Site icon মুক্তিপত্র

জাতীয় এতিমখানা

এতিমখানা বা অনাথআশ্রম শব্দ বা বিষয়গুলোর সাথে আমরা সাবাই পরিচিত। বিশেষ করে দান খয়রাত এর বিষয় আসলে সবাই যে যার ধর্ম ও সাধ্য মত এসব জায়গায় দান করেন পরকালের আশায়, কেউ বা আবার মানবিক বোধের তাড়নায়।

এতিমখানা বা অনাথআশ্রমের প্রতিষ্ঠানিক, আর্থিক ও সামাজিক কার্যক্রম সম্পর্কে যাদের ধারনা নেই তাদের জন্য সংক্ষেপে বলে যাই। প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে যা হয় তা হল মূলত হত দরিদ্র, পিতৃ-মাতৃহীন আর্থিক ভাবে অস্বচ্ছলদের বসবাস এখানে। আর্থিক কার্যক্রম বলতে পুরোটাই সাধরনত সাধারন মানুষের পূণ্যের আশায় দানের টাকা। এখানে থাকা প্রতিটি এতিম বা অনাথের থাকা, খাওয়া, শিক্ষা, ব্যবহার্য জিনিষপত্র, জামা কাপড় হতে শুরু করে প্রতিটি প্রয়োজন মেটানো হয় দানের টাকায়। আর সামাজিক কার্যক্রম বলতে মূলত এতিমখানা ও আশ্রম গুলো হতে যারা থেকে-খেয়ে বড় হয় তারা মূলত ধর্মীয় বিষয়ে শিক্ষা লাভ করে এবং পরবর্তিততে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ও ধর্মীয় সামাজিক কর্মকান্ডে অংশ নেয়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ এতিমখানা ও আশ্রমের চিত্র বেশিরর ভাগ ক্ষেত্রে জরাজীর্ণ, কোন রকম দিনাতিপাত এই ধরনের। অনেক সময় দেখাযায় অর্থকষ্টে তারা এলাকায় ঘুরে সাহায্য তুলতে।

তবে আজ যে এতিমখানা বা আশ্রমের কথা বলতে চলেছি তার অবস্থা বাকীগুলোর মত নয়। ঝাঁ চকচকে অবকাঠামো, শতভাগ নিরাপত্তা, শত ভাগ সকল সুবিধা সহ এমন কোন কিছুর কমতি নেই এই এতিমখানার এতিমদের জন্য। জ্বি বলছিলাম ‘জাতীয় সংসদ’ নামক রাষ্ট্রিয় এতিমখানার কথা। কথা হল জাতীয় সংসদকে রাষ্ট্রিয় এতিমখানা বলে ডাকার কারন কি? কারনটা হল আমাদের জনপ্রতিনিধিরা সাংসদ, মন্ত্রী নির্বাচিত হবার পর তাদের সবকিছুর দায়িত্ব রাষ্ট্রিয় খরচে জনগণের অর্থায়নে এমন ভাবে দেয়া হয় যেমনটা একটি এতিমখানা বা আশ্রমের নিরুপায় অসহায় এতিম/অনাথের ক্ষেত্রে করা হয়।

আসুন আগে একনজরে দেখি মন্ত্রী ও সাংসদের রাষ্ট্রিয় সুবিধা গুলো কি কি

প্রধানমন্ত্রীর বেতন ভাতা:

দ্য প্রাইম মিনিস্টার’স (রেমুনারেশেন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০১৬ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বেতন মাসে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা। এছাড়া তিনি মাসিক বাড়ি ভাড়া পান এক লাখ টাকা, দৈনিক ভাতা পান তিন হাজার টাকা।

মন্ত্রীর বেতন ভাতা:

দ্য মিনিস্টারস, মিনিস্টার অব স্টেট অ্যান্ড ডেপুটি মিনিস্টারস (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০১৬ অনুযায়ী, একজন মন্ত্রী বেতন পান মাসিক এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা। ডেপুটি স্পিকার, বিরোধী দলীয় নেতা এবং চিফ হুইপরাও সমান বেতন পান। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী কাউকেই তাদের বেতনের জন্য কোন কর দিতে হয় না।

এছাড়া একজন মন্ত্রী আরো যেসব সুবিধা পান:

বাসস্থান থেকে অফিস বা অফিস থেকে বাসস্থানে যাতায়াতের খরচ পাবেন। নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের ভ্রমণ খরচও তিনি পাবেন। এছাড়া অন্তত দুইজন গৃহকর্মীর ভ্রমণের খরচ পাবেন।

উপ-সচিব পদমর্যাদার একজন একান্ত সচিব, সহকারী সচিব পদমর্যাদার একজন সহকারী একান্ত সচিব এবং ক্যাডারের বাইরে থেকে আরেকজন সহকারী একান্ত সচিব। জাতীয় বেতন স্কেলে দশম গ্রেডের দুইজন কর্মকর্তা।

আরো পাবেন একজন জমাদার ও একজন আর্দালি, দুইজন এমএলএসএস, একজন পাচক বা পিয়ন।

প্রতিমন্ত্রীর বেতন ভাতা:

প্রতিমন্ত্রীদের বেতন প্রতি মাসে ৯২ হাজার টাকা। এই আয়ের ওপর কোন কর নেই। এছাড়া তিনি আরো পাবেন:

উপ-সচিব পদমর্যাদার একজন একান্ত সচিব, সহকারী সচিব পদমর্যাদার একজন সহকারী একান্ত সচিব এবং ক্যাডারের বাইরে থেকে আরেকজন সহকারী একান্ত সচিব। জাতীয় বেতন স্কেলে দশম গ্রেডের দুইজন কর্মকর্তা।

আরো পাবেন একজন জমাদার ও একজন আর্দালি, দুইজন এমএলএসএস, একজন পাচক বা পিয়ন।

উপমন্ত্রীর বেতন ভাতা:

একজন উপমন্ত্রী বেতন পান ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা। তাকেও বেতন ভাতার জন্য কোন কর দিতে হবে না।

সহকারী সচিব পদমর্যাদার একজন একান্ত সচিব, এবং ক্যাডারের বাইরে থেকে আরেকজন সহকারী একান্ত সচিব। এছাড়া একজন ব্যক্তিগত সহকারী, একজন জমাদার ও একজন আর্দালি, একজন এমএলএসএস, একজন পাচক বা পিয়ন।

মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি যারা সংসদ সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হয়েছে, তারা আরো কিছু অতিরিক্ত সুবিধা পাবেন।

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্য যেসব সুযোগ-সুবিধা পান সেগুলো হচ্ছে,

১. সংসদ সদস্যদের মাসিক বেতন ৫৫,০০০ টাকা

২. নির্বাচনী এলাকার ভাতা প্রতিমাসে ১২,৫০০ টাকা

৩. সম্মানী ভাতা প্রতিমাসে ৫,০০০ টাকা

৪. শুল্কমুক্তভাবে গাড়ি আমদানির সুবিধা

৫. মাসিক পরিবহন ভাতা ৭০,০০০ টাকা

৬. নির্বাচনী এলাকায় অফিস খরচের জন্য প্রতিমাসে ১৫,০০০ টাকা

৭. প্রতিমাসে লন্ড্রি ভাতা ১,৫০০ টাকা

৮. মাসিক ক্রোকারিজ, টয়লেট্রিজ কেনার জন্য ভাতা ৬,০০০ টাকা

৯. দেশের অভ্যন্তরে বার্ষিক ভ্রমণ খরচ ১২০,০০০ টাকা

১০. স্বেচ্ছাধীন তহবিল বার্ষিক পাঁচ লাখ টাকা

১১. বাসায় টেলিফোন ভাতা বাবদ প্রতিমাসে ৭,৮০০ টাকা

১২. সংসদ সদস্যদের জন্য সংসদ ভবন এলাকায় এমপি হোস্টেল আছে।

এছাড়া ২০১৫ -২০১৯ সাল পর্যন্ত একজন সংসদ সদস্য প্রতিবছর ৪ কোটি টাকা করে থোক বরাদ্দ পাবেন। এই থোক বরাদ্দের পরিমাণ পরে ২০ কোটি টাকা করা হয়েছে।

এই হল আমাদের মন্ত্রী ও সাংসদের রাষ্ট্রিয় সুবিধার নমুনা , এছাড়াও তাদের নানান প্রকার আয়ের উৎসের কথা বাদই দিলাম। আমাদের মন্ত্রী ও সাংসদের রাষ্ট্রিয় যে বেতন ভাতা তা আমাদের দেশের জনসাধারণের আয়ের সাথে তুলনা করা বোকামি। যেহেতু তারা রাষ্ট্রীয় উচ্চ পদে আসীন তাদের জন্য এটাই হয়ত প্রয়োজন। কিন্তু তাই বলে কি এভাবে? একজন মন্ত্রী ও সাংসদের কি একটি ফোন কেনার সামর্থ্য নেই? গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, টেলিফোন, লন্ড্রি বিল পরিশোধের সামর্থ্য নেই? প্রসাধনী, টয়লেট পেপার কেনার টাকাটাও কি নেই? এতই দৈন দশা? তাদের এই দৈনতা তো একজন এতিম-অনাথ এর দৈনতার চেয়েও শোচনীয় মনে হচ্ছে!

একজন অনাথ এতিম শিশুও কিছুটা বড় হবার পর বিনে পয়সায় থাকা খাওয়ার এতিমখানা বা আশ্রমে থাকার চেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, কারো কাছ থেকে কিছু চেয়ে নিতে লজ্জা পায়। আর স্বাধীনতার পর থেকে আজ অব্দী আমাদের মন্ত্রী, সাংসদ জনপ্রথিনিধিদের সুযোগ সুবিধা নিজেদের মন মতো নির্লজ্জের মতো বৃদ্ধি করে গেছেন জনগণের সেবার নামে! নজির আছে অসংখ্য ক্ষমতার অপব্যাবহারের। এই তালিকায় যে শুধু তারা তাই নয় ধীরে ধীরে যুক্ত হচ্ছে সচিব, জেলা প্রশাসক, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি, সরকারী উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা।

তাদের এই নির্লজ্জ সংস্কৃতির নাম ভিআইপি সংস্কৃতি। এই নির্লজ্জ সংস্কৃতি এতটাই নিকৃষ্ট যে শুধু বিনে পয়সায় ভোগবিলাস নয় রাষ্ট্রের যেকোনো নাগরিকের জীবনের চাইতে তাদের মূল্য বেশি। এদেশের মানুষ সর্বত্র এসব ভিআইপির ভোগান্তিতে অতিষ্ঠ । গতবছর একজন ভিআইপি আসাকে কেন্দ্র করে মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাটে দীর্ঘসময় ফেরি আটকে রাখার কারণে মুমূর্ষু অবস্থায় থাকা এক স্কুল ছাত্রের মৃত্যুর ঘটনা পর্যন্ত ঘটে! যার প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বলেছিল কিছুদিন আগে “কেউ ভিআইপি নন, তারা সার্ভেন্ট অব দ্য স্টেট।” অবশ্য এইদেশের ভিআইপিরা এসব হাইকোর্ট এর নির্দেশনার চেয়ে বেশি শক্তিশালি।

আর তাই গতপরশু সর্বশেষ দেখা গেল ভিআইপিদের জন্য আলাদা হাসপাতাল এর খবর! যদিও গতকাল আবার বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সুরথ কুমার সরকার ইনিয়ে বিনিয়ে সংবাদটি ‘সঠিক তথ্য নির্ভর নয় এবং ভুল।’ বলার চেষ্টা করেছেন।

অন্যদিকে বিবিসির সূত্র মতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ‘ভিআইপি’দের আলাদা হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেয়ার ব্যাপারে নিজেদের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবশ্য যুক্তি দিয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমান। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ভালো সচ্ছল পেশেন্ট আছে না? কথা উঠেছিল তারা কোথায় ভর্তি হতে পারে? সরকারিভাবে আমরা যা করছি, সেগুলো তো আপামর জনগণের জন্য। যে শতশত মানুষ অসুস্থ হচ্ছে, তাদের জন্যে তো একটা ব্যবস্থা আছেই।” “ধরুন একজন প্রখ্যাত শিল্পপতি, উনি হয়ত করোনার চিকিৎসায় সরকারি যে ব্যবস্থাপনাগুলো আছে – এগুলোতো সাধারণ মানের – সেখানে যেতে উনি ইতস্তত করলেন। তো উনি অ্যাপোলো (বর্তমানে এভারকেয়ার হাসপাতাল), ইউনাইটেড বা স্কয়ারে গেলে যেন চিকিৎসা পায়। তারা টাকা দিয়েই চিকিৎসা করাবেন।” হাবিবুর রহমানের কাছে প্রশ্ন ছিল ভিআইপিদের মধ্যে আর কারা পড়বেন? এই তালিকায় মন্ত্রী, রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তারাও কি আছেন? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই কর্মকর্তা বলছেন, প্রথমে শুধু বিদেশি কূটনীতিকদের জন্য এ ধরণের একটি ব্যবস্থার কথা ভাবা হয়েছিল। সরকারের মন্ত্রী বা রাজনীতিবিদরাও কি এখানে যাবেন? –এমন প্রশ্নের জবাবে অবশ্য সরাসরি তিনি কিছু বলেননি।”

আর এই সব দেখে মনেহয় জাতীয় সংসদ যেন একটি এতিমখানা। আর আমাদের জনপ্রতিনিধিরা, দুনিয়াতে তাদের মত এতিম অনাথ কেও নেই! আমাদের জনগণের টাকা যেন দানের টাকা, ট্যাক্সের টাকা নয়। জনগণ যেন পরকালে কিছু পাওার আশায় জনপ্রতিনিধিদের পেছনে এই পরিমান অর্থ ব্যয় করছে! আর এই সংসদতো জনগণের উন্নয়নের জন্য নয়, রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য নয়, জনপ্রতিনিধি নামক এতিম অনাথ পালনকেন্দ্র! তাই এর নাম বদলে “জাতীয় সংসদ” থেকে “জাতীয় এতিমখানা” করে দেয়া হোক। যা কিনা দেশের রাজনৈতিকদের রাষ্ট্রীয় খরচে দুবেলা দুমুঠো খাইয়ে পড়িয়ে রাজার হালে পালছে এসব ভিআইপিদের।

আবু রাইহান

তথ্যসূত্রঃ- বাংলাদেশের প্রথম সারির জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্য হতে প্রাপ্ত।

Exit mobile version