“ভাই, মাননীয় স্পিকার মহোদয়—আমাকে এক মিনিট সময় দেওয়া যাবে আর?”
এই এক মিনিট- ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ ট্রল হয়েছে। হয়তো অনেকের কাছে
তুচ্ছ, আবার কারও কাছে ট্রলের বিষয়। কিন্তু বাস্তবে এই এক মিনিটই হয়ে উঠেছে ইতিহাসের এক
গভীরতম মুহূর্ত। কারন, এই সংক্ষিপ্ত সময়ের ভেতর উচ্চারিত হয়েছিল এক দীর্ঘ বঞ্চনার
ইতিহাস, এক নীরব আর্তনাদের ভাষ্য, এবং এক সুপ্ত প্রতিবাদের আগুন। জাতীয় সংসদের মতো
সর্বোচ্চ মঞ্চে দাঁড়িয়ে চা-শ্রমিকদের বাস্তবতা এমন স্পষ্টতা ও সাহসের সঙ্গে তুলে
ধরা—নিঃসন্দেহে বিরল।
এই উচ্চারণ আমাদের বাধ্য করে ফিরে তাকাতে—বাংলাদেশের চা-শ্রমিকদের দিকে, যাদের জীবন যেন
এক দীর্ঘস্থায়ী উপনিবেশিক বাস্তবতার ধারাবাহিকতা।
চা শ্রমিকদের জীবন যেন এক দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনার কাঠামো
প্রায় ১৮০ বছর ধরে চা-শ্রমিকরা একই ভূখণ্ডে বসবাস করেও ভূমির মালিকানা পায়নি। তারা গাছ
লাগায়, কিন্তু বিক্রি করতে পারে না; তারা শ্রম দেয়, কিন্তু ন্যায্য মজুরি পায় না; তারা নাগরিক,
কিন্তু নাগরিক অধিকারের পূর্ণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
এই বাস্তবতাকে কেবল দারিদ্র্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়- এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক,
কাঠামোগত বঞ্চনার ফল।
বর্তমানে দৈনিক ১৭০–১৮৭ টাকার মজুরি দিয়ে একটি পরিবার চালানো প্রায় অসম্ভব। এর সঙ্গে
যুক্ত হয়েছে অস্বাস্থ্যকর বাসস্থান, অপুষ্টি, সীমিত চিকিৎসা এবং শিক্ষার অপ্রতুলতা। ফলে
প্রশ্নটি অনিবার্য- এই অবস্থা এতদিন পরিবর্তিত হলো না কেন?
এই বঞ্চনার পেছনে কয়েকটি সুস্পষ্ট কাঠামোগত কারণ রয়েছে।
প্রথমত, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার। চা-শিল্পের সূচনা হয়েছিল এমন একটি মডেলে, যেখানে
শ্রমিকদের স্থায়ীভাবে নির্ভরশীল করে রাখাই ছিল মূল কৌশল/ দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনার এক নীল
নকশা। স্বাধীনতার পরও সেই কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। শ্রমিকদের বাসস্থান,
স্বাস্থ্যসেবা, এমনকি সামাজিক জীবনও বাগান কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন।
দ্বিতীয়ত, সিন্ডিকেট ও স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব। উৎপাদন খরচ কম রাখার জন্য শ্রমিকদের মজুরি
দীর্ঘদিন ধরে দমিয়ে রাখা হয়েছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব সুস্পষ্ট।
তৃতীয়ত, নীতিগত উদাসীনতা। চা-শ্রমিকরা দেশের সাধারণ শ্রম আইনের পূর্ণ সুরক্ষা পায় না; তাদের
জন্য আলাদা বিধিমালা রয়েছে, যা প্রায়শই তাদের অধিকার সীমিত করে।
চতুর্থত, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। ভাষা, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক দূরত্ব্স-সব মিলিয়ে তারা মূলধারার
সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন, ফলে তাদের কণ্ঠ দীর্ঘদিন অশ্রুতই থেকে গেছে।
বাংলাদেশে চা-শ্রমিকদের জন্য কিছু বিশেষ আইন রয়েছে—যেমন চা শ্রমিক কল্যাণ তহবিল আইন,
২০১৬; Tea Plantation Labour Rules, ১৯৭৭; এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধা আইন, ১৯৫০।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই আইনের অনেকগুলোই মালিকপক্ষের প্রভাবাধীন কাঠামোর মধ্যে তৈরি বা
প্রয়োগিত। ফলে শ্রমিকদের প্রকৃত অংশগ্রহণ ও স্বার্থ কতটা প্রতিফলিত হয়—তা নিয়ে প্রশ্ন
থেকেই যায়।
উদাহরণস্বরূপ:
অর্জিত ছুটি পেতে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয় ( প্রতি ২২ দিন কাজে ১ দিন) – যা অন্যান্য
শিল্প থেকে ভিন্ন।
বাগানের মালিকদের কাছ থেকে প্রভিডেন্ট ফান্ডের পূর্ণ অংশ পেতে ১০ বছর পর্যন্ত কাজ করতে
হবে , যা অন্যান্য শিল্পের তুলনায় ভিন্ন।
ভূমির অধিকার এখনো অস্পষ্ট আইন আছে—কিন্তু ন্যায়বিচার অনুপস্থিত। চা শ্রমিকদের
ভূমির অধিকার বা মালিকানা আইনগতভাবে অস্পষ্ট এবং তারা প্রায়শই বঞ্চিত হন, যা চা-শ্রমিকদের
ভূমি অধিকার আইন এর মাধ্যমে নিশ্চিত করার দাবি ওঠে। চা-শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও আবাসন: চা
বাগান শ্রমিকদের আইনগত অধিকার ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিধিমালা অনুযায়ী, চা শ্রমিকদের আবাসন
ও স্বাস্থ্যের ব্যাপারে বিশেষ বিধান রয়েছে। তবে হিসাবের খাতায় যেন মর্যাদাহানি।
‘৪২০ টাকার’ বিভ্রম: একটি অর্থনৈতিক প্রতারণা
বাংলাদেশের চা-শিল্প বহুদিন ধরেই অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু এই শিল্পের
মূলে যে শ্রমিকসমাজ দাঁড়িয়ে আছে, তাদের জীবনমানের সঙ্গে এই ‘গুরুত্ব’ শব্দটির কোনো সামঞ্জস্য খুঁজে
পাওয়া যায় না। বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মজুরি নিয়ে যে বিতর্ক সামনে এসেছে, তা আমাদের শ্রম-
নৈতিকতা, অর্থনৈতিক যুক্তি এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে একসঙ্গে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
২০২২ সালের মজুরি আলোচনায় একটি দাবি সামনে আনা হয়—চা-শ্রমিকদের প্রকৃত দৈনিক আয়
নাকি ৪২০ টাকা। কিন্তু এই হিসাব বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়—এটি একটি কৌশলগত বিভ্রম। এবং
এটি কোনো অর্থনৈতিক হিসাব নয়; এটি শ্রমিকের মর্যাদাকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করার একটি বিপজ্জনক
প্রয়াস। এবং আধুনিক দাস প্রথারই যেন ভিন্ন কোনো নামান্তর।
প্রথমত, শ্রমিকের নিজস্ব উদ্যোগে নিজ বাসস্থানে উৎপাদিত ফলমূলকে ‘আয়’ হিসেবে গণ্য করা
হয়েছে—যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। যুক্তিটি হলো-যেহেতু শ্রমিকের বাসস্থানের জমিটি বাগান মালিকের,
সেহেতু সেই জমিতে উৎপাদিত যে কোনো ফলনও ভূমি মালিকের আওতাধীন এবং তা শ্রমিকের মজুরি আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এই যুক্তি অর্থনৈতিক বাস্তবতার চেয়ে বেশি প্রতিফলিত করে একধরনের
নিয়ন্ত্রণমূলক মানসিকতা, যেখানে শ্রমিকের ব্যক্তিগত উদ্যোগকেও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে শোষিত
করা হয়।
দ্বিতীয়ত, বাসস্থানকে ‘ঘর ভাড়া’ হিসেবে হিসাব করা হয়েছে—যদিও এটি শ্রম নিশ্চিত করার
পূর্বশর্ত। তাছাড়াও আপনি বাসায় ফুল টাইম কাজের লোক রাখলেন, যাকে আপনি অব্যবহৃত কোনো কক্ষে
থাকার জায়গা দিয়েছেন । বেতন দেওয়ার সময় তার বেতন থেকে ১০০০ টাকা কেটে রেখে বললেন , এইটা তোমার
ঘর ভাড়া । এই ব্যবস্থার আর একটা সুবিধা হলো, মালিকেরা সুবিশাল চা বাগানের বিভিন্ন কৌশলগত পয়েন্টে
এই ঘরগুলো তুলে দেয় শ্রমিকদের থাকবার জন্য। ফলত, সেসব ঘরের শ্রমিক বাসিন্দারা মূলত এক প্রকারে
বাগানের নিরাপত্তা প্রহরীর মতো কাজ করে। নিরাপত্তার স্বার্থে আবার আলাদা করে কোনো খরচ করতে হয়
না। আর ঘরগুলো ওখানে না করে দিলে ওইরকম ম্যালেরিয়া ইনফেস্টেড জায়গায় থাকাও তো ঝুঁকির। এমনিতেও
দুর্গম অঞ্চলে স্বাস্থ্য ঝুঁকির শেষ নেই।
তৃতীয়ত, শ্রমিক কল্যাণ ব্যয়কে আয় হিসেবে দেখানো হয়েছে—যা আসলে মালিকের আইনি
দায়বদ্ধতা। শ্রমিক কল্যাণ কর্মসুচি ৪৩ টাকা। বাংলাদেশের সর্বশেষ শ্রমিক আইনে বলা হয়েছে যে,
প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশের ৫% শ্রমিক কল্যাণে ব্যয় হবে। ফলে শ্রমিক কল্যাণে যদি পয়ঃনিষ্কাশন, পানীয় জল
সরবরাহ, ম্যালেরিয়া প্রতিরোধক স্প্রেতে কোম্পানির ব্যয় হয় সেইটা বাংলাদেশের আইন অনুসারে
প্রতিষ্ঠানের মুনাফা থেকে দিতে হব, এইটা শ্রমিকের পরোক্ষ আয় হিসেবে গণ্য হবেনা।
চতুর্থত, ওভারটাইম ও বোনাসকে মূল মজুরির অংশ হিসেবে ধরা হয়েছে—যা শ্রম অর্থনীতির মৌলিক
নীতির পরিপন্থী।বিভিন্ন ভাতা ধরা হয়েছে, যে ভাতা গুলো উপস্থিতি সহ বিভিন্ন শর্তাদির সাথে লেজ লাগিয়ে
রাখা হয়েছে। এমন কি পারফরম্যান্স বোনাস ও ওভারটাইমকেও দৈনিক মজুরীর অংশ হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
এই ধরনের চিন্তা পদ্ধতিই দাস প্রভু সম্পর্কের চিন্তা পদ্ধতি। শ্রম অর্থনীতির মৌলিক নীতিই বলে, মজুরি
নির্ধারিত হয় নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার ভিত্তিতে। অতিরিক্ত শ্রম বা বিশেষ দক্ষতার জন্য প্রদত্ত পারিশ্রমিক
কখনোই মূল মজুরির বিকল্প হতে পারে না। কারন এগুলো অনিশ্চিত, শর্তসাপেক্ষ এবং সর্বজনীন নয়।
এই সমগ্র হিসাবপদ্ধতি শ্রমিককে একটি স্বাধীন অর্থনৈতিক সত্তা হিসেবে নয়, বরং একটি
নিয়ন্ত্রিত উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে। এটি আধুনিক শ্রম সম্পর্ক নয়; বরং প্রভু-ভৃত্য
সম্পর্কের প্রতিফলন।
বাস্তবতা: মর্যাদাহানির হিসাব
বাস্তব হিসাব অনুযায়ী শ্রমিকদের দৈনিক প্রত্যক্ষ আয় প্রায় ১৭২.৬১ টাকা—যা ন্যূনতম
জীবনধারণের জন্যও অপর্যাপ্ত। সুতরাং ‘৪২০ টাকা আয়’—একটি পরিসংখ্যানগত বিভ্রান্তি।
এই প্রেক্ষাপটে ৩০০ টাকা বা তার বেশি দৈনিক মজুরির দাবি কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি ন্যায্যতার
প্রশ্ন।
এটি কি আধুনিক দাসত্ব?
শ্রমিককে একটি স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক সত্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং তার জীবনযাপনের প্রতিটি
উপাদান—বাসস্থান, খাদ্য, এমনকি ব্যক্তিগত উদ্যোগ—সবকিছুকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে এনে
মজুরির অংশ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এই বাস্তবতায় একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—শ্রমিক কি কেবল তার
কর্মঘণ্টা বিক্রি করে, নাকি তার পুরো জীবনই একটি প্রতিষ্ঠানের অধীনস্থ? যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তবে
সেটি আধুনিক অর্থনীতির ভাষায় শ্রম সম্পর্ক নয়; বরং এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বন্দিদশা- আধুনিক
দাসত্বের এক নির্মম রূপ। বাস্তবসম্মত হিসাব করলে দেখা যায়, শ্রমিকদের প্রত্যক্ষ আয় এখনো
ন্যূনতম জীবনধারণের মানদণ্ড পূরণ করতে ব্যর্থ। ফলে ‘৪২০ টাকা আয়’-এর দাবি কেবল একটি
পরিসংখ্যানগত কৌশল, যা বাস্তবতাকে আড়াল করে।
এই অন্ধকার বাস্তবতার মধ্যেও জাতীয় সংসদে উচ্চারিত সেই এক মিনিট আশার আলো দেখায়।
কারণ, এটি কেবল একটি বক্তব্য নয়—এটি একটি রাজনৈতিক সংকেত।
চা-শ্রমিকদের প্রশ্ন এখন আর প্রান্তিক নয়; এটি জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসছে।
এখন কী করা জরুরি?
জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ
ভূমির অধিকার বা দীর্ঘমেয়াদি লিজ নিশ্চিত করা
চা শ্রমিকদের ব্যাপারে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরাসরি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ
শ্রম আইন সংস্কার ও পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করা
সিন্ডিকেট ভেঙ্গে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা
চা-শ্রমিকদের জীবন কোনো পরিসংখ্যান নয়- এটি মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন।
যে মানুষগুলো দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে, তাদের যদি বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে হয়-
তবে সেটি কেবল একটি খাতের ব্যর্থতা নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের নৈতিক সংকট।
সংসদে উচ্চারিত সেই এক মিনিট-যদি নীতিতে প্রতিফলিত হয়, তবে তবে হয়তো এই দীর্ঘ নীরবতা
ভাঙবে, বদলাতে পারে। আর যদি না হয়—তবে এই নীরব আর্তনাদই একদিন আমাদের collective failure-এর দলিল হয়ে থাকবে।
নিয়াজ মাহমুদ সাকিব
প্রভাষক ও গবেষক
