১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও উপ-দূতাবাস জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। নিহতদের সবাই চিকিৎসার উদ্দেশ্যে কলকাতায় গিয়েছিলেন। প্রশ্ন হলো, কেন বাংলাদেশের মানুষ চিকিৎসার জন্য ভারতে যায়? যারা কলকাতায় গিয়েছিলেন, তারা পর্যটক হিসেবে সেখানে ছিলেন না; তারা গিয়েছিলেন চিকিৎসার আশায়। অসুস্থ শরীর নিয়ে, পরিবারের সঞ্চয় সঙ্গে নিয়ে, সুস্থ হয়ে দেশে ফেরার প্রত্যাশায়। কিন্তু চিকিৎসার সন্ধানে সীমান্ত পেরোনো সেই মানুষগুলো আর দেশে ফিরতে পারলেন না। কলকাতার একটি হোটেলে আগুনে পুড়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর খবর নিছক একটি দুর্ঘটনার সংবাদ নয়। এই মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, মানুষের আস্থা, চিকিৎসার মান, অর্থনৈতিক সামর্থ্য এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গিয়ে শুধু ভারতীয় হাসপাতালের প্রশংসা কিংবা বাংলাদেশের হাসপাতালের সমালোচনা করলে চলবে না। কারণ বাংলাদেশে ভালো চিকিৎসক নেই এ কথা সত্য নয়। দক্ষ চিকিৎসক, নার্স, গবেষক এবং স্বাস্থ্যকর্মীর অভাবও প্রধান সমস্যা নয়। বাংলাদেশে অত্যাধুনিক হাসপাতাল তৈরি হয়েছে, বিশেষায়িত চিকিৎসার সক্ষমতাও বেড়েছে। তবু কেন একজন রোগী নিজের দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর আস্থা না রেখে কলকাতা, চেন্নাই, বেঙ্গালুরুর দিকে ছুটছেন এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজেদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভেতরেই খুঁজতে হবে।
মানুষ চিকিৎসার জন্য প্রথমে খোঁজে বিশ্বাস। একজন রোগী যখন গুরুতর অসুস্থ হন, তখন তিনি শুধু একজন চিকিৎসক খোঁজেন না; তিনি এমন একটি ব্যবস্থার সন্ধান করেন যেখানে রোগ নির্ণয় দ্রুত হবে, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা পাওয়া যাবে, একাধিক বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া যাবে এবং চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে পরিচালিত হবে, আবার তা একইসাথে সাধ্যের মধ্যে হতে হবে। বাংলাদেশের বহু রোগীর অভিজ্ঞতা হলো এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে, একই পরীক্ষা বারবার করতে হচ্ছে, বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে, আবার কখনও চিকিৎসা নিয়ে দ্বিতীয় মতামত পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে। সেইসাথে রয়েছে বাংলাদেশের অস্বাভাবিক চিকিৎসা ব্যয়।
অন্যদিকে ভারতীয় হাসপাতালগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি রোগীদের জন্য একটি সুসংগঠিত চিকিৎসা-পরিবেশ তৈরি করেছে। কলকাতার ভৌগোলিক নৈকট্য, তুলনামূলক সহজ যাতায়াত, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচিতি, চিকিৎসার বিভিন্ন বিশেষায়িত সুবিধা এবং হাসপাতালভিত্তিক সমন্বিত সেবা সবকিছু মিলে অনেক বাংলাদেশী রোগীর কাছে ভারত একটি স্বাভাবিক গন্তব্য হয়ে উঠেছে।
কিন্তু এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশিরা সবসময় উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে যান না; অনেক সময় তারা এমন চিকিৎসার নিশ্চয়তার জন্য যান, যেটি নিজের দেশে পেয়েও তারা নিশ্চিত হতে পারেন না। এই বিশ্বাসের সংকটই সবচেয়ে বড় সমস্যা। বিশেষ করে ক্যানসার, হৃদরোগ, নিউরোসার্জারি, কিডনি, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, জটিল শিশু রোগ কিংবা বিরল রোগের ক্ষেত্রে রোগী ও তার পরিবার ঝুঁকি নিতে চান না। তারা মনে করেন, বিদেশে গেলে হয়তো রোগটি আরও দ্রুত শনাক্ত হবে, আরও বিশেষজ্ঞের মতামত পাওয়া যাবে এবং চিকিৎসার ফলাফল সম্পর্কে তারা বেশি নিশ্চিত হতে পারবেন। এই ধারণা সবসময় চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিচারে সঠিক নাও হতে পারে; কিন্তু জনস্বাস্থ্য নীতির জন্য মানুষের এই ধারণাটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার কার্যকারিতা শুধু হাসপাতালের যন্ত্রপাতি দিয়ে মাপা যায় না; মানুষ সেই ব্যবস্থাকে কতটা বিশ্বাস করে, সেটিও তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়া কোনো পরিবারের জন্য বিলাসিতা নয়। অনেক পরিবার জমি বিক্রি করে, সঞ্চয় ভেঙে, ঋণ করে কিংবা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ভারতে চিকিৎসা করাতে যায়। হাসপাতালের খরচের সঙ্গে যুক্ত হয় ভিসা, বিমান বা স্থলযাত্রা, হোটেল, খাবার এবং সঙ্গে থাকা স্বজনের ব্যয়। তারপরও মানুষ যায়। এর অর্থ, তাদের কাছে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার ঝুঁকি এতটাই বড় যে অতিরিক্ত ব্যয় করেও ভারতে চিকিৎসা নেওয়াকে তারা তুলনামূলক নিরাপদ মনে করেন।
এখানে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক প্রশ্ন রয়েছে। একজন নাগরিক যখন চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান, তখন শুধু একটি পরিবারই অর্থ ব্যয় করে না; দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থও বিদেশে চলে যায়। সেই অর্থের একটি অংশ যদি দেশের হাসপাতাল, চিকিৎসা-প্রযুক্তি, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করা যেত, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাই শক্তিশালী হতে পারত। ভারত কেন এত বাংলাদেশি রোগী আকর্ষণ করছে তার উত্তরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ডাক্তার জয়নাল আবেদীন বলেন,
“সুপারশপে যে সব পণ্য থাকে, তার সবই বাজারে পাওয়া যায়। বাজারে মাছ মাংসের দাম বরং তুলনামূলক কম। তবুও কেন আপনি বা আমি সুপারশপে যাওয়াই পছন্দ করি? ঐ একই কারণে মানুষ ইন্ডিয়া যায়। মানুষ চায় আমার খুব লাভের দরকার নাই, অন্তত যেন কেউ রামধরা খাইয়ে না দেয়। একটু যেন প্রফেশনাল আচরণ পাই। আনফরচুনেটলি, বাংলাদেশের আর সব সেক্টরের মতো চিকিৎসা ব্যবস্থাও একেবারেই প্রফেশনাল না। একটা মাছ বাজার ভাইভ আছে। মেইল হোয়াটসঅ্যাপ, ফলোআপ এসবের বালাই নাই, একাউন্টিবিলিটি নাই। ইন্ডিয়া (বিশেষত সাউথ) এটা ক্যাচ করে ফেলেছে। তারা ভীষণ ভীষণ প্রফেশনাল। পাশাপাশি তাদের ল্যাব সাপোর্ট ভালো। যেহেতু এদেশের মানুষ প্রফেশনালিজম কী জানে না, চেনা না…তাই ভাবে ইন্ডিয়ার ডাক্তার ও চিকিৎসা ভালো।একচুয়ালি তারা প্রফেশনাল। তারা প্রফেশনালের মতো কমিউনিকেশন রাখে, ট্রিট করে, কথা বলে। মানুষ আরাম পায়। এই আরামটা কেন ও কীভাবে পাচ্ছে, আমাদের দেশে কেন আরামটা নাই এসব এত গভীরভাবে ভাবে না। সোজা মনে করে এদেশের ডাক্তার খারাপ। তবে ডাক্তাররা শুধু সিস্টেমের একটা অংশ মাত্র। আমি যতজন রোগীর সাথে কথা বলেছি, আমার মনে হয়েছে এটাই বড় কারণ।”
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশের স্বাস্থ্যনীতিতে এখন তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসার একটি কার্যকর ও স্বচ্ছ মানদণ্ড তৈরি করতে হবে। রোগীর টেস্ট রেজাল্ট, নিরাপত্তা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, জরুরি সেবা, চিকিৎসকের যোগ্যতা এবং রোগীর অধিকার এসবের ভিত্তিতে হাসপাতালের মান মূল্যায়ন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিশেষায়িত চিকিৎসা ও ডায়াগনস্টিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। শুধু নতুন হাসপাতাল নির্মাণ করলেই হবে না; দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা এবং multidisciplinary care-এর ব্যবস্থা করতে হবে। একজন জটিল ক্যানসার রোগী যেন রোগ নির্ণয় থেকে চিকিৎসা পর্যন্ত কম খরচে একটি সমন্বিত সেবা পান সেই সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
তৃতীয়ত, রোগীর সঙ্গে চিকিৎসকের সম্পর্ককে পুনর্গঠন করতে হবে। একজন রোগীকে সময় দেওয়া, চিকিৎসার সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করা, প্রয়োজন হলে দ্বিতীয় মতামতের সুযোগ দেওয়া এবং চিকিৎসায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এসব মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক অংশ।
আমরা যদি এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি যেখানে রোগী শুধু চিকিৎসকের দক্ষতার ওপর নয়, পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পারেন, তাহলে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই কমবে।একজন নাগরিকের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার স্বাধীনতা থাকতে পারে; কিন্তু নিজের দেশে মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকা একটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা।
