একটি পরিকল্পিত শহর গড়ে ওঠে মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু আমাদের ঢাকা শহর আজ যেন এক মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। উত্তরার এক ভবনে লাগা আগুন থেকে বাঁচার আকুতিতে গ্রিলের বাইরে বের করে রাখা এক মৃত্যুপথযাত্রীর হাতটাকে একটা চিহ্ন হিসেবে ধরা যায়। একটি ব্যর্থতার চেইনের চিহ্ন। ভবন ডিজাইন, ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি সেবা সব কিছু একসাথে ভেঙে পড়ার চিহ্ন।
বাংলাদেশে ভবন নির্মাণের প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা রাজধানী উন্নয়ন কর্পোরেশন (রাজউক) । ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮ এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী প্রতিটি বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু অগ্নি নিরাপত্তা শর্ত মানা বাধ্যতামূলক। আইনের প্রধান দিকগুলো হলো:
* জরুরি নির্গমন পথ (Fire Exit): ভবনের আয়তন ও উচ্চতা অনুযায়ী পর্যাপ্ত প্রশস্ত এবং ধোঁয়ামুক্ত জরুরি সিঁড়ি থাকতে হবে।
* উন্মুক্ত ছাদ: অগ্নিকাণ্ডের সময় উদ্ধারকাজের সুবিধার্থে ভবনের ছাদ কোনোভাবেই তালাবদ্ধ রাখা যাবে না।
* অগ্নি নির্বাপণ সরঞ্জাম: ভবনে ফায়ার অ্যালার্ম, স্মোক ডিটেক্টর, স্প্রিংকলার সিস্টেম এবং ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে।
* সেটব্যাক বা খালি জায়গা: ভবনের চারপাশে নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা খালি রাখতে হবে যাতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি অনায়াসে চলাচল করতে পারে।
কিন্তু, বাস্তবতা হলো বিল্ডিং কোড না মেনে কোন রকম ফায়ার এক্সিট, ফায়ার ডোর, স্মোক ভেন্ট, স্প্রিংকলার কিছুর ব্যবস্থাই না রেখে পাঁচ দশ পনেরো তালা তুলে ফেলে খালি ভাড়া দিতে পারলেই বাঁচেন মালিকগণ। এক্সিট পথ নামে থাকলেও কাজে ব্যবহৃত হয় স্টোর হাউজ, গুদামঘর হিসেবে! নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে ছাঁদ তালা মেরে রাখা হয়, আগুন লাগলে সেখানে যাওয়ার উপায় অব্দি নাই। ফার্মের মুরগীর মতো খাঁচায় আটকে পুড়ে দম বন্ধ হয়ে মৃত্যু বরণ করা লাগছে।
আধুনিকতার মোড়কে আমরা আসলে একেকটি ‘কংক্রিটের খাঁচা’ নির্মাণ করছি। যেখানে আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই, ভবন আছে কিন্তু নিরাপত্তা নেই। স্মোক ভেন্ট বা পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন না থাকায় মানুষ আগুনের চেয়ে ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে আগে মৃত্যুবরণ করে। রাজউকের পরিদর্শক দল এবং ফায়ার সার্ভিসের ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে যে স্বচ্ছতা প্রয়োজন ছিল, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। নকশা অনুমোদনের পর ভবনটি সেই অনুযায়ী নির্মিত হচ্ছে কি না, তা দেখার লোক নেই। তার চেয়েও দু:খজনক ব্যাপার হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিপুল টাকাওয়ালা মালিকদের এইসব দূর্ঘটনার পর কখনো কোনো শাস্তিও হয় না। অর্থ ও ক্ষমতার দাপটে পার পেয়ে যাওয়ার এই সংস্কৃতিই অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেছে।
শিক্ষা ব্যবস্থারও দায় রয়েছে এসব ঘটনায়! সাধারণ মানুষকে এইসব দুর্যোগের এর সময় প্রাথমিকভাবে কী কী কাজ করা দরকার তার কোন হাতেকলমে শিক্ষা এ দেশে দেয়া হয় না স্কুল লেভেলে। অন্যান্য দেশে শিশুদের শৈশব থেকেই দুর্যোগকালীন মহড়া শেখানো হয়। অথচ আমাদের দেশে আগুন লাগলে, ভূমিকম্পের সময়, বন্যার সময়, বজ্রপাতের সময় কী করা উচিৎ তার কোন মহরা নাই, প্রশিক্ষণ নাই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফায়ার সার্ভিস এর অব্যবস্থাপনা। না আছে ওনাদের আধুনিক সরঞ্জাম, না আছে আধুনিক প্রশিক্ষণ, না আছে দ্রুত চলে আসার মতো খোলা রাস্তা। উপরন্তু মানুষের অবিবেচকের মত আচরণ যেমন, রাস্তা আটকে ভিডিও করা যার ফলে ফায়ার সার্ভিস বা এম্বুল্যান্স এর মত জরুরি যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে- আরো সমস্যা বাড়ায়।
গতকাল উত্তরায় যে ৬ জন মানুষ পুড়ে মারা গেলেন, তারা কেবল সংখ্যা নন; তারা আমাদের অব্যবস্থাপনার শিকার। এভাবে চলতে থাকলে এই লাশের মিছিল দীর্ঘ হতেই থাকবে। নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে হলে রাজউকের কঠোর তদারকি, ভবন মালিকদের দায়বদ্ধতা এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।
সাজ্জাদ সিয়াম, লেখক ও শিক্ষক
