ইউনূস সরকারের সময়কাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্বর্তী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই সময়টি একদিকে রাজনৈতিক পুনর্গঠন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু হলেও বাস্তবে তা প্রশাসনিক দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণক্ষমতার দৃশ্যমান সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে চিহ্নিত হয়েছে। ফলে এই সময়কালকে এককভাবে সাফল্য বা ব্যর্থতার সরল কাঠামোতে মূল্যায়ন না করে বরং একটি জটিল, বহুস্তরীয় এবং দ্বৈত বাস্তবতার সময় হিসেবে বিশ্লেষণ করাই অধিক যুক্তিযুক্ত।
রাজনৈতিক দিক থেকে ইউনূস সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল একটি গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা। নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন, ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি কিছুটা আস্থা পুনঃস্থাপনে সহায়ক হয়। বিরোধী রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং পেশাজীবী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংলাপের পরিবেশ তৈরি হওয়ায় রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়। তবে একই সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। আন্দোলন, পাল্টা আন্দোলন এবং ক্ষমতার বৈধতা নিয়ে বিতর্ক রাষ্ট্র পরিচালনাকে জটিল করে তোলে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাংবিধানিক সীমা, এর সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৈধতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিবর্তন আনার ক্ষমতা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি মহলে প্রশ্ন ও মতবিরোধ সৃষ্টি হয়, যা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে আরও দীর্ঘায়িত করে। একই সময়কালে ১,৪১১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ১৯৫ জন নিহত এবং ১১,০০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকারের সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল এই সময়ের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গণপিটুনি, জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়া, এবং সন্দেহ বা অভিযোগের ভিত্তিতে সহিংসতার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ২০২৪ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত অন্তত ২৫৯ জন গণপিটুনি ও জনতার সহিংসতায় নিহত এবং ৩১৩ জন আহত হয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির একটি সুস্পষ্ট সূচক। এসব ঘটনার অনেক ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও কার্যকর প্রতিরোধ বা দ্রুত হস্তক্ষেপের অভাব লক্ষ্য করা যায়। এটি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগক্ষমতা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। এই পরিস্থিতি আংশিকভাবে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যবর্তী শূন্যতার ফল হিসেবে বিবেচিত হলেও, সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সক্ষমতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি করে। এছাড়া আগস্ট ২০২৪ থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত দেশে মোট ৩,৫০৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যা গড়ে প্রতিদিন ১০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ড নির্দেশ করে। একই সঙ্গে একটি জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৮০% মানুষ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যা জননিরাপত্তা সম্পর্কে গভীর অনিশ্চয়তা প্রতিফলিত করে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইউনূস সরকারের সময়কাল ছিল উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জপূর্ণ। সরকার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করলেও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা যায়। দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়ায় নতুন বিনিয়োগের গতি কমে যায়। শিল্প ও উৎপাদন খাতে প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার হ্রাস পায়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সীমিত সাফল্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি করে এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর চাপ বাড়ায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬.১% থেকে কমে ২০২৫ সালে প্রায় ২.৩%-এ নেমে আসে, যা অর্থনৈতিক গতির উল্লেখযোগ্য পতন নির্দেশ করে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ১২%-এর ওপরে পৌঁছে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ১৬% হওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৪.৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, যা অর্থনীতির ভঙ্গুরতা বৃদ্ধি করে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক আস্থার ক্ষেত্রে দুর্বলতা অর্থনীতির ভঙ্গুরতা আরও স্পষ্ট করে তোলে। অর্থনৈতিক সংস্কারের ঘোষণা থাকলেও এর বাস্তবায়ন ধীরগতির হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত ইতিবাচক পরিবর্তন দ্রুত দৃশ্যমান হয়নি।
সামাজিক ক্ষেত্রে এই সময়ে একদিকে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায় এবং মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়, অন্যদিকে সামাজিক মেরুকরণ এবং বিভক্তি আরও প্রকট হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক মতপার্থক্যের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়, যেখানে বিভাজনমূলক বক্তব্য, গুজব এবং উত্তেজনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অপরাধ ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতির অবনতি স্পষ্ট। ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসেই দেশে মোট ১,৬৮,৫০৫টি ফৌজদারি মামলা এবং ৩,৫০৯টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় উচ্চতর অপরাধ প্রবণতা নির্দেশ করে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং সামাজিক সহিংসতার ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, যা রাষ্ট্রের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে। তবে, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে সরকার দুর্নীতি দমন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে, যা একটি ইতিবাচক বার্তা প্রদান করে। পূর্ববর্তী সময়ের বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের তদন্ত শুরু হওয়ায় রাষ্ট্রের জবাবদিহিতামূলক কাঠামো পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা দৃশ্যমান হয়।
বিচারিক ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ জনআস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হলেও বিচারিক সক্রিয়তা এবং কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত গ্রেপ্তার ও তদন্তের প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সরকার বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের অংশ হিসেবে আদালতের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, মামলার জট কমানোর উদ্যোগ এবং বিচারিক কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ই-কোর্ট ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট এবং আদালতের কার্যক্রমে প্রশাসনিক নজরদারি বৃদ্ধি বিচারিক দক্ষতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে আরও স্বাধীন করার বিষয়ে নীতিগত আলোচনা শুরু হয়, যা দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের একটি সম্ভাব্য ভিত্তি তৈরি করে। সংসদ অনুপস্থিত থাকায় অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনিক ও আইনি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একাধিক অধ্যাদেশ জারি করে।
সার্বিকভাবে মূল্যায়ন করলে ইউনূস সরকারের সময়কাল ছিল একদিকে সংস্কারমুখী এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার সময়, অন্যদিকে প্রশাসনিক দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, গণপিটুনি ও জনতার সহিংসতা বৃদ্ধি, এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়।
এই সময়ে রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে এর ফলাফল আংশিকভাবে সীমিত থাকে। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শেষ হয়েছে এবং জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত হচ্ছে আগামীকাল থেকে। এখন মূল প্রশ্ন হলো নতুন নির্বাচিত সরকার কতটা কার্যকরভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করতে পারে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে পারে এবং রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে পারে। এই মুহূর্তে দেশের জনগণ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সকলেই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যে, নির্বাচিত বিএনপি সরকার পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সময়ের সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে কতটা কার্যকর, স্থিতিশীল এবং জবাবদিহিতামূলক শাসন নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়।
অপরাজিতা দেবনাথ, এডভোকেট, ঢাকা জজ কোর্ট
