দেশে কোনো ধর্ষণের ঘটনা আলোড়ন সৃষ্টি করলেই সরকার, রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি কমন প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়, তা হলো “পপুলিস্ট বক্তব্য এবং কাজ”। ভিক্টিম পরিবারকে মুখোমুখি হতে হয় নানান হয়রানির। আর আড়ালে ঢাকা পড়ে ধর্ষণ রোধে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, বিচারহীনতা এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারার বাস্তবতা।
ডেইলি স্টার ও বিবিসি বাংলার তথ্যানুযায়ী, দেশে গত ১০ বছরে ৬০০০ এরও বেশি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। গত ৪ মাসে এই সংখ্যা প্রায় ১১৮টি, যার মধ্যে ১৭ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবলই রেকর্ডেড শিশু ধর্ষণের।
অন্যদিকে এসব ধর্ষণের ঘটনায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি, বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের ব্যর্থতা দেশজুড়ে মব জাস্টিস বা বিচারবহির্ভূত হত্যার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে।
প্রথমত, মব জাস্টিস কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যা কোনোভাবেই সমাধান নয়; বরং তা দেশের আইনের শাসনকে আরও দুর্বল করবে। এতে ১০ জন অপরাধীর দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত হলেও, অন্য ১০ জন নিরপরাধ ব্যক্তির মৃত্যু ঘটবে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হবে অনেকেই। প্রতিশোধের টুল হিসেবে ব্যবহৃত হবে ধর্ষণের অপবাদ।
ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার অপব্যবহারের নতুন পথ তৈরি হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।
২০১৯ সালে তথাকথিত “হারকিউলিস” কর্তৃক ধর্ষক হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করার ঘটনা অনেকেরই মনে আছে । সবার কাছে হারকিউলিস যেন হয়ে উঠেছিল “Batman of Gotham City”। কিন্তু বাস্তবে আসলে কী ঘটেছিল?
ঘটনাটি ছিল পুরোপুরি মিথ্যা ও সাজানো নাটক। দুইজন নিরপরাধ মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছিল। প্রথম আলোর তথ্যমতে, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে জমি নিয়ে পারিবারিক বিরোধের জেরে করা হয়েছিল মিথ্যা ধর্ষণ মামলা। পরে ঘটে সেই হত্যাকাণ্ড, আর অপরাধ ঢাকতে সাজানো হয়েছিল “হারকিউলিস” ইস্যু। হত্যার পূর্বে তাদের অপহরণ করতে ব্যবহৃত হয়েছিল কোনো সরকারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়ি। তথাকথিত ভিক্টিমের শরীরেও ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ নিরপরাধ দুইজন মানুষ হত্যা করা হয় এবং সেই ঘটনায় পুরো দেশ আনন্দ উদযাপন করে। এই পরিস্থিতির দায় কিছুটা অবশ্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিই।
কিছুদিন আগেই ফেনীর এক মাদ্রাসার ইমামকে মিথ্যা ধর্ষণ মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল। সেই ইমাম কিছুদিন জেলও খেটেছিলেন। এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু পরে তদন্তে তিনি নিরপরাধ প্রমাণিত হন। ভাবুন তো, যদি তাকে ঘটনার পরপরই মব জাস্টিসের মাধ্যমে হত্যা করা হতো, তাহলে কী ঘটত? একজন নিরপরাধ মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হতো।
এ ধরনের ঘটনার উদাহরণ দেশে আরও অসংখ্য রয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক বিরোধের জেরে নিরীহ মানুষকে মিথ্যা অভিযুক্ত করে মব জাস্টিস বা বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হতে হয়।
ধর্ষকের বিচার অবশ্যই দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে, তবে তা অবশ্যই সুষ্ঠু বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। অন্যথায়, উপরে বর্ণিত পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
বিদ্যমান আইনগত বিচার প্রক্রিয়া ভেঙে দ্রুত বিচার করতে যাওয়াও কোনো স্থায়ী বা কার্যকর সমাধান নয়। এতে মামলার মেরিট নষ্ট হওয়া, তদন্ত ও বিচারে লুপহোল তৈরি হওয়া এবং উচ্চ আদালতে গিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাহলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সমস্যা কোথায় এবং সমাধান কী?
১। শক্তিশালী বিচার বিভাগ গঠন ও সরকারের সহায়তা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো দ্রুত বিচার বিভাগের সামগ্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন, স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, কার্যকর ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো।
কিন্তু বিচার বিভাগের বর্তমান চিত্র হলো,
– বিচার বিভাগের বাজেট এবং বিটিভির জন্য বরাদ্দ বাজেট প্রায় একই, যুব উন্নয়ন খাতের বাজেটও বিচার বিভাগের চেয়ে বেশি। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতের সঙ্গে তুলনা করাটা “লজ্জাজনক” হয়ে দাঁড়াবে বলেই মনে হচ্ছে।
– দেশে মোট বিচারকের সংখ্যা প্রায় ২৩০০, আর বিচারাধীন মামলা প্রায় ৪০–৫০ লক্ষ। যেখানে ন্যূনতম বিচারক প্রয়োজন প্রায় ৬০০০।
– ১৮ কোটি মানুষের জন্য হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ সংখ্যা মাত্র প্রায় ৬০টি, যার মধ্যে আপিল ফোরাম প্রায় ৩০-৪০ টি। এই সংখ্যাটাও এই বছর বৃদ্ধি পেয়েছে। আর আপিল বিভাগে বিচারক সংখ্যা মাত্র ৭ জন।
– নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা সারা দেশে মাত্র ১০১টি। কয়েকটি জেলায় একাধিক ট্রাইব্যুনাল থাকলেও অধিকাংশ জেলায় মাত্র ১টি ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। দেশে ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন শুধু ধর্ষণ মামলাই প্রায় দেড় লক্ষ। অর্থাৎ গড়ে প্রতি বিচারকের মাথাপিছু প্রায় ১৫০০ টি ধর্ষণ মামলা। এর বাইরে নারী ও শিশু নির্যাতন সম্পর্কিত অন্যান্য মামলা তো আছেই।
– আদালতে কর্মচারী সংকট প্রকট, যা প্রয়োজনীয় সংখ্যার অর্ধেকেরও হবে কম বলে জানা যায়। প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে বিচারকার্য ব্যাঘাত ও দীর্ঘ হয়, তবুও জনবল নিয়োগে পদক্ষেপ গ্রহণের অভাব।
– এছাড়াও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাতে মানবাধিকার সংস্থা ও কর্মীদের বাঁধা তো আছেই।
উপরিউক্ত তথ্যগুলো শুনতে হাস্যকর লাগলেও, এইটাই বিচার বিভাগের বাস্তব চিত্র। বিচার প্রক্রিয়ায় কেন দীর্ঘসূত্রতা, তাও এই তথ্যগুলো থেকেই বোঝা যায়।
কিন্তু বিচার বিভাগের উন্নয়ন ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে প্রত্যেক সরকারের কমন ও একমাত্র পদক্ষেপ ছিল “We don’t do that here.” অথচ বিচার বিভাগ শক্তিশালী হলে জনগণের কল্যাণ হবে, সমাজে স্থিতিশীলতা আসবে, দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে।
সুতরাং বিচার বিভাগের উন্নয়নে রাষ্ট্রের কোন অংশ এবং কেন বাধা সৃষ্টি করছে বা অনীহা প্রদর্শন করছে, সেই প্রশ্নের উত্তর জনগনকেই খুঁজে বের করতে হবে।
তাই করণীয় এখন,
– আদালতে বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি, কাঠামোগত উন্নয়ন, শক্তিশালী বাজেট ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
– ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং গুরুতর ধর্ষণ মামলার জন্য বিশেষ ফোরাম গঠন।
– হাইকোর্টে নারী ও শিশু ধর্ষণ মামলার জন্য আলাদা আপিল ফোরাম ও একাধিক বেঞ্চ তৈরি।
– শতবর্ষী আইনি প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা।
– তদন্তে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিশ্চিত করা।
এতে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সম্পূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন এবং শাস্তি কার্যকর করা সম্ভব।
২। বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা:
– বিচারক, প্রসিকিউটর (রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী), পুলিশের ( তদন্তকারী সংস্থা, চার্জশিট জমা, সাক্ষ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করা) দায়িত্ব পালনে সততা নিশ্চিত করতে হবে।
– বিশেষ করে পুলিশ ও প্রসিকিউশনের দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী করতে হবে। প্রচলিত মামলা বাণিজ্য রোধ করতে হবে।
– প্রয়োজনে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে আলাদা জুডিশিয়াল ইউনিট বা ফোর্স গঠন করা।
৩। বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থা এবং সংস্কৃতির সংস্কার:
ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা প্রধান সমাধান হলেও তা একমাত্র সমাধান নয়। রাষ্ট্রের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামো ও সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে না পারলে, শুধু কঠোর শাস্তির প্রয়োগের মাধ্যমে ধর্ষণ পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।
আমাদের বিদ্যমান সামাজিক ব্যবস্থা,
– রুট লেভেল থেকে রাজনীতি, সরকারি ও কর্পোরেট সেক্টর, মিডিয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে নারীদের যৌন প্রোডাক্ট হিসেবে দেখার উদাহরণ অনেক পুরনো। কর্মক্ষেত্রে নতুন বা জুনিয়র নারী কর্মীরা এই হয়রানি বেশি ফেস করে।
– রাস্তা-ঘাট, পরিবহন ও কর্মক্ষেত্রে নারীরা নিয়মিত যৌন হয়রানির শিকার হওয়া।
– মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত শিশু ধর্ষণের ঘটনা।
– অনলাইনে যৌন হয়রানি ও পর্ণোগ্রাফি।
তাই দেশের সামগ্রিক সামাজিক ব্যবস্থা ও সংস্কৃতির সংস্কার এবং আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে না পারলে, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনা নিয়মিত ঘটতে থাকবে।
ধর্ষণ প্রতিরোধ এবং দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচারিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করে। তাই এই মহামারী প্রতিরোধের দায়িত্বও সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে।
পরিশেষে, রামিসাসহ ধর্ষণের শিকার সকল শিশু ও নারী ধর্ষণের দ্রুত বিচার চাই। রাষ্ট্রের প্রতিটি পরিবারের নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা চাই।
মোঃ আরিফুল ইসলাম,শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
