মূল: ফিলিক্স গুয়াতারি
অনুবাদক: আজমাঈন ফারহিন
[অনুবাদকের ভূমিকা: ফিলিক্স গুয়াতারি (Felix Guattari) একজন ফরাসি মনোবিশ্লেষক, দার্শনিক এবং সেমিওটিশিয়ান। তিনি ফরাসি দার্শনিক জিল ডেলুজ (Gilles Deleuze)-এর সাথে ১৯৭২ সালে Anti-Oedipus ও ১৯৮০ সালে A Thousand Plateaus প্রকাশ করেন। লেখাটি গুয়াতারির প্রবন্ধ Everybody Wants to Be a Fascist এর শেষার্ধের অনুবাদ। এটি তিনি ১৯৭৩ সালে ইতালিতে অনুষ্ঠিত “Psychoanalysis and Politics” শীর্ষক একটি কনফারেন্সে বক্তৃতা হিসেবে উপস্থাপন করেন, যা পরবর্তীতে প্রবন্ধ হিসেবে প্রকাশ করা হয়। মূল বক্তৃতা ফরাসি ভাষায় হলেও, সিলভের লটরিঞ্জার (Sylvere Lotringer) এর ইংরেজি অনুবাদ করেন এবং এই লেখাটা মূলত তারই বাংলা অনুবাদ। ৭০-এর দশকে যখন গুয়াতারি এই প্রবন্ধ লেখেন তখন অনেকেই ফ্যাসিবাদকে একটি ঐতিহাসিক ভুল ভাবতে শুরু করে, যা মানুষ পেছনে ফেলে এসেছে। কিন্তু গুয়াতারি আমাদের সতর্ক করেন যে, ফ্যাসিবাদ শেষ হয়ে যায়নি, বরং এটি প্রতিনিয়ত বিবর্তিত হতে থাকে এবং এর প্রাণভোমরা আমাদের প্রত্যেকের কামনাশক্তির মধ্যেই নিহিত আছে। বর্তমান সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প কিংবা ভারতে বিজেপির উত্থান থেকে শুরু করে, ইউরোপে উগ্র জাতীয়তাবাদী ডানপন্থী রাজনীতির উত্থানের সঙ্গে গুয়াতারির সতর্কবাণী ক্রমেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। ]
ইনকুইজিশন ছিল এক ধরনের ফ্যাসিবাদী যন্ত্রের আদি সূচনা, যা আজ অবধি নিজেকে বিকশিত ও নিখুঁত করে চলেছে। সুতরাং আমরা দেখছি যে, ফ্যাসিবাদের আণবিক উপাদানগুলোর বিশ্লেষণ বিভিন্ন পরিসরে করা সম্ভব। এটি সেই একই ফ্যাসিবাদ, যা ভিন্ন ভিন্ন রূপে আমাদের পরিবারে, স্কুলে বা ট্রেড ইউনিয়নে আজও চলমান রয়েছে। আধুনিক যুগের সর্বগ্রাসীবাদের (Totalitarianism) বিরুদ্ধে সংগ্রাম তখনই সংগঠিত করা সম্ভব হবে, যখন আমরা এই যন্ত্রের ধারাবাহিকতা স্বীকার করতে প্রস্তুত হবো। সামাজিক পরিসরে কামনার (Desire) প্রশ্নগুলো মোকাবিলা করার অনেক উপায় রয়েছে। আমরা চাইলে প্রশ্নগুলোকে উপেক্ষা করতে পারি, অথবা সরলীকৃত কোনো রাজনৈতিক ছকে নামিয়ে আনতে পারি। আবার আমরা চাইলে তাদের রূপান্তর, স্থানচ্যুতি এবং বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য তারা যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে, তা আয়ত্ত করার চেষ্টাও করতে পারি। স্তালিনবাদ এবং ফ্যাসিবাদকে সাধারণত একে অপরের বিপরীত হিসেবে দেখা হয়, কারণ আপাতদৃষ্টিতে তাদের সংজ্ঞা সম্পূর্ণ আলাদা। অন্যদিকে সব ধরনের ফ্যাসিবাদকে একই শিরোনামের নিচে রাখা হয়। অথচ, বিভিন্ন ধরনের ফ্যাসিবাদের মধ্যেকার পার্থক্য সম্ভবত স্তালিনবাদ ও নাৎসিবাদের কিছু দিকের পার্থক্যের চেয়েও অনেক গভীর। এই পার্থক্যগুলোকে চিহ্নিত করার পাশাপাশি একটি সর্বগ্রাসী যন্ত্রের ধারাবাহিকতাকে খুঁজে বের করতে চাওয়া মোটেও পরস্পরবিরোধী নয়, যে যন্ত্রটি ফ্যাসিবাদী, স্তালিনবাদী, বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক, সকল কাঠামোর মধ্য দিয়ে তার গতিপথে এগিয়ে যাচ্ছে।
ডায়োক্লেসিয়ান এবং কনস্টানটাইনের সাম্রাজ্য পর্যন্ত অতীতে না গিয়েও, ১৮৭১ সালের কমিউনার্ডদের ওপর দমন-পীড়ন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত এর বংশধারা খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এইভাবে, উৎপাদন শক্তির রূপান্তর এবং উৎপাদন সম্পর্কের ভিত্তিতে বিভিন্ন সর্বগ্রাসী ব্যবস্থা কামনাকে সামষ্টিকভাবে অবরুদ্ধ করার জন্য ভিন্ন ভিন্ন টোটকা তৈরি করেছে। আমাদের অবশ্যই এর যান্ত্রিক গঠন নিরূপণ করতে হবে, ঠিক যেভাবে আমরা রাসায়নিক গঠন নিরূপণ করি। কিন্তু এটি হবে কামনার এক সামাজিক রসায়ন, যা কেবল ইতিহাসের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় না, বরং তা সামাজিক জগতের মধ্য দিয়েও প্রবাহিত হয়। কামনা যন্ত্রের (Desiring-Machines) যেই অতিলম্বিতার (Transversality) উপর সর্বগ্রাসী ব্যবস্থা নির্ভর করে তা আসলে তাদের সামাজিক অতিলম্বিতা থেকে অবিচ্ছেদ্য। তাই, ফ্যাসিবাদের বিশ্লেষণ কেবল কোনো ঐতিহাসিকের কাজ নয়। আমি আবারও বলছি: পূর্বে ফ্যাসিবাদ যা শুরু করেছিল, তা আজও সমসাময়িক সামাজিক জগতের গঠনে ভিন্ন রূপে ছড়িয়ে আছে। একটি সামগ্রিক সর্বগ্রাসী রসায়ন আজ রাষ্ট্রের কাঠামো, রাজনৈতিক ও ইউনিয়ন কাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক কাঠামো, এমনকি ব্যক্তিগত কাঠামোকেও নিয়ন্ত্রণ করছে; যখন অপরাধবোধ এবং নিউরোসিসের ক্ষেত্রে এক ধরনের সুপার-ইগোর ফ্যাসিবাদের কথা হয় তখন তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কিন্তু সময় এবং স্থান অতিক্রমকারী এই অদ্ভুত সর্বগ্রাসী যন্ত্রটি আসলে কী? কোনো সায়েন্স ফিকশনের গল্পের উপাদান? আমি এখনই আক্কেলওয়ালা মনোবিশ্লেষক, মার্ক্সবাদী এবং জ্ঞানতাত্ত্বিকদের তীর্যক মন্তব্য শুনতে পাচ্ছি। তারা বলবে, ‘এ কী জগাখিচুড়ি! সব কিছুকে এক বস্তায় ভরা হয়েছে।’ আমি কি মনে করিয়ে দিতে পারি যে, অণু এবং পরমাণু পর্যায়ে বিশ্লেষণ করার মাধ্যমেই রসায়নবিদরা পরবর্তীতে জটিল উপাদানগুলোর সংশ্লেষণ করতে সফল হয়েছিলেন। কিন্তু এরা তবুও বলবে, ‘এগুলো নিছক যান্ত্রিক কথাবার্তা ছাড়া আর কিছুই না।’ যদিও, এ পর্যন্ত আমরা কেবল একটি তুলনার কথাই বলছি। আর তা ছাড়া, তর্ক করেই বা কী লাভ? কেবল তারাই আমার কথা শুনবেন, যারা আমার বর্ণিত এই আণবিক-রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদ-বিরোধী সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনুভব করেন। সামাজিক শ্রম-বিভাজনের বিবর্তন দিনদিন আরও বিশাল উৎপাদনশীল গোষ্ঠী সৃষ্টির প্রয়োজন তৈরি করেছে। কিন্তু উৎপাদনের এই বিশালতা একই সাথে সেই মানব উপাদানগুলোর এক ধরনের তীব্র আণবিকায়ন ঘটিয়েছে, যেগুলো শিল্প, অর্থনীতি, শিক্ষা এবং তথ্যের যান্ত্রিক সংমিশ্রণে অংশ নেয়। কাজ কখনোই একজন মানুষ করে না, বরং তা করে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং যন্ত্রের একটি সম্মিলন, যা কামনার ক্ষেত্রেও সত্য। সহকর্মীদের সাথে কথাও একজন মানুষ বলে না; বরং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের একটি অতি-মানবিক (Transhuman) শিকল তৈরি হয়, যা সংকেতবাহী মাধ্যম এবং বস্তুগত প্রবাহের সংযোগস্থলে প্রবেশ করে।
যেহেতু আজকের উৎপাদন শক্তিগুলো প্রথাগত মানব আঞ্চলিকতাগুলোকে (Territorialities) ধ্বংস করে দিচ্ছে, তাই এরা কামনার পারমাণবিক শক্তিকে অবমুক্ত করতে সক্ষম। তবে যেহেতু এই অবমুক্তি অপরিবর্তনীয় এবং এর বৈপ্লবিক পরিধি গণনা করা অসম্ভব, তাই সর্বগ্রাসী-আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী এবং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলো তাদের নিপীড়ক যন্ত্রগুলোকে ক্রমাগত নিখুঁত এবং সূক্ষ্মতর করতে বাধ্য হচ্ছে। তাই আমার মনে হয়, সর্বগ্রাসী ক্ষমতার এই যান্ত্রিক গঠন খুঁজে বের করা হলো কামনার মুক্তির জন্য অণু-রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি অপরিহার্য অংশ। যেই মুহূর্তে আপনি এর মোকাবিলা বন্ধ করবেন, আপনি হঠাৎ করেই বৈপ্লবিক উন্মুক্ততা থেকে সর্বগ্রাসী সীমাবদ্ধতার দিকে হেলে পড়বেন। তখন আপনি নিজেকে সাধারণীকরণ এবং সর্বগ্রাসী কর্মসূচির বন্দি হিসেবে খুঁজে পাবেন এবং প্রতিনিধিত্বকারী পক্ষগুলো আবারও তাদের ক্ষমতা ফিরে পাবে। আণবিক বিশ্লেষণ হলো এমন একটি তত্ত্ব ও চর্চার তাগিদ যা জনগণের কামনার সম্ভাবনাকে তাদের থেকে কেড়ে নিতে রাজি নয়। সম্ভাব্য আপত্তির বিপরীতে, আমরা ইতিহাসকে সবচেয়ে ছোট জিনিসগুলো দিয়ে দেখার কথা বলছি না। আমরা প্যাসকেলের মতো এটিও বলছি না যে, যদি ক্লিওপ্যাট্রার নাক বড়ো হতো, তাহলে ইতিহাসের গতিপথ ভিন্ন হয়ে যেত। বিষয়টি স্রেফ এই সর্বগ্রাসী যন্ত্রের প্রভাব ধরতে না পারার প্রশ্ন, যা প্রতিনিয়ত নিজেকে শক্তির ভারসাম্য ও সামাজিক রূপান্তরের আলোকে পরিবর্তন ও অভিযোজন করতে থাকে। নিশ্চয়ই ব্যক্তি হিসেবে হিটলারের ভূমিকা নগণ্য ছিল; তবে তাঁর ভূমিকা মৌলিক এই অর্থে যে, তিনি এই সর্বগ্রাসী যন্ত্রের একটি নতুন ধরনকে রূপদান করেছিলেন। আজও তাকে দেখা যায় স্বপ্নে, প্রলাপে, চলচ্চিত্রে, পুলিশের বিকৃত আচরণে, এমনকি কিছু গ্যাংয়ের লেদার জ্যাকেটেও, যারা নাৎসিবাদ সম্পর্কে কিছু না জেনেও হিটলারবাদের প্রতীকগুলো পুনরুৎপাদন করে চলেছে।
এখন একটি প্রশ্নে ফিরে আসা যাক, যা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভিন্নরূপে প্রাসঙ্গিক। ১৯১৮ সালের বিপর্যয় এবং ১৯২৯ সালের মহামন্দার পর, জার্মান পুঁজিবাদ কেন একটি সাধারণ সামরিক একনায়কত্বকে আঁকড়ে ধরতে রাজি ছিল না? কেন জেনারেল ফন শ্লাইচারের পরিবর্তে হিটলারকে বেছে নেওয়া হলো? দানিয়েল গুয়েরিন এই প্রসঙ্গে বলেন, বড় পুঁজিপতিরা সমাজের প্রতিটি কোষে প্রবেশ করার এই অতুলনীয় এবং অপূরণীয় মাধ্যমটিকে, অর্থাৎ ফ্যাসিবাদী জনসংগঠনকে হাতছাড়া করতে চায়নি। সত্যিই, একটি নিছক সামরিক একনায়কত্ব জনগণকে সেভাবে বিভক্ত করতে পারে না, যেভাবে পুলিশের মতো সংগঠিত একটি দল পারে। একটি সামরিক একনায়কত্ব মানুষের লিবিডিনাল শক্তিকে সেভাবে ব্যবহার করতে পারে না যেভাবে একটি ফ্যাসিবাদী একনায়কত্ব পারে; যদিও তাদের ফলাফল বা দমনমূলক পদ্ধতি ও নির্যাতন অনেক সময় একই রকম মনে হতে পারে। হিটলারের ব্যক্তিত্বে অন্তত চারটি লিবিডিনাল ধারার মিশেল ঘটেছিল, যা জনগণের মধ্যে এক নতুন ধরনের কামনা-যন্ত্রের রূপান্তরকে মূর্ত করে তোলে:
-এক ধরনের নিম্নবর্গীয় তরিকা, যা তাকে সেইসব মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ এনে দিয়েছিল যারা কমবেশি সোশ্যাল-ডেমোক্রেটিক এবং বলশেভিক আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত ছিল।
-এক ধরনের যুদ্ধফেরত সৈনিকের তরিকা, যা ১৯১৪ সালের যুদ্ধের আয়রন ক্রস দ্বারা চিহ্নিত হয়েছিল। এটি তাকে অন্তত সামরিক কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয় রাখতে সাহায্য করেছিল, যদিও তিনি তাদের পূর্ণ আস্থা অর্জন করতে পারেননি।
-একজন দোকানদারের সুবিধাবাদ, এক ধরনের মেরুদণ্ডহীনতা, যা তাকে শিল্প-কারখানা ও অর্থায়ন জগতের রাঘববোয়ালদের সাথে আপস করতে সক্ষম করেছিল; যারা ভেবেছিল যে হিটলারকে খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করা যাবে।
– সর্বশেষ এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট: বর্ণবাদী প্রলাপ, একটি উন্মাদ, প্যারানয়েড শক্তি যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কংকালঘর থেকে উদ্ভূত সামষ্টিক মরণ-নেশার সাথে তাকে একীভূত করেছিল।
অবশ্যই, এই বিশ্লেষণটি এখনও অনেকটাই ছকনির্ভর। কিন্তু আমি যে বিষয়টি জোর দিয়ে বলতে চেয়েছি তা হলো, হিটলারের ব্যক্তিত্বে এই যান্ত্রিক স্ফটিকীকরণের স্থানীয় এবং বিশেষ শর্তগুলোকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। আমি জোর ধরে বলব যে, এটি কেবল ঐতিহাসিক-মনোবিশ্লেষনী সাধারণীকরণে ক্ষান্ত হওয়ার বিষয় নয়। আজ রাজনৈতিক ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে, ক্ষুদ্র গোষ্ঠীগুলোতে, পারিবারিক জীবনে, বা শিক্ষা ব্যবস্থায় আমরা অন্যান্য ফ্যাসিবাদী আণবিক-স্ফটিকীকরণ দেখতে পাচ্ছি, তা সেই সর্বগ্রাসী যন্ত্রেরই উত্তরসূরি। ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা নগণ্য, এই অজুহাতে তারা আমাদের এটা বিশ্বাস করাতে চায় যে, সব ধরনের স্থানীয় নিপীড়ক বা আমলার উন্মত্ত অঙ্গভঙ্গি বা প্যারানয়েড কারসাজির মুখে আমরা হাত পা গুটিয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারি না। কামনার অণু-রাজনীতি মানে হলো যে, এখন থেকে আমরা কোনো ফ্যাসিবাদী কৌশল এড়িয়ে যেতে রাজি নই, তা সে যেই পরিসরেই প্রতীয়মান হোক না কেন, যেমন পারিবারিক পরিসরে, এমনকি আমাদের ব্যক্তিগত অর্থনীতির পরিসরেও। বিভিন্ন উপায়ে, বিশেষ করে চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশনের মাধ্যমে আমাদেরকে বোঝানো হয় যে, নাৎসিবাদ কেবল একটি দুঃস্বপ্ন বা এক ধরনের ঐতিহাসিক গলদ ছিল, যা আমাদের পার করতে হয়েছে। কিন্তু এটি আবার বীর নায়কদের জন্য ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়ও বটে। তাছাড়া, পুঁজিবাদ আর সমাজতন্ত্রের যৌথ ঝান্ডা দেখতে খুব হৃদয়স্পর্শী ছিল না? আমাদের আরও বিশ্বাস করানো হয় যে, ফ্যাসিবাদী অক্ষশক্তি এবং মিত্রশক্তির মধ্যে বাস্তব বৈরিতাপূর্ণ দ্বন্দ্ব ছিল। এটি আসলে সেই যাচাই প্রক্রিয়ার প্রকৃত রূপকে আড়াল করার একটি উপায়, যার মাধ্যমে বুর্জোয়া শ্রেণি শেষ পর্যন্ত সেই ফ্যাসিবাদী পদ্ধতিকে নির্মূল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যা একসময় তাদের কাছেই বিপজ্জনক মনে করতে শুরু করে।
কার্ল রাডেক নাৎসিবাদকে বুর্জোয়াদের বাইরের কিছু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন; যেন এটি বুর্জোয়াদের ব্যবহৃত লোহার ব্যান্ড, যা দিয়ে তারা “পুঁজিবাদের ফুটো হওয়া ট্যাঙ্ককে” মেরামত করতে চেয়েছিল। কিন্তু এই চিত্রায়ণ কি একটু বেশিই সান্ত্বনাদায়ক না? ফ্যাসিবাদ কেবল একটি বিশেষ ধরনের বুর্জোয়াদের বাইরে ছিলো, যারা একে এর অস্থিতিশীলতা ও এটি জনগণের মধ্যে কামনার শক্তিকে খুব তীব্রভাবে জাগিয়ে তোলার কারণে ভয় পেত। সংকটের চরম পর্যায়ে যে দাওয়াইকে স্বাগত জানানো হয়েছিল, পরে তা একটু বেশিই বিপজ্জনক মনে হতে লাগল। কিন্তু আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদ একে নির্মূল করার কথা তখনই ভাবতে শুরু করে, যখন শ্রেণি সংগ্রাম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিকল্প উপায়গুলো, অর্থাৎ জনগণের কামনাকে দমনের নতুন ফরমুলা তাদের হাতের নাগালে আসে। ঠিক যখনই স্তালিনবাদ এই বিকল্প ব্যবস্থার “সমঝোতা” করে নিল, তখনই তাদের সাথে একটি জোট গড়া সম্ভব হয়ে উঠল।
নাৎসি রেজিম কখনোই তার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলোকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। ফুয়েরারের(হিটলার) কার্যত অসাধ্য লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন ক্ষমতা-যন্ত্রের মধ্যে একটি সমঝোতা বজায় রাখা, কেননা সামরিক যন্ত্র, রাজনৈতিক-পুলিশি চক্র, অর্থনৈতিক যন্ত্র ইত্যাদি প্রত্যেকেই নিজেদের স্বনিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চেয়েছিল। একই সময়ে, তাকে মাথায় রাখতে হয়েছিল যে, জনগণের বিপ্লবী জোশ যেকোনো মুহূর্তে তাদের বলশেভিক কায়দায় বিপ্লবের দিকে ঠেলে দিতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, পশ্চিমা গণতন্ত্র এবং সর্বগ্রাসী স্তালিনবাদের জোট ‘গণতন্ত্র রক্ষার’ জন্য গঠিত হয়নি। এটি গঠিত হয়েছিল কেবল ফ্যাসিবাদী পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো ধ্বংসাত্মক মোড় নেওয়ার কারণে এবং সর্বোপরি, সেই সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলে জনগণের মধ্যে যে বিধ্বংসী কামনা-রসায়ন তৈরি হয়েছিল তার প্রতিক্রিয়ায়। এই পুরো সময়জুড়ে পৃথিবী এমন এক সংকটের কবলে ছিল যা কেয়ামতের মতো মনে হচ্ছিল। অবশ্যই, এটি ভুললে চলবে না যে, ইতালি ও জার্মানির বামপন্থী সংগঠনগুলোকে সবার শুরুতে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সংগঠনগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল কেন? কারণ তারা কখনোই জনগণের সামনে এমন কোনো প্রকৃত বিকল্প তুলে ধরতে পারেনি, যা তাদের অবদমিত কামনার শক্তিকে কাজে লাগাতে পারে, অথবা সেই শক্তিকে ফ্যাসিবাদী ধর্মের দিক থেকে সরিয়ে আনতে পারে (এই বিষয়ে আমি রাইখের বিশ্লেষণকে চূড়ান্ত মনে করি)।
প্রায়ই দাবি করা হয়, শুরুতে ফ্যাসিবাদী সরকারগুলো জরুরি সমস্যাগুলোর ন্যূনতম অর্থনৈতিক সমাধান দিয়েছিল, যেমন কৃত্রিমভাবে অর্থনীতি চাঙ্গা রাখা, বেকারদের পুনঃনিয়োগ, বড় মাপের গণপূর্ত কর্মসূচি এবং পুঁজির নিয়ন্ত্রণ। এই পদক্ষেপগুলোকে, উদাহরণস্বরূপ, ভাইমার প্রজাতন্ত্রের সোশ্যাল-ডেমোক্রেটিক সরকারগুলোর অক্ষমতার সাথে তুলনা করা হয়। “সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্টদের কর্মসূচি খারাপ ছিল, সংগঠন খারাপ ছিল, জোট খারাপ ছিল” এমন ব্যাখ্যাই তখন যথেষ্ট মনে হয়। তাদের ভুল এবং বিশ্বাসঘাতকতার তালিকা অন্তহীনভাবে যিকির করা হয়। কিন্তু এই সমস্ত ব্যাখ্যাগুলোর কোনটিই এই জিনিসটি বুঝতে সক্ষম নয় যে, কেন একটি নতুন সর্বগ্রাসী কামনা-যন্ত্র জনগণের মধ্যে এমনভাবে দানা বেঁধেছিল যে, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের কাছে এটি অক্টোবর বিপ্লব থেকে উদ্ভূত রেজিমের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক মনে হয়েছিল। যেই ব্যাপারটি প্রায় কেউই স্বীকার করতে রাজি নয় তা হলো, এই ফ্যাসিবাদী যন্ত্রটি, এর ইতালীয় ও জার্মান সুরতে পুঁজিবাদ এবং স্তালিনবাদের জন্য হুমকি হয়ে ওঠার কারণ হলো এর মধ্যে জনগণের ঢালা এক অভাবনীয় সামষ্টিক মরণ-নেশা। জনগণ তাদের কামনাকে ‘এক নেতা, এক দেশ, এক জাতিতে’ আকৃতি দান করে এক প্রলয়ংকরী মোহের সাহায্যে সেই বাস্তবতাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল যাকে তারা ঘৃণা করত, যেই বাস্তবতাকে বিপ্লবীরা আক্রমণ করতে চায়নি কিংবা আক্রমণে ব্যর্থ হয়েছে। জনগণের কাছে পুরুষত্ব, রক্ত, বেঁচে থাকার স্থান এবং মৃত্যু, প্রচলিত সংজ্ঞায়নের প্রতি অতিমাত্রায় শ্রদ্ধাশীল সমাজতন্ত্রের জায়গা দখল করে নিয়েছিল। তবুও, ফ্যাসিবাদ এক ধরনের সহজাত ভণ্ডামি, অযৌক্তিক উস্কানি এবং সামষ্টিক হিস্টিরিয়া ও দুর্বলতার নাটকের মাধ্যমে সেই একই প্রচলিত সংজ্ঞায়নেই ফিরে যায়। ফ্যাসিবাদ স্রেফ স্তালিনবাদের চেয়ে একটু বেশি ঘুরপথ অবলম্বন করেছিল মাত্র।
ফ্যাসিবাদের সারকথা আসলে ভালোবাসা এবং মৃত্যুর এক সংমিশ্রিত রূপ, যেখানে জীবনতৃষ্ণা (Eros) এবং মরণতৃষ্ণা (Thanatos) এক হয়ে গেছে। হিটলার এবং নাৎসিরা মৃত্যুর জন্য লড়ছিল, এমনকি জার্মানির মৃত্যু পর্যন্ত; আর জার্মান জনগণ নিজেদের ধ্বংসের পথে তাদের অনুসরণ করতে রাজি ছিল। যুদ্ধটি নিশ্চিতভাবে হেরে যাওয়ার পরেও তারা আরও কয়েক বছর কীভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পেরেছিল, তা কি আর অন্য কোনোভাবে বোঝা সম্ভব? এই ঘটনার তুলনায় স্তালিনবাদী যন্ত্রটিকে বাইরে থেকে দেখলে অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত লাগে। তাই ইংরেজ এবং মার্কিন পুঁজিবাদীরা স্তালিনবাদের সাথে জোট বাঁধতে খুব একটা দ্বিধাবোধ না করায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। ‘থার্ড ইন্টারন্যাশনাল’ বিলুপ্ত হওয়ার পর, পুঁজিবাদী কৌশলের কাছে স্তালিনবাদী একনায়কত্ব একটি বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে হাজির হয়েছিল, যার ফ্যাসিবাদ বা প্রচলিত একনায়কত্বের চেয়ে কিছু বাড়তি সুবিধা ছিল। শ্রমিক শ্রেণি, ঔপনিবেশিক জনগোষ্ঠী বা নিপীড়িত জাতিগত সংখ্যালঘুদের যেকোনো উত্তাল আন্দোলন দমন করার জন্য স্তালিনবাদী পুলিশ এবং তাদের চরের চেয়ে ভালো আর কে হতে পারে? তাই গত বিশ্বযুদ্ধটি (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ) ছিল এই যুগের জন্য সবচেয়ে কার্যকর এবং সময়োপযোগী সর্বগ্রাসী যন্ত্র বেছে নেওয়ার একটি মোক্ষম সুযোগ।
ফ্যাসিবাদের বিপরীতে, পুঁজিবাদী সর্বগ্রাসী যন্ত্রগুলো শ্রমিকদের বিভক্ত, বিশেষায়িত এবং আণবিকায়ন করার চেষ্টা করে; আর সেই ফাঁকে তাদের কামনার সম্ভাবনাকে শুষে নেয়। এই যন্ত্রগুলো শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে, তাদের পরিবারে, দম্পতিদের মধ্যে, এমনকি শৈশবেও অনুপ্রবেশ করে। তারা শ্রমিকদের আত্মবোধ এবং বিশ্ববোধের একেবারে কেন্দ্রে নিজেদের স্থাপন করে। পুঁজিবাদ বড়ো মাপের গণআন্দোলনকে ভয় পায়। তাই পুঁজিবাদের লক্ষ্য হলো স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিজের হাতে রাখা। এই নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রকে এবং ‘সামাজিক অংশীদারদের’ মধ্যে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার বিভিন্ন যন্ত্রকে। আর যখনই কোনো সংঘাত পূর্বনির্ধারিত ছকের বাইরে চলে যায়, পুঁজিবাদ তাকে অর্থনৈতিক বা স্থানীয় যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্বীকার করতেই হবে যে, পশ্চিমা সর্বগ্রাসী যন্ত্র এখন তার স্তালিনবাদী প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণভাবে ছাড়িয়ে গেছে। অথচ, ফ্যাসিবাদের তুলনায় স্তালিনবাদ স্থিতিশীলতার দিক থেকে এগিয়ে ছিল; কারণ সেখানে দলকে (কমিউনিস্ট পার্টি) সামরিক যন্ত্র, পুলিশি যন্ত্র বা অর্থনৈতিক যন্ত্রের সমান স্তরে নামিয়ে আনা হয়নি। কার্যত, স্তালিনবাদ ক্ষমতার সমস্ত যন্ত্রকে ওভারকোড করেছিল, আর জনগণকে রেখেছিল একটি কঠোর নিয়ন্ত্রণে। উপরন্তু, এটি আন্তর্জাতিক সর্বহারা শ্রেণির অগ্রগামী অংশকেও শক্ত শেকলবন্দি করতে সক্ষম হয়েছিল।
স্তালিনবাদের ব্যর্থতা, যা আধুনিক যুগের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা, স্পষ্টতই উদ্ভূত হয়েছে উৎপাদন শক্তির বিবর্তনের সাথে; বিশেষত শ্রমশক্তির আণবিকীকরণের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে না পারার কারণে। সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে এই ব্যর্থতা ধারাবাহিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নেয়, যার ফলে পার্টির স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সেনাবাহিনীর হাতে এক ধরনের আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন ফিরে আসে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরে এর প্রভাব পড়েছিল পপুলার ডেমোক্রেসিগুলোর সাথে বিশৃঙ্খল সম্পর্কের রূপে— যেমন চীনের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ এবং কমিউনিস্ট দলগুলোর মধ্যে কার্যত বহুকেন্দ্রীকতা সৃষ্টি। ফলে সর্বত্রই জাতীয় ও আঞ্চলিক প্রশ্নগুলো আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর পাশাপাশি, এটি পুঁজিবাদী দেশগুলোকে তাদের স্থানীয় কমিউনিস্ট দলগুলোকে নিজেদের গৃহপালিত করার এবং আংশিকভাবে আত্মীকরণের সুযোগ করে দেয়। এই দিক থেকে দেখলে, স্তালিনের উত্তরাধিকার সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছে। অবশ্য কিছু দল ও ইউনিয়নের মধ্যে এখনও স্তালিনবাদ টিকে আছে, কিন্তু বাস্তবে এটি এখন পুরোনো সোশ্যাল-ডেমোক্রেটিক মডেলে পর্যবসিত। মে ’৬৮ বা ‘লিপের’ মতো বৈপ্লবিক কামনার সংগ্রামগুলো এখন স্তালিনবাদের প্রভাব থেকে ক্রমেই বেরিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অভ্যন্তরীণভাবে সর্বগ্রাসীবাদের নতুন ফরমুলা খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। আর যতক্ষণ না তা পাওয়া যাচ্ছে, পুঁজিবাদকে এমন সব ফ্রন্টে লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হবে যা আগে থেকে আঁচ করা অসম্ভব (যেমন: ম্যানেজার ধর্মঘট, অভিবাসী ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সংগ্রাম, স্কুল, কারাগার বা মানসিক হাসপাতালে বিদ্রোহ, যৌন স্বাধীনতার লড়াই ইত্যাদি)। এই নতুন পরিস্থিতিতে, যেখানে আর কোনো সমজাতীয় সামাজিক গোষ্ঠী নেই যাদের কর্মকান্ড শুধুমাত্র অর্থনৈতিক লক্ষ্যে পরিচালিত, সেখানে দমন আরো বিস্তার ও তীব্রতা লাভ করছে।
অনেক দেশে এখনও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের সেই পুরোনো ফ্যাসিবাদ টিকে আছে, কিন্তু পাশাপাশি নতুন নতুন কিসিমের আণবিক ফ্যাসিবাদ গড়ে উঠছে। এটি একটি স্লো বার্নিং ফ্যাসিবাদ, যা পরিবারে, স্কুলে, বর্ণবাদে এবং প্রতিটি বস্তির রন্ধ্রে রন্ধ্রে কাজ করে; যা মৃতদেহ পোড়ানোর চুল্লির অভাব ঠিকঠাকভাবেই পূরণ করে দিচ্ছে। সর্বত্র, সর্বগ্রাসী যন্ত্র উপযুক্ত এক কাঠামো খুঁজছে, এমন এক কাঠামো যা মানুষের কামনাকে মুনাফার অর্থনীতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম। আমাদের সেই চটজলদি এবং সহজ সূত্র চিরতরে বর্জন করতে হবে যে: “ফ্যাসিবাদ আর ফিরে আসবে না।” ফ্যাসিবাদ ইতোমধ্যে ফিরে এসেছে এবং এটি নিয়মিত ফিরে আসছে। এটি সমাজের সূক্ষ্মতম ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে এবং এটি প্রতিনিয়ত বিবর্তিত হচ্ছে, কেননা এটি কামনার একটি অণু-রাজনৈতিক অর্থনীতির অংশ, যা উৎপাদন শক্তির বিবর্তনেরই প্রতিফলন। ফ্যাসিবাদকে দেখে মনে হয় যেন এটি বাইরে থেকে আসছে, কিন্তু এটি এর প্রাণশক্তি খুঁজে পায় ঠিক প্রত্যেকের কামনার কেন্দ্রে। আমাদের অবশ্যই সেইসব সোশ্যাল-ডেমোক্রেটদের অশনি মূর্খতায় বিভ্রান্ত হওয়া বন্ধ করতে হবে, যারা তাদের সেনাবাহিনীকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে গণতান্ত্রিক সেনাবাহিনী’ বলে দাবি করে; আবার সেই সেনাবাহিনীই যখন হঠাৎ করে ভয়াবহ ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়ন শুরু করে, তখন তারা অবাক হওয়ার ভান করে। একটি সামরিক যন্ত্র, সে যে দেশে স্থাপিত হবে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা যাই হোক না কেন, সেখানে স্বভাবগতভাবেই ফ্যাসিবাদী কামনা দানা বাঁধে। ট্রটস্কির সেনাবাহিনী, মাও-এর সেনাবাহিনী কিংবা কাস্ত্রোর সেনাবাহিনীও এর ব্যতিক্রম ছিল না; যদিও এটি তাদের নিজ নিজ অর্জনকে কোনোভাবেই খাটো করে না। ফ্যাসিবাদ, কামনার মতোই সমগ্র সামাজিক পরিসরে সর্বত্র বিচ্ছিন্ন টুকরো টুকরো অংশে ছড়িয়ে আছে। এটি শক্তির ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে এক এক জায়গায় দানা বাঁধে। ফ্যাসিবাদের সম্পর্কে বলা যায় যে, এটি একই সাথে সর্বশক্তিমান এবং হাস্যকরভাবে দুর্বল। এটি শক্তিশালী হবে নাকি দুর্বল, তা নির্ভর করে আমাদের সামষ্টিক ব্যবস্থার এবং জনগণের সক্ষমতার ওপর, যাতে তারা সামাজিক লিবিডোকে প্রতিটি স্তরে বৈপ্লবিক কামনার যন্ত্রগুলোর সাথে একাত্ম করতে পারে।
অনুবাদকের টিকা:
১. ইনকুইজিশন হলো মধ্যযুগে ক্যাথলিক চার্চ কর্তৃক ধর্মদ্রোহী দমন অভিযান, যা দ্বাদশ শতাব্দীতে ফ্রান্স ও ইতালিতে শুরু হয়। পরবর্তীতে স্পেনে ষোড়শ শতাব্দীতে এর সবচেয়ে কুখ্যাত ও ভয়াবহ রুপ দেখতে পাওয়া যায়, যা ইতিহাসে স্প্যানিশ ইনকুইজিশন নামে পরিচিত।
২. প্রচলিত মনোবিশ্লেষণে কামনাকে একটি শূন্যতা হিসেবে দেখা হয়, যা মানুষ পূরণ করতে চায়। কিন্তু ডেলুজ ও গুয়াতারি এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাদের লেখায় কামনাকে এক ধরনের উৎপাদনশীল সামাজিক শক্তি হিসেবে দেখা হয়।
৩. ১৮৭১ সালের প্যারিস কমিউনের সদস্যদের কমিউনার্ড বলা হয় । এটি ছিল একটি র্যাডিকাল, বিপ্লবী সরকার, যা দ্বিতীয় ফরাসি সাম্রাজ্যের পতনের পর দুই মাস প্যারিস শাসন করেছিল।
৪. ফ্রয়েডীয় মনোবিশ্লেষণে সুপার ইগো বা অধিসত্ত্বা বলতে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় আত্মস্থ সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতাকে বোঝায়।
৫. মে ’৬৮ বলতে বোঝানো হয় ১৯৬৮ সালের মে মাসে ফ্রান্সে সংগঠিত বিশাল ছাত্র-শ্রমিক বিদ্রোহ।
৬. লিপ হলো ১৯৭৩ সালে ফ্রান্সের বেসাসন শহরে লিপ নামক ঘড়ি কারখানা শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে শ্রমিকরা বিদ্রোহ শুরু করে এবং কারখানা দখল করে।
