চট্টগ্রামের বর্ষা মানেই এক অদ্ভুত সমীকরণ। পাহাড়, নদী আর সমুদ্রবেষ্টিত এই জনপদের মানুষ বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটায় আশীর্বাদ খোঁজার বদলে এখন আতঙ্কে আকাশের দিকে তাকায়। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চট্টগ্রামের নাগরিক জীবনের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি বিশেষ শব্দ, ‘জলাবদ্ধতা’। তবে ইদানীং এই শব্দটির সমান্তরালে আরেকটি শব্দ বেশ জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে, তা হলো ‘জলজট’। আপাতদৃষ্টিতে শব্দ দুটিকে সমার্থক মনে হলেও এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক বিশাল তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক প্যারাডক্স। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে যখন এই নগরের অলিগলিতে হাঁটি, তখন সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর নীতিনির্ধারকদের আশ্বাসের মাঝে এই দুই শব্দের লড়াইটা বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চট্টগ্রামবাসীর জন্য এটি কেবল সংজ্ঞার লড়াই নয়, বরং অস্তিত্বের এক অমীমাংসিত সংকট। জলজট এবং জলাবদ্ধতার মধ্যকার পার্থক্যটুকু বুঝতে হলে আমাদের চট্টগ্রামের ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটকে নতুন করে দেখা প্রয়োজন।
জলাবদ্ধতা বলতে সাধারণত আমরা বুঝি কোনো একটি স্থানে দীর্ঘ সময় ধরে পানি জমে থাকা, যা সহজে নামছে না। আর জলজট হলো বৃষ্টির পর সাময়িকভাবে পানি জমে যাওয়া, যা ড্রেনেজ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারছে না। চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে ট্র্যাজেডি হলো, এক সময় যা ছিল স্রেফ সাময়িক জলজট, তা এখন স্থায়ী জলাবদ্ধতায় রূপ নিয়েছে। জোয়ার-ভাটার এই শহরে বৃষ্টির পানি নামার স্বাভাবিক পথগুলো যখন রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন সেখানে ‘জট’ আর ‘বদ্ধতা’র পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। চাক্তাই খাল থেকে শুরু করে মহেশখালী প্রতিটি ধমনী আজ পলি আর প্লাস্টিলে রুদ্ধ। ফলে আকাশ থেকে পানি পড়ার আগেই নিচ থেকে জোয়ারের পানি এসে জনপদকে গ্রাস করে নিচ্ছে। এটি কি কেবল প্রকৃতির খেলা, নাকি মানবসৃষ্ট কোনো গোলকধাঁধা?
মানুষ কি কেবল ভুক্তভোগী? না, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার চশমা দিয়ে দেখলে বলতে হয় এই সংকটে আমাদের নিজেদের দায়ও কম নয়। সম্প্রতি চট্টগ্রামের নর্দমাগুলো পরিষ্কার করতে গিয়ে যে দৃশ্য দেখা গেছে তা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। টন টন প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন, ছেঁড়া আসবাবপত্র আর গৃহস্থালি বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে ড্রেনগুলো। মানুষ যেন নালাকে ময়লা ফেলার ডাস্টবিন বানিয়ে ফেলেছে। এই সচেতনতার অভাব নিয়ে অতি সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান। তিনি পয়েন্ট অফ অর্ডারে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রামের মানুষের কষ্টের চিত্র তুলে ধরে বলেন, চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সমস্যা জলাবদ্ধতা। এই মুহূর্তে চট্টগ্রামের মানুষ পানিতে ভাসছে। সাধারণ মানুষ যাদের বাসা ছিল না তাদের জীবন আসলেই আক্ষরিক অর্থে পানিতে ভাসছে এবং আমাদের পানি গলা পর্যন্ত। পুরো চট্টগ্রাম জুড়ে। মানুষ ভাবতে শুরু করেছে যে চট্টগ্রামের এই সমস্যার কোনদিন সমাধান হবে ন। তিনি ড্রেনে বর্জ্য ফেলার ভয়াবহতা এবং জনসচেতনতার অভাবকেও এই সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
অথচ এই চরম বাস্তবতাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করার এক চেষ্টা আমরা লক্ষ্য করি। গত ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এক বিবৃতিতে দাবি করেন যে চট্টগ্রামে আসলে কোনো জলাবদ্ধতাই হয়নি। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতার খবর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও কাল্পনিক। ২০২৪ সালের ছবি ছড়িয়ে দিয়ে একটি অপপ্রচার চালানো হয়েছে। ৫টি স্থানে জলজট হয়েছিল, জলাবদ্ধতা নয়। এই পানির উচ্চতা প্রতিমন্ত্রীর এই ‘জলজট’ তত্ত্ব চট্টগ্রামের কোমর পানিতে ডুবে থাকা মানুষের কাছে এক বড় প্যারাডক্স। যখন হাঁটু সমান পানি ডিঙিয়ে মানুষকে কর্মস্থলে যেতে হয়, তখন সরকারি নথিতে তাকে ‘জলজট’ হিসেবে চিহ্নিত করা এক প্রকারের ডিজিটাল সান্ত্বনা বৈকি।
আবার এই পুরো প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েনও কম নয়। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সমন্বয়হীনতার বিষয়টি বারবার সামনে আনছেন। প্রকল্পের ভুল ত্রুটি নিয়ে তিনি সরাসরি আঙুল তুলেছেন বিগত সরকারের পরিকল্পনার দিকে। মেয়র সম্প্রতি এক বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেছেন, আওয়ামী লীগ এই প্রজেক্টটি ভুল জায়গায় দিয়ে গেছে, এটা ঠিক করার চেষ্টা চলছে।
তাঁর মতে, চট্টগ্রামের ড্রেনেজ সিস্টেমের মাস্টারপ্ল্যান না মেনে অপরিকল্পিতভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে যা এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চসিক মেয়রের এই দাবি সত্য হলে বুঝতে হবে আমরা গত এক দশকে কেবল পানির ওপর টাকার বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কোনো টেকসই সমাধান খুঁজিনি।
সংসদ সদস্যের এই উদ্বেগের রেশ ধরে খোদ জাতীয় সংসদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও চট্টগ্রামবাসীর এই দুর্ভোগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্পের সীমাবদ্ধতাগুলো অনুধাবন করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এটার সলিউশন দিবেন বলে আশ্বাসও দিয়েছেন। সরকার প্রধানের এই সরাসরি হস্তক্ষেপ ও আশ্বাসের বাণী চট্টগ্রামবাসীর মনে কিছুটা হলেও আশার আলো সঞ্চার করেছে। তবে এই আশ্বাসকে বাস্তবে রূপ দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
প্যারাডক্সটি আরও ঘনীভূত হয় যখন আমরা পাহাড় কাটার প্রসঙ্গটি আনি। চট্টগ্রামের প্রাণ এই পাহাড়গুলো এখন ক্ষতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড় কাটার ফলে যে বালু নিচে নেমে আসে তা সরাসরি গিয়ে পড়ে শহরের ড্রেন এবং নালায়। ফলে ড্রেন পরিষ্কার করার কয়েক দিনের মাথায় তা আবার ভরাট হয়ে যায়। এই বালু ও পলি অপসারণের জন্য প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হয় কিন্তু সমস্যার মূলে হাত দেওয়ার সাহস বা সদিচ্ছা কোনোটিই চোখে পড়ে না। পাহাড় রক্ষা না করে জলাবদ্ধতা দূর করার চেষ্টা অনেকটা ফুটো বালতিতে পানি ভরার মতো। সাংবাদিকতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বর্ষা এলেই সংস্থাগুলোর মধ্যে একে অপরকে দোষারোপের এক চমৎকার ‘পাসিং দ্য বল’ খেলা শুরু হয়। সিটি কর্পোরেশন বলে সিডিএ-র মেগা প্রকল্পের কারণে পানি নামছে না, আবার সিডিএ বলে ড্রেন পরিষ্কার রাখা সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব। এই প্রশাসনিক রশি টানাটানির মাঝখানে আটকা পড়ে থাকে সাধারণ মানুষের ভাগ্য।
আবার জোয়ার ভাটার বিষয়টি এখানে একটি অনন্য মাত্রা যোগ করে। কর্ণফুলী নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদীর পানি ধারণক্ষমতা কমেছে। ফলে সাগরে জোয়ার এলে সেই পানি খালের মাধ্যমে উল্টো শহরের ভেতর ঢুকে পড়ে। তখন বৃষ্টি না হলেও শহর ডুবে যায়। একে কি আমরা জলাবদ্ধতা বলবো? নাকি প্রকৃতির সাথে আমাদের হঠকারিতার ফল বলবো? চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে যে মাস্টারপ্ল্যানগুলো করা হয়েছে তার অধিকাংশতেই এই প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। খালের দুই পাশে কংক্রিটের দেয়াল তুলে আমরা হয়তো পানিকে শাসন করতে চেয়েছি কিন্তু পানি যে তার নিজস্ব পথ চেনে তা আমরা ভুলে গিয়েছি। খালের স্বাভাবিক প্রবাহ আর মোহনার মুখগুলো রুদ্ধ করে দিয়ে আমরা এক কৃত্রিম জলজট তৈরি করছি যা ক্রমশ স্থায়ী রূপ নিচ্ছে।
এই সমস্যার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও ভয়াবহ। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ যা দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার সেখানে জলাবদ্ধতার কারণে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হয়। ছোট ব্যবসায়ীরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন, মধ্যবিত্তরা তাদের তিলে তিলে গড়া বসতবাড়ি ছেড়ে অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকায় চলে যাচ্ছেন।
চট্টগ্রামের আভিজাত্য হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলো এখন পানির নিচে। মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি তা কেবল একটি শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা। নীতিনির্ধারকরা যখন বলেন সহনশীল মাত্রায় জলজট তখন তারা ভুলে যান যে সাধারণ মানুষের ধৈর্য আর সহ্যের সীমা অনেক আগেই পার হয়ে গেছে।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা এবং উন্মুক্ত নালা-খালে পড়ে মৃত্যুর যে পরিসংখ্যান, তা কেবল একটি সংখ্যা নয় বরং এটি এই শহরের বাসিন্দাদের জন্য এক গভীর ট্র্যাজেডি। ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গত দুই যুগেরও বেশি সময়ে জলাবদ্ধতা, খোলা নালা ও খালের স্রোতে ভেসে গিয়ে চট্টগ্রামে মোট ৬৫ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এই দীর্ঘ তালিকায় রয়েছে শিশু, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে দিনমজুর ও ব্যবসায়ী। এর মধ্যে শুধু গত সাত-আট বছরেই নালা ও খালের অরক্ষিত গর্তে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ জন। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই মৃত্যুর মিছিলের মধ্যে ২০১৫ সালে পাহাড় ধস ও জলাবদ্ধতা সংশ্লিষ্ট ঘটনায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ মারা যান, যার সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ জন। এছাড়া বাকি বছরগুলোতে গড়ে ৩ থেকে ৫ জন মানুষ প্রতি বর্ষায় এই মরণফাঁদে পা দিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। এই ৬৫টি জীবনের অবসান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার সামান্য অবহেলাও কতটা প্রাণঘাতী হতে পারে।
সম্প্রতি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বুয়েটের একজন সাবেক ছাত্র ও বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীর সাথে আলাপকালে উঠে এল এই সংকটের এমন কিছু প্রযুক্তিগত দিক, যা আমাদের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।
সেই প্রকৌশলীর ভাষায়, আমরা যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই যে শহরের সব ড্রেন, সেকেন্ডারি খাল এবং মেইন খালগুলো একদম পরিষ্কার আছে, তবুও চট্টগ্রাম জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে না। এখানে একটি বড় কারিগরি হিসাব আছে যাকে আমরা বলি ‘রিটার্ন পিরিয়ড’। বর্তমান অবকাঠামোতে যদি জোয়ারের সময় ৫ বছর রিটার্ন পিরিয়ডের মাত্র ৩ ঘণ্টার একটি ভারী বৃষ্টি হয়, তবে চট্টগ্রামের অনেক এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবেই। এটি সরাসরি ড্রেনেজ ক্যাপাসিটির সীমাবদ্ধতা। অথচ ট্র্যাজেডি হলো, আমাদের সিস্টেম সেই ক্যাপাসিটির সীমা পর্যন্ত যাওয়ারই সুযোগ পায় না; তার আগেই ময়লা আর পলি দিয়ে নালাগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় আমরা বিদ্যমান সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহারই করতে পারছি না।
এই সক্ষমতা বাড়ানোর জন্যই সিডিএ ৩৬টি খালের মেগা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছিল। কিন্তু প্রকৌশলগত দৃষ্টিতে এখানেও একটি শুভঙ্করের ফাঁকি রয়ে গেছে। চট্টগ্রাম শহরে আসলে খাল ৩৬টি নয়, বরং প্রায় ৫০টি। ফলে প্রকল্পের বাইরে থেকে যাওয়া খালগুলো সমস্যার সমাধানকে অসম্পূর্ণ করে তুলছে। আবার এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় কারিগরি দিকের চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব ছিল প্রকট। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী কাজটি সিটি কর্পোরেশনের করার কথা থাকলেও সেটি চলে যায় সিডিএ-র হাতে, আর বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় সেনাবাহিনীর প্রকৌশল ব্রিগেড। খালের মুখে রেগুলেটর বা স্লুইস গেট বানানোর দায়িত্ব পড়ে আবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপর। এই যে তিন-চারটি সংস্থার আলাদা আলাদা কর্মযজ্ঞ, সেখানে সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবই আজ গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজ থেকে ৩০ বছর আগের চট্টগ্রামের কথা ভাবলে অবাক হতে হয়। তখন বৃষ্টি কি খুব কম হতো? আসলে সময়ের সাথে চট্টগ্রামের উপরিভাগের চরিত্র বদলে গেছে। আগে শহরে প্রচুর ডোবা, নিচু জমি আর খোলা জায়গা ছিলো যা ‘রিটেনশন এরিয়া’ হিসেবে কাজ করতো। বৃষ্টির পানি সেখানে জমা হতো এবং অনেকটা পানি মাটিতে ‘ইনফিল্ট্রেট’ বা চুইয়ে ভেতরে যেত। এখন সেই পথ রুদ্ধ; চারদিকে শুধু ‘পেভড সারফেস’ বা কংক্রিটের আচ্ছাদন। ফলে পানি আর মাটিতে যাওয়ার সুযোগ পায় না, অত্যন্ত দ্রুত ‘সারফেস রানঅফ’ তৈরি করে নালায় চলে আসে। এর সাথে যোগ হয়েছে পাহাড় কাটার অভিশাপ। পাহাড়ের আলগা মাটি বৃষ্টির পানির সাথে মিশে পলি হিসেবে ড্রেনগুলোকে ভরাট করে দিচ্ছে, বিশেষ করে শহরের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের খালগুলো এখন প্রায় মৃত।
আমাদের রেগুলেটরগুলোর নকশাও এক বড় প্যারাডক্স। মহেশ খালে বানানো নতুন ১৪ ভেন্টের রেগুলেটরটি আধুনিক ও শক্তিশালী হলেও অন্যগুলোর অবস্থা তথৈবচ। সবচেয়ে ট্র্যাজিক উদাহরণ হলো নোয়া খাল। সবচেয়ে বেশি পানি প্রবাহিত হওয়া এই খালে পানি উন্নয়ন বোর্ড আউটার রিং রোডের ওপর যে নতুন রেগুলেটরটি বানিয়েছে, সেটিতে মাত্র ৬টি ভেন্ট রাখা হয়েছে। অথচ সেখানেও অন্তত ১৪ ভেন্টের প্রয়োজন ছিল। খালের প্রস্থ আর রেগুলেটরের এই সক্ষমতার অভাবই প্রমাণ করে যে আমাদের প্রকৌশলগত পরিকল্পনা কতোটা অদূরদর্শী।
তবে এর মধ্যেই সিটি কর্পোরেশনের ‘বাড়ইপাড়া খাল’ খননের উদ্যোগটি একটি ইতিবাচক উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা চাক্তাই খালের ওপর চাপ কমাবে। কিন্তু শুধু একটি খালের ওপর ভরসা করলে চলবে না। শহরের উত্তর-পূর্ব দিকেও এমন নতুন খালের প্রয়োজন যা পুরনো মাস্টারপ্ল্যানে ছিল। যেহেতু নগরায়ন ঠেকানো সম্ভব নয়, তাই খালের ডাউনস্ট্রিমে বড় বড় ‘রিটেনশন পন্ড’ বা জলাধার তৈরি করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সিডিএ-র মেগা প্রজেক্টে শুরুতে এই রিটেনশন পন্ডের প্রস্তাব থাকলেও পরে তা রহস্যজনকভাবে বাদ দেওয়া হয়, যা ছিল একটি বড় কৌশলগত ভুল।
জলজট নাকি জলাবদ্ধতা; এই তর্কের আড়ালে আসল সত্যটি হলো সুশাসনের অভাব এবং সমন্বিত পরিকল্পনার অনুপস্থিতি। শুধু খাল পরিষ্কার করলে সমাধান আসবে না; খাল, নালা এবং রেগুলেটর: এই তিনটিরই ক্যাপাসিটি যুগপৎভাবে বাড়াতে হবে। রাজাখালী ও বির্জা খালের পানি চাক্তাইয়ে না নিয়ে যদি পূর্ব পাশে আউটার রিং রোডের নিচের অব্যবহৃত রেগুলেটরগুলো দিয়ে কর্ণফুলীতে ফেলার ব্যবস্থা করা যায়, তবেই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। পাহাড় রক্ষা, নদী খনন, নতুন খাল উদ্ধার এবং আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার সমন্বয় না ঘটলে আগামী বর্ষাতেও আমাদের হয়তো সেই একই হাহাকারের গল্প লিখতে হবে।
পরিশেষে, চট্টগ্রামের এই জলমগ্ন বাস্তবতা এখন আর কোনো সংবাদপত্রের হেডলাইন নয়, এটি এই জনপদের ললাট লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলজট আর জলাবদ্ধতার এই প্যারাডক্স কেবল তাত্ত্বিকদের আলোচনার বিষয় হয়েই থাকবে যদি না আমরা কর্ণফুলীর ডাক আর পাহাড়ের কান্না শুনতে পাই। চট্টগ্রামের মানুষ চায় না তারা কোনো মেগা প্রকল্পের অংশ হোক তারা চায় বর্ষার দিনে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে আর জোয়ারের পানিতে নোনা স্বাদ না পেতে। এই আকাঙ্ক্ষা কি খুব বেশি?
উত্তরটা হয়তো খালের পলি আর ড্রেনের ময়লায় চাপা পড়ে আছে যা উদ্ধার করার দায় আমাদের সবার। সাংবাদিক হিসেবে আমি কেবল এই প্যারাডক্সটি তুলে ধরতে পারি কিন্তু এর সমাধান লুকিয়ে আছে সেই সব হাতে যারা এই নগরের ভাগ্যবিধাতা। তাঁরা কি পারবেন এই শব্দজট থেকে চট্টগ্রামকে মুক্তি দিতে? নাকি আগামী বর্ষাতেও আমাদের আবার লিখতে হবে ডুবছে চট্টগ্রাম বাড়ছে হাহাকার? সময় এবং জলপ্রবাহই তার উত্তর দেবে।
সাজিদ সামী চৌধুরী, স্বাধীন সাংবাদিক, চিন্তক ও গবেষক।
