সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করতে সরকারের পক্ষ থেকে যে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে, তা কেবল নগরের সৌন্দর্য বর্ধন নয় বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসন নিশ্চিতের জন্য একটি সাহসী পদক্ষেপ। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এই জঞ্জাল দূর করার পেছনে যেমন জননিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত, তেমনি এর সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের জাতীয় খাদ্য উৎপাদন ও রাজনৈতিক শুদ্ধাচারের বিষয়টিও।
বর্তমানে আমাদের গ্রামগুলোতে কৃষি শ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। একজন কৃষি শ্রমিকের দৈনিক মজুরি এখন গড়ে ৮০০-১০০০ টাকা, কাজের সময়ও অত্যন্ত নমনীয়। সকাল আটটায় কাজে গিয়ে মাগরিবের আজান দিলেই তারা ফিরে আসেন। তবুও গ্রামে পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। এর প্রধান কারণ হলো ঢাকা শহরের ফুটপাতে অবৈধ ব্যবসার মোহ। গ্রামের একজন কর্মক্ষম মানুষ যখন দেখেন যে কোনো পুঁজি, কর বা বিশেষ দক্ষতা ছাড়াই ঢাকার রাস্তায় দোকান বসিয়ে প্রতিদিন কৃষিকাজের চেয়েও বেশি আয় করা সম্ভব, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদনশীল কাজ ছেড়ে শহরের ফুটপাতে ভিড় করেন। এই “সহজ আয়ের” হাতছানি আমাদের গ্রামীণ জনশক্তিকে অনুৎপাদনশীল করে তুলছে। একইভাবে, বিপুল সংখ্যক মানুষ ঢাকায় আসছেন ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা চালিয়ে কম পরিশ্রমে বেশি টাকা আয়ের উদ্দেশ্যে। যদি হকার এবং তিন চাকার অবৈধ যানবাহন অনতিবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে দেশে চরম খাদ্য উৎপাদন ঘাটতি দেখা দেবে। অন্যদিকে, এই বিশাল জনশক্তি যখন শহরে অনুৎপাদনশীল কাজে লিপ্ত হয়, তখন তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে আয় কমে গেলে তারা অতি দ্রুত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, যা ঢাকাকে একটি অপরাধের নগরীতে পরিণত করতে পারে।
ফুটপাতে এই অবৈধ ব্যবসার একটি অন্ধকার দিক হলো এর রাজস্বহীনতা এবং চাঁদাবাজি। এই বিপুল সংখ্যক হকার সরকারকে কোনো ভ্যাট বা রাজস্ব দেয় না, বরং তারা স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও ক্যাডারদের মোটা অংকের চাঁদা দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে। এই অবৈধ অর্থই রাজনৈতিক দলগুলোর চাঁদাবাজির অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বিএনপির মতো দলের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। জনমনে বিএনপির ইমেজ নিয়ে যে “চাঁদাবাজির” অপবাদ বা আশঙ্কা রয়েছে, ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করার মাধ্যমে তারা সেই অপবাদ সহজেই মুছে ফেলতে পারে। দলের নেতাকর্মীরা যদি নিজেরা চাঁদাবাজি বন্ধ করে এবং উচ্ছেদ অভিযানে আন্তরিকভাবে অংশ নেয়, তবে জনগণের কাছে বিএনপির ভাবমূর্তি বহুগুণ উজ্জ্বল হবে।
ফুটপাত দখলমুক্ত করার পাশাপাশি পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা উচ্ছেদ। এই রিকশাগুলো মূলত অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে ব্যাটারি চার্জ দেয়, যা দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম কারণ। তাছাড়া এই চালকদের কোনো লাইসেন্স নেই, তারা রাস্তায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচল করে এবং হুটহাট ব্রেক করে মারাত্মক সব দুর্ঘটনা ঘটায়। এদের উচ্ছেদ করা গেলে এই চালকরা পুনরায় গ্রামে ফিরে কৃষি উৎপাদনে যুক্ত হতে বাধ্য হবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক।
এই শুদ্ধি অভিযান সফল করতে হলে প্রশাসনকে কৌশলী হতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ও মোড়গুলো দিয়ে শুরু করে পর্যায়ক্রমে পুরো শহর দখলমুক্ত করতে হবে। তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার কথা মাথায় রেখে একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে ‘হলিডে মার্কেট’ ব্যবস্থা। একেক দিন শহরের একেক নির্দিষ্ট এলাকায় বা ছুটির দিনগুলোতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফুটপাতে ব্যবসার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। এতে যেমন হকারদের কর্মসংস্থান টিকে থাকবে, তেমনি সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে শহর যানজটমুক্ত থাকবে এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে কোনো বিঘ্ন ঘটবে না। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সফল করতে হলে পুলিশ, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বৈধ ব্যবসায়ীদেরও আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো দিয়ে শুরু করে পর্যায়ক্রমে পুরো শহরকে অবৈধ দখলমুক্ত করার মাধ্যমেই কেবল একটি সুশৃঙ্খল মেগাসিটি এবং সমৃদ্ধ কৃষি অর্থনীতি নিশ্চিত করা সম্ভব।
