গত আগস্ট মাসে রংপুরে একই পরিবারের ৪ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। ২০২৬-এর আগস্ট মাসে পুলিশের অপরাধবিষয়ক পরিসংখ্যানে এটিকে ১টি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হবে। হত্যাকাণ্ডের শিকার কত জন, তা বোঝার কোনো উপায় থাকবে না। উদাহরণটি দেখায়, পুলিশের অপরাধবিষয়ক মাসিক পরিসংখ্যান প্রতি মাসে অপরাধের প্রকৃত চিত্র ও প্রবণতার প্রতিফলন দেখাতে পারে না। পুলিশের পরিসংখ্যানে কী কী সংকট আছে তা যেমন খতিয়ে দেখা দরকার, সেই সঙ্গে,কী কী পরিবর্তন আনলে এই পরিসংখ্যান অপরাধের প্রবণতা বিশ্লেষণে আরও উপযোগী হতে পারে, তা নিয়েও আলাপ করা জরুরি।
বাংলাদেশ পুলিশ তাদের ওয়েবসাইটে প্রতি মাসে অপরাধবিষয়ক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে থাকে। ২০১৮-এর ভোট ডাকাতির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনার সরকার এই পরিসংখ্যান প্রকাশ বন্ধ করে দেয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তা আবার চালু হয়। এ সময় ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে পরবর্তী সকল তথ্য উন্মুক্ত করা হয়।
এসব পরিসংখ্যানে মূলত নির্দিষ্ট মাসে নির্দিষ্ট অপরাধের আওতায় কয়টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, তার উল্লেখ থাকে। ধরুন, কোনো মাসে খুনের মামলা দেখানো হচ্ছে ৩০০টি। তার মানে এই নয়, ওই মাসে ৩০০টি খুন হয়েছে বা ৩০০ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। প্রথমত, কোনো ঘটনায় ৪ জন মানুষ খুন হলে যদি ১টি মামলা হয়, তাহলে পরিসংখ্যানে ৪ জন নয়, বরং ১টি মামলা হিসেবে দেখানো হবে। ফলে এই পরিসংখ্যান থেকে নিহতের সংখ্যা জানা সম্ভব হয় না। আবার, পূর্বের কোনো মাসের হত্যাকাণ্ডে যদি বর্তমান মাসে মামলা হয়, সেটিও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার মাসে নয় বরং মামলা হওয়ার মাসের পরিসংখ্যানে যোগ হবে। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট কোনো মাসের অপরাধ প্রবণতা এতে ধরা যায় না।
পুলিশের পরিসংখ্যানে অপরাধের সংখ্যা নয়, অপরাধের ঘটনায় মামলা দায়েরের সংখ্যা উঠে আসে। গণমাধ্যমও অনেকসময় এই পার্থক্য ধরতে পারে না। যেমন, ২০২৫ এর ২৩ অক্টোবর দৈনিক বণিকবার্তায় “এক দশকের মধ্যে দেশে দৈনিক গড়ে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড চলতি বছর” শিরোনামে একটি খবর প্রকাশিত হয়। অথচ তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে সংঘটিত কমপক্ষে ১১৩০টি খুনের ঘটনায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে মামলা দায়ের হয়েছিল। এই ১১৩০টি হত্যাও কিন্তু অন্তর্বর্তী আমলের পরিসংখ্যানে যোগ হয়েছে, যা গণমাধ্যমটি অন্তর্বর্তী আমলে সঙ্ঘটিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে ধরে নিয়েছিল। বিভ্রান্তি নিরসনের জন্য ওই সময়ে প্রতি মাসে হত্যার পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে কতগুলো মামলা “পূর্ববর্তী সময়ের”, তা উল্লেখ করে দেয়া হতো। কিন্তু এতেও পরিষ্কারভাবে জানা সম্ভব ছিল না, “পূর্ববর্তী সময়ের” অপরাধগুলোর মধ্যে কতটি ঠিক কোন মাসের। এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা নানাবিধ পরিসংখ্যান প্রকাশ করলেও, হত্যাকাণ্ড বিষয়ে পুলিশ ছাড়া কেউ পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না। তাই এটি এমন হওয়া উচিত, যাতে প্রতি মাসের প্রকৃত চিত্রটা বোঝা যায়।
পুলিশ নিজস্ব রেকর্ডের জন্য বর্তমান পদ্ধতি বহাল রাখার পাশাপাশি প্যারালালি ভিন্ন পদ্ধতির পরিসংখ্যান চালু করতে পারে। বর্তমানে নির্দিষ্ট ৯ ধরনের অপরাধ ও ‘অন্যান্য’ নামে একটি ক্যাটাগরি, তথা মোট ১০টি ক্যাটাগরিতে মামলার সংখ্যা প্রকাশ করা হয়। এছাড়া “দ্রুত বিচার”-এর আওতায় কয়টি মামলা, অস্ত্র-মাদকসহ বিভিন্ন জিনিস উদ্ধারে কয়টি মামলা হয়েছে তাও প্রকাশ করা হয়।
প্যারালাল একটি পরিসংখ্যানে, মামলার সময়কাল না ধরে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সময়কাল অনুযায়ী ডাটাবেজ আপডেট করা যেতে পারে। পুরোনো ঘটনার মামলা নতুন করে এলে পূর্ববর্তী ঐ মাসের পরিসংখ্যানই আপডেট করা হবে। এতে অন্তত মাস অনুযায়ী বিভিন্ন অপরাধের মামলার চিত্র স্পষ্ট হবে।
বর্তমানে মামলার সংখ্যা পুলিশের ইউনিট অনুযায়ী ভাগ করা হয়। কোন মেট্রোপলিটনে, বা কোন রেঞ্জে কতটি মামলা তা দেখানো হয়। এর বদলে, বিভাগ, জেলা বা উপজেলা অনুযায়ী মামলার সংখ্যা দেখানো হলে, অপরাধের স্থানভিত্তিক চিত্র নির্ণয়ে তা সহায়ক হবে।
যে অপরাধগুলোর পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়, তার মধ্যে একটি হলো “নারী ও শিশু নির্যাতন”। মূলত “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০”-এর অধীনে যত মামলা হয়, সব এই পরিসংখ্যানে যোগ হয়। এর মধ্যে যৌতুক, সংবাদপত্রে ভুক্তভোগী নারী বা শিশুর পরিচয় প্রকাশ, ইত্যাদিও রয়েছে। ফলে ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, ইত্যাদি আলাদাভাবে বোঝায় উপায় থাকে না। আমরা যে পদ্ধতি প্রস্তাব করছি, তাতে নির্দিষ্ট আইনের অধীনে মামলার সংখ্যার বদলে, শিশু ও নারীর জন্য আলাদাভাবে নির্দিষ্ট অপরাধের ধরন অনুয়ায়ী কয়টি ঘটনার মামলা হয়েছে, তার উল্লেখ করা যেতে পারে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা যৌন নিপীড়নের পরিসংখ্যান প্রতি মাসে প্রকাশ করে। যৌন নিপীড়নের কতগুলো ঘটনা গণমাধ্যমে আসে, কতগুলোতে মামলা হয়, তা তখন নির্ণয় করা যাবে। এক্ষেত্রেও কোনো ঘটনায় একাধিক ভুক্তভোগী থাকলে, তা উল্লেখ করতে হবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর অধীনে কতগুলো মামলা হয়, তা বর্তমানে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু এতে মাদক বিস্তারের কোনো চিত্রই বোঝা সম্ভব নয়। কারও পকেটে এক প্যাকেট গাঁজা পাওয়া গেলেও একটি মামলা হয়, কারও কাছে ১ লাখ পিস ইয়াবা পাওয়া গেলেও একটি মামলা হয়। অথচ এই দুই মামলার ভার সমান নয়। এক্ষেত্রে, পরিসংখ্যানে কোন ধরনের মাদক কতটুকু পাওয়া গেছে, কোন জেলা-উপজেলা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, তার উল্লেখ থাকতে পারে।
বর্তমানে এই পরিসংখ্যান police.gov.bd সাইটে পিডিএফ ফাইলে আপলোড করা হয়। বর্তমান পদ্ধতির পরিসংখ্যান এভাবে প্রকাশ করলেও, প্যারালাল যে পদ্ধতির কথা বলা হচ্ছে, তা পিডিএফে নয় বরং ওয়েবসাইট পেইজে সরাসরি প্রকাশ করতে হবে, যেন তা নিয়মিত আপডেট করা যায়। ইউজারদের জন্য এক্সেল ও সিএসভি ফাইলে ডাউনলোডের অপশন থাকতে পারে। এছাড়া প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ফিল্টারিং পদ্ধতিও রাখা যায়।
মামলার সংখ্যা দিয়ে প্রকৃত অপরাধচিত্র পাওয়া যায় না, কারণ অনেকসময় অপরাধ সংঘটিত হলেও মামলা দায়ের করা হয় না। আবার কখনো ভুয়া মামলাও করা হয়। এই সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েই, পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান এমনভাবে সাজানো যেতে পারে, যা অপরাধের হারকে অধিক স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। গবেষক, বিশ্লেষকদের জন্য এরূপ পরিসংখ্যান যেমন কাজে দেবে, তেমনি এ বিষয়ে পলিসি গ্রহণে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও সহায়তা করবে।
