পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বৃহৎ পুঁজিপতিদের জন্য অন্যতম সংকট হলো বাজারের সংকট। অর্থাৎ তাদের উৎপাদিত পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের জন্য বাজার খোজা , তাদের সঞ্চিতপুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্র খোঁজা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে বাজার ও বিনিয়োগের ক্ষেত্র বলতে গোটা একটা দেশকেই বোঝানো হচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণই ছিল এই বাজার বা কলোনী দখল। পোস্ট কলোনিয়াল যুগেও আমরা দেখছি, সাম্রাজ্যবাদী বা শক্তিশালীপুঁজিবাদী দেশগুলো অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলোতে তাদের পুঁজি(বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে) ও পণ্য(বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে) নিয়ে প্রবেশের জন্য কখনো উক্ত দেশগুলোর নির্বাচনকে প্রভাবিত করছে, কখনো প্রভাবিত করছে সেখানকার শাসক গোষ্ঠীকে, কখনো বা গোপন চুক্তি করছে বাজার দখলের। দক্ষিণ এশিয়া সহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ গুলোর অস্থিরতার পেছনের কারণগুলোই হলো- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ভারত, তুরস্কের মতো শক্তিশালী পুজিপতি দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের দ্বন্দ্ব।
বাংলাদেশের ইন্টেরিম সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করেছে, যা সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। ইন্টেরিম সরকারের মতে উক্ত চুক্তির লক্ষ্য হলো মার্কিনীদের নিকট শুল্কমুক্তভাবে বস্ত্র সরবরাহ করতে পারা যা গার্মেন্টস শিল্পকেই এগিয়ে দিবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলা হচ্ছে, ভারতের আধিপত্য ঠেকাতেই এই চুক্তি।
বাস্তবত দেখা যাচ্ছে, গার্মেন্টস শিল্পের উন্নয়নের নাম করে এই বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে মূলত বাংলাদেশের বাজারকে দ্বিধাহীনভাবে মার্কিনী ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। যেখানে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী বা বাজারের স্বার্থের কথা খুব একটা চিন্তা করা হয় নি।
এখানে উক্ত চুক্তির কয়েকটা নির্দিষ্ট ধারা নিয়ে আলোচনা করা হলো।
সেকশন ২ এ আর্টিকেল ২.৭ এর অধীনে বলা আছে,
বাংলাদেশ এমন কোনো নিয়ম বা আইন তৈরি করতে পারবে না যা আমেরিকার সার্ভিস (যেমন: সফটওয়্যার, ব্যাংকিং, বা পরামর্শ সেবা) বা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বৈষম্য করে।
এখানে মূলত ৩টি বিষয় বলা হয়েছে:
১. দেশি প্রতিষ্ঠানের সাথে সমান সুযোগ: বাংলাদেশের কোনো কোম্পানি যে সুবিধা পায়, আমেরিকার কোম্পানিকেও একই সুবিধা দিতে হবে। তাদের ওপর বাড়তি কোনো কড়াকড়ি আরোপ করা যাবে না
২. অন্য দেশের সাথে তুলনা: বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের (যেমন ভারত বা চীন) কোম্পানিকে যদি কোনো বিশেষ সুবিধা দেয়, তবে আমেরিকার কোম্পানিকেও সেই একই সুবিধা দিতে হবে।
৩. বৈষম্যহীনতা: আমেরিকার সেবাকে খাটো করে দেখা বা তাদের ব্যবসায় বাধা সৃষ্টি করা যাবে না।
এই আর্টিকেলের জরুরি বিষয়টা হলো দেশি প্রতিষ্ঠানের বা উদ্যেক্তাদের সাথে সমান সুযোগ দিতে হবে আমেরিকান কোন প্রতিষ্ঠানকেও।
আর্টিকেল ২.১১ এর ৩ নং ধারাতে বলা আছে-
বাংলাদেশ কখনো ভ্যাট (Value-Added Tax বা মূল্য সংযোজন কর) এমনভাবে চাপাবে না, যেটা আমেরিকান কোম্পানিগুলোর সাথে বৈষম্য করে।
আর্টিকেল ৫.২ এর অধীনে বলা আছে-
সাধারণ জনসেবামূলক কাজ ছাড়া অন্য কোনো পণ্য উৎপাদনকারী দেশি প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি দেবে না। বাংলাদেশ নিজেও তার পণ্য উৎপাদনকারী সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন কোনো আর্থিক সহায়তা দেবে না যা ব্যবসার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করে।
একই আর্টিকেলে উল্লেখ করা আছে-
আমেরিকা যদি লিখিতভাবে অনুরোধ করে, তবে বাংলাদেশ তার দেশের ম্যানুফ্যাকচারিং (পণ্য উৎপাদনকারী) প্রতিষ্ঠানগুলোকে কী কী ধরনের আর্থিক সাহায্য বা ভর্তুকি দিচ্ছে, তার সব তথ্য দিতে বাধ্য থাকবে। এছাড়া, এই ভর্তুকির কারণে যদি ব্যবসায়িক পরিবেশে কোনো ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, তবে বাংলাদেশ তা সমাধান করার জন্য ব্যবস্থা নেবে।
দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার পণ্যকে সুবিধা দেওয়ার জন্য দেশীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে কোনো রকম ভর্তুকি দেওয়া যাবে না। এমনকি দেশে ব্যবসারত আমেরিকান কোম্পানির উপরও ভ্যাট চাপানো যাবে না। এর ফলে দেশীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কি একটা অসম প্রতিযোগিতার মুখে ফেলে দেওয়া হলো না? একই সাথে দেশীয় পণ্যকে এগিয়ে নেওয়ার স্বাধীনতাও কি হরণ করা হলো না?
উপরের এই শর্ত সমূহ আরোপ করার পর এই চুক্তিতে কৃষি পণ্য, ডেইরি পণ্য, ঔষধ ও মেডিকেল সরঞ্জাম, এল এন জি গ্যাস, তুলা সহ বিভিন্ন পণ্য আমেরিকা কোম্পানি থেকে ক্রয় এর শর্ত দেওয়া হয়েছে। এই চুক্তি কিভাবে দেশীয় ব্যবসায়ীদের সামগ্রিক ভাবে বিপদ্গ্রস্থ করবে তা বোঝার জন্য শুধু মাত্র ডেইরি পণ্যের চুক্তিটা নিয়েই আলোচনা করা হলো।
সেকশন ১ এর অধীনে আর্টিকেল ১.৪ এর ৪ নং ধারা অনুযায়ী –
বাংলাদেশ আমেরিকার মাংস (গরু, খাসি ইত্যাদি), মুরগি, কলিজা বা মগজের মতো অংশ (offal), প্রক্রিয়াজাত মাংস, শিং বা মাগুর ক্যাটফিশ জাতীয় মাছ (Siluriformes) এবং ডিম জাতীয় পণ্য আমদানিতে বাধা দেবে না। শর্ত হলো, এই পণ্যগুলো আমেরিকার FSIS (Food Safety and Inspection Service) দ্বারা পরীক্ষিত হতে হবে এবং সেগুলোর সাথে FSIS-এর একটি স্বাস্থ্য সনদ (Export Certificate) থাকতে হবে।
একই আর্টিকেলের ৫ নং ধারা অনুযায়ী-
আমেরিকা থেকে আসা এই মাংস ও ডিম জাতীয় পণ্যগুলোর জন্য বাংলাদেশ নতুন করে কোনো পণ্য রেজিস্ট্রেশন (Product Registration) বা ওই আমেরিকান কারখানার জন্য আলাদা কোনো ফ্যাসিলিটি রেজিস্ট্রেশন (Facility Registration) করার নিয়ম চাপিয়ে দিতে পারবে না। অর্থাৎ, FSIS-এর সার্টিফিকেট থাকলেই তা বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য যথেষ্ট হিসেবে গণ্য হবে।
অর্থাৎ, আমেরিকার সরকারি সংস্থার (FSIS) সার্টিফিকেট থাকলে বাংলাদেশ সেই মাংস বা ডিম জাতীয় পণ্যগুলোকে কোনো বাড়তি ঝামেলা বা নতুন নিবন্ধন ছাড়াই গ্রহণ করবে। এতে করে খুব সহজে আমেরিকার মাংস, মাছ, ডিম বা পোল্ট্রি পণ্য সহজে আমাদের দেশের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে।
ব্যাপারটা এখানেই সীমাবদ্ধ না,
আর্টিকেল ১.৮ এর অধীনে ২ নং ধারায় আছে-
চুক্তি কার্যকর হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশকে তাদের আমদানির নিয়ম পরিবর্তন করতে হবে। আগে আমেরিকার কোনো একটি রাজ্যে বার্ড ফ্লু দেখা দিলে পুরো রাজ্য থেকে আমদানি বন্ধ রাখা হতো, এখন তা কমিয়ে শুধুমাত্র সংক্রমণ পাওয়া এলাকার ১০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। অর্থাৎ, আক্রান্ত ওই ১০ কি.মি. এলাকা বাদে আমেরিকার বাকি সব জায়গা থেকে আমদানি চালু রাখতে হবে।
একই আর্টিকেলের ৩ নং ধারা অনুযায়ী-
আমেরিকার কৃষি বিভাগের একটি শাখা (APHIS) যদি নিশ্চিত করে যে কোনো একটি নির্দিষ্ট ১০ কি.মি. এলাকা বার্ড ফ্লু মুক্ত, তবে বাংলাদেশকে তা মেনে নিতে হবে। আমেরিকা নিজেদের দেশে বিক্রির জন্য যেটুকু এলাকা নিষিদ্ধ করবে, বাংলাদেশের আমদানির নিষেধাজ্ঞাও ঠিক ততটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে; এর বাইরে বাড়তি কোনো বিধিনিষেধ দেওয়া যাবে না।
অর্থাৎ, আমেরিকার কোনো খামারে বার্ড ফ্লু ধরা পড়লে বাংলাদেশ পুরো দেশ বা পুরো রাজ্য থেকে আমদানি বন্ধ করতে পারবে না। শুধুমাত্র আক্রান্ত স্থানের চারপাশের ১০ কি.মি. এলাকা থেকে আমদানি বন্ধ থাকবে এবং ওই এলাকাটি নিরাপদ কি না, তা আমেরিকার কর্তৃপক্ষ (APHIS) ঠিক করে দেবে।
এই শর্তের ফলে দেশে বিপুল পরিমাণে আমেরিকার পোল্ট্রি পণ্যের সরবরাহ বেড়ে যাবে, ফলে দেশীয় খামারি ও উদ্যেক্তারা এই অসম প্রতিযোগিতায় বাজার হতেই উচ্ছেদের হুমকির মুখে পড়বে। দেশীয় খামারিদের রক্ষার জন্য সরকার ভর্তুকি প্রদান, আমেরিকার পণ্যের উপর কর চাপানোর মত কোন পদক্ষেপ নিবে সেটাও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নিষিদ্ধ।
ফলে, এই চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন ও আশংকা থেকেই যায় যে, এই চুক্তি কি আসলে দেশীয় ব্যবসায়ীদের বিকাশের পথ অবরুদ্ধ করে বাংলাদেশকে মার্কিনী পণ্যের বাজারে পরিণত করার পায়তারা কিনা?
শান্তনু বোস, এক্টিভিস্ট।
