ছোটবেলায় করলা ছিল ভীষণ অপ্রিয়। অপ্রিয় বলতে, খেতামই না। একটা সময় পরিস্থিতির কারণে খেতে হলো। কিছুটা ভালোও লাগল। এখন করলা আমার অন্যতম পছন্দের সবজি। খাদ্যাভ্যাসের এই সামান্য পরিবর্তন আমাকে হঠাৎ একটা রাজনৈতিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—রাজনীতিও কি এমন?
যে মানুষ একসময় একটা মতাদর্শকে ঘৃণা করত, সে কি পরে সেই মতাদর্শেরই সমর্থক হতে পারে? কিংবা আরও মজার প্রশ্ন, যে ব্যক্তি একটি রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করল, সে যদি শেষে তার প্রায় বিপরীত অবস্থানে গিয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আমরা তাকে কী বলব? বিবর্তিত? বাস্তববাদী? নাকি স্রেফ সুবিধাবাদী?
উইনস্টন চার্চিল রাজনৈতিক জীবনে একবার দল বদলেছিলেন, আবার দুই দশকের বেশি সময় পর আগের দলেও ফিরে গিয়েছিলেন। ১৯০৪ সালে তিনি কনজারভেটিভ পার্টি ছেড়ে লিবারেল পার্টিতে যোগ দেন এবং ১৯২৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কনজারভেটিভ পার্টিতে ফিরে যান। পরে তাঁর নামে একটি মজার মন্তব্য প্রচলিত হয়—“Anyone can rat, but it takes a certain amount of ingenuity to re-rat.”
অন্যদিকে, রোনাল্ড রিগানের রাজনৈতিক রূপান্তরও বেশ নাটকীয়। তিনি রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে ডেমোক্র্যাট ছিলেন এবং ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের রাজনীতির প্রতি তাঁর সমর্থন ছিল। পরে তিনি মার্কিন রাজনীতির অন্যতম প্রধান রক্ষণশীল নেতা হয়ে ওঠেন। নিজের রাজনৈতিক পরিবর্তন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, “I didn’t leave my party; my party left me.”
অর্থাৎ একজন মানুষ দল বদলাতে পারেন। কিন্তু আরও বড় প্রশ্ন হলো, তিনি কি শুধু দল বদলান, নাকি নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসও বদলে ফেলেন।
কখনো কখনো একজন রাজনীতিক নিজের পুরোনো নীতির সঙ্গেও সংঘাতে যেতে পারেন।
থমাস জেফারসন ছিলেন সংবিধানের ক্ষমতার সীমা নিয়ে বেশ কঠোর ব্যাখ্যার পক্ষে। কিন্তু ১৮০৩ সালের লুইজিয়ানা ক্রয়ের সময় তিনি একটি সাংবিধানিক সমস্যার মুখোমুখি হন। নতুন ভূখণ্ড অধিগ্রহণের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারকে সংবিধানে স্পষ্টভাবে দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে তাঁর নিজেরই সংশয় ছিল। এমনকি তিনি এ বিষয়ে সংবিধান সংশোধনের খসড়াও তৈরি করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই সংশোধনের অপেক্ষা না করে তিনি চুক্তিটি এগিয়ে নেন।
এখানে জেফারসন কি নিজের আদর্শের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন, নাকি বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে নিজের আদর্শের সীমাটা নতুন করে বুঝেছিলেন? ইতিহাস অবশ্য খুব সহজ উত্তর দেয় না।
একজন মানুষ নিজের পুরোনো বিশ্বাস পরিবর্তন করতে পারেন। কিন্তু কেন পরিবর্তন করেন?
নতুন তথ্য পেয়েছেন বলে?
বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর পুরোনো ধারণাকে দুর্বল করেছে বলে?
এটা কি নিজের ভুল স্বীকার করার ফল?
নাকি ক্ষমতার সমীকরণ বদলেছে বলে মতাদর্শও বদলে যায়?
এখানেই দর্শন আমাদের একটু সাহায্য করতে পারে।
হেগেলের দ্বান্দ্বিক চিন্তাকে(dialectic) জনপ্রিয়ভাবে অনেক সময় ‘থিসিস–অ্যান্টিথিসিস–সিনথেসিস’ দিয়ে বোঝানো হয়। যদিও এই তিনটি শব্দকে হেগেলের নিজের আনুষ্ঠানিক সূত্র হিসেবে দেখানো ঠিক নয়, তাঁর চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, একটি ধারণার ভেতরের দ্বন্দ্ব বা সীমাবদ্ধতা কখনো কখনো তাকে নতুন অবস্থানের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
রাজনীতিতেও কি এমন হতে পারে?
একজন মানুষ একটা বিশ্বাস নিয়ে শুরু করলেন। পরে বাস্তবতা সেই বিশ্বাসের কিছু সীমাবদ্ধতা দেখাল। তিনি অন্য দিকে গেলেন। তারপর হয়তো আবার এমন একটা জায়গায় দাঁড়ালেন, যেখানে পুরোনো বিশ্বাসের কিছু অংশও রয়ে গেল, নতুন অভিজ্ঞতার কিছু অংশও যোগ হলো।
তাহলে তিনি কি আগের মতাদর্শকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করলেন?
নাকি সেটাকেই অন্যভাবে বুঝলেন?
আইজায়াহ বার্লিনের ‘value pluralism’ আমাদের আরেকটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়। রাজনৈতিক জীবনে সব মূল্যবোধকে একই সঙ্গে সর্বোচ্চ মাত্রায় পাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। স্বাধীনতা, সমতা, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার কিংবা ব্যক্তিস্বাধীনতার মতো মূল্যবোধ অনেক সময় একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে যায়।
তাহলে রাজনৈতিক মতাদর্শ কি আসলে একটি স্থির প্যাকেজ? নাকি সময়ের সঙ্গে একজন মানুষ নিজের পুরোনো মতাদর্শের ভেতর থেকেই নতুন ব্যাখ্যা খুঁজে নিতে পারেন?
হয়তো পারেন।
ধরুন, একজন রাজনীতিবিদ বিরোধী দলে থাকাকালে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ছিলেন। ক্ষমতায় গিয়ে তিনি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিলেন। তাহলে কি এটা আদর্শগত বিবর্তন, নাকি ক্ষমতার অঙ্ক?
আর এখানেই বিষয়টি আরও জটিল হয়ে যায়।
একজন নেতার মতাদর্শ বদলের মূল্যায়নও কি অনেক সময় তার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না? ফল ভালো হলে একই পরিবর্তনকে দূরদর্শিতা বলা হতে পারে, আর ফল খারাপ হলে সেটাকেই সুবিধাবাদ বা ভণ্ডামি হিসেবে দেখা হতে পারে।
ম্যাকিয়াভেলির রাজনীতির বাস্তববাদী পাঠও এখানে আরেকটি প্রশ্ন সামনে আনে—রাজনীতিতে নীতি, উদ্দেশ্য ও ফলাফল কি সবসময় একই দিকে হাঁটে?
সম্ভবত মানুষের রাজনৈতিক পরিচয়কে একটা স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে দেখা একটু কঠিন।
মানুষ যেমন বয়সের সঙ্গে নিজের খাবারের রুচি বদলায়, তেমনি অভিজ্ঞতা, ইতিহাস, অর্থনীতি কিংবা ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তার চিন্তাকেও বদলে দিতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তন কোথায় গিয়ে বিশ্বাসের বিবর্তন, আর কোথায় গিয়ে সুবিধার সঙ্গে বিশ্বাসের সমন্বয়—সেটা হয়তো এত সহজে বলা যায় না।
কারণ মতাদর্শ বদলানো নিজেই সবকিছু বলে না। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পরিবর্তনের কারণ, প্রক্রিয়া এবং তার পরিণতি।
একটু করলা ভাজিতে ফিরে আসা যাক। ছোটবেলায় অপছন্দের করলা এখন খুব প্রিয় একটি খাবার।
তাহলে রাজনীতিও কি কখনো এমন হতে পারে? একসময় যেটাকে আমরা তেতো মনে করেছিলাম, সময়ের সঙ্গে সেটার স্বাদ বদলে যেতে পারে? নাকি রাজনীতিতে করলা বদলালে, ভাজিটাও বদলে যায়?
জন মেনার্ড কেইনসের নামে বহুল-উদ্ধৃত, যদিও নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়, একটি উক্তি দিয়ে শেষ করা যাক—“When the facts change, I change my mind. What do you do, sir?”
