্রতিটি ভয়াবহ ঘটনার পর শাস্তির ভাষায় উত্তেজিত হই, কিন্তু বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কাজ করি না। রামিসার মতো শিশুর মৃত্যু আমাদের কাঁদায়, ক্ষুব্ধ করে। কিন্তু এই ক্ষোভ যদি কেবল শরীয়াহ বনাম অশরীয়াহ বিতর্কে আটকে যায়, তাহলে আসল প্রশ্ন হারিয়ে যাবে: কেন শিশু নিরাপদ নয়? কেন ধর্ষক আগেও অপরাধ করে পার পায়? কেন প্রতিষ্ঠানগুলো জবাবদিহির বাইরে থাকে? কেন ভুক্তভোগী পরিবার মামলা চালাতে পারে না? কেন পুলিশ ও আদালত দ্রুত, সংবেদনশীল ও কার্যকর হতে পারে না? রামিসার জন্য ন্যায়বিচার চাইলে আমাদের এই কঠিন, দীর্ঘ, বাস্তব লড়াইয়ে নামতে হবে। আবেগী স্লোগান নয়—দরকার কার্যকর বিচার-ব্যবস্থা।
