বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখকে প্রায়ই ঋতুচক্রের নবায়নের এক প্রাচীন, অরাজনৈতিক উদযাপন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু এর রঙিন শোভাযাত্রা ও লোকসংগীতের আড়ালে লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক অর্থের এক গভীর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ক্ষেত্র। ঐতিহাসিকভাবে মুঘল সম্রাট আকবরের সময় থেকে কৃষিভিত্তিক ছন্দে প্রোথিত এই বাংলা নববর্ষ আধুনিক রাজনীতিতে জন্ম নেয়নি, এবং এটি কখনোই কেবল নগরকেন্দ্রিক প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তবে এটিকে একটি জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতীকে রূপান্তর করার প্রক্রিয়াটি রাষ্ট্রের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
পহেলা বৈশাখের উৎপত্তি মূলত ষোড়শ শতাব্দীর মুঘল সম্রাট আকবর-এর শাসনামল। তিনিই কৃষিভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থাকে কার্যকর করার জন্য বাংলা অঞ্চলে “ফসলি সন” চালু করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল কৃষি উৎপাদন চক্রের সঙ্গে খাজনা আদায়ের সময়সূচি সমন্বয় করা। ফলে নববর্ষের ধারণাটি মূলত প্রশাসনিক হলেও, তা দ্রুতই গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। গ্রামীণ ধারাবাহিকতা যা শতাব্দী জুড়ে চলে আসছে, তন্মধ্যে অন্যতম- হালখাতা খোলা (ব্যবসায়িক হিসাবের নবায়ন) , বৈশাখী মেলা , লোকসংগীত, পালাগান, গ্রামীণ উৎসবসমূহ ইত্যাদি। এসব প্রথার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা প্রমাণ করে এটি একটি অর্গানিক কালচারাল ইভ্যুলুশন, কোনো আধুনিক রাজনৈতিক উদ্ভাবন নয়। তবে এর একটা আধুনিক নগর সংস্করণ আবার আছে যেটা কিনা আংশিক না কখনও কখনও পুরোটাই রাজনৈতিক।
ঢাকাকেন্দ্রিক যে “পহেলা বৈশাখ”—যা আমরা আজ দেখি—তার বিকাশ মূলত বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে। সর্বপ্রথম ছায়ানট ১৯৬০-এর দশকে রমনা বটমূলে নববর্ষ উদযাপন শুরু করে। এটি ছিল পাকিস্তানি শাসনের সাংস্কৃতিক দমননীতির বিরুদ্ধে এক প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ। এরপর ১৯৮৯ সালে চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় “মঙ্গল শোভাযাত্রা” শুরু করে—যা পরবর্তীতে এই উৎসবের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে ওঠে।
কেউ কেউ মনে করেন, এই সংস্কৃতি বাংলাদেশে সক্রিয় হবার পেছনে এরশাদের প্রচ্ছন্ন প্ররোচনা আছে, কেউ কেউ তো মনে করেন বাংলাদেশের ভূখন্ডে এই সংস্কৃতির “পরিচয় করিয়েছে” এরশাদ তাঁর রাজনৈতিক স্বার্থে, তবে এই ব্যাপারটা ঐতিহাসিকভাবে অসত্য।
বরং তিনি একটি বিদ্যমান সাংস্কৃতিক ধারাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দৃশ্যমান ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করেছেন, সেকথা কিন্তু সর্বৈব সত্য। সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে, যিনি কিনা বৈধতার সংকটে ভুগছিলেন, তিনি সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতাকে একটি কৌশলগত হাতিয়ার নিয়ে আবির্ভূত হন। তিনি যখন ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে রাষ্ট্রের কাঠামোকে ইসলামায়িত করছিলেন, তখন একইসাথে বাংলা সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিকেও জোরদার করছিলেন। এই দ্বৈততা কোনো বিরোধ ছিল না-এটি ছিল একটি হিসেবি পদক্ষেপ। এই প্রেক্ষাপটে পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে রাষ্ট্র-সমর্থিত এক কোমল বৈধতার প্রতীক। তবে সিমবলিক ব্যালেন্স তথা প্রতীকী ভারসাম্য রক্ষায় এই উৎসবের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ কিংবা পৃষ্ঠপোষকতার পেছনে এরশাদের সংস্কৃতি নিয়ে রাজনীতি ছিল বটে।
১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এরশাদের শাসনামলকে বুঝতে হলে তার রাজনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে বিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিভঙ্গীর দিকে নজর দিতে হবে। সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করাতে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক বৈধতা তথা গণতান্ত্রিক বৈধতার সংকটে ভোগে এরশাদ এবং স্বভাবতই বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ক্রমাগত চাপ তাঁকে অনুভব করেতেই হতো। এই প্রেক্ষাপটে, রাষ্ট্রকে একটি গ্রহণযোগ্য “চেহারা” দেওয়া ছিল তার জন্য অপরিহার্য। এবং ফলতই, দ্বৈত কৌশলের আশ্রয় নিলো এরশাদ- ধর্মীয় কিছু সংস্কার দিয়ে ধর্ম নিয়ে চিন্তা করা মানুষদের ও সাংস্কৃতিক সংস্কার এনে সাংস্কৃতিক মানুষদের এক রকম নাগালে রাখার চেষ্টা। অন্য ভাষায় বলতে, Dual legitimacy strategy। একদিকে তিনি ধর্মভিত্তিক জনমতকে আকর্ষণ করে নিজের কাছে টানবার জন্য ১৯৮৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করলেন আবার অন্যদিকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতার স্বার্থে জাতীয় উৎসবগুলোর দৃশ্যমানতা বাড়াবার যথাসম্ভব ব্যবস্থা নিলেন। এই দুইয়ের সমন্বয়কে বলা যায় সিম্বোলিক ব্যালেন্সিং- যেখানে রাষ্ট্র বিভিন্ন পরিচয়কে একসাথে ব্যবহার করে নিজেকে টিকিয়ে রাখে।
পহেলা বৈশাখের কৌশলগত ব্যবহার কীভাবে করেছেন তিনি? রাষ্ট্রীয় মিডিয়ায় কৃষ্টি- সংস্কৃতির প্রচার বৃদ্ধি, সরকারি পর্যায়ে উদযাপনকে উৎসাহদান ও প্রণোদনার ব্যবস্থা কররে এবং নগর মধ্যবিত্তের মধ্যে সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি করে পহেলা বৈশাখের কৌশলগত ব্যবহার করেছেন তিনি। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বৈশাখ কোনো “ নিজেদের উদ্ভাবন করা প্রথা তথা নয়, বরং এরিক হবসব্যমে্র ভাষায় একটি “recontextualized tradition”- যেখানে পুরনো ঐতিহ্যকে নতুন রাজনৈতিক অর্থ দেওয়া হয়।
পরবর্তী দশকগুলোতে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের শাসনামলে, সাংস্কৃতিক ক্ষমতার একটি সুসংহতীকরণ দেখা যায়। সাংস্কৃতিক হেজেমনিকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে আওয়ামী লীগ (২০০৯–২০২৪) ছিল সিদ্ধহস্ত। দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনামলে আওয়ামী লীগ একটি সুসংগঠিত সাংস্কৃতিক কাঠামো তৈরি করে। তাঁরা এসেই বৈশাখের মতো উৎসবগুলোর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের পদক্ষেপ নেয়। ফলে, রাষ্ট্রীয় ক্যালেন্ডারের অন্যতম প্রধান অনুষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পায় এই উৎসব। টেলিভিশন, কর্পোরেট স্পনসরশিপ, জাতীয় সম্প্রচার সবই ছিল পহেলা বৈশাখকে ঘিরে। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো-তে “মঙ্গল শোভাযাত্রা”-র অন্তর্ভুক্তি এক ভিন্ন মাত্রা এনে দেয় বৈশাখ উৎসবকে, স্থানীয় উৎসব পায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
এ্যান্টোনিও গ্রামস্কির-এর ধারণা অনুযায়ী রাষ্ট্র কেবল রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক আধিপত্যও প্রতিষ্ঠা করে , সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় প্রভাব বিস্তার করলেও অনেকটা করতলগতো রাখা যায় সুবিশাল এক কমিউনিটি, যাদের কিনা জনসাধারণের কাছে দারুণ রকম গ্রহণযোগ্যতা থাকে, একই সাথে থাকে জনমতকে প্রভাবিত করার জাদুকরী এক ক্ষমতা। শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের মতাদর্শিক সাযুজ্যতা মতের প্রান্তিকী করণেও ভূমিকা রাখে। ফলত, একটি ডমিন্যান্ট কালচারাল ন্যারেটিভ তৈরি হয়—যেখানে- বাঙালিত্ব মানেই অসাম্প্রদায়িকতা উৎসবে অংশগ্রহণই রাজনৈতিক অবস্থান। আর চুপিসারে, পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে- অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ (Secular nationalism) এর প্রতীক। Vis-à-vis ধর্মীয় রাজনীতির বিপরীতের এক অবস্থান কিংবা মুক্তিযুদ্ধ-ভিত্তিক জাতীয় পরিচয়ের অংশ। প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা, গণমাধ্যমের সম্প্রসারণ এবং ইউনেস্কোর মতো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মাধ্যমে এই উৎসবটি অসাম্প্রদায়িক বাঙালি পরিচয়ের এক সূচকে পরিণত হয়।
কিন্তু পহেলা বৈশাখ কি একটি “Political Phenomenon”? পহেলে বৈশাখ কি বিশেষ কোনো রাজনৈতিক বার্তা বহন করে? প্রশ্নটি তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি বহুমাত্রিক রাজনৈতিক অর্থ বহন করে। এই প্রশ্ন জাতিকে চরম সংকটপূর্ণ এক দ্ব্যর্থক দ্বন্দ্বে্র উপকূলে এনে হাজির করে- জাতিগত পরিচয় (বাঙ্গালী) বনাম ধর্মীয় পরিচয় (মুসলিম) এবং এই প্রশ্নই রাষ্ট্রীয় বয়ানে “আমরা কারা”?- প্রশ্নের উত্তর নির্মাণ করে।
উৎসবটি উদযাপন করা লোকেরা একটি বার্তা নিয়ে আবির্ভূত হয়: আমরা উদার; আমরা সংস্কৃতিমনা; আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক। এটি একধরনের সিম্বোলিক কমিউনিকেশন যেখানে কার্যক্রমের মাধ্যমে মতাদর্শ প্রকাশ পায়। অন্য ভাষায়, এটাই পলিটিকাল সিগন্যালিং। আর ইলেক্টোরাল সাইকোলজির বিবেচনায় নিলে শহুরে শিক্ষিত ভোটাররা সাংস্কৃতিক ইঙ্গিতে প্রভাবিত হয় এবং শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা অপিনিয়ন লিডার্স হিসেবে কাজ করে অন্যের তথা জনসাধারণের চিন্তা-চেতনাকে প্রভাবিত করবার বাকি কাজটা তারাই করে। ফলে এটি সরাসরি ভোট না আনলেও বা সরকারি দলের অনুকূলে সরাসরিভাবে কিছু না করলেও ন্যারেটিভ তৈরিতে এ ঠিকই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রায়শই মতাদর্শগত ধারার সাথে সংযুক্ত, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই বয়ানকে আরো শক্তিশালী করে।
আর কারো কারো তো আবার ইসলামপন্থীরা এই বুঝি ক্ষমতা নিয়ে নিলো আর সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা কাঠগড়ায় দাঁড়ালো এমন চিন্তায় নিদ্রা যায় যায় অবস্থা। শিল্পীগোষ্ঠী সেই রাজনৈতিক শক্তির দিকেই ঝুঁকবে, যারা তাদের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল রক্ষা করতে পারবে। আজ পহেলা বৈশাখ কেবল একটি উৎসব নয়; এটি একটি অর্থবহ সংকেত-ক্ষেত্র- একটি স্থান যেখানে জাতির বিভিন্ন কল্পনা মঞ্চস্থ ও আলোচিত হয়। এটি অন্তর্ভুক্তি, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সাংস্কৃতিক শিকড়ের বার্তা দেয়, কিন্তু একইসাথে মতাদর্শগত সীমারেখাও নির্ধারণ করে।
তবে বর্তমান বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য পীর হানজালার মন্দির উন্নয়নে পুরোহিতদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার মতো ঘটনা হয়তো বৈশাখে বিরোধী দলীয় পক্ষের প্রচ্ছন্ন সমর্থন বা কোনো বাঁধা পূর্ণ আচরণ না আসবারই ইঙ্গিত। তবে যদি আবার বর্তমান সরকার দলীয় দল-বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি- পহেলা বৈশাখকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে চায়, তাহলে এটি কেবল একটি উৎসব আয়োজন নয়—বরং একটি সিম্বোলিক রিপজিশিনিং।
সম্ভাব্য ফলাফল কি হতে পারে? সরকারের ইমেইজ রিব্র্যান্ডিং। বি এন পি-র দেশীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতি নিয়ে খুব একটা মাথা-ব্যাথা নাই, এমন ধারণা দুর্বল হবে। তবে রক্ষণশীল কেউ কেউ আবার ব্যাপারটা ভালোভাবে না ও নিতে পারেন। তবে নিউট্রাল কালচারাল ক্লাসকে কে নিজেদের দিকে টানতে পারবে দলটি, তা এক- প্রকার নিশ্চিতভাবেই বলা যেতে পারে। অর্থাৎ, এখন পর্যন্ত নিরপেক্ষ কিংবা পুরোনো আওয়ামী পন্থী শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং ভেঙ্গে যাবে কালচারাল মনোপলি, বিপদে পড়বে আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক আধিপত্য। আওয়ামী ঘরানার লোকজনই সংস্কৃতি লালন করতো বা আওয়ামী সরকারই সংস্কৃতিমনা ছিল, এমন একপাক্ষিক ধারণার শিকলে হাতুড়ি পড়বে নিশ্চিত।
আর সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা চিন্তা করলে , আমাদের নিজস্ব রক্ষণশীল সমর্থকগোষ্ঠীর বিরূপ প্রতিক্রিয়া আশা করাই যায়। আবার কারো কারো মনে হতে পারে সন্দেহের উদ্রেক, এক কথায়- অথেনটিসিটি ক্রাইসিস। সত্যিকারের পরিবর্তন, নাকি কৌশলগত অভিনয়? এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি আর এই নয় যে রাজনৈতিক দলগুলো পহেলা বৈশাখ উদযাপন করবে কিনা, বরং তারা কতটা আন্তরিকভাবে এর অর্থকে ধারণ করতে পারে। যদি বিএনপির মতো একটি দল এই উৎসবকে গ্রহণ করতে চায়, তবে তা কেবল একটি অনুষ্ঠান আয়োজন নয়—বরং জাতীয় কল্পনায় তাদের প্রতীকী অবস্থান পুনর্নির্ধারণের প্রচেষ্টা।
শেষ পর্যন্ত, পহেলা বৈশাখ আর কেবল “নতুন বছর” নয়। এটি এখন একটি প্রশ্ন—বাংলাদেশ কী বা কোন ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করবে, তা নির্ধারণ করবে কে?
