প্রযুক্তির এই যুগে আমরা যেন এক অদ্ভুত বাস্তবতায় বসবাস করছি যেখানে প্রত্যেকে নিজেকে “কন্টেন্ট ক্রিয়েটর” ভাবছে, এবং প্রতিটি মুহূর্তকে সম্ভাব্য ভাইরাল কনটেন্ট হিসেবে দেখতে শিখে ফেলেছে। ঘটনা ঘটার আগেই ক্যামেরা অন, মানুষের ব্যক্তিগত পরিসর ভেঙে ফেলা যেন এখন স্বাভাবিক আচরণ। কিন্তু এই প্রবণতা কেবল সামাজিক রুচির অবক্ষয় নয়; এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মর্যাদা এবং নিরাপত্তার উপর সরাসরি আঘাত।
পাবলিক প্লেসে দাঁড়িয়ে থাকা মানেই কেউ তার সম্মতি ছাড়া ভিডিও ধারণ ও প্রকাশের জন্য উন্মুক্ত এমন ধারণা আইনগত বা নৈতিকভাবে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বাস্তবতা হলো, অনুমতি ছাড়া ভিডিও করা এবং তা বিভ্রান্তিকর ক্যাপশনসহ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া একটি গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারে। একটি নিরীহ মুহূর্তকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে কাউকে সামাজিকভাবে হেয় করা, মানহানি ঘটানো, এমনকি পেশাগত বা ব্যক্তিগত জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনা এসব এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এর ফলে ভিক্টিমের কতটা মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তা কি আমরা ভেবে দেখি?
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের সাম্প্রতিক নীতিমালা যেখানে বিনা অনুমতিতে কারও ভিডিও প্রকাশ করলে কারাদণ্ড এবং সাইবার আইনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে তাকে আমরা স্বাগত জানাই। অনেকের কাছে এই পদক্ষেপ কঠোর মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই কঠোরতাই এখন প্রয়োজন। যখন সামাজিক নৈতিকতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ ব্যর্থ হয়, তখন আইনের হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
সমালোচকরা হয়তো বলবেন, এতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা নাগরিক সাংবাদিকতার ক্ষেত্র সংকুচিত হবে। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক বিভাজন টানতে হবে: জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার এক জিনিস, আর ব্যক্তিগত মুহূর্তকে অনুমতি ছাড়া ধারণ করে তা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রথমটি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে, দ্বিতীয়টি সেটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সুতরাং এই নীতিমালা কোনোভাবেই বৈধ সাংবাদিকতা বা জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের বিরুদ্ধে নয়; বরং এটি অপব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
আমরা ভুলে যাচ্ছি, ডিজিটাল স্পেসেও মানুষের মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকা উচিত। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা আমাদের দায়িত্ববোধকে খর্ব করার লাইসেন্স হতে পারে না। বরং যত বেশি ক্ষমতা, তত বেশি জবাবদিহিতা—এই নীতিই হওয়া উচিত পথনির্দেশক। বিনা অনুমতিতে ভিডিও ধারণ ও প্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান শুধু যৌক্তিকই নয়, সময়োপযোগীও বটে।
