রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় ক্লেপ্টোক্রেসি অথবা চৌর্যতন্ত্র শুধু একটি শাসনব্যবস্থার নাম নয়; এটি এক ধরনের রাজনৈতিক অর্থনীতির কাঠামো, যেখানে রাষ্ট্র স্বয়ং একটি সংগঠিত লুটের ব্যবস্থায় পরিণত হয়। গ্রিক শব্দ Kleptes (চোর) এবং Kratos (শাসন) থেকে উদ্ভূত এই ধারণা আমাদের সামনে এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে: ক্ষমতা যখন জনকল্যাণের পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহৃত হয়, রাষ্ট্র তখন আর নাগরিকদের রক্ষাকবচ থাকে না, বরং হয়ে ওঠে শোষণের প্রধান মাধ্যম। এক কথায়, চোরের শাসনই ক্লেপ্টোক্রেসি।
ব্যাপ্তি, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে অনেক অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক ও দুর্নীতিবিরোধী বিশ্লেষক শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ২০০৯–২০২৪ সময়কালে সংঘটিত ব্যাংকিং খাতভিত্তিক লুণ্ঠন ও পুঁজি পাচারকে বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্লেপ্টোক্রেসির সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রকাশিত ‘শ্বেতপত্র’ অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিভিন্ন উপায়ে বিদেশে পাচার হয়েছে। এর মধ্যে ছিল অতিমূল্যায়িত মেগাপ্রকল্প, ব্যাংক জালিয়াতি, ঋণ কেলেঙ্কারি, ওভার-ইনভয়েসিং (খরচের চাইতে অতিরিক্ত বিল জমা দেওয়া), একচেটিয়া ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক। যদিও এই পরিসংখ্যান রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত, তবুও সমালোচকরাও একমত যে এই সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাত অস্বাভাবিক মাত্রার অপব্যবহারের শিকার হয়েছিল।
প্রথমত, ক্লেপ্টোক্রেসির মূল ভিত্তি হলো জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি। এখানে বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম এবং অন্যান্য তদারকি প্রতিষ্ঠানকে সচেতনভাবে দুর্বল করে দেওয়া হয়। ফলে ক্ষমতাসীনরা নির্বিঘ্নে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করতে পারে। এই প্রক্রিয়াটি সাধারণ দুর্নীতির চেয়েও বেশি গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক—এটি একটি systemic corruption, যেখানে দুর্নীতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং শাসনব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
দ্বিতীয়ত, এই শাসনব্যবস্থা প্রায়শই একনায়কতন্ত্র বা অলিগার্কির সঙ্গে যুক্ত থাকে। ক্ষমতা গুটিকয়েক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, যারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে। এখানে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়াও প্রভাবিত হয় একটি সীমিত গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ দ্বারা। ফলে গণতন্ত্রের যে মৌলিক চেতনা, তথা জনগণের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব, সেটা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়।
তৃতীয়ত, ক্লেপ্টোক্রেসির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো capital flight বা পুঁজি পাচার। লুণ্ঠিত অর্থ দেশের ভেতরে বিনিয়োগ না হয়ে বিদেশি ব্যাংক বা অফশোর অ্যাকাউন্টে জমা হয়। এর ফলে দেশের অর্থনীতি দ্বিমুখী সংকটে পড়ে: একদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হ্রাস পায়, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের সুযোগ কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে এবং বৈষম্যকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ক্লেপ্টোক্রেসি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি বহু দেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা। ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তোর শাসনামলে বিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অভিযোগ, ফিলিপাইনের ফার্দিনান্দ মার্কোসের আমলে রাষ্ট্রীয় তহবিল লুণ্ঠন, কিংবা আধুনিক প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনকে ঘিরে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন—সবই প্রমাণ করে যে ক্ষমতা যখন নিয়ন্ত্রণহীন হয়, তখন তা সহজেই চৌর্যতন্ত্রে রূপ নেয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও ক্লেপটোক্রেটিক প্রবণতা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে।
হাসিনাশাহীর দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে একাধিক বড় ধরনের ঋণ অনিয়ম, জালিয়াতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ঋণখেলাপির ঘটনা সামনে আসে। এর মধ্যে হলমার্ক–সোনালী ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারি এবং বেসিক ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারি বিশেষভাবে আলোচিত। হলমার্কসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয় বলে তদন্তে উঠে আসে; অন্যদিকে বেসিক ব্যাংকের ক্ষেত্রেও ঋণ অনুমোদন ও বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় ব্যাংক পরিচালনায় দুর্বলতা, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং কার্যকর জবাবদিহির অভাব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
পরবর্তী সময়ে এস আলম গ্রুপকে ঘিরে একাধিক ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুল ঋণগ্রহণের অভিযোগ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকটকে আরও আলোচনায় আনে। একইভাবে সিকদার গ্রুপের বিপুল ঋণখেলাপি এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এসব ঘটনাকে সরাসরি “ক্লেপ্টোক্রেসির প্রমাণ” হিসেবে বিবেচনা না করলেও, ক্লেপ্টোক্রেসি ও রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে আলোচনায় প্রাসঙ্গিক উদাহরণ হিসেবে দেখা অধিকতর সঙ্গত। কারণ এখানে মূল প্রশ্নটি হলো—রাষ্ট্রীয় ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সুবিধা গ্রহণ, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের অর্থের ঝুঁকির মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই সময়কে আলাদা করে তুলেছিলো শুধু দুর্নীতির পরিমাণ-ই নয়; বরং এমন একটি ধারণা যে— ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, এমনকি বিচার বিভাগের কিছু অংশও ক্রমশ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছিলো। ফলে দুর্নীতি আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছিল একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত বাস্তবতা।
যদি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনাকে চিহ্নিত করতে বলা হয়, তাহলে অনেক বাংলাদেশি সম্ভবত উল্লেখ করবেন হলমার্ক-সোনালী ব্যাংক কেলেঙ্কারি, বেসিক ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি কিংবা পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ, যা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং মুনাফাকেন্দ্রিক স্বার্থের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে এর আগেও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে দুর্নীতি নিয়ে গুরুতর অভিযোগ ও বিতর্ক ছিল। ওই সময়ে বাংলাদেশ ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে (CPI) সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিল। এর মধ্যে ২০০৩ সালে বাংলাদেশ ১৩৩টি দেশের মধ্যে ১৩৩তম অবস্থান করে, যেখানে স্কোর ছিল ১.৩ (০ সর্বাধিক এবং ১০ সর্বনিম্ন দুর্নীতিগ্রস্ত)। ওই বছর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সরকারি খাতের দুর্নীতিকে “স্থানীয়ভাবে প্রোথিত, দীর্ঘস্থায়ী এবং সর্বব্যাপী” হিসেবে বর্ণনা করা হয়—যা পরবর্তীতে Transparency International Bangladesh (TIB)-এর আলোচনাতেও উঠে আসে। ২০০১ সালে ০.৪ থেকে ২০০৫ সালে ১.৭-এ পৌঁছে স্কোরে কিছুটা উন্নতি হলেও বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থান ছিল অত্যন্ত দুর্বল। একই সময়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। আর এরশাদের আমল ছিল সামরিক বাহিনী সমর্থিত স্বৈরশাসন; ফলে সেই সময়ের শাসনব্যবস্থা, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও দুর্নীতির প্রশ্নকে আলাদাভাবে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন।
সবশেষে, বাংলাদেশের ক্লেপ্টোক্রেসির ইতিহাসকে শুধু বিচ্ছিন্ন দুর্নীতি, ঘুষ বা অনিয়মের সমষ্টি হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়; বরং এটিকে এমন একটি সম্ভাব্য ক্ষমতা–সম্পদ সম্পর্কের কাঠামোর পুনরাবৃত্ত চক্র হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, যেখানে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর উত্থান, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা এবং পুঁজি পাচারের মতো প্রক্রিয়া পারস্পরিকভাবে একে অপরকে শক্তিশালী করতে পারে। অর্থাৎ, দুর্নীতি যেখানে নির্দিষ্ট ক্ষমতার অপব্যবহার বা অনিয়মকে বোঝায়, ক্লেপ্টোক্রেসি সেখানে সেই ক্ষমতার অপব্যবহার কীভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে যুক্ত হয়ে সম্পদ আহরণের একটি পদ্ধতিতে পরিণত হতে পারে, সেই বৃহত্তর প্রশ্নটি সামনে আনে। বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকার ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের ব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে; তবে এসব অভিযোগের মাত্রা, প্রকৃতি ও প্রমাণ সরকার বা সময়ভেদে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। প্রথমত, এটি অর্থনৈতিক বৈষম্যকে তীব্র করে তোলে। সাধারণ মানুষ দারিদ্র্যের ফাঁদে আটকে পড়ে, যখন শাসকগোষ্ঠী বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ কমে যায়, যা একটি জাতির মানবসম্পদ উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। দ্বিতীয়ত, মেধাপাচার বা brain drain বৃদ্ধি পায়—যোগ্য ও দক্ষ জনগোষ্ঠী একটি দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবেশে নিজেদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত দেখে বিদেশমুখী হয়। তৃতীয়ত, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ধ্বংস হয়ে পড়ে; নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রভাবিত হয়, বিরোধী মত দমন করা হয়, এবং নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে যায়।
সর্বোপরি, ক্লেপ্টোক্রেসি কেবল একটি রাজনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি সামগ্রিক উন্নয়ন সংকট। এটি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে, জনগণের আস্থা নষ্ট করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে। তাই এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই শুধুমাত্র আইনি বা প্রশাসনিক পদক্ষেপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সক্রিয় নাগরিক সমাজ এবং সর্বোপরি একটি জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
চৌর্যতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা মানে শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়, এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণের সংগ্রাম।
