নিয়াজ মাহমুদ সাকিব
বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন পুরোনো মানচিত্র হঠাৎ অচল হয়ে পড়ে। গত
তিন দশক ধরে বিশ্বায়নের যে কাঠামো আমরা দেখেছি – যেখানে উৎপাদনের কেন্দ্র ছিল মূলত চীন,
আর বাজার ছিল পশ্চিমা দেশগুলো- সে কাঠামোই এখন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। এক সময় যে বৈশ্বিক
সরবরাহ ব্যবস্থা ছিল পরস্পরনির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে, আজ সেটিই নতুন করে ভেঙে সাজানো হচ্ছে।
এই পুনর্গঠনের কেন্দ্রে আছে একটি শব্দ- ডিকাপলিং।
ডিকাপলিং বলতে বোঝায় অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত নির্ভরতা কমিয়ে দুটি বৃহৎ অর্থনীতির আলাদা
পথে হাঁটা। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই শব্দটি আলোচনায় এসেছে। কিন্তু
এই বিচ্ছিন্নতার ঢেউ শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে পুরো বিশ্বের ওপর।
উৎপাদন, প্রযুক্তি, বাণিজ্য- সব ক্ষেত্রেই নতুন এক ভূরাজনীতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে সাপ্লাই চেইন
শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং কৌশলগত নিরাপত্তার অংশ।
এই পরিবর্তনের সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার একটি উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানও
নতুন করে আলোচনায় আসছে। প্রশ্নটি তাই সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ- এই নতুন সাপ্লাই চেইন
রাজনীতিতে বাংলাদেশ কি কেবল দর্শক হয়ে থাকবে, নাকি সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে নতুন
উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে?
ডিকাপলিং: বিশ্ব অর্থনীতির নতুন অভিধান
একসময় বিশ্বায়নের মূল দর্শন ছিল আন্তঃনির্ভরতা। ধারণাটি ছিল সহজ- যতো বেশি দেশ পরস্পরের
ওপর নির্ভর করবে, ততো কমবে সংঘাত, বাড়বে সমৃদ্ধি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বিশ্বাসে
ফাটল ধরেছে।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে শুরু হওয়া বাণিজ্য যুদ্ধ প্রথম বড় সংকেত দেয়। এরপর
প্রযুক্তি খাতে নিষেধাজ্ঞা, বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, পরিস্থিতিকে
আরও জটিল করে তোলে, সঙ্গে যুক্ত হয় কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা। অনেক দেশ বুঝতে পারে
যে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য উৎপাদনে একক দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
ফলে এখন বিশ্বজুড়ে নতুন একটি চিন্তা ছড়িয়ে পড়ছে- ঝুঁকি কমাতে উৎপাদনের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য
প্রয়োজন। অর্থাৎ একই দেশে সবকিছু উৎপাদনের বদলে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দেওয়া।
এই প্রক্রিয়াকেই অনেকে বলছেন economic decoupling, আবার কেউ কেউ বলছেন de-risking।
নাম যাই হোক, বাস্তবতা হলো- বিশ্ব অর্থনীতির পুরোনো সরল রূপরেখা এখন বদলে যাচ্ছে।
সাপ্লাই চেইনের নতুন ভূরাজনীতি
এই পরিবর্তনের ফলে বিশ্বে কয়েকটি নতুন প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
প্রথমত, China + 1 strategy। অর্থাৎ, চীনে উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও কোম্পানিগুলো একটি
বিকল্প দেশ খুঁজছে। এতে কোনো সংকট তৈরি হলে পুরো উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে না।
দ্বিতীয়ত, friend-shoring- অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে উৎপাদন ও
সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করা।
তৃতীয়ত, near-shoring- যেখানে কোম্পানিগুলো বাজারের কাছাকাছি উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন
করছে।
এই নতুন প্রবণতার ফলে বিশ্বজুড়ে কিছু দেশ দ্রুত গুরুত্ব পাচ্ছে। ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে
ইলেকট্রনিকস উৎপাদনে বড় ভূমিকা নিচ্ছে। ভারত প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে নতুন বিনিয়োগ টেনে
আনছে। মেক্সিকো উত্তর আমেরিকার বাজারের কাছাকাছি থাকার সুবিধা পাচ্ছে।
অর্থাৎ সাপ্লাই চেইনের নতুন মানচিত্রে নতুন নতুন উৎপাদন কেন্দ্র উঠে আসছে। প্রশ্ন হলো-
এই মানচিত্রে বাংলাদেশের জায়গা কোথায়?
বাংলাদেশের সম্ভাবনা
বাংলাদেশ গত তিন দশকে একটি বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় যে
অর্থনীতি কৃষিনির্ভর ছিল, সেটি এখন ক্রমশ শিল্প ও রপ্তানিনির্ভর হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের
কেন্দ্রবিন্দু নিঃসন্দেহে তৈরি পোশাক শিল্প।
আজ বিশ্বে অন্যতম বৃহৎ গার্মেন্টস রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান
সুপ্রতিষ্ঠিত। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প একটি নির্ভরযোগ্য
সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত।
এই অভিজ্ঞতা নতুন সাপ্লাই চেইন বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য বড় একটি ভিত্তি তৈরি করেছে।
প্রথমত, বাংলাদেশের রয়েছে বিশাল তরুণ শ্রমশক্তি। শ্রম ব্যয়ের তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক
অবস্থান অনেক আন্তর্জাতিক কোম্পানির কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ইতোমধ্যে শিল্প উৎপাদনে বাংলাদেশের একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে- বিশেষ করে
রপ্তানিমুখী শিল্পে।
তৃতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগোলিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ব ও পশ্চিমের বাজারের মাঝামাঝি
অবস্থান অনেক সময় কৌশলগত সুবিধা তৈরি করে।
এই কারনগুলো আমলে নিয়ে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, চীন থেকে কিছু উৎপাদন স্থানান্তরের
ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি সম্ভাব্য গন্তব্য হতে পারে।
তবে সম্ভাবনা আর বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য সবসময়ই বড়।
সীমাবদ্ধতা: সুযোগের সঙ্গে বাস্তবতার হিসাব
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা যতটা উল্লেখযোগ্য, ততোটাই স্পষ্ট এর সীমাবদ্ধতাও।
প্রথমত, অবকাঠামো এখনো বড় একটি চ্যালেঞ্জ। শিল্প উৎপাদনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ,
সুনিপুণ বন্দর ব্যবস্থা এবং দ্রুত পরিবহন নেটওয়ার্ক অপরিহার্য। গত এক দশকে কিছু উন্নয়ন
হলেও আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় এখনো অনেক পথ বাকি।
দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ রয়েছে। আমলাতান্ত্রিক
জটিলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক ধীরগতি অনেক সময় বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে
প্রভাবিত করে।
তৃতীয়ত, দক্ষতার ঘাটতি। আধুনিক উৎপাদন শিল্পে শুধু শ্রমশক্তি থাকলেই হয় না; প্রয়োজন
প্রযুক্তিগত দক্ষতা, গবেষণা সক্ষমতা এবং উদ্ভাবনী পরিবেশ।
বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রাংশ বা প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে প্রবেশ করতে
চায়, তাহলে এই দক্ষতার ভিত্তি তৈরি করা জরুরি।
ভূরাজনীতির ভারসাম্য
ডিকাপলিংয়ের যুগে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কূটনৈতিক ভারসাম্য।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বেশ জটিল। একদিকে চীন অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগে একটি
গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা।
এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ কাজ নয়।
ছোট ও মাঝারি অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এটি একটি সূক্ষ্ম কৌশল। কোনো একদিকে অতিরিক্ত
ঝুঁকে পড়লে অন্য দিকের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাই নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক কৌশলকে আরও সূক্ষ্ম ও
বাস্তববাদী হতে হবে।
নীতিগত প্রস্তুতি: সুযোগকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ
বাংলাদেশ যদি সত্যিই নতুন সাপ্লাই চেইন বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চায়, তাহলে কিছু
নীতিগত পরিবর্তন অপরিহার্য।
প্রথমত, শিল্প বৈচিত্র্য। পোশাক শিল্পের সাফল্য বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ, কিন্তু অতিরিক্ত
নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। ইলেকট্রনিকস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মাসিউটিক্যালস বা
প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, দক্ষতা উন্নয়ন। প্রযুক্তিগত শিক্ষা ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব বাড়ানো
জরুরি। ভবিষ্যতের শিল্প অর্থনীতিতে দক্ষ শ্রমশক্তিই সবচেয়ে বড় সম্পদ।
তৃতীয়ত, লজিস্টিকস ও অবকাঠামো উন্নয়ন। দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ছাড়া
আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনে প্রতিযোগিতা করা কঠিন।
চতুর্থত, নীতিগত স্থিতিশীলতা। বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিগত
পরিবেশ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
এক পরিবর্তনশীল পৃথিবী, এক সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ
বিশ্ব অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে পুরোনো ধারণাগুলো নতুন করে
মূল্যায়িত হচ্ছে। ডিকাপলিং হয়তো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা নয়, কিন্তু এটি নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক
উৎপাদন ও বাণিজ্যের মানচিত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
এই পরিবর্তনের সময় অনেক দেশ নতুন সুযোগ খুঁজে পাচ্ছে। কেউ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, কেউ আবার
সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রস্তুতির অভাবে পিছিয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- এই পরিবর্তনের ঢেউ কি শুধু দূর থেকে দেখে যাবে
সবাই, নাকি তার ওপর ভর করেই নতুন এক অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু হবে বাংলাদেশের?
ইতিহাস আমাদের বারবার দেখিয়েছে যে অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মুহূর্তগুলোই নতুন শক্তির জন্ম
দেয়। যে দেশগুলো সময়মতো প্রস্তুতি নেয়, তারাই ভবিষ্যতের মানচিত্রে নিজেদের জায়গা তৈরি করে।
সাপ্লাই চেইনের নতুন ভূরাজনীতি হয়তো অনিশ্চয়তায় ভরা। কিন্তু অনিশ্চয়তার ভেতরেই কখনো
কখনো সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার বীজ লুকিয়ে থাকে। বাংলাদেশের সামনে সেই সম্ভাবনার দরজাটি হয়তো
ইতোমধ্যেই খুলতে শুরু করেছে। এখন প্রয়োজন দূরদৃষ্টি, পরিকল্পনা এবং সাহসী নীতিগত পদক্ষেপ।
তথ্যসূত্রঃ
Baldwin, R., 2016. The Great Convergence: Information Technology and the New
Globalization. Cambridge, MA: Harvard University Press.
Farrell, H. and Newman, A., 2019. Weaponized interdependence: How global economic
networks shape state coercion. International Security, 44(1), pp.42–79.
Gereffi, G., 2018. Global value chains and development: Redefining the contours of
21st century capitalism. Cambridge: Cambridge University Press.
Gereffi, G., Humphrey, J. and Sturgeon, T., 2005. The governance of global value
chains. Review of International Political Economy, 12(1), pp.78–104.
International Monetary Fund (IMF), 2023. Geoeconomic Fragmentation and the Future
of Multilateralism. Washington, DC: IMF.
Organisation for Economic Co-operation and Development (OECD), 2021. Global Value
Chains: Efficiency and Risks in the Context of COVID-19. Paris: OECD Publishing.
Rodrik, D., 2011. The Globalization Paradox: Democracy and the Future of the World
Economy. New York: W. W. Norton & Company.
The World Bank, 2020. World Development Report 2020: Trading for Development in
the Age of Global Value Chains. Washington, DC: World Bank.
The World Bank, 2023. Bangladesh Development Update: New Frontiers in Growth.
Washington, DC: World Bank.
United Nations Conference on Trade and Development (UNCTAD), 2020. World
Investment Report 2020: International Production Beyond the Pandemic. Geneva:
United Nations.
United Nations Conference on Trade and Development (UNCTAD), 2023. Global Trade
Update. Geneva: UNCTAD.
World Economic Forum, 2023. Chief Economists Outlook: Geoeconomic Fragmentation
and Global Supply Chains. Geneva: World Economic Forum.
