ভিড়, চিৎকার, দৌড়াদৌড়ি। কেউ একজন পড়ে গেছে। তারপর আর “কেউ একজন” থাকে না—সে হয়ে যায় একটি শরীর, যাকে ঘিরে মানুষজনের উন্মত্ততা। লাথি, ঘুষি, আঘাত। কেউ থামায় না। বরং আরও মানুষ এগিয়ে আসে। এই দৃশ্যগুলো এখন আর নতুন লাগে না। এটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর।
একটা সময় আমরা ভেবেছিলাম, এসব কেবল অস্থিরতার মুহূর্তে ঘটে—কোনো রাজনৈতিক টানাপোড়েন, কোনো অনিশ্চয়তার সময়ে। ইউনূস সরকারের সময় যখন কবর থেকে মৃত মানুষকে তুলে এনে পুড়িয়ে ফেলার মতো নৃশংসতা ঘটল, তখন অনেকেই বলেছিল—এটা সাময়িক, পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তারপর এলো নির্বাচিত বিএনপি সরকার। মনে হয়েছিল এবার অন্তত এই মবের সংস্কৃতি থামবে। রাষ্ট্র ফিরে আসবে, আইন নিজের জায়গা নেবে। কিন্তু এসব ঘটনা থামেনি। বরং আরও স্পষ্ট হয়েছে সমস্যাটা কোনো এক সরকারের না, সমস্যাটা গভীরতর। রাষ্ট্র যেন ধীরে ধীরে তার একচেটিয়া সহিংসতার অধিকার হারাচ্ছে। রাস্তায়, বাজারে, জনসমক্ষে একটা নতুন “বিচারব্যবস্থা” তৈরি হয়েছে, যার নাম মব।
কুষ্টিয়ায় পীর শামীম হত্যার ঘটনাটি এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। একজন মানুষকে প্রকাশ্যে মেরে ফেলা হয়েছে। ভিডিওতে অপরাধীদের মুখ স্পষ্ট। প্রমাণ নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই। তবুও এ নৃশংস ঘটনায় আজ পর্যন্ত গ্রেফতার হয়নি কেউ। আরও ভয়ঙ্কর হলো নিহত ব্যক্তির পরিবার পর্যন্ত মামলা করতে রাজি না। এটা কেবল একটি পরিবারের ভয় না—এটা একটি সামাজিক বাস্তবতা। এই ভয়ই মববাজদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা জানে, মানুষ ভয় পায়। তারা জানে, অনেক ক্ষেত্রে বিচার চাওয়ার সাহসও হারিয়ে যায়। এই ভয়ের সংস্কৃতি মববাজদের একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, তারা যাই করুক না কেন, পার পেয়ে যাবে! আর সেই কারণেই এই ধরনের সহিংসতা থামে না, বরং আরও সংগঠিত হয়, আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এখানেই রাষ্ট্রের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই ধরনের ঘটনায় তো রাষ্ট্র নিজেই বাদী হয়ে মামলা করার কথা। আইন তো ব্যক্তিগত সাহসের ওপর নির্ভর করার কথা না; এটা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। তাহলে কেন তা করা হচ্ছে না? এই নীরবতা কি অক্ষমতা, নাকি ইচ্ছাকৃত উদাসীনতা?
আরেকটি প্রশ্ন সমান জরুরি – বিরোধী দলগুলো কোথায়? অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে যখন এমন ঘটনা ঘটেছিল, তখন তারা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। আজ যখন তারা ক্ষমতায়, তখন সেই প্রতিবাদ কোথায়? নাকি ক্ষমতায় এলে নৈতিকতা বদলে যায়? আজ যারা মবের ভিডিও দেখে উল্লাস করছে, যারা ভাবছে “ঠিকই হয়েছে”—তারা কি একবারও ভাবছে, এই আগুনটা কোনো সীমা মানে না?
ধরুন, কারও সাথে আপনার শত্রুতা আছে। সে যদি কাল আপনাকে একটা মিথ্যা ট্যাগ দেয়, একটা গুজব ছড়ায়, তাহলেই কি যথেষ্ট না? ভিড় জড়ো হতে সময় লাগে না। সত্য যাচাই করতে কেউ দাঁড়ায় না। তখন আপনি বা আপনার পরিবার—এক মুহূর্তে “টার্গেট” হয়ে যেতে পারেন। মবের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই—এটা অন্ধ। আর অন্ধ সহিংসতা কখনো বেছে নেয় না, কাকে আঘাত করবে।
রাষ্ট্রের কাজ শুধু শাসন করা না, জনগণকে রক্ষা করা। যদি একজন মানুষ জনসমক্ষে পিটিয়ে মারা যায়, এবং রাষ্ট্র শুধু দেখে—বা দেখেও না দেখার ভান করে—তাহলে সেই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কোথায়? একটা সমাজ ধ্বংস হয় একদিনে না। ধীরে ধীরে, ছোট ছোট আপসের মাধ্যমে, নীরবতার মাধ্যমে, “ঠিকই তো করেছে” এই কথাটার মাধ্যমে মব গোষ্ঠী শক্তিশালী হয়। এদের দ্রুতগতিতে ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের এ দায়িত্ব এড়ানোর কোনো সুযোগ সরকারের নেই।
