বিদ্যুৎ বিল কেন ভুতুড়ে হয়, সেটা নিয়ে সরকারী একটা ব্যাখ্যা হলো ব্যবহার, কিন্তু লোকে তা বুঝতে পারছে না। ভাবছে যে, বিল ভুতুড়ে।
কিন্তু ভুতুড়ে বিল যে আসে, সেটা তো আমরা সবাই জানি। ভুতুড়ে বিলের কারণটা নিয়ে তেমন ভালো প্রতিবেদন চোখে পড়েনি। কেবল একটাই কথা গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে, সিস্টেম লসকে গ্রাহকের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে।
সিস্টেম লস আসলে চুরি। চুরিটাতে দুই দল লোক জড়িত। একদল হলো সরকারী লোক, আরেকদল স্থানীয় প্রভাবশালী।
গ্যাস ও বিদ্যুতের একটা বেশ বড় অংশ চুরি হয়। অবৈধ সংযোগ। বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালীরা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ দেন, কিছু মফস্বল ও ঢাকার প্রান্তিক এলাকা। মানুষের কাছ থেকে তারা সরকারি দামের বেশ কয়েকগুন বাড়তি টাকা আদায় করেন।
রাষ্ট্র টাকাটা থেকে বঞ্চিত হয়। কিন্তু দলীয় প্রভাবশালীরা সেটা পকেটে পোড়েন। এই বিদ্যুতের দাম সরকারী বিলের চাইতে বেশি, কারণ সংযোগটা অবৈধ। সরকার নিজে এই এলাকাগুলোতে বহু ক্ষেত্রে সংযোগ দেয় না। কিন্তু এই ঘাটতিটা পূরণ করে যখানে সংযোগ দিয়েছে, তাদের বঞ্চিত করে ও বাড়তি বিল চাপিয়ে দিয়ে।
যেমন ধরেন কড়াইল বসতি। কেন আগুন লেগেছিল সেখানে, কারণ জানতে গিয়ে একটা ভয়াবহ বিষয় জানলাম। সেখানে আগে গ্যাসের “অবৈধ” সংযোগ ছিল। যে কোন পটপরিবর্তনে, বা এমনকি ঘুষখোরদের চাহিদা বৃদ্ধির কারণেও এই সংযোগ কেটে ফেলা হয় এবং তারপর ঘুষের “নতুন বন্দোবস্ত” রফা হলে পুরনো “অবৈধ” বন্দোবস্তেই সবাই ফেরত যায় আবার।
তো, বেশ কয়েকজন স্থানীয় তখন জানালেন, কড়াইলবাসীর কাছ থেকে এত অস্বাভাবিক একটা হার হাকা হয়েছিল অন্তবর্তী আমলে যে তারা সেটা পোষাতে পারেননি। আর অভ্যুত্থানের কারণে আগের নিয়ন্ত্রক যারা ছিলেন, তারা আর ততটা সুবিধা করতে পারছিলেন না।
ফলে রান্নার প্রয়োজনে মানুষ সিলিন্ডার কেনেন। কড়াইলের মত ঘন ও ঘিঞ্জি এলাকায় সিলিন্ডার আদতে বিপদজনক। একটা সিলিন্ডার সন্ধ্যা-রাতের দিকে বিস্ফোরিত হয়। তারপর আগুন ধরে যাওয়া সেই বাড়ি থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়তে থাকে, সিলিন্ডারও বিস্ফোরিত হতে থাকে। কপাল ভালো যে, গভীর রাতে ঘটনাটি ঘটেনি। তাহলে বহু প্রাণহানি ঘটতো।
এখন, যে কোন বিবেচক সরকারের উচিত এই কথিত “অবৈধ” সংযোগগুলোকে কতগুলো মানদণ্ড মেনে জরুরি ভিত্তিতে বৈধতা দেয়া, সেগুলোর নিরাপত্তার দিকটি নিশ্চিত করেই এবং বিদ্যুৎ বা গ্যাসের দামটা রাষ্ট্রের কোষাগারেই আনা।
যা হোক, ধরুন বছরে যদি বিশ টাকার বিদ্যুৎ চুরি হয়, এই বিশ টাকা কোটি কোটি গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেয়া যায়। পরিসংখ্যানের নিয়মে আপনার চেনা কারও ঘাড়ে হয়তো একবার সেটা চাপবে।
অভিযোগ করলে সেটা আবার পরের বিলে অ্যাডজাস্টও করে নেয়। আমার অভিজ্ঞতা বলে যে, অ্যাডজাস্ট করার সময়ে পুরোটা বাড়তি ফেরত দেয়া হয় না, বেশ খানিকটা ঠিকই রেখে দেয়।
যদি এমনকি পুরোটা অ্যাডজাস্টও করে নিতো, তাহলেও দেখুন, বাস্তবে বিশ টাকা আসলে কম উঠছেই। খাতায় সেটা ঠিক রাখা যাচ্ছে কারও না কারও ওপর চাপিয়ে এবং পরে অ্যাডজাস্ট করে অন্য কারও ওপর চাপিয়ে।
এটা অনেকটা এমএলএমের মত। চুরি যত বাড়বে, কিংবা ঘাটতি যত তৈরি হবে, তত বেশি মানুষের ঘাড়ে যাবে।
কিন্তু আরেকটা মডেলের কথা ভাবা যেতে পারে। এটা ঠিক কি না, জানতে আরও তথ্য প্রয়োজন, অথচ কোন জনপরিসরে এই তথ্যগুলো নাই।
অ্যাডজাস্ট করার এই বিষয়টা কি বছরেই শেষ হয়ে যায়, কারও না কারও ওপর চাপিয়ে? নাকি তা খাতায় ঠিক করা হয়, একেক মাসে একেকজনের ওপর চাপিয়ে? তাহলে আরও একটা বিকল্প চুরির পথের সম্ভাবনা আছে। যেখানে একটা দীর্ঘমেয়াদী কাঠামো তৈরি করা সম্ভব।
ধরুন, প্রথম বছর চুরি বিশ টাকা। এই পুরোটা যদি গ্রাহকের ঘাড়ে আদায় করে হিসাব চুকিয়ে না ফেলে বরং অ্যাডজাস্ট ও নতুন লোকে ঘাড়ে চাপানো হয়, তাহলে প্রতি বছরই যেহেতু চুরি হয়, পরের বছর এই চুরির মোট পরিমান হবে চল্লিশ টাকা, ফলে আগের চাইতে একটু বেশি পরিমানে লোকের ঘাড়ে চাপাতে হচ্ছ । তারপরের বছর তা হবে ষাট টাকা। চুরির পরিমান না বাড়লেও ক্রমশ এই ঘটনা দেখতে থাকা এবং তার শিকার হওয়াটা নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হবে।
এটা সম্ভব, সেক্ষেত্রে পতনটা হবে দীর্ঘমেয়াদী। কিন্তু যে কোন এমএলএমে যেটা হয়, একসময়ে বৃত্তটা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসতে থাকে।
যাহোক, যে মডেলেই তারা বাড়তি বিল আদায় করে থাকুন না কেন, বিষযটা অর্থনীতির জন্য, বাসায় রান্নার জন্যও খুবই জীবনক্ষয়ী। ভোররাতে উঠে রান্নার জন্য মানুষকে বসতে হয়, আবার মাসের শেষে আতঙ্কে থাকতে হয় ভুতুড়ে বিল আসবার।
আওয়ামী আমলে এমন বহু প্রতিবেদন দেখেছি যেখানে এলাকার পর এলাকায় অবৈধ সংযোগ এর খবর এসেছে।
এর কিন্তু একটা রাজনৈতিক অর্থনীতিও তৈরি হয়েছে।
যেমন, একটা এলাকায় সরকার কিছুতেই গ্যাস বা বিদ্যুত দেবে না। ওদিকে এলাকাবাসীর তা চাহিদা। ফলে সেখানে অবৈধ সংযোগ আসলে মানুষ বেশি দামেও তা কিনতে রাজি থাকেন।
বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষেরা বহুগুন বেশি দামে “অবৈধ” বিদ্যুৎ পান। এই অবৈধতা আবার পূরণ করা হয় বৈধ প্রান্তিকদের ঘাড়ে লোডশেডিং ও বাড়তি বিল চাপিয়ে। বহু ক্ষেত্রে প্রান্তিক নন, এমন মানুষরাও ভুতুড়ে বিল পান। কিন্তু সেটা বিপদজনক, কারণ তাদের ভাষা আছে, তাদের গণমাধ্যম আছে। ফলে তারা অভিযোগ করেন।
কিন্তু বৃত্তটা ছোট হয়ে আসতে থাকলে আর কিছু করার থাকে না। সবার ঘাড়েই আসতে থাকে।
অন্যদিকে, অবৈধ এই সংযোগ উচ্ছেদ করতে গেলেও তা এলাকাবাসীর প্রতিরোধের মুখে পড়ে।
যেটা অনুমানযোগ্য, কর্তৃপক্ষও এই লোকদেখানো উচ্ছেদ অভিযান চালায় এবং প্রতিরোধকে উচ্ছেদ না করতে পারার কারণ হিসেবে দেখায়। কারণ এটা তাদের জন্যও লাভজনক, কোষাগারের টাকার একটা অংশ তাদের পকেটে আসে।
আমার উত্তেজিত “ভদ্রলোক” বন্ধুরা নিশ্চিতভাবেই দাবি করবেন, বলপ্রয়োগে সব “অবৈধ” সংযোগ উচ্ছেদ করতে।
সেটা আসলে রাজনৈতিক আত্মহত্যার মত বিষয় হবে। কারণ গ্যাস ও বিদ্যুৎ মানুষের অধিকার।
বরং ভুতুড়ে বিলের আসল কারণটা চিহ্নিত করা, সেটা নিয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটি করা, এলাকাগুলোকে চিহ্নিত করা, কোন প্রক্রিয়ায় সেখানকার অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করেই সংযোগগুলোকে বৈধ করা যায় এবং টাকাটা সরকারের কাছে আসে সেটা নিশ্চিত করা যায়– তার একটা নীতি কৌশল ঠিক করতে হবে।
জুরাইনের বৈধ গ্যাসের গ্রাহকরা কষ্ট পাচ্ছেন, ফূঁসে উঠেছেন। তাদের গ্যাস নাই, তার কারণ কিন্তু শুধু এ্টা না যে, গ্যাসের সংকট চলছে। গ্যাসের স্বাভাবিক সময়েও এক এক এলাকায় চাপ কমিয়ে এই অবৈধ সংযোগের ঘাটতি পূরণ করা হয়।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের পুরো গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঞ্চালানা পদ্ধতি একটা ভয়াবহ জটিল ও কুটিল দুর্নিতির ফাঁদের মাঝে আছে যার ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
অবশ্যই, এটা দেখার, নিযন্ত্রণ করার দায়িত্ব সরকারের। চোররা চুরি করেছে, জনগণ অবৈধ বিদ্যুৎ গ্যাস পাচ্ছে– ইত্যাদি বলে ছাড় পাবার সুযোগ দেখি না। কারণ এখন এই অবৈধ নেটওয়ার্ক নিশ্চিতভাবেই সরকারী দলেরই হাতে চলে এসেছে।
মানুষকে অবৈধ সংযোগ নিতে বাধ্য করার পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য রাষ্ট্রই দায়ী, সরকারকে অবশ্যই সেই দায় স্বীকার করে উত্তরণের একটা দিশা নির্ধারণ করতে হবে।
অন্তত একটা পথনির্দেশনা, একটা পরিকল্পনা, এবং সবার আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ ও দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন সংগ্রাম করে আসা মানুষগুলোর সাথে বসা জরুরি।
