বাংলাদেশের তরুণদের এক অংশ আজ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তগুলো যুক্তি বা নিরাপত্তার ভিত্তিতে নয়, বরং হতাশা, সামাজিক চাপ এবং দ্রুত সফলতার স্বপ্নের ওপর নির্ভর করে নেওয়া হচ্ছে। সেই সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইউরোপে পাড়ি জমানো, যাকে সাংকেতিক ভাষায় বলে ‘গেম দেওয়া’।
প্রতিনিয়ত খবরের শিরোনামে উঠে আসে ডুবে যাওয়া নৌকা, নিখোঁজ তরুণ, অথবা সীমান্তে আটক মানবপাচারের শিকার মানুষদের গল্প। তবুও এই প্রবণতা থামছে না। বরং নতুন নতুন রুট, নতুন নতুন দালালচক্র এবং নতুন নতুন কৌশলের মাধ্যমে এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা আরও বিস্তৃত হচ্ছে। প্রশ্ন হলো কেন বাংলাদেশের মানুষ প্রাণের ঝুঁকি আছে জানা সত্ত্বেও ‘গেম’ দেয়? এই প্রশ্নের কোন সহজ উত্তর নেই। এটি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সংকটের ফল নয়; বরং এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক বাস্তবতা।
প্রথমত, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব এবং আয়ের অনিশ্চয়তা অনেক তরুণকে দেশের ভেতরে ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে নিরুৎসাহিত করে। তবে একইসাথে এটাও সত্য যে এই দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ চাকরি করছে, ব্যবসা করছে, এবং নিজেদের মতো করে টিকে আছে। অর্থাৎ সমস্যাটি একমাত্র সুযোগের অভাব নয়; বরং প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার মধ্যে গভীর ব্যবধান।
দ্বিতীয়ত, বিদেশে যাওয়াকে আমরা ক্রমশ একটি সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে গড়ে তুলেছি। “অমুক ইতালি গিয়ে সফল হয়েছে” এই ধরনের গল্পগুলো বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। ফলে বিদেশযাত্রা একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত থেকে সামাজিক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।
তৃতীয়ত, বৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার জন্য যে পরিশ্রম, দক্ষতা এবং ধৈর্য প্রয়োজন; যেমন ভাষা দক্ষতা, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া, ভালো রেজাল্ট থাকা বা কারিগরি প্রশিক্ষণ তা অনেকেই এড়িয়ে যেতে চায়। এই শূন্যস্থান পূরণ করার জন্যই তারা বেছে নেয় তথাকথিত “গেম” অর্থাৎ অবৈধ রুট।
চতুর্থত, মানবপাচারকারী দালালচক্র এই প্রবণতাকে পুঁজি করে। তারা শুধু মানুষ পাচার করে না, বরং একটি “স্বপ্ন” বিক্রি করে। যেখানে ঝুঁকি আড়াল করা হয় এবং সাফল্যের গল্পগুলো অতিরঞ্জিত করা হয়। এই চক্র অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হয়, ফলে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
সবশেষে, একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক দিক রয়েছে তা হলো দেশের প্রতি হতাশা ও বিচ্ছিন্নতা। অনেক তরুণ মনে করে, “যেভাবেই হোক দেশ ছাড়তে হবে”; এমনকি যদি সেই পথে মৃত্যু ঝুঁকি থাকে তবুও। দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তার অভাববোধ থেকেই এই প্রবণতার জন্ম। ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন তাদের কাছে এতটাই প্রবল হয়ে উঠেছে যে, সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য তারা ভূমধ্যসাগরের মৃত্যুফাঁদে ঝাঁপ দিতেও দ্বিধা করছে না।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই অন্তত ৬০৬ জন অভিবাসী মারা গেছে বা নিখোঁজ হয়েছে। মার্চের মাঝামাঝি এসে এই সংখ্যা ৬৮০ ছাড়িয়ে গেছে, যার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছিল বাংলাদেশী। সম্প্রতি লিবিয়া থেকে অবৈধ পথে সাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিস বা ইতালি যাওয়ার সময় ২২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৮ জনই ছিল বাংলাদেশী। অবৈধপথে এভাবে বিভিন্ন দেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টার কারণে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতার ওপর, যার মূল্য কার্যত তলানিতে নেমে এসেছে। ফলস্বরূপ, বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে বাংলাদেশী যাত্রীদের অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদ ও যাচাই-বাছাইয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, কিছু দেশ ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোরতা বাড়িয়েছে, এমনকি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভিসা প্রক্রিয়াই স্থগিত রাখার নজিরও তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে মানবপাচার প্রতিরোধে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ কার্যকর করা হয়েছিল। অথচ আইন থাকা সত্ত্বেও দালালচক্রের বিস্তার, অবৈধ রুটের প্রসার, এবং প্রতারণার ঘটনা ছিল নিয়মিত। এই স্পষ্ট সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ৬ই জানুয়ারী মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ, ২০২৬ জারি করে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অগ্রগতি হিসেবে দেখা যায়। আগের আইনের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এই অধ্যাদেশ মানবপাচারের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো অভিবাসী চোরাচালানকে (মাইগ্র্যান্ট স্মাগলিং) পূর্ণাঙ্গ অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে অবৈধ পথে ইউরোপমুখী “গেম” এখন শুধু একটি অনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, বরং সুস্পষ্টভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড, এবং গুরুতর ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
এছাড়া এই আইনি কাঠামো সংঘবদ্ধ দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। শুধু সরাসরি পাচারকারী নয়, বরং তাদের সহায়তাকারী নেটওয়ার্ক, অর্থায়নকারী, এবং মধ্যস্থতাকারীদের বিরুদ্ধেও শাস্তির পরিধি বাড়ানো হয়েছে। পাচারের সঙ্গে জড়িত সম্পদ জব্দ করা, ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা, এমনকি বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো ব্যবস্থা যুক্ত হওয়ায় এই চক্রগুলোর আর্থিক ভিত্তিকে আঘাত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
একইসঙ্গে আইনটি সময়োপযোগী আরেকটি দিক যুক্ত করেছে; ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যে অনলাইন রিক্রুটমেন্ট ও প্রলোভনের মাধ্যমে তরুণদের ফাঁদে ফেলা হয়, সেটিকেও আইনের আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা এবং অঙ্গ পাচার বা জোরপূর্বক অপরাধে ব্যবহার এসব নতুন মাত্রার অপরাধকেও স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো আইন থাকলেও দালালরা এখনো সক্রিয়, রুট এখনো চালু, মৃত্যু এখনো থামেনি। তাই এই অধ্যাদেশকে অতি দ্রুত সংসদে আইন হিসেবে পাশ করতে হবে এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে এই সমস্যাটি এতটাই গভীর যে একক কোনো সমাধান কার্যকর হবে না। বরং সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, মানবপাচারকারী দালালচক্র ভেঙে ফেলা অপরিহার্য। এটি আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের মাধ্যমে করতে হবে এবং এক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক ছাড় দেওয়া যাবে না। দ্বিতীয়ত, বিদেশে যাওয়ার আগে তরুণদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে; যেখানে ভাষা, দক্ষতা এবং শ্রম অধিকার সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হবে। উচ্চশিক্ষায় বিদেশ গমনেচ্ছু শিক্ষার্থীদের সরকার কর্তৃক সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন বিএনপি সরকারের একটি ঘোষণাকে ইতিবাচকভাবে দেখা যায়। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যাংক গ্যারান্টি বা ব্যাংক সলভেন্সির সাপোর্ট হিসেবে ১০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানানো প্রয়োজন, কারণ এটি ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ অভিবাসনের একটি কার্যকর বিকল্প তৈরি করতে পারে। বৈধভাবে বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা করা, দক্ষতা অর্জন করা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রবেশ করা; এটি শুধু ব্যক্তির জন্য নয়, দেশের জন্যও লাভজনক। তৃতীয়ত, অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে এই প্রচারণা জরুরি। সর্বোপরি, বিদেশে বিপদে পড়া বাংলাদেশিদের জন্য কার্যকর, প্রাতিষ্ঠানিক সাপোর্ট সিস্টেম গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অবৈধ পথে গিয়ে বিপদে পড়া বাংলাদেশিরা আটক, নির্যাতন বা আইনি জটিলতায় পড়লেও দ্রুত কোনো সহায়তা পায় না। দূতাবাসগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, জরুরি হেল্পলাইন চালু, আইনি সহায়তা প্রদান, এবং শ্রম অধিকার রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা রাখা অত্যন্ত জরুরি। একইসঙ্গে যেসব বাংলাদেশি দেশে ফিরতে চান, তাদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক পুনর্বাসন ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
