২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ প্রায় এক যুগ ধরে চলতে থাকা শাপলা-শাহবাগ বাইনারি থেকে বের হয়ে এক নতুন শুরু করতে চেয়েছিল। আমাদের চোখে ছিল এক নতুন দেশ বিনির্মানের স্বপ্ন।তবে সে বাইনারি থেকে বের হওয়ার আশা ইতিমধ্যে দূরাশায় পরিণত হয়েছে। নতুন রূপে জেঁকে বসেছে পুরাতন সে বাইনারির রাজনীতি। প্রায় এক যুগ আগে ৫ মে শাপলা চত্বরে রাষ্ট্র যে ক্র্যাকডাউন চালিয়েছিল, তা ছিল গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন; এর বিচার হওয়া জরুরি। শাপলা চত্বরের মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক আছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০১৩ সালেই বলেছিল, মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা অনিশ্চিত; সরকারি হিসাবে ১১ জন, আর স্বাধীন সংবাদসূত্রে প্রায় ৫০ জনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছিল। ২০২৬ সালের ৫ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর বলেন, শাপলা চত্বরের ঘটনায় ৫৮ জন নিহত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে; একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হেফাজত ২০২৫ সালে ৯৩ জনের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করেছিল, অধিকার ৬১ জনের নাম দিয়েছিল, আর ‘শহীদনামা’ ৪১ জনের মৃত্যুর কথা বলেছিল। অর্থাৎ, সংখ্যার বিতর্ক থাকলেও একটি সত্য অস্বীকার করা যায় না: রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অভিযানে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন, এবং এত বছর পরও পূর্ণাঙ্গ বিচার হয়নি।
কিন্তু মানবাধিকার রক্ষার অর্থ কোনো রাজনৈতিক শক্তির দাবিগুলোকে সমালোচনার বাইরে রাখা নয়। হেফাজতের ১৩ দফা দাবির দিকে তাকালেই দেখা যায়, তা কেবল ধর্মীয় অনুভূতির দাবি ছিল না; বরং রাষ্ট্র, আইন, শিক্ষা, নারী, সংস্কৃতি ও নাগরিক স্বাধীনতার উপর এক বিশেষ ধর্মীয় কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার প্রকল্প ছিল। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে ছিল কাদিয়ানীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা, ‘মসজিদের নগরী’ ঢাকায় মূর্তি বানানো যাবে না,নাস্তিকদের ফাঁসি দিতে হবে, নাস্তিক দের কল্লা চাই, ভাস্কর্য বানানো যাবে না – ইত্যাদি ইত্যাদি। এ যেন মামার বাড়ির আবদার। মূর্তি থাকবে না, নাস্তিক থাকবে না, ভাস্কর্য থাকবে না। শুধু মোল্লা আর মাদ্রাসা থাকবে। একটা দাবি এমন ছিল যে, মোমবাতি প্রজ্বলন করা যাবে না।হেফাজত আর কওমীদের ডিকশ্যানারিতে সম্ভবত ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা’ শব্দযুগলের অস্তিত্ব নাই। ৫ আগস্টের পর যে নির্বিচারে দেশের অগণিত ঐতিহাসিক ভাস্কর্য ভাঙা হলো, সেই দায় কেন শাপলা ও হেফাযতের উপর বর্তাবে না? জাতীয় ভাবে সে দাবি তোলা ও এর পক্ষে ন্যারেটিভ উৎপাদনের দরুণ এর দায় শাপলার উপরই বর্তায় – বললে অত্যুক্তি করা হয় না। শাহবাগকে ক্রমাগত ফ্যাসিস্টের দোসর আর ফ্যাসিস্ট এনাবলার বলতে থাকা শাপলার বি(কু)খ্যাত স্লোগান ছিল- ‘কুকুর বেড়াল মেরো না, নাস্তিক পেলে ছেড়ো না।’ এরকম জঙ্গীবাদী দাবি নিয়েই সে রাতে ঢাকা দখল করেছিল কওমী মাদ্রাসার আলেম ও শিক্ষার্থীরা। এগুলো কোনো গণতান্ত্রিক দাবি নয়; এগুলো নাগরিক অধিকারকে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় পরিচয়ের অধীনস্থ করার দাবি। এই দাবি যে টেক্সটবুক ফ্যাসিজমের চেয়ে কম কিছু নয় – এ কথা বর্তমান বাংলাদেশের স্মরণ রাখা দরকার।
২০১৩ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে নেমে আসে এক ত্রাসের রাজত্ব। ব্লগার, মুক্তমনা ও বাক স্বাধীনতার উপর এক সংঘবদ্ধ ও পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়।ব্লগার কিলিং এর এক ভয়ানক যুগে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। অভিজিৎ রায়, রাজীব হায়দার ওরফে, থাবা বাবা, জুলহাজ মান্নান, মাহবুব রাব্বি তনয়ের মতো অনেক ব্লগার, মুক্ত চিন্তক ও মানবাধিকার কর্মীদের দিনে দুপুরে ভরাট রাস্তায় কুপিয়ে মেরে ফেলা হয়। অনেক ব্লগার ও লেখক জীবন বাঁচাতে দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। প্রশ্ন হচ্ছে, সরাসরি উস্কানি দাতা হিসেবে কেন হেফাজতে ইসলামকে এ সকল টার্গেট কিলিং এর দায় দেওয়া হবে না!
শাপলা চত্ত্বরের রাজনীতি কেবল এত টুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আশ্চর্যের বিষয় হলো শাপলা চত্বরের সাধারণ কর্মী, মাদ্রাসার ছাত্র ও দরিদ্র তরুণদের জীবনকে হেফাজতের নেতৃত্ব কীভাবে ব্যবহার করেছে। শাপলা চত্ত্বরের হারানো প্রাণ গুলোর সাথে সবচেয়ে বড় প্রতারণা করেছে খোদ হেফাজতে ইসলামের নেতারাই। যেই শেখ হাসিনা হেফাজতে ইসলামের কর্মী ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের উপর রাতের আঁধারে ক্র্যাকডাউন চালায়, হেফাজতে ইসলামের নেতারা খোদ শেখ হাসিনার সাথেই গোপন আঁতাত গড়ে তোলে। ২০১৪ সালে ঢাকা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার থেকে হাটহাজারী রেলস্টেশনের পিছনে ২ দশমিক ৬৪ একর জমির দখল নেয় হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী। এর সামনে একটি সাইনবোর্ডে লিখাঃ ‘মাননীয় যোগাযোগমন্ত্রীর অনুমতিক্রমে এই জমির দখলদার মালিক দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসা।’ পুকুরটির মালিক বাংলাদেশ রেলওয়ে। আর দখল নেওয়া মাদ্রাসাটির মহাপরিচালক হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী।
হেফাজতে ইসলামের ডাকে সেদিন সারা দেশ থেকে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এসে জড়ো হয়েছিল শাপলা চত্ত্বরে। বড় বড় নেতারা জেনে শুনে সেদিন এক ম্যাসাকারের মুখে ঠেলে দিয়েছিল কিছু তরুণ প্রাণকে। তাদের অনেকে জানতোই না কেন এ সমাবেশে এসেছে বা কী এর উদ্দেশ্য। তবু যখন জীবন উৎসর্গ করার সময় এলো, প্রাণ দিল কিছু শিশু আর সাধারণ কর্মীরা। অন্যদিকে, হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বরা শেখ হাসিনাকে ‘কওমী জননী’ উপধিতে ভূষিত করেছেন, যে কিনা বলেছিল ৫ মে শাপলায় কিছুই হয়নি। হুজুররা রঙ মেখে মাটিতে শুয়ে ছিল। হেফাজতে ইসলামের কয়েক হাজার শহিদ হওয়ার দাবির বিপরীতে সরকার থেকে ১০ জনের হিসাব দেওয়া হয়েছিল, যদিও নিরপেক্ষ সূত্র বলছে সংখ্যাটি ৬০ এর ঘরে।
রাষ্ট্রীয় পুলিশী ক্র্যাক ডাউনের শিকার একটা গোষ্ঠীকে বিচার পাইয়ে দেওয়া ও তা নিশ্চিত করা তাদের মানবাধিকারের মধ্যে পড়ে। তবে তারা খুব সহজেই আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাত করে সহজ সুন্দর সময় কাটিয়েছে। এখন, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে তারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। যদিও প্রাণ গিয়েছে কেবল কোমলমতি শিশুরই। আর হেফাজত সেই লাশগুলো নিয়ে ক্রমাগত রাজনীতি করে গেছে। আজ পর্যন্ত শাপলা চত্ত্বরে প্রাণ হারানো প্রতিটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর লাশ কেবল একটি রাজনৈতিক টুল হিসেবে রয়ে গেছে তাদের কাছে।
শাপলায় জীবন দেওয়া প্রতিটি প্রাণের বিচার রাষ্ট্রকে করতে হবে। সেই সাথে সে সকল নেতাদেরও ছাড় দেওয়া যাবে না – যারা টিকিং টাইম বম্ব হিসেবে নিরপরাধ শিশুদের রাতের অন্ধকারে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ণের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।যারা শাপলার শহিদদের সাথে সবচেয়ে বড় বেইমানি ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
আমাদেরকে শাপলা – শাহবাগ বাইনারি থেকে বের হতে হলে এ বিষয় গুলোর নিষ্পত্তি করতে হবে। নতুবা, সারাদিন সম্প্রীতির গীত গাইলেও কোনো লাভ হবে না। যারা আমাদের মানবাধিকারেই বিশ্বাস করে না, তাদের সাথে এক টেবিলে বসে আলোচনা করা সম্ভব না। নতুন বাংলাদেশ চাইলে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক চুক্তি স্পষ্ট হতে হবে: রাষ্ট্র কাউকে হত্যা করবে না; জনতা কাউকে কোপাবে না; ধর্ম কাউকে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করবে না; এবং কোনো রাজনৈতিক শক্তি মানবাধিকারের ভাষা ব্যবহার করে মানবাধিকারের বিরুদ্ধেই রাজনীতি করবে না। নতুবা, যাদের কাছে অপর পক্ষের ঘাড়ের উপরের কল্লাটাই নিরাপদ না, তাদের সাথে আলোচনার সর্ব পথই বন্ধ।
কেননা, কবি বলেছেন,
“তলোয়ারের সাথে গর্দানের কোনো সংলাপ হয় না।”
ইসমাম জামান,ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
