বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন দল মানেই অনেক সময় একধরনের স্বস্তির নিঃশ্বাস। পুরোনো দ্বন্দ্ব, পরিচিত মুখ, একঘেঁয়ে চর্বিত চর্বণে ক্লান্ত মানুষ—সবকিছুর বাইরে কিছু একটা আসবে, এই প্রত্যাশা থেকেই মানুষ নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকায়। এনসিপি (NCP) ঠিক সেই প্রত্যাশার জায়গাতেই জন্ম নিয়েছিল।
তরুণদের ভাষা, নাগরিক অধিকারের কথা, দুর্নীতিবিরোধী উচ্চারণ—শুরুতে এনসিপি নিজেকে তুলে ধরেছিল একটি ভিন্ন ধারার রাজনীতির প্রতিনিধি হিসেবে। তারা বলেছিল, ক্ষমতা নয় নীতি আগে; দল নয় নাগরিক আগে। এই বক্তব্য একসময় শহুরে তরুণ সমাজ, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং রাজনীতিতে হতাশ মানুষদের একাংশের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল।
কিন্তু রাজনীতি শুধু স্লোগান উচ্চারণে চলে না। চলে সিদ্ধান্তে। আর সাম্প্রতিক সময়ে এনসিপির জামায়াতের সঙ্গে জোট সেই সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এবং সবচেয়ে বিতর্কিত।
এই লেখাটির উদ্দেশ্য কোনো আবেগী প্রশংসা বা একপেশে আক্রমণ নয়। এটি সরাসরি তাদের প্রতি দুটো প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়ার চেষ্টা: এই জোটের পর এনসিপি আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে? এবং এই অবস্থান তাদের ভবিষ্যৎকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে?
এনসিপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পুঁজি ছিল তাদের পরিচয়। তারা বলেছিল—আমরা পুরোনো কাঠামোর বাইরে। আমরা সেই রাজনীতি করবো না, যেটা ক্ষমতার অঙ্কে আটকে থাকে। এই দাবির মধ্যেই ছিল তাদের আলাদা হওয়ার কারণ।
কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে ঢুকতেই এনসিপির সামনে একটা কঠিন সত্য ধরা পড়ে—সংগঠন ছাড়া রাজনীতি চলে না।
মাঠপর্যায়ে দুর্বলতা, গ্রাম-ইউনিয়ন পর্যায়ে সীমিত উপস্থিতি, নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতার অভাব—এই সমস্যাগুলো এনসিপিকে খুব দ্রুতই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। তখন সামনে দুটো পথ ছিল:
- ধীরে ধীরে নিজের সংগঠন গড়া।
- তুলনামূলকভাবে শক্ত কোনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে হাত মেলানো।
এনসিপি দ্বিতীয় পথটাই বেছে নিয়েছে। সংস্কার প্রশ্নে বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি ও এনসিপি কার্যত বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে। জোটের জন্য শেষপর্যন্ত এনসিপি বেছে নিয়েছে জামায়াতকেই।
জামায়াতের সঙ্গে জোট—এই সিদ্ধান্তকে কেউ কেউ বলছেন ‘রাজনৈতিক বাস্তববাদ’। কথায় যুক্তি আছে। জামায়াতের রয়েছে শক্ত সাংগঠনিক কাঠামো, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং নিবেদিত কর্মীশক্তি। নির্বাচনী রাজনীতিতে এগুলো অমূল্য সম্পদ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—কোন মূল্যে এই সম্পদ নেওয়া হচ্ছে?
যে দল নিজেকে নতুন ও বিকল্প বলে দাবি করেছিল, তারা যখন একটি পুরোনো, সুপরিচিত আদর্শিক কাঠামোর সঙ্গে জোট বাঁধে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এটা কি কৌশল, নাকি আপস?
এখান থেকেই এনসিপির ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়ের শুরু। রাজনীতিতে সব সিদ্ধান্তেরই দুই দিক থাকে। এনসিপির এই জোটও তার ব্যতিক্রম নয়। স্বল্পমেয়াদে এই জোট এনসিপিকে কিছু বাস্তব সুবিধা দিচ্ছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।এক্ষেত্রে এনসিপি প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু সুবিধা পাচ্ছে:
প্রথমত, মাঠপর্যায়ের শক্তি। যেখানে এনসিপির ঘাটতি ছিল, সেখানে জামায়াতের সংগঠন সেই শূন্যতা পূরণ করছে। প্রচার, কর্মী, নির্বাচনী লজিস্টিক—সবকিছুই এখন তুলনামূলক সহজ।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা। একা দাঁড়িয়ে যে মনোযোগ পাওয়া কঠিন ছিল, জোটে থাকলে সেটা পাওয়া যাচ্ছে। মিডিয়া কাভারেজ, রাজনৈতিক আলোচনায় উপস্থিতি—সবই বেড়েছে।
তৃতীয়ত, নির্বাচনী বাস্তবতায় প্রবেশাধিকার। বাংলাদেশে নতুন দল হিসেবে একা ভালো ফল করা কঠিন। জোট এনসিপিকে অন্তত খেলায় থাকার সুযোগ দিচ্ছে।
এই জায়গা পর্যন্ত এসে অনেকেই বলবেন—এনসিপি ভুল কিছু করছে না।
কিন্তু এর আড়ালে যে ঝুঁকিগুলো ধীরে ধীরে জমছে তা কিন্তু অনেকেরই নজর এড়াচ্ছে না। সমস্যা হলো, রাজনীতিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয়গুলো হঠাৎ আসে না। এগুলো ধীরে ধীরে ভেতরে ভেতরে কাজ করে। এক্ষেত্রে এনসিপির সামনে যে ঝুঁকিগুলো থাকছে:
এক. পরিচয়ের ক্ষয়
এনসিপির যে পরিচয়—’নতুন রাজনীতি’—সেটা এখন ঝাপসা। সাধারণ মানুষের চোখে এনসিপি আর আগের মতো আলাদা নয়। তারা এখন আর বিকল্প নয়, বরং আরেকটি পরিচিত ধারার অংশ।রাজনীতিতে পরিচয় হারানো মানে শুধু ব্র্যান্ডভ্যালু হারানো নয়; এর মানে বিশ্বাস হারানো।
দুই. সিদ্ধান্তে অসম ক্ষমতা
যে দলে সংগঠন শক্ত, তার প্রভাব জোটে বেশি হয়। এটা রাজনৈতিক বাস্তবতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এনসিপির ভূমিকা যদি কেবল সমর্থনকারীতে নেমে আসে, তাহলে দলটি ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান হারাবে।
তিন. ভেতরের নীরব ভাঙন
সব ভাঙন ঘোষণা দিয়ে হয় না। অনেক সময় কর্মীরা চুপ করে সরে যায়, নেতারা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। আদর্শগত দ্বন্দ্ব জমতে জমতে একসময় দলটা ফাঁপা হয়ে যায়। ইতোমধ্যে এনসিপির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা-নেত্রী পদত্যাগ করেছেন। তৃণমূলে এনসিপির অনেক নেতা-কর্মী পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। তাই এনসিপির ভেতরে এই ঝুঁকি ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান।
এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে এনসিপির সামনে বাস্তবিক অর্থে তিনটি পথ খোলা আছে। এর কোনটা তারা নেবে, সেটাই নির্ধারণ করবে তাদের ভবিষ্যৎ।
প্রথমত, জোটনির্ভর দল হিসেবে টিকে থাকা। এটি সবচেয়ে সহজ পথ। এই পথে এনসিপির অস্তিত্ব থাকবে, কিন্তু মূলত বড় জোটের ছায়ায়।নাম থাকবে, কিছু আসন পাওয়া যেতে পারে, রাজনীতিতে উপস্থিতি থাকবে। কিন্তু সিদ্ধান্ত, দিকনির্দেশ, আদর্শ—সবকিছুতেই আপস বাড়বে। এই পথে এনসিপি হয়তো বাঁচবে, কিন্তু তারা আর আলাদা কিছু হিসেবে থাকবে না।
দ্বীতিয়ত, ভাঙন ও পুনর্গঠন। এই পথ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। জোটের চাপ থেকে দল ভেঙে যেতে পারে। একাংশ বেরিয়ে নতুন করে সংগঠন গড়তে পারে—ছোট পরিসরে, দুর্বল কিন্তু স্পষ্ট অবস্থান নিয়ে। এই পথ কঠিন। কিন্তু ইতিহাস বলে, অনেক সময় রাজনীতিতে ছোট কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য শক্তিই ভবিষ্যতের বড় শক্তিতে রূপ নেয়।
তৃতীয়ত, কৌশলগত জোট, কিন্তু পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখা। সবচেয়ে কঠিন পথ এটি। এখানে এনসিপিকে একসঙ্গে দুই কাজ করতে হবে—জোটে থাকতে হবে, আবার নিজস্ব পরিচয়ও রক্ষা করতে হবে। এর জন্য দরকার—নীতিগত বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান, জোটের সীমা নির্ধারণ,নিজের সংগঠন দ্রুত শক্ত করা,তরুণ ও নাগরিক সমর্থকদের সঙ্গে খোলা সংলাপ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই পথ খুব কম দলই নিতে পারে। কারণ এটি ধৈর্য, সাহস এবং ক্ষমতার লোভ সংবরণ করা—সব একসঙ্গে দাবি করে। সেক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন ওঠে: ‘আমরাই বিকল্প’ বলা, গণমানুষকে নতুন রাজনীতির স্বপ্ন দেখানো এনসিপির কাছে কোনটা গুরুত্বপূর্ণ – ক্ষমতা না বিশ্বাসযোগ্যতা?
এনসিপির ভবিষ্যৎ এখনো চূড়ান্ত নয়। রাজনীতিতে সবকিছুই পরিবর্তনশীল। কিন্তু একটি সিদ্ধান্ত তাদের ভবিষ্যতের মানচিত্র স্পষ্ট করে দিয়েছে—জামায়াতের সঙ্গে জোট। এই জোট এনসিপিকে দ্রুত রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা দিতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ—’বিশ্বাসযোগ্যতা’-কে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
তাই প্রশ্নটা খুব সোজা: এনসিপি কি দ্রুত ক্ষমতার পথে হাঁটবে, নাকি ধীরে বিশ্বাসযোগ্যতার পথে? যদি জামায়াতের সাথেই তারা এগোতে চায়, তাহলে সাময়িক লাভ তাদের হবে। সংসদে হয়ত কয়েকটি আসন মিলতে পারে। জামায়াতের সাথে জোট এনসিপির দ্রুত রাজনৈতিক উপস্থিতি বাড়াতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তাদের ‘নতুন রাজনীতি’সূচক পরিচয় ও ব্র্যান্ডভ্যালু ধ্বংস করবে।
কাজেই, এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে— এনসিপির ভবিষ্যৎ কী।
মাহমুদ নেওয়াজ জয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।
