১৫ আগস্ট, ১৯৭৫। ভোররাত সাড়ে চারটা নাগাদ ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির গেট ভাঙল ট্যাংকের চাকা। আধঘণ্টার মধ্যে বাড়ির ভেতরে যা ঘটল, সেটাকে আমরা ইতিহাসের বইয়ে এক লাইনে লিখি — “১৫ আগস্ট মুজিব সপরিবারে নিহত হন।” এক লাইনের ভেতর একটা জাতির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের গোটা দিকনির্দেশনা লুকিয়ে আছে, আর পঞ্চাশ বছর পরেও আমরা সেই দিকেই হাঁটছি।
শুরুটা করা যাক মুজিবের নিজের সিদ্ধান্ত দিয়ে, কারণ সেটা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। ১৯৭৫-এর জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস হলো। বহুদলীয় ব্যবস্থা উঠে গেল। বাকশাল এলো। সারা দেশে থাকল মাত্র চারটে সরকারি সংবাদপত্র, বাকি সব বন্ধ। বিরোধী দল, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতি — এসব শব্দই তখন কার্যত অচল হয়ে গেল রাতারাতি। যে মানুষটা একদিন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মুখ ছিলেন, ক্ষমতায় বসে তিনিই সেই দরজা বন্ধ করে দিলেন নিজের হাতে। জনগণের কাছে আর কোনো সাংবিধানিক পথ রইল না তাঁর কাছে জবাব চাওয়ার। এই অংশ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক কম — বাকশাল-উত্তর বাংলাদেশ কার্যত একনেতার রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছিল।
তারপর যা ঘটল, সেটা রাজনৈতিক পালাবদল না। নির্মূল অভিযান। মুজিবের সঙ্গে সেই রাতে প্রাণ হারালেন তাঁর স্ত্রী, তিন ছেলে, দুই পুত্রবধূ, ভাই — এমনকি দশ বছরের রাসেলও। সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে প্রাণভিক্ষা চাওয়া একটা শিশুকে গুলি করার মধ্যে ক্ষমতা দখলের কোনো যুক্তি নেই — আছে শুধু নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার তাগিদ। আর ঠিক এইখানেই ইতিহাসের কৌশলটা লুকিয়ে। এই নৃশংসতাই মুজিবকে এমন একটা মর্যাদা দিয়ে দিলো যেটা তাঁর শেষ দুই বছরের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তাঁকে কখনো এনে দিত না।
কারণ একজন নেতাকে ভোটে হারানো যায়। তাঁর নীতি নিয়ে সংসদে তর্ক করা যায়, বই লেখা যায়, রাস্তায় মিছিল করা যায়। কিন্তু সন্তানসহ গুলি করে মারা একজন মানুষকে নিয়ে প্রশ্ন তুলতে গেলে প্রথমেই সামনে এসে দাঁড়ায় লাশের সারি। তর্কটা তখন রাজনীতি থেকে সরে যায় নৈতিকতার মাঠে, যেখানে যুক্তি প্রায় সবসময়ই হেরে যায় কান্নার কাছে। বাকশালের দমননীতি, সংবাদপত্র বন্ধ করা, প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংস — সব চাপা পড়ে যায় একটা পারিবারিক ট্র্যাজেডির ভারে। মুজিব হয়ে ওঠেন শহীদ, এমন একটা পরিচয় যা তাঁকে বাঁচিয়ে দেয় জীবিত থাকলে যে প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হতে হতো, তার থেকে। আওয়ামী লীগ পরবর্তী দশকগুলোতে এই শহীদত্বকে রাজনৈতিক পুঁজিতে বদলেছে এত যত্নের সাথে যে আজ সমালোচনা আর অবমাননা প্রায় একই শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মূল্যটা অবশ্য শুধু এই মিথ তৈরিতে থামেনি। মূল্যটা আরও গভীরে, রাষ্ট্রক্ষমতার গঠনেই।
মুজিব সরলেন, কিন্তু তাঁর জায়গায় ফিরল না গণতন্ত্র — এলো সেনাশাসন। খন্দকার মোশতাক তিন মাসও টিকলেন না। তারপর জিয়া। তারপর এরশাদ। প্রায় দেড় দশক ধরে রাষ্ট্রক্ষমতার আসল কেন্দ্র রইল সংসদ ভবনে না, সেনানিবাসে। যে জনগণের নামে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, ক্ষমতার লাগাম তাদের হাত থেকে একে একে সরে গেল অভ্যুত্থান আর পাল্টা-অভ্যুত্থানের এক ক্লান্তিকর চক্রে — ১৯৭৫ সালেই তিন-তিনবার। প্রতিটা পালাবদলে সাধারণ মানুষ হয়ে উঠল দর্শক মাত্র, খবরের কাগজ পড়ে পরদিন জানতে পারা মানুষ। ভোটকেন্দ্রের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াল ক্যান্টনমেন্টে রাতে কী ঘটছে, সেই গুঞ্জন।
সঙ্গে সঙ্গে গভীর হলো আরেকটা ছায়া — বৈদেশিক প্রভাবের। একটা তরুণ, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ঠিক দাঁড়াতে না-পারা রাষ্ট্র স্নায়ুযুদ্ধের ভূরাজনীতিতে সহজেই অরক্ষিত হয়ে পড়ে, বিশেষত যখন তার ভেতরের রাজনীতি বন্দুকের জোরে নির্ধারিত হচ্ছে। যে জায়গা পূরণ করার কথা ছিল একটা স্থিতিশীল প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের, সেটা পূরণ হলো সামরিক নেতৃত্ব আর তাদের বৈদেশিক পৃষ্ঠপোষকদের অস্বস্তিকর এক জোটে। বৈধতার উৎস তখন আর ভোট রইল না — উৎস হয়ে দাঁড়াল কার হাতে অস্ত্র, আর কোন দূতাবাস নীরব সমর্থন দিচ্ছে। ১৯৮২-তে এরশাদের ক্ষমতা দখল তাই কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা না — সাত বছর আগে বসানো প্যাটার্নেরই যুক্তিসঙ্গত পরের পাতা।
এখানে একটা ফাঁদ আছে, যেটা এড়ানো জরুরি। বাকশালের সমালোচনা করা আর হত্যাকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়া — দুটো আলাদা জিনিস। অথচ আমাদের রাজনৈতিক ভাষা প্রায়ই এই দুটোকে এক করে ফেলে। কেউ বাকশাল নিয়ে প্রশ্ন তুললে তাকে দাঁড় করানো হয় হত্যাকারীদের কাতারে। কেউ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করলে ধরে নেওয়া হয় সে বাকশালেরও সমর্থক। এই মিথ্যা সমীকরণের ভেতর ইতিহাসের একটা সৎ পাঠ প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে — অথচ মুজিব মুক্তিসংগ্রামের নায়ক ছিলেন এটা যেমন সত্য, শাসনামলের শেষ পর্বে গণতান্ত্রিক কাঠামো ভাঙার দায় তাঁর কাঁধে, এটাও তেমনই সত্য। এই দুই সত্যকে একসাথে রাখার মতো জায়গা আমাদের রাজনৈতিক বিতর্কে এখনও তৈরি হয়নি।
শিক্ষাটা তাই মুজিবের ভুল নিয়ে না। শিক্ষাটা পদ্ধতি নিয়ে। কীভাবে সরানো হলো, সেটা কেন সরানো হলো তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ কিছু না — কারণ একটা স্বৈরাচারী প্রবণতাকে বন্দুক দিয়ে থামালে গণতন্ত্র জন্ম নেয় না, জন্ম নেয় আরেকটা বন্দুকের শাসন, শুধু উর্দিটা বদলায়। আজও যখন কোনো নির্বাচনের আগে ক্যান্টনমেন্টের দিকে চোখ যায় দেশের, যখন কোনো রাজনৈতিক সংকটে প্রথম প্রশ্নটা হয় ‘সেনাবাহিনী কী করবে’ — তখন বোঝা যায়, সেই ভোররাতের প্যাটার্নটা এখনও কতটা জীবন্ত।
