ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে সাংবাদিক রিতিকা চোপড়ার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন রীতিমতো তোলপাড় শুরু করে দিয়েছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ভারতের তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের মধ্যে গত ১০ মাসে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্তত ১৪ বার লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছেন ২ জন নির্বাচন কমিশনার। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেয়া থেকে শুরু করে কমিশনের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের মতে অমিল ছিল।
প্রতিবেদনটি সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠছে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কি আদৌ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনুসরণ করছে? ভারতের ভোটার তালিকায় কী চলছে? কেন এই দুই কমিশনার বারবার আপত্তি জানিয়েছেন? ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্যগুলো আমরা তিনটি দিক থেকে বোঝার চেষ্টা করবো।
ইসিআইয়ের ভিতরে কী ঘটেছে?
ভারতের নির্বাচন কমিশন বা ইসিআই একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। দেশটির সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কমিশনে একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং দুইজন নির্বাচন কমিশনার থাকেন। তবে এখানে তিনজনের পদমর্যাদা সমান, অর্থাৎ প্রধান নির্বাচন কমিশনার এককভাবে সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন না। ২০২৩ সালের আইনের ১৮(২) ধারাতে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের সকল কাজ যতটা সম্ভব সর্বসম্মতভাবে পরিচালিত হবে। তবে কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত কার্যকর হবে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, গত ১০ মাসে এই কাঠামোর মধ্যেই মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশি অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছেন। নতুন ভোটার নিবন্ধন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া ও পুনর্বহাল, আপিল এবং ভোটার তালিকার প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন তারা। অভিযোগ রয়েছে, কিছু সিদ্ধান্ত তাদের অনুমোদন ছাড়া একাই কার্যকর করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। এক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার নিয়মটি অনুসরণ হয়নি।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি ছিল ভোটার তালিকা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। ভারতের আইনে, প্রতিটি এলাকার ভোটার তালিকা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব থাকে ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারের (ইআরও) হাতে, যিনি সাধারণত মহকুমা প্রশাসনের কর্মকর্তা। কিন্তু ২০২৬ সালে ইসিআই নতুন প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্ম ইসিনেট চালু করার পর এই তালিকা ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম এক জায়গায় আনা হয়। এরপর ইআরওরা অভিযোগ করেন, সফটওয়্যারে তাদের কার্যক্রম অনেকটাই দিল্লির নির্বাচন কমিশনের আইটি বিভাগের উপর নির্ভর করে। তখন বিবেক জোশি সতর্ক করেন যে এতে ভোটার তালিকা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এবং সুখবীর সিং সান্ধু জানান, রাজ্য পর্যায়ের কর্মকর্তারা ভোটার তালিকা পরিচালনার ডিজিটাল ব্যবস্থা ইআরও নেটে পূর্ণাঙ্গ প্রবেশাধিকার পাচ্ছেন না। শেষ পর্যন্ত তারা বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের কেবিনেট সচিবের কাছেও তুলে ধরেন।
আরেকটি মতবিরোধ ছিল নতুন ভোটার নিবন্ধনের ফর্ম নিয়ে। জুলাইয়ে ইসিআইয়ের ডিজিটাল ফর্ম-৬ এ এমন একটি নতুন প্রশ্ন যুক্ত হয় যা আগে কোনোদিন ছিল না, নতুন ভোটারদের জানাতে হচ্ছিল তাদের বাবা-মা কিংবা দাদা-দাদি কি আগের এসআইআরের (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন) অংশ ছিল কি না। এর আগে মে মাসেই জোশি লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন যে এটি অননুমোদিত এবং বেআইনি, সান্ধুও এ ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তবুও তাদের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে ফর্মে প্রশ্নটি রাখা হয়েছিল, যেটি নতুন ভোটারদের জন্য ছিল যন্ত্রণাদায়ক । এখানেই শেষ নয়, জোশি এবং সান্ধু জানান, তাদের অনুমতি ছাড়াই নির্বাচন কমিশন থেকে কিছু নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছিল। পরে ভোটার তালিকা নিয়ে তাদের মতবিরোধ এ পর্যায়ে চলে যায় যে, দুজনই আলাদাভাবে বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের কেবিনেট সচিবের কাছে জানান। অর্থাৎ এ বিষয়টি স্পষ্ট যে ইসিআইতে শুধু এসআইআর নিয়ে আপত্তি ছিল না।
এসআইআরের প্রভাব
নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে বিরোধের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে এসআইআর বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন, যেই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা সংশোধন করা হয়। ২০২৫ সালের জুনে বিহার থেকে শুরু হয় এই প্রক্রিয়া এবং এরপর এটি আরো ৩০টি রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় শাসিত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এসব জায়গায় খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারকে।
এসআইআরের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব দেখা যায় যেসব রাজ্যে নির্বাচন হয়েছে সেসব রাজ্যের পরিবর্তিত ভোটার তালিকার দিকে তাকালে। বিহারে নির্বাচনের আগে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাদ দেওয়া হয়েছে প্রায় ৬৮.৫ লক্ষ ভোটারের নাম। একই সময়ে ২১.৫৩ লক্ষ নতুন ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়, অর্থাৎ চূড়ান্ত ভোটার সংখ্যা প্রায় ৪৭ লক্ষ কমে যায়। পশ্চিমবঙ্গে প্রভাব আরো প্রকট। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পূর্বে প্রায় ৯০.৮৩ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এবং শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত তালিকায় বাদ যায় ২৭.১৬ লক্ষ ভোটার, তাঁদের মধ্যে নাম পুনরুদ্ধারের জন্যে আপিল করেন প্রায় ২২.২১ লক্ষ ভোটার।
এর প্রভাব আরো ভালোভাবে বোঝার আরেকটি উপায় হচ্ছে বাতিল ভোটার সংখ্যার সাথে নির্বাচনের ফলাফলের তুলনা করা। পশ্চিমবঙ্গের ৪৯টি আসনে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি ছিল। এর মধ্যে ২৬টি আসন পেয়েছে বিজেপি এবং ২১টি আসন পেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস, এবং বাকি দুইটি আসন পায় ন্যাশনাল কংগ্রেস। একটি আলোচিত উদাহরণ হচ্ছে ভবানীপুর আসন । এ আসনে ২০২৬ সালের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫,১০৫ ভোটে হেরেছেন। ওই আসনে এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাদ পড়েছিল প্রায় ৪৫ হাজার ভোটার। অন্যদিকে টালিগঞ্জে তৃণমূলের অরূপ বিশ্বাস হেরে যান মাত্র ৬ হাজার ভোটে, সেখানে বাতিল ভোটারের সংখ্যা ছিল ৩৩,৫৩৩। যদিও এসব সংখ্যা এসআইআরের সাথে নির্বাচনের ফলাফলের সাথে সরাসরি কোনো সম্পর্ক প্রমাণ করে না, তবে প্রক্রিয়াটির পরিধি বোঝার জন্যে এই সংখ্যাগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
বাস্তবে কী প্রমাণ সামনে এসেছে?
বাস্তবে কি ঘটেছে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ পাওয়া যায় গোয়ায়। গোয়াতে এসআইআরের মাধ্যমে ৬৮৯ জন বাদ পড়া ভোটার নিজেদের নথিপত্র নিয়ে সামনে আসেন। নথিপত্র যাচাইয়ের পর ৯৭জনকে ভোটার তালিকায় থাকার যোগ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বাদ পড়ে যাওয়া ভোটারদের নাম ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য সফটওয়্যারে কোনো ধরনের ব্যবস্থা ছিল না। গোয়ায় প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তার অধিদপ্তর থেকে ১১ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আটবার নির্বাচন কমিশনের কাছে এই ব্যবস্থা চালুর জন্যে অনুরোধ করা হয়। শেষ পর্যন্ত তা সময়মতো চালু হয় নি এবং ২১ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকায় সেই ৯৭ জনের নাম ছিল না। এখানে প্রশ্ন ওঠে, ভোটার তালিকা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আসলে কার কাছে রয়েছে।
তবে ভোটার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন কিন্তু নতুন নয়, গত বছর নভেম্বরে ভারতের বিরোধী দলীয় নেতা কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী “এইচ ফাইলস” নামে একটি কনফারেন্স করেন যেখানে ২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ভোটার তালিকা নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ করা হয়। তাঁর দাবি ছিল, রাই নামের একটি আসনে একজন ব্রাজিলিয়ান নারী মডেলের ছবি ১০টি বুথে ২২ বার বিভিন্ন নামের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে। রাহুল গান্ধী আরও দেখান যে, ১০৮ জন ভোটারের ঠিকানা ছোট একটি বাড়ি দেখাচ্ছিল, এবং আরেকটি বাড়িতে ৫০০ জন ভোটারের নাম থাকার দাবি করেন।
রাহুল গান্ধীর সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ ব্রাজিলিয়ান নারীর ঘটনাটি পরে যাচাই করা হয় এবং দেখা যায় যে আসলেই বিভিন্ন নারীর নামের পাশে ব্রাজিলিয়ান সেই নারীর ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল। রাহুল গান্ধী আরো একটি দাবি করেছিল যে হরিয়ানার আম্বালা জেলার ধকল গ্রামের দুইটি বুথে একজন নারীর ছবি ২২৩ বার ভোটার এন্ট্রির পাশে ব্যবহৃত হয়েছিল। পরে “দা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস” তাঁদের অনুসন্ধানে বিষয়টির সত্যতা খুঁজে পায়, ৭৫ বছর বয়সী সেই নারীর নাম চরণজিৎ কৌর। অনুসন্ধানে উঠে আসে, তাঁর ছবি ২২৩টি জায়গায় নয় বরং ২৫৫ জন ভোটারের নামের পাশে ব্যবহার করা হয়েছিল।
এ ঘটনাগুলোর পর থেকেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে জনগণের মনে সন্দেহ জোরালো হতে থাকে। বিশেষ করে ভোটার তালিকা মেশিন রিডেবল ফরম্যাটে প্রকাশ না করা এবং সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের সময়সীমা ৪৫ দিনে নামিয়ে আনার পর সন্দেহ আরো তীব্র হয়।
এখন দেখার বিষয় এই বিতর্ক কোথায় গিয়ে থামে। ২৪ সেপ্টেম্বর রাহুল গান্ধী প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করেছেন অন্যদিকে একই সময়ে ককরোচ জনতা পার্টিও তাঁর পদত্যাগের দাবি করে এবং পদত্যাগ না করলে দেশজুড়ে আন্দোলন ও দিল্লিতে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণাও দিয়েছে। সময়ই বলে দিবে যে জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ করবে কিনা বা নির্বাচন কমিশন নিজেদের সিদ্ধান্ত এবং প্রক্রিয়া আরো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করবে কিনা।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত যে, ভারতের রাজনীতিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, কারণ নির্বাচন কমিশনের এই ভূমিকা, গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার উপর ওঠা এই প্রশ্নগুলো আগামীতে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
