জামায়াত-এনসিপি রাজনৈতিক জোটের গুঞ্জনে গত দুই দিন ধরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন সয়লাব। এক পক্ষ এ জোটকে স্বাগত জানালেও এই জোটের দরুণ এনসিপির রাজনীতি বিলীন হয়ে যাওয়ার আশংকা করছেন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বরা। যেখানে বাংলাদেশে ভোটের মাঠে বিএনপি- আওয়ামীলীগ সবারই জামায়াতের সাথে জোট করার অতীত ইতিহাস বিদ্যমান,সেখানে এনসিপির জোট করাতে সমস্যা কোথায়?
শোনা যাচ্ছে, এনসিপি প্রাথমিকভাবে ৫০ টি আসন দাবি করলেও জামায়াত এনসিপির জন্য ৩০ টি আসন ছাড়তে রাজি।সেই সাথে জানা যায় আসন প্রতি দেড় কোটি টাকা নির্বাচনী ফান্ডিং ও পাবার কথা এনসিপির। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে এনসিপির বিভিন্ন অংশের থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক আহ্বায়ক আব্দুল কাদের “এতে তারুণ্যের রাজনীতির কবর রচিত হতে যাচ্ছে এবং কার্যত এনসিপি জামায়াতের গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে” বলে মন্তব্য করেন। তাছাড়াও এনসিপির প্রগতিশীল অংশ সোশাল মিডিয়ায় এ জোট নিয়ে নানা সমালোচনায় মুখোর।আনুষ্ঠানিকভাবে এ জোটের ঘোষণা চলে আসলে দলের ভিতর রীতিমতো ভাঙনেরও গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় নেতাদের কেও কেও ঘোষণা দিয়ে পার্টি ছেড়েছেন।এনসিপির কেন্দ্রীয় নারী নেতৃত্বের অনেকেই এ জোটের জোড়ালো বিরোধিতা করছেন। এনসিপি নেত্রী ডা.তাসনিম জারা তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সতন্ত্র থেকে নির্বাচনের কথা জানিয়েছেন।বাকি নারী নেত্রীদের থেকেও পাওয়া যাচ্ছে একই ইঙ্গিত। জোটের খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার পর পরই এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ও চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির প্রধান সমন্বয়কারী মীর আরশাদুল হক পার্টি ছেড়েছেন।তিনি ‘দল ও বড় অংশের নেতারা ভুল পথে আছেন’ বলে অভিযোগ করে পার্টি থেকে পদত্যাগ করেন।
অর্থাৎ, জোটের সম্ভাবনাতেই এনসিপির মতো সদ্য জন্মানো একটা দলে দেখা যাচ্ছে ভাঙ্গন ও ফাটল ধরার তীব্র আশংকা। এর আগে, দলটির আরও তিন জন কেন্দ্রীয় নেতা – অনিক রায়, তুহিন খান এবং অলিক মৃ দলটি থেকে পদত্যাগ করেছেন।
তাছাড়াও ইতোমধ্যে প্রায় দেড় শ’ আসনে এনসিপি প্রার্থীদেরকে নমিনেশন দিয়েছে।আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে প্রার্থীরা ব্যাপক প্রচার-প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন জোটের নিয়মানুযায়ী এনসিপি যদি কেবল ত্রিশ আসনে প্রার্থী দেয়, তবে বাকি প্রার্থীরা তা সহজ স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার কথা না।দলের মধ্যে বিদ্রোহ দেখা দেওয়ার আশংকা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।তরুণদের জন্য এক অপার সম্ভাবনা ও অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি নিয়ে জুলাই অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া দলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল।দল গঠনের এক বছরের মাথায় তাতে এমন বহুমুখী ভাঙ্গনের সম্ভাবনা যে রাজনীতির নতুন বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি দেওয়া পার্টির জন্য শুভ সংকেত না, তা বোধ করি সন্দেহ ছাড়াই দাবি করা যায়।
আওয়ামীলীগের প্রচার করা প্রোপাগাণ্ডার কারণেই হোক কিংবা এনসিপি নেতাদের বিভিন্ন সময়ে করা বেফাঁস মন্তব্যের কারণেই হোক, এনসিপি দীর্ঘদিন ধরেই লোকমুখে জামায়াতের বি টিম হিসেবে সমালোচিত।জোটে সাধারণত যারা অধিকতর শক্তিশালী, তারাই নেতৃত্ব দেয় এবং বাকিরা সে দলকে অনুসরণ করে।বর্তমান বাংলাদেশে বিএনপি ও জামায়াতের পরে এনসিপি তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে অলিখিত ভাবে প্রতিষ্ঠিত।প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকেই হাসনাত, সার্জিসরা দেশে বাইনারির বাইরের রাজনীতির কথা বলে আসছেন।বাংলাদেশের রাজনীতিতে লীগ-বিএনপির বাইরে গিয়ে নতুন এক রাজনৈতিক বন্দোবস্তের স্বপ্ন আমাদেরকে দেখিয়েছিলেন নাহিদ ইসলামেরা।কিছুদিন আগে এবি পার্টি, এনসিপি ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনকে নিয়ে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ নামে একটি জোট করা হয়।সেই জোটের মূল প্রতিপাদ্য ছিল বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে গিয়ে তৃতীয় শক্তিশালী একটি পক্ষ হিসেবে নিজেদের দাঁড় করানো এবং শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করা।তবে জামায়াতের সাথে জোট ও আসন সমাঝোতার খবরে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের পক্ষ থেকে এটিকে জোটের আকাঙ্খার পরিপন্থী বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।সাধারণত, জোটের নিয়ামনুসারে, যে দল বেশি শক্তিশালী সে দল ডমিনেট করে।এক্ষেত্রে জোটবদ্ধ হওয়ার পর এনসিপির রাজনৈতিক ভবিষ্যত জামায়াতের সাথে বিলীন হয়ে যাওয়াতেই এগুচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন অমূলক নয়।প্রশ্ন উঠতে পারে, যদি লীগ, বিএনপি সবাই জামায়াতের ভোট ব্যাংককে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা উঠাতে পারে, এনসিপি করলে দোষ কোথায়।আওয়ামী লীগ যখন ’৯৬ এ জামায়াতের সাথে যুগপদ আন্দোলন গড়ে তোলে তখন আওয়ামী লীগ প্রায় অর্ধশত বর্ষ আগে জন্ম নেওয়া একটি রাজনৈতিক দল।
বিএনপি যখন জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হয়, ততদিনে তাদের একাধিকবার সরকারে গিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার সুস্পষ্ট অভিজ্ঞতা বিদ্যমান।কিন্তু আদতে মাত্র এক বছরও হয়নি এনসিপি দলটি তার যাত্রা আরম্ভ করেছে।ইতোমধ্যে তাদের নামের পাশে জামাটের বি টিম নামক ট্যাগ কথিত আছে।এখনো তাদের রাজনীতি পোক্ত ভাবে দাঁড়ায় নাই।এখনো তারা নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ও আদর্শিক লাইন প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে।দলকে গড়ে তোলার কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের গহ্বরে ঢুকে যাওয়ার আশংকা তৈরি হয়, সে লাইন এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে বিবেচিত।
কেবল এনসিপির ভবিষ্যতই নয়, দেশের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি ও চর্চা ফিরিয়ে আনতে এনসিপিকে একটি স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে খুঁটি গেড়ে দাঁড়ানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।জামাতের সাথে জোটে গেলে হয়তো কিছু আসনে তারা জিতে আসতে পারবে।তবে এনসিপি তো গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া একটি দল।রাজপথে হাজার শহিদের রক্ত ও বিপ্লবের উপর ভর করে গড়ে ওঠা দল।তারা যদি শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে ক্ষমতার রাজনীতিতে সাময়িক স্বল্প সফলতার লোভ সংবরণ করে দীর্ঘ মেয়াদী রাজনীতির পরিকল্পনায় এগুতে থাকে, তবে আগামী ২০-২৫ বছর পর এনসিপি জাতীয় রাজনীতির গণতান্ত্রিক সংগ্রামে এক বিশ্বস্ত বিকল্প হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে পারবে।
অপর দিকে জামায়াত এ জোটের পূর্ণ ফায়দা হাসিল করবে। তাদের বাঁধা ভোট ব্যাংক নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা নেই।তবে এনসিপির মতো স্বঘোষিত মধ্যমপন্থী একটি দল জোটে ভিড়লে যেসব সেকুলার লিবারালরা আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে একটি মধ্যমপন্থী দলের অপেক্ষায় ছিল, তাদের ভোট সে জোট আকৃষ্ট করতে সক্ষম হবে।
তাছাড়া জামায়াতের নামের পাশে দীর্ঘদিন ধরে লেগে থাকা একাত্তর বিরোধী ট্যাগ তাদের জন্য একটি বিশাল প্রতিবন্ধকতা।এনসিপি বরাবরই একাত্তর ও চব্বিশ উভয়কেই ধারণ করে তাদের রাজনৈতিক ক্যাম্পেইন সাজিয়েছে।ফলে এনসিপিকে জোটে পেলে নিজেদের পক্ষে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সেকুলার ও মুক্তিযদ্ধপন্থী ভোটকেও নিজেদের দিকে ভিড়ানো সম্ভবপর হবে।তেমনি জামায়াত নিজের ডানপন্থী মতাদর্শ দিয়েই জোটের কর্মসূচি প্রদান ও বাস্তবায়ন করতে চাইবে।জোটের প্রভাবশালী দল হওয়ায় এনসিপির মধ্যমপন্থী মতাদর্শকে ছাপিয়ে ডানপন্থী রাজনীতি প্রকট ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং সেটি জামায়াতের সুস্পষ্ট সফলতা।
তাছাড়া শহিদ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর দেশে সংবাদ মাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন গুলোতে একযোগে সংঘবদ্ধ হামলায় শিবিরের অংশগ্রহণ ও উস্কানি দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে।প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটে মব আক্রমণে শিবির নেতার উস্কানি দেওয়ার ভিডিও সোশাল মিডিয়াতে ভাইরাল।এনসিপি সে মবোক্রেসির সাথে নিজেদের নাম জড়িয়ে জুলাই অভ্যুত্থানপন্থী জন আকাঙ্খার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে ভোটের মাঠে কতটুকু এগিয়ে থাকতে পারবে সেটি তাদের বিবেচনা করার সময় এসেছে।তার পাশাপাশি এনসিপির স্টুডেন্ট উইং- বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের রাজনীতি অনেকটাই শিবির বিরোধী ধ্যান ধারণায় দাঁড়িয়ে আছে।এখন হঠাৎ এই জোট সমাঝোতা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে বাগছাসের রাজনীতিকে বেকায়দায় ফেলবে। আর ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে এনসিপির রাজনীতি না দাঁড়ালে জাতীয় রাজনীতিতেও তারা এর প্রভাব অনুভব করবে এবং নেতৃত্বে এক ভ্যাকিউম সৃষ্টি হবে।
কিন্তু নাহিদ ইসলামেরা যে নিজেদের একেবারে বিকিয়ে দিয়ে জোটবদ্ধ হচ্ছে এ কথাও অসত্য।জানা যায়, এনসিপিকে আসন প্রতি দেড় কোটি টাকা দিবে জামায়াত।এতে তাদের ফান্ডিং সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।সেই সাথে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে জামায়াত এনসিপি জোট যদি নির্বাচনে বিজয়ী হয় তবে এনসিপি প্রধান নাহিদ ইসলামের হবেন প্রধানমন্ত্রী কিংবা না জিতলে নাহিদ হবেন প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা।তবুও এসকল সাময়িক প্রাপ্তিকে ছাপিয়ে দীর্ঘমেয়াদী বাংলাদেশপন্থী রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে ডানপন্থী শক্তির সাথে হাত না মিলিয়ে একটি মধ্যম্পন্থী স্বতন্ত্র বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের দাঁড় করানোই এনসিপির নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং বাংলাদেশে সার্বিক গণতান্ত্রিক উত্তরণের সর্বোত্তম মাধ্যম।
ইসমাম জামান,ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
