৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য—“শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের রূপকার: মানবাধিকার, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য মুক্ত গণমাধ্যম”—আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, তথ্যের অবাধ প্রবাহ ছাড়া কোনো গণতন্ত্রই টেকসই হতে পারে না। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দিনটি উদযাপনের চেয়ে আত্মলব্ধি আর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বেশি। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে এক নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল, যেখানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হবে অবারিত। কিন্তু দেড় বছরের ব্যবধানে দেখা যাচ্ছে, ভয়ের সংস্কৃতি কেবল রূপ পরিবর্তন করেছে, নির্মূল হয়নি। আজ বাংলাদেশের গণমাধ্যম একদিকে যেমন কালাকানুনের জালে বন্দি, অন্যদিকে “মব সেন্সরশিপ” বা গোষ্ঠীগত চাপের মুখে বাকরুদ্ধ।
বাংলাদেশের সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এর আইনি কাঠামো। দীর্ঘদিনের বিতর্কিত Digital Security Act (DSA) বাতিল করে Cyber Security Act (CSA) প্রবর্তন করা হলেও, এর মূল চরিত্র রয়ে গেছে দমনমূলক। বিশেষ করে মানহানি বা রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার মতো অস্পষ্ট ধারার সুযোগ নিয়ে সাংবাদিকদের হয়রানি করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের দণ্ডবিধিকে ব্যবহার করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যে ধরনের আইনি যুদ্ধ শুরু হয়েছে তা নজিরবিহীন। পেশাদার সাংবাদিকদের নির্বিচারে হত্যা মামলার আসামি করা কিংবা ‘উস্কানিদাতা’ হিসেবে অভিযুক্ত করা কেবল বিচারিক হয়রানি নয়, বরং একটি পুরো পেশাকে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা। যখন একজন সাংবাদিককে সংবাদ পরিবেশনের দায়ে খুনের মামলার আসামি হতে হয়, তখন সেখানে আইনের শাসনের চেয়ে প্রতিহিংসার প্রতিফলনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ঘটনা বিশ্লেষণ করলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা ফুটে ওঠে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস-এর ২০২৬ সালের সূচকে বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫২তম অবস্থানে নেমে এসেছে, যা দেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতির চরম অবনতির ইঙ্গিত দেয়। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রায় সহস্রাধিক সাংবাদিক কোনো না কোনোভাবে হামলা, হুমকি বা আইনি জটিলতার শিকার হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রায় ২৬৮ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা ও সহিংসতার অভিযোগে মামলা হয়েছে। শুধু আদালত নয়, রাজপথেও সংবাদমাধ্যমগুলো আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের মতো শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলোর কার্যালয়ে ভাঙচুর এবং মুদ্রণ বন্ধের হুমকি “মব সেন্সরশিপের” এক ভয়াবহ নজির। এর পাশাপাশি বিভিন্ন সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে তাদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলা হয়েছে।
এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় আরও দৃঢ় হতে হবে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের দেওয়া সুপারিশমালা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়; বরং এতে দুর্নীতির বিস্তার ঘটে এবং জনরোষ পুঞ্জীভূত হয়। মুক্ত গণমাধ্যম কোনো রাষ্ট্রের শত্রু নয়, বরং এর সবচেয়ে বড় সুরক্ষাকবচ। আজকের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত এমন এক বাংলাদেশ গড়া, যেখানে সাংবাদিকরা কোনো হুমকির ভয় ছাড়াই সত্য তুলে ধরতে পারবেন। কারণ, যেখানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নেই, সেখানে গণতন্ত্র কেবল একটি শব্দ ছাড়া আর কিছুই নয়।
