আলোকিত মানুষ সংক্রান্ত প্রথম তথ্য আমি পাই সম্ভবত ক্লাস সিক্সে।
তখন আমার স্কুলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের একটা শাখা খোলা হয়। মাসিক ফি-র বিনিময়ে সেখান থেকে বই আনা যেত। একটাই বই এক সাথে তুলে আনা যেত। আমি ভালোমতন বাছাই করে সেই বইটাই নিতাম যেটা সবাই পড়তে চাইতো। সব বই সেখানে পাওয়া যেত না। এমন বই-ই পাওয়া যেত যেগুলো মানুষকে “আলোকিত” করে। যে বই আমায় অন্ধ করে, যে বই আমায় বন্ধ করে-সেই জাতীয় বই সেখানে পাওয়া যেত না। কাজেই আমার মতন অন্ধতমিস্র বাসিন্দাদের সেখানে মজা পাবার কথা না।
তবু কিছু বই আমি নিতাম। নিয়ে দশ টাকার বিনিময়ে বন্ধুদের কাছে দুইদিনের জন্য ধার দিতাম।
এভাবে এক সপ্তাহে আমার ত্রিশ টাকা উঠতো। তারপর আবার অন্য একটা বই আনতাম। এভাবে মাসে আমার একশ বিশ টাকা উঠতো। দ্রুত পড়তাম বলে ধার দেবার আগে বইটা নিজে পড়ে ফেলতাম। বইও পাওয়া যেতো, লাভও হতো। একেবারে সামাজিক ব্যবসা যাকে বলে। কিন্তু সেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের শাখা বেশিদিন আমাদের স্কুলে টিকতে পারেনাই—সম্ভবত আমার মতন আরও অনেক কিশোর উদ্যোক্তার কারণে। অবশ্য সেই সময়ে ইমার্জেন্সি চালু হয়ে গেলো। সেটাও আরেকটা কারণ হতে পারে।
আলোকিত মানুষ হবার দ্বিতীয় জনম আমি পেয়েছিলাম সিলেটি এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের লেখা পড়ে। তিনি কিশোর উপন্যাস লিখতেন, যেখানে সবসময় একটা নির্দিষ্ট ধরণের লোক ভিলেনের ভূমিকায় থাকতো। আর সায়েন্স ফিকশন লিখতেন। আমি সমগ্র কৈশোর জুড়ে বিপুল বিক্রমে তাকে নকল করে কিশোর উপন্যাস আর সায়েন্স ফিকশন লেখার চেষ্টা করতাম। সেগুলা এতোই ফটোকপির ফটোকপির মতন দূর্বল কালির হতো যে ছাপা বা পড়ারও অযোগ্য হয়ে রইতো। তার পরেও দীর্ঘদিন আমি তার ফ্যানবয় ছিলাম। এমনকি তাকে দেখে আমার জীবনের প্রথম রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম একদিনের জন্যে। সেই অংশ নিয়ে এমন ছ্যাকা খেয়েছিলাম যে অনার্স জীবন পার করেছি সেই আন্দোলনে আমাদের সবার অংশ নেয়া কত ভুল ছিলো তাই নিয়ে আলাপ করে করে। প্রথমদিকে সকলে আমাকে এ নিয়ে নিন্দামন্দ করতো। তবে ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের সময় সেই ব্যক্তির ব্যাপক ডিসেন্ট্রি হয় এবং তিনি অনবরত শব্দ করতেন! এমন বমি করতে থাকলেন য আমার প্রজন্মের বড় একটি অংশেরও তাকে নিয়ে বদহজম প্রকাশিত হয়।
তবে এতো পরে আসার আগে আরেক মহা আলোকিত মানবের পরিচয় দিতে হয় যিনি আমাকে কেলিয়ে আলোকিত করবার চেষ্টা করেছিলেন। তখন আমি মানুষ হবার জন্য শিক্ষা ট্যাগলাইন ধারী এক আধা বেসামরিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র। স্বভাবতই আমি তখনও সংগঠন করি এবং পড়ালেখা বিশেষ করি না কারণ আমার তথাকথিত প্রাকৃতিক বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতির ওপরেই একরকম বিতৃষ্ণা জন্মে গেছে। যাইহোক, আমি এক সংগঠনের সভাপতি ছিলাম আর আরেক সদৃশ নামসম্বলিত এক সংগঠনের কুকির্তীর কারণে আমাকে ডেকে এনে সেই আলোকিত ব্যক্তিত্ব ঘটা করে শিক্ষকদের দিয়ে আমাকে উদুম কেলানি দেন। এই একই ব্যক্তিত্ব নবীনবরণের দিন আমাদের সীমানার বাইরে স্বপ্ন দেখতে উদবুদ্ধ করেছিলেন। ততদিনে আমি তার উপদেশমাফিক বইটই পড়ে বিদেশে একটা স্কলারশিপ বাগিয়ে ফেলেছি। তবে সেইসব সীমা পরিসীমা ছাড়িয়ে আমার আধা-বেসামরিক ক্যাটাগরিতে তথ্য আদায়ের উপলক্ষ্যে বিনা অপরাধে যে গুরুর মুষ্ঠি-ছোঁয়া খেয়ে গুরুর চরণে পতিত হতে হয়।
তখন থেকেই আমি সুন্দর কথা বলা, পরিশিলিত, স্পষ্ট উচ্চারণের ইনভিসিবল উত্তরীয় গায়ে চড়ানো মানুষদেরকে অবিশ্বাস করি।
যে ব্যক্তি পশ্চিমা একসেন্টে বাংলা বলে, তাকেই আমি ভয় পাই। কারণটা যতটা দার্শনিক তার চেয়ে প্রায়োগিক বেশি। যতবার আমি এমন মানুষদেরকে পেয়েছি, ততবারই তারা আমাকে পেয়ে বসতে চেয়েছে, না পেয়ে বসতে পারলে উদুম কেলানি দিয়েছে।
“আলোকিত মানুষ” বিষয়টি নিয়ে আমার বিতৃষ্ণা নিয়ে এই বিতং করবার কারণ হলো নিজের বায়াসটা সবার সামনে তুলে ধরা, যেটা সামাজিক বিজ্ঞানে দস্তুর। তবে এই কাজটা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে করা নিতান্ত জরুরি নয়।
আমাদের ছোটবেলায় এই আলোকিত মানুষগণ শিক্ষাখাতে একটা বিশেষ ধারার আনায়ন করেন যেটার নাম ছিলো “বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা।” এই বিজ্ঞান বলতে বিশুদ্ধ জ্ঞান নয়, বরং গণিত তাড়িত জ্ঞানকেই বুঝানো হয়। আমরা সকলে সেই ব্যান্ডওয়াগনে চেপে একটি পত্রিকার পয়সায় গণিত উৎসব করে এমন অবস্থায় সেই পত্রিকাকে দশ বছরে নিয়ে গেলাম যে একটা পর্যায়ে তারা আদিবাসীকে উপজাতি বলে আমাদের নামে লেখা প্রকাশ করলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে দেবু মামার বাড়িতে সেই পত্রিকা পৌঁছাবে বলে আমাদের তাদেরকে আবার নতুন লেখা পাঠাতে আবারও ইচ্ছে করে ওঠে। এই পত্রিকা আর কি কি করেছে সেই বক্তব্যে আমি যাবোনা কারণ তাতে আমার এমন মার খেতে হবে যে বুদ্ধিজীবি হিসেবে না থাকবে আমার বুদ্ধির দাম, না চলবে আমার জীবিকা।
তো বিজ্ঞানভিত্তিক আলোকিত মানুষের যে মডেলে দুনিয়া চলছিলো সেখানে বিজ্ঞান মানে আবার শুধুই পশ্চিমা বিজ্ঞান আর ভাষা মানে শুধু পশ্চিমা বাংলা ভাষা। এই দুই পশ্চিম আবার দুই ভিন্ন পশ্চিম। বিজ্ঞানের পশ্চিম অপর মহাদেশে আর ভাষার পশ্চিম সীমান্ত সংলগ্ন পশ্চিম। এমনই এক অবস্থা তারা হাজির করেছে যে এই যে আমি তাদের সমালোচনা করে লেখা লিখছি, তাও আমি লিখছি পশ্চিমা ঢঙ্গেই। কেননা লেখার ভাষায় এটাই দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে– ভাই ভাইবা দেখেন, কোন হালায় “কেননা” বা “দস্তুর” শব্দটা একটা সত্যিকারের বাংলা কথ্য ভাষায় ব্যবহার করে?
কিন্তু এটাই সায়েন্স! তারা ঠিক করে দেবে বিশুদ্ধ জ্ঞান কোনটা আর অশ্লীল জ্ঞান কোনটা। তারা ঠিক করে দেবে ইতিহাসের গতিমুখ কোনটা। তারা ঠিক করে দেবেন কোন বই আমাকে অন্ধ করে আর কোন বই চোখ খুলে দেয়। যে বই তাদের লাইব্রেরিতে নাই, যে চেহারা তাদের ভিলেনের আছে, যে স্বপ্ন তাদের ভাষণে আছে–সেগুলাই ভীষণ কাম্য। বাকিটা নয়।
তবে এই আলো কিসের আলো? এই আলো হলো মূলত ইয়ুরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের বাংলা পরিভাষা। এই আদ্যিকালের এনলাইটেনমেন্টের আমলে আবিস্কার হইলো যে সায়েন্টিফিক মেথড হইলো সত্য আবিষ্কারের সর্বোচ্চ টোটকা। যেটাকে কার্য এবং কারণের গণ্ডিতে ফেলে দেয়া যায়, সেটাকেই ব্যাখ্যা করা যায় আর সেই ব্যাখ্যা থেকেই জীবনের সকল সমস্যাকে সমাধান করা যায়। এবং এই পথে তাদের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ালো পশ্চিমা সংগঠিত ধর্ম–মূলত ক্যাথোলিসিজম। তাই তারা ধর্মকে শত্রুজ্ঞান করলেন। এবং সফল হলেন। নিজস্ব নানা দলাদলি ও বিজ্ঞানের আক্রমণে ধর্ম এতোটাই দূর্বল হয়ে গেলো যে এক পর্যায়ে ফ্রেডরিখ নিৎশা ঘোষণা করলেন যে ঈশ্বর মৃত আর তারও আগে মার্ক্স ধাপ করে বলে ফেললেন যে ধর্ম হলো জনতার আফিম।
এখন এই মার্ক্স আর নিৎশার কথা যখন উঠলোই, তখন একটু থামা যাক। কারণ এই দুইজনের কথা আমাদের আলোকিত মানুষেরা বড় আগ্রহ নিয়ে বলেন, কিন্তু বলেন অর্ধেকটা। মার্ক্স বললেন ধর্ম আফিম, সেটা তারা মুখস্ত করলেন। কিন্তু মার্ক্স আরও বললেন যে ধর্ম হলো হৃদয়হীন পৃথিবীর হৃদয়, আত্মাহীন পরিস্থিতির আত্মা। সেই অংশটুকু তারা সুবিধামতন বাদ দিলেন। কারণ সেই অংশটুকু স্বীকার করলে তাদের পুরা ন্যারেটিভটাই গোল হয়ে যায়। তখন আর শুধু “ধর্ম মানেই অন্ধকার” বলে পার পাওয়া যায় না। তখন প্রশ্ন করতে হয় যে মানুষ কেন ধর্মে যায়, কোন শূন্যতা তাকে সেদিকে টানে, আর সেই শূন্যতা পূরণের দায়িত্ব কে নেবে। নিৎশা বললেন ঈশ্বর মৃত, সেটা আমাদের আলোকিত মহল উৎসবের সাথে গ্রহণ করলেন। কিন্তু নিৎশা তো এটা উদযাপন করে বলেননি। তিনি বলেছিলেন ভয়ে, উদ্বেগে। কারণ তিনি জানতেন যে ঈশ্বরকে সরিয়ে দিলে যে শূন্যস্থান তৈরি হবে সেটা পূরণ করতে গিয়ে মানুষ আরও ভয়ংকর কিছু বসাবে সেখানে। এবং বসিয়েছেও। বিশ শতকের ইতিহাস তার সাক্ষী। ঈশ্বরের জায়গায় বসলো রাষ্ট্র, বসলো পার্টি, বসলো নেতা, বসলো আইডিওলজি। এবং এরা প্রত্যেকে ঈশ্বরের চেয়ে বেশি রক্ত ঝরিয়েছে, কারণ ঈশ্বরের অন্তত একটা ক্ষমার ধারণা ছিলো, এদের তা নাই।
কিন্তু আমাদের আলোকিত মানুষেরা এই জটিলতায় যেতে রাজি না। তাদের দুনিয়া সরলরৈখিক। একদিকে আলো, আরেকদিকে অন্ধকার। একদিকে বিজ্ঞান, আরেকদিকে কুসংস্কার। একদিকে প্রগতি, আরেকদিকে প্রতিক্রিয়া। এই বাইনারি তারা এতো জোরে আঁকড়ে ধরেন যে এটাই তাদের ধর্ম হয়ে দাঁড়ায়। তারা নিজেরাই একটা চার্চ বানিয়ে ফেলেন যেখানে বিজ্ঞান হলো ঈশ্বর, র্যাশনালিটি হলো প্রার্থনা, আর যে কেউ প্রশ্ন করলে সে হেরেটিক। মধ্যযুগের ক্যাথলিক চার্চ যা করতো, এরা সেটাই করেন, শুধু পোশাক বদলে গেছে।
এবার আসি আমাদের দেশের প্রসঙ্গে। বাংলাদেশে এই এনলাইটেনমেন্টের আমদানি হয়েছে একটা খুব নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ হিসেবে। এটা কোনো জ্ঞানতাত্ত্বিক আন্দোলন ছিলো না। এটা ছিলো একটা শ্রেণির ক্ষমতা ধরে রাখার হাতিয়ার। যারা ইংরেজি বলতে পারেন, যারা ঢাকার নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় বড় হয়েছেন, যারা নির্দিষ্ট কিছু স্কুলে পড়েছেন, তারা নিজেদের “আলোকিত” ঘোষণা করলেন। আর বাকি সবাই হলো আলোকিত হবার অপেক্ষায় থাকা অন্ধকারের বাসিন্দা। এটা কলোনিয়ালিজম এর সবচেয়ে পুরনো কৌশল। হোয়াইট ম্যানস বার্ডেনের বাংলা সংস্করণ। শুধু সাদা চামড়ার বদলে এসেছে শুদ্ধ উচ্চারণ, আর আফ্রিকার বদলে এসেছে বরিশাল, সিলেট, রংপুর।
আমি নিজে খুলনা এলাকার মানুষ। আমারা বাসায় যখন কথা বলি তখন এমন সব শব্দ থাকে যেগুলার ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। সেই ভাষাকে আমাদের আলোকিত মানুষেরা বলেন “আঞ্চলিক ভাষা”, যেন সেটা মূল ভাষার একটা বিকৃত সংস্করণ। অথচ ভাষাবিজ্ঞান বলে যে প্রতিটি কথ্য ভাষাই সমান বৈধ, কোনোটাই অপরটার বিকৃতি নয়। কিন্তু সেই বিজ্ঞান তারা মানবেন না। কারণ সেই বিজ্ঞান তাদের ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন করে। ভাই, নাগরি তো আলাদা ভাষা। রাজবংশী আলাদা ভাষা। চাটগাইয়া আলাদা ভাষা। এগুলা আপনি পারেননা সেটা আপনার ঝামেলা। সেটার বোঝায় সারা বাংলাদেশের মানুষ এখন পশ্চিমা ভাষায় লেখে আর পশ্চিমা টোনে নিজেদের শিক্ষা প্রমাণের চেষ্টা করে।
এই আলোকিত মানুষদের আরেকটা মজার বৈশিষ্ট্য হলো তারা সবসময় একটা “পশ্চিম” এর দিকে তাকিয়ে থাকেন। সেই পশ্চিম তাদের মাথায় একটা আদর্শ হিসেবে বসে আছে যেটা বাস্তবে কোথাও নাই। তারা যে পশ্চিমকে চেনেন সেটা মূলত কিছু বই, কিছু TED Talk, আর কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে তৈরি একটা ফ্যান্টাসি। আসল পশ্চিমে গেলে তারা দেখতেন যে সেখানেও মানুষ চার্চে যায়, সেখানেও মানুষ ক্রিসমাস পালন করে, সেখানেও মানুষ মৃত্যুর পরে কি হবে তা নিয়ে ভাবে। সেখানেও মানুষ কমিউনিটি খোঁজে, অর্থ খোঁজে, ‘বিলংগিং’ খোঁজে। কিন্তু সেই পশ্চিমকে দেখলে তো আর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা যায় না।
আমি আলোকিত মানুষ চাই না। কারণ আলোকিত মানুষ মানেই এমন কেউ যে ভাবে সে আলো দেখেছে আর বাকিরা অন্ধকারে আছে। এই ভাবনাটাই সহিংস। এই ভাবনাটাই এমন একটা কাঠামো তৈরি করে যেখানে কিছু মানুষ অন্য মানুষদের “সভ্য” করবার অধিকার রাখে। এবং ইতিহাস বলে যে যখনই কেউ অন্যকে সভ্য করতে গেছে, তখনই সে আসলে অন্যকে বশ করতে গেছে। আমি বরং এমন মানুষ চাই যে জানে যে সে জানে না। যে জানে যে তার আলো আরেকজনের চোখে ঝলসানি হতে পারে। যে বুঝতে পারে যে জ্ঞান শুধু বই আর ল্যাবে থাকে না, থাকে মাঠে, থাকে রান্নাঘরে, থাকে নানীর মুখের গল্পে, থাকে মাঝির নৌকা চালানোর কৌশলে। যে স্বীকার করতে পারে যে তার এনলাইটেনমেন্ট আরেকজনের অন্ধকার তৈরি করতে পারে।
কিন্তু সেরকম মানুষ তো টিভিতে ভালো দেখায় না। সেরকম মানুষ তো মঞ্চে দাঁড়িয়ে “স্বপ্ন দেখো” বলে হাজার হাজার তরুণকে হাততালি দিতে পারে না। সেরকম মানুষের তো ট্যাগলাইন থাকে না। কাজেই তাদের বাজারদর কম। আর আমাদের আলোকিত মানুষেরা যদি কিছু ভালো বোঝেন, সেটা হলো বাজার।
আর এই বাজারের কথাটাই আসলে মূল কথা। কারণ আলোকিত মানুষ তৈরির পুরো প্রকল্পটাই শেষমেশ একটা বাজার। ভাবুন তো, কারা এই আলোকিত মানুষ তৈরির কারখানা চালান? তারা বই বিক্রি করেন। তারা ওয়ার্কশপ বিক্রি করেন। তারা মোটিভেশনাল স্পিচ বিক্রি করেন। তারা স্কলারশিপের গাইডলাইন বিক্রি করেন। তারা “সঠিক পথ” বিক্রি করেন। এবং যে কোনো বিক্রেতার মতনই তাদেরও দরকার এমন একটা ক্রেতাশ্রেণি যারা মনে করে তাদের কিছু একটা অভাব আছে। আলোকিত মানুষের বাজারে সেই অভাবটা হলো “অন্ধকার”। আপনি যদি মনে না করেন যে আপনি অন্ধকারে আছেন, তাহলে তো আলোর দোকানে আপনার যাবার কথা না। কাজেই আপনাকে প্রথমে বোঝাতে হবে যে আপনি অন্ধকারে আছেন। আপনার নানীর শেখানো জ্ঞান অন্ধকার। আপনার মায়ের রান্নাঘরের বিজ্ঞান অন্ধকার। আপনার গ্রামের চাষীর মাটি চেনার ক্ষমতা অন্ধকার। এগুলা অন্ধকার কারণ এগুলার কোনো সার্টিফিকেট নাই, পিয়ার রিভিউ নাই, ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর নাই। এগুলা অন্ধকার কারণ এগুলা ইংরেজিতে লেখা নাই।
এখন কেউ বলতে পারেন যে আমি নিজেও তো এই আলোর দোকান থেকেই কিনে খেয়েছি। একদম ঠিক। আমি সেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়েছি। সেই পত্রিকায় লিখেছি। সেই স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে গেছি। আমি এই লেখাটাই লিখছি সেই পশ্চিমা বাংলায় যেটার সমালোচনা করছি। এটা আমি জানি। এবং এটাই আসলে সবচেয়ে বড় সমস্যা। এই আলোকায়নের প্রকল্প এতোটাই গভীরে ঢুকে গেছে যে এর সমালোচনা করতে গেলেও এর ভাষাতেই করতে হয়। এর বাইরে দাঁড়ানোর জায়গাটাই তারা নষ্ট করে দিয়েছেন। আপনি যদি তাদের ভাষায় না লেখেন তাহলে আপনি “অশিক্ষিত”। আর যদি লেখেন তাহলে আপনি ইতিমধ্যেই তাদের জালের ভেতরে। এটা একটা দারুণ ফাঁদ, স্বীকার করতেই হবে।
তবু আমি মনে করি এই ফাঁদটা চিনতে পারাটাই প্রথম কাজ। ফাঁদ থেকে বের হবার আগে ফাঁদটা যে ফাঁদ সেটা তো জানতে হবে। আমাদের এই পুরো শিক্ষাব্যবস্থা, আমাদের পুরো বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎ একটা নির্দিষ্ট ছাঁচে তৈরি। সেই ছাঁচটা ভাঙার কথা আমি বলছি না, কারণ সেটা বললে আমি নিজেই আরেকজন আলোকিত মানুষ হয়ে যাই যে অন্যদের বলছে কোনটা সঠিক পথ। আমি শুধু বলছি ছাঁচটা চিনুন। জানুন যে আপনি একটা ছাঁচের ভেতরে আছেন। জানুন যে এই ছাঁচ কারা বানিয়েছে, কেন বানিয়েছে, কার লাভে বানিয়েছে।
আর তারপর নিজে ঠিক করুন আপনি কি করবেন। হয়তো আপনি সেই ছাঁচেই থাকবেন, কারণ সেটাই আপনার জন্য কাজ করে। সেটা ঠিক আছে। হয়তো আপনি বের হতে চাইবেন। সেটাও ঠিক আছে। কিন্তু অন্তত সেই সিদ্ধান্তটা হোক আপনার নিজের, কোনো মঞ্চের ওপর থেকে নেমে আসা আলোর ঝলকানিতে চোখ ধাঁধিয়ে নেয়া সিদ্ধান্ত না।
আমি আলোকিত মানুষ চাই না। আমি এমন মানুষ চাই যে অন্ধকারকে ভয় পায় না। যে জানে যে অন্ধকার মানেই অজ্ঞতা নয়, কখনও কখনও অন্ধকার মানে বিশ্রাম, কখনও অন্ধকার মানে গর্ভ, কখনও অন্ধকার মানে এমন একটা জায়গা যেখানে চোখ বন্ধ করে নিজের কথা শোনা যায়। আলোকিত মানুষেরা এতো ব্যস্ত অন্যকে আলো দেখাতে যে নিজেদের ছায়াটা দেখার ফুরসত তাদের নাই। আর যে মানুষ নিজের ছায়া দেখেনি, সে মানুষ আমাকে পথ দেখাবে, এই ভরসা আমার নাই।
শেষ করি একটা কথা বলে। আমার ঠাকুমা কোনোদিন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়েননি। তিনি গণিত অলিম্পিয়াডে যাননি। তিনি TED Talk দেখেননি। তিনি ইংরেজি জানতেন না। তিনি মার্ক্স পড়েননি, নিৎশা পড়েননি। তবু তিনি জানতেন কখন বৃষ্টি আসবে। তিনি জানতেন কোন মাটিতে কোন ফসল হয়। তিনি জানতেন কোন গাছের পাতায় কোন রোগ সারে। তিনি জানতেন মানুষের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় যেন সে কথা শোনে। তিনি জানতেন শোকে কিভাবে পাশে দাঁড়াতে হয়। এবং তিনি এই সবকিছু জানতেন কোনো সার্টিফিকেট ছাড়া, কোনো ট্যাগলাইন ছাড়া, কোনো মঞ্চ ছাড়া।
আমাদের আলোকিত মানুষদের হিসাবে তিনি অন্ধকারের মানুষ।
আমার হিসাবে তিনিই একমাত্র আলো যেটা কোনোদিন আমার চোখ ঝলসায়নি।
আমি আপনাদের আলোকিত মানুষ চাই না। আমি এমন মানুষ চাই, যে আলো আঁধারির এই বাইনারির বাইরে, এমনকি ভাষার সিনট্যাক্সের বাইরে, এ-আই প্রম্পটের বাইরে চিন্তা করতে জানেন। তা না হলে যে গভীর অন্ধকারে আমাদেরকে এই ইয়ুরোপিয় আলোক ফেলেছে, ধরেন সেটা পরিবেশ বিপর্যয় থেকে শুরু করে পারমাণবিক মৃত্যুশংকা পর্যন্ত—সেখান থেকে আমরা কোনদিন বের হতে পারবো না।
শেষ করি আপনাদের আলোকিত মানুষদের পরদাদাদের অপছন্দের ক্যাথলিক চার্চের নিউ টেস্টামেন্টের একটা লাইন দিয়ে—
De profundis clamavi ad te, Domine.
“Out of the depths I have cried to you, O Lord”
অনুপম দেবাশীষ রায় মুক্তিপত্রের প্রধান সম্পাদক। তার সাথে যোগাযোগের ঠিকানা anupam.roy@sociology.ox.ac.uk
